দেশের বৃহত্তম শরীয়াহভিত্তিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি’র নিয়ন্ত্রণ, দখল, শেয়ার কেলেঙ্কারি, জালিয়াতি ও আত্মসাতের অভিযোগে সাবেক প্রেসিডেন্ট মো. সাহাবুদ্দিনসহ ২১ জনের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ মিলেছে তদন্তে। এই অভিযোগে এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলম (এস. আলম) এবং ব্রিলিয়ান্ট বিজনেস কোম্পানি লিমিটেডের চেয়ারম্যান-ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ মোট ২১ জনের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা হয়েছিল ২০২৪ সালের অক্টোবরে। ওই মামলার তদন্ত চেয়ে উচ্চ আদালতে রিট হয়েছিল। রিটের শুনানি নিয়ে ঘটনা তদন্তের নির্দেশ দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। নির্দেশনা অনুযায়ী দীর্ঘ তদন্ত শেষে বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা বিভাগ (বিএফআইইউ) উচ্চ আদালতে প্রতিবেদন জমা দেয়। ওই প্রতিবেদনে সাবেক প্রেসিডেন্ট সাহাবুদ্দিনসহ আসামিদের সংশ্লিষ্টতার বিষয় উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদনের ওপর বুধবার হাইকোর্টে শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে।
মানবজমিন প্রতিবেদনটির কপি হাতে পেয়েছে। এতে চারটি স্বাধীন নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের অনুসন্ধানে অন্য আসামিদের সঙ্গে সাবেক প্রেসিডেন্ট সাহাবুদ্দিনের সংশ্লিষ্টতার তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে এবং সেগুলো লন্ডনভিত্তিক একটি ফরেনসিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে যাচাইয়ের কথাও বলা হয়েছে। পরে এসব প্রতিবেদন যাচাই-বাছাই করে লন্ডনভিত্তিক ফরেনসিক প্রতিষ্ঠান অনুমোদন দিয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
আদালতে দাখিল করা বিএফআইইউ’র ৪২ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে জেএমসি বিল্ডার্সের মাধ্যমে ব্যাংকের শেয়ার নিয়ন্ত্রণ এবং এস আলম গ্রুপের স্বার্থ রক্ষায় সাবেক প্রেসিডেন্ট মো. সাহাবুদ্দিনের ভূমিকা ছিল বলে অভিযোগ উল্লেখ করা হয়েছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্যে বলা হয়েছে, ২০১৭ সালে সরকারের প্রত্যক্ষ মদতে এস আলম গ্রুপ ব্যাংক কোম্পানি আইনের বিভিন্ন বিধান লঙ্ঘন করে ইসলামী ব্যাংকের প্রায় ৮২ শতাংশ শেয়ারের নিয়ন্ত্রণ নেয়। ওই সময় জেএমসি বিল্ডার্সের প্রতিনিধি হিসেবে মো. সাহাবুদ্দিনকে পরিচালনা পর্ষদে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। পরে তিনি ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন এবং প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগে ওই পদ থেকে সরে দাঁড়ান। প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, জেএমসি বিল্ডার্স ব্যাংক থেকে জালিয়াতির মাধ্যমে অর্থ বের করে সেই অর্থ দিয়েই পুনরায় ব্যাংকের শেয়ার কিনেছিল। একইসঙ্গে পরিচালনা পর্ষদে থেকে এস আলম গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ অনুমোদনের মাধ্যমেও ব্যাংকটিকে আর্থিক সংকটে ফেলা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে, সাবেক প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া, সাংবিধানিক সুরক্ষা এবং আইনি অবস্থান নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বর্তমানে মামলাটি আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। মামলাটি নিয়ে এতোদিন তেমন কোনো আলোচনাও ছিল না।
এ বিষয়ে গতকাল ‘অধিকার’ এর অনুষ্ঠানে সাবেক প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন করা হলে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, আইনে যখন ব্যাখ্যার প্রয়োজন আসবে তখন দেখা যাবে। এখনই এ বিষয়ে কিছু বলার সময় হয়নি। তিনি আরও বলেন, প্রেসিডেন্টের জন্য আইনে কিছু সুরক্ষা রয়েছে, বিষয়টি যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। এ বিষয়ে ইসলামী ব্যাংককে আইনি সহায়তা দানকারী আইনজীবী ব্যারিস্টার এম. আব্দুল কাইয়ুম মানবজমিনকে বলেন, ইসলামী ব্যাংকের শেয়ারসংক্রান্ত মামলার শুনানি বর্তমানে হাইকোর্টে চলমান রয়েছে এবং আগামী বুধবার মামলার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য রয়েছে। তিনি বলেন, ইসলামী ব্যাংকের হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ, বিশ্বাস ভঙ্গ ও জালিয়াতির অভিযোগে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ২০২৫ সালে সাবেক প্রেসিডেন্ট সাহাবুদ্দিনসহ ২১ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে এবং আদালত মামলার তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। বিষয়টি বর্তমানে আদালতের বিচারাধীন রয়েছে।
