ইরানের কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত পারমাণবিক স্থাপনাগুলো থেকে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম জব্দ করার পরিকল্পনা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। নিউইয়র্ক পোষ্টের চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানে মার্কিন বিশেষ বাহিনী দেশটির সামরিক ইতিহাসের ‘সবচেয়ে জটিল ও অত্যাধুনিক অভিযান’ চালানোর জন্য প্রস্তুত।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) উপ-পরিচালক জোসেফ রজার্স বলেছেন, বলতে খারাপ লাগছে, তবে আমার মনে হয় ইরানের বর্তমান পারমাণবিক উপাদান সরানোর সবচেয়ে সম্ভাব্য উপায় হলো সামরিক অভিযান। কারণ আলোচনায় খুব দ্রুত কোনো অগ্রগতি হচ্ছে না।
যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক পরিকল্পনার সঙ্গে পরিচিত একটি সূত্র শুক্রবার নিউইয়র্ক পোস্টকে জানিয়েছে, অত্যন্ত জটিল এই অভিযানে হাজারো স্থলসেনা ইরানের কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে প্রবেশ করবে। তাদের বিস্ফোরক ফাঁদ (বুবি ট্র্যাপ) এড়িয়ে এগোতে হবে, ধ্বংসস্তূপ সরাতে নির্মাণকর্মীদের কাজে লাগাতে হবে এবং পুরো এলাকা ঘিরে একটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষাবলয় গড়ে তুলতে হবে। এরপর বিশেষ অভিযান বাহিনীর একটি ছোট দল সরাসরি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম উদ্ধার করবে।
সূত্রটির ভাষায়, এটি হবে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ একটি প্রক্রিয়া।
এনিয়ে জোসেফ রজার্স বলেন, আমার মনে হয় এটি সামরিক ইতিহাসের সবচেয়ে, অথবা অন্যতম সবচেয়ে, জটিল অভিযান হবে। তিনি আরও বলেন, এটি হবে একটি বিরাট লজিস্টিকনির্ভর এবং যুদ্ধপরিস্থিতিতে পরিচালিত কঠিন অভিযান। ইরানের সামরিক সক্ষমতা অনেকটাই ধ্বংস হয়েছে, তবে তারা এখনও ভেনেজুয়েলার ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে পাহারা দেয়া কিউবান বাহিনীর চেয়ে অনেক বেশি সক্ষম।
দ্য হাই সাইড নামে একটি স্বাধীন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই বিশেষ অভিযানে সিল টিম ৬-এর সিলভার স্কোয়াড্রন, ২য় রেঞ্জার ব্যাটালিয়ন এবং মার্কিন সেনাবাহিনীর ২১তম অর্ডন্যান্স কোম্পানি অংশ নিতে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২১তম অর্ডন্যান্স কোম্পানির দায়িত্ব হবে ব্যাপকভাবে ধ্বংস হওয়া ফোরদো এবং গুরুতর ক্ষতিগ্রস্ত ইসফাহান পারমাণবিক স্থাপনা থেকে যত পরিমাণ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম পাওয়া যাবে, তা নিরাপদে সংগ্রহ ও পরিবহন করা।
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনে জানায়, ইরানের কাছে ২০ হাজার পাউন্ডেরও বেশি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে।
রজার্স বলেছেন, যেসব স্থাপনা থেকে উপাদান সংগ্রহ করা হবে, সেগুলোর চারপাশে নিরাপদ নিরাপত্তাবলয় গড়ে তুলতে হবে। এর জন্য স্থলবাহিনীকে পুরো এলাকা নিয়ন্ত্রণে নিতে হবে এবং বিমানঘাঁটি পর্যন্ত নিরাপদ কনভয় চলাচলের পথ নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি জানান, মার্কিন সেনাদের ধ্বংস হয়ে যাওয়া প্রবেশপথ খনন করে খুলতে হবে, একই সঙ্গে ইরানের সামরিক বাহিনীর সম্ভাব্য হামলাও প্রতিহত করতে হবে।
ট্রাম্প প্রশাসনের প্রথম মেয়াদে হোয়াইট হাউসের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদে (এনএসসি) ইরানের গণবিধ্বংসী অস্ত্র মোকাবিলাবিষয়ক পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা রিচার্ড গোল্ডবার্গ বলেন, প্রশ্ন হলো, আপনি কতক্ষণ এ ধরনের অভিযান চালিয়ে যেতে পারবেন এবং একই সঙ্গে কীভাবে সব সেনাকে নিরাপদে ফিরিয়ে আনবেন?
তার মতে, এই অভিযানের জন্য এমন একটি আকাশপথ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে, যাতে মার্কিন সামরিক বিমান নিরাপদ স্থানে যাতায়াত করতে পারে।
গোল্ডবার্গ বলেন, ইরান ইতোমধ্যে ইসফাহান স্থাপনায় সম্ভাব্য হামলার প্রস্তুতি নিয়েছে। তার ভাষায়, আমরা এমন প্রতিবেদন দেখেছি যে ইসফাহান স্থাপনার প্রতিরক্ষা আরও জোরদার করা হয়েছে, সেখানে বিস্ফোরক ফাঁদ পাতা হয়েছে এবং চারপাশে নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, এ মুহূর্তে আকস্মিক হামলার কোনো সুযোগ নেই। লক্ষ্যবস্তু কোথায় আছে, আমরা জানি; ইরানও জানে। এর আগে গত মাসে সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সম্ভাব্য অভিযানের আশঙ্কায় ইরান ইসফাহান স্থাপনার টানেলগুলোতে মাইন ও বিস্ফোরক পেতে রেখেছে।
এদিকে, গত এক মাসে ইরানের নাতাঞ্জ পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র থেকে শত শত সেন্ট্রিফিউজ সরিয়ে নেয়ার খবর প্রকাশের পর পিকঅ্যাক্স মাউন্টেননতুন সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হিসেবে উঠে এসেছে।
গোল্ডবার্গ বলেন, আমরা জানি না সেখানে কতগুলো সেন্ট্রিফিউজ রয়েছে। সেগুলো খুলে নেওয়া হবে, ধ্বংস করা হবে নাকি বাইরে নিয়ে আসা হবে—এটা নিশ্চিত নয়। তবে যদি পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনে বিশেষ অভিযান চালানো হয়, তাহলে সম্ভবত তার কারণ হবে আকাশ হামলায় স্থাপনাটি ধ্বংস করা সম্ভব নয় বলে মনে করা।
তিনি বলেন, শুধু বিমান হামলাই যথেষ্ট হবে কিনা, তা নির্ভর করবে ভবনটির নকশা ও দুর্বল অংশ সম্পর্কে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তথ্যের ওপর।
তার মতে, ফোরদোতে বাঙ্কার-বাস্টার বোমা হামলার সময় যেমন স্থাপনাটির দুর্বল এয়ার শ্যাফটকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল, এখানেও তেমন কৌশল প্রয়োজন হতে পারে।
গোল্ডবার্গ বলেন, এটি হবে ধ্বংসের মিশন। যদি স্থাপনার ভেতরে প্রবেশ করতে হয়, তাহলে উদ্দেশ্য হবে পুরো স্থাপনাটিই ধসিয়ে দেয়া।
তবে ইসফাহান ও ফোরদোর তুলনায় পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনে দ্রুত সফল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি বলে মনে করেন তিনি।
তার ভাষায়, পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনের অভিযানটি সম্ভাব্যভাবে মাদুরো অভিযানের মতো হতে পারে। কারণ সেখানে গোপনে প্রবেশ করে বিস্ফোরক স্থাপন করা এবং দ্রুত সেখান থেকে বেরিয়ে আসাই হবে মূল কৌশল।