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি’র নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ, শেয়ার জালিয়াতি, প্রতারণা, বিশ্বাস ভঙ্গ ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে ঢাকার সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতে ২০২৫ সালে দায়ের হওয়া মামলায় সাবেক প্রেসিডেন্ট মো. সাহাবুদ্দিন, এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলম (এস আলম), ব্রিলিয়ান্ট বিজনেস কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল ওয়াহেদ, চেয়ারম্যান মিরফাত আরা বেগমসহ মোট ২১ জনকে আসামি করা হয়। ব্যাংকের পক্ষে ক্ষমতাপ্রাপ্ত প্রতিনিধি ও সিনিয়র অফিসার আবদুচ ছামাদ বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন। মামলাটি সি.আর. মামলা নং-১০২/২০২৫। এতে দণ্ডবিধির ৪০৯, ৪২০, ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১, ৪৭৭এ, ৩৪ ও ১০৯ ধারাসহ সংশ্লিষ্ট আইনের বিভিন্ন ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, পরিকল্পিতভাবে জালিয়াতি, প্রতারণা, জাল দলিল সৃষ্টি, হিসাব জালিয়াতি ও ফৌজদারি বিশ্বাস ভঙ্গের মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ দখল করে জনগণের হাজার হাজার কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি করা হয়েছে।
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, ২০১৭ সালে এস আলম গ্রুপের পরিকল্পনা ও প্রত্যক্ষ মদতে ব্রিলিয়ান্ট বিজনেস কোম্পানি লিমিটেডসহ মোট ২৪টি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংকের প্রায় ৮১ দশমিক ৯২ শতাংশ শেয়ার অধিগ্রহণ করা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশই এস আলম গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিল এবং সমন্বিতভাবে ব্যাংকের মালিকানা ও পরিচালনা পর্ষদের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে। এজাহারে আরও বলা হয়েছে, মাত্র ৮ লাখ টাকা পরিশোধিত মূলধন থাকা ব্রিলিয়ান্ট বিজনেস কোম্পানি লিমিটেড প্রায় ২৫১ কোটি টাকা মূল্যের ৭ কোটি ৭৫ লাখ ৩৬ হাজার ৩৯৩টি শেয়ার ক্রয় করে, যা প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক সক্ষমতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। অভিযোগে বলা হয়েছে, এই শেয়ার ক্রয় পূর্বপরিকল্পিত প্রতারণা এবং অবৈধ অর্থায়নের মাধ্যমে সম্পন্ন করা হয়।
মামলার নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট ২৪টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৬টির হিসাব ছিল ইউনিয়ন ব্যাংক পিএলসিতে, চারটির হিসাব ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক পিএলসিতে এবং কয়েকটির হিসাব ছিল কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলন (বাংলাদেশ)-এ। তদন্তে ধারণা করা হয়েছে, এসব হিসাবের মাধ্যমে শেয়ার ক্রয়ের অর্থের জোগান দেয়া হয় এবং ইসলামী ব্যাংকের নিজস্ব অর্থও বিভিন্ন কৌশলে ব্যবহার করা হয়। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, শেয়ার অধিগ্রহণের পর অভিযুক্তদের মনোনীত ব্যক্তিদের পরিচালনা পর্ষদে পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। অথচ তাদের অনেকেই যে প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি হিসেবে পরিচালক হন, সেই প্রতিষ্ঠানের কোনো শেয়ারের মালিক ছিলেন না। ফলে পরিচালক নিয়োগের বৈধতা ও উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। মামলায় আরও অভিযোগ করা হয়েছে, পরিচালনা পর্ষদের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার পর এস আলম গ্রুপসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে বিপুল অঙ্কের ঋণ ও বিনিয়োগ অনুমোদন দেয়া হয়। পরবর্তীতে ওই অর্থ আত্মসাৎ ও বিদেশে পাচার করা হয়েছে বলেও এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে, ২০২৫ সালের ৪ঠা ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানো ইসলামী ব্যাংকের এক প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে মামলায় বলা হয়েছে, কয়েকটি শেয়ারহোল্ডার প্রতিষ্ঠান যোগসাজশে ১০ দশমিক ৭০৩৯ শতাংশ শেয়ার ধারণ করে ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ১৪ক ও ১৪খ ধারা লঙ্ঘন করেছে। একইসঙ্গে বিএসইসি’র অধিগ্রহণ বিধিমালা, ২০০২ ও ২০১৮ অনুসরণ না করার অভিযোগও আনা হয়েছে।
