মর্গের লাশ থেকেও টাকা আদায়

মর্গের লাশ থেকেও টাকা আদায়

ফন্ট সাইজ:

মৃত্যুর পরও রেহাই নেই, জিম্মি হচ্ছে লাশ। স্বজনের কান্না, শোক আর অসহায়ত্বকে পুঁজি করে রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে গড়ে উঠেছে ভয়ঙ্কর এক অবৈধ বাণিজ্য। অভিযোগ, অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় সরকারি নিয়মে বিনামূল্যে হওয়ার কথা থাকা ময়নাতদন্ত করাতে গিয়ে লাশপ্রতি ৭ থেকে ১২ হাজার টাকা পর্যন্ত গুনতে বাধ্য হচ্ছেন স্বজনরা। শুধু তাই নয়, লাশ নামানো থেকে শুরু করে ময়নাতদন্ত, দ্রুত রিপোর্ট, এমনকি লাশ এম্বুলেন্সে তোলার প্রতিটি ধাপেই অর্থ আদায়ের ফাঁদ পেতে রাখা হয়েছে। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এই অর্থ বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত একটি সংঘবদ্ধ চক্র। অভিযোগ রয়েছে, মর্গের কর্মচারীদের পাশাপাশি হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের দায়িত্বশীলদের একটি অংশের যোগসাজশেই চলছে এই অনিয়ম।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মিরপুর বিভাগের সাতটি জোনের পাঁচটি থানা এবং সাভার-আশুলিয়া এলাকার অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় উদ্ধার হওয়া লাশের ময়নাতদন্ত হয় শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে। সম্প্রতি সেখানে অনুসন্ধান চালিয়ে স্বজনদের কাছ থেকে অর্থ আদায়সহ নানা অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ময়নাতদন্তের প্রতিটি ধাপেই এমন পরিস্থিতি তৈরি করা হয়, যাতে স্বজনরা বাধ্য হয়ে টাকা দেন। অভিযোগ রয়েছে, ডোম থেকে শুরু করে ফরেনসিক বিভাগের কিছু দায়িত্বশীল ব্যক্তির যোগসাজশেই দীর্ঘদিন ধরে এই অবৈধ কার্যক্রম চলছে।

সম্প্রতি সাভারের আশুলিয়া থানার শিমুলিয়া ইউনিয়নের এক নারীর লাশ ময়নাতদন্ত করাতে এসে চরম ভোগান্তির শিকার হন তার স্বজনরা। নিহতের স্বজন মনছুর আলী বলেন, ছেলের স্ত্রীর সঙ্গে কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে শাশুড়ির সঙ্গে হাতাহাতি হয়। এ সময় গলা চেপে ধরলে তিনি অজ্ঞান হয়ে যান। হাসপাতালে নেয়ার পর চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। পরে মামলার কারণে লাশ ময়নাতদন্তের জন্য সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের মর্গে পাঠায় পুলিশ। তিনি বলেন, লাশ নিয়ে মর্গে পৌঁছানোর পরই নানা অজুহাত শুরু হয়। বলা হয়, মর্গে জায়গা নেই, স্যার নেই, আজ আর হবে না। পরে লাশ গাড়ি থেকে নামানোর জন্য টাকা চাওয়া হয়। কিছু টাকা দেয়ার পর তারা লাশ ভেতরে নেয়।

মনছুর আলী জানান, এরপর তাদের হাতে একটি ছোট সাদা কাগজ ধরিয়ে দেয়া হয়। সেখানে লেখা ছিল- দু’টি বাজারের ব্যাগ, আধা কেজি ওজনের ছয় প্যাকেট রিন ডিটারজেন্ট, একটি ডেটল সাবান, দু’টি আতর, দু’টি হ্যান্ড গ্লাভসসহ আরও কয়েকটি সামগ্রী কিনে আনতে হবে। তিনি সবকিছু কিনে আনার পর আবার বলা হয়, ‘লাশ কাটতে হলে ১০ হাজার টাকা লাগবে। মনছুর আলী বলেন, আমি বললাম, এটা তো সরকারি কাজ। টাকা লাগবে কেন? তখন তারা জানায়, প্রতি মাসে ম্যাডামকে ৩০ হাজার টাকা দিতে হয়। আমাদের কোনো বেতন নেই। টাকা না দিলে লাশ ধরা হবে না। শেষ পর্যন্ত নিরুপায় হয়ে ৭ হাজার টাকা দিয়ে ময়নাতদন্ত করিয়ে লাশ নিয়ে বাড়ি ফিরেছি।

এর কিছুদিন আগে রাজধানীর কাফরুল এলাকা থেকে রাবেয়া নামে এক নারীর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে লাশটি ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয় একই মর্গে। অভিযোগ, ময়নাতদন্ত শেষে লাশ বুঝে পেতে তার পরিবারকে গুনতে হয়েছে সাড়ে ৮ হাজার টাকা। একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন পটুয়াখালীর বাউফলের বাসিন্দা সুমাইয়ার স্বজনরাও। মোহাম্মদপুরের একটি তালাবদ্ধ ফ্ল্যাট থেকে সুমাইয়ার অর্ধগলিত ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। মৃত্যুর কারণ জানতে সেটিও পাঠানো হয় সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে। স্বজনরা জানান, প্রথমে বিভিন্ন সামগ্রী কিনে দিতে হয়েছে। এরপর লাশ নামাতে টাকা, ময়নাতদন্ত শেষে লাশ এম্বুলেন্সে তুলতে টাকা এবং দ্রুত ময়নাতদন্তের জন্য আলাদা করে ৬ হাজার টাকা দিতে হয়েছে। তাদের অভিযোগ, মর্গে জীবন নামে এক ব্যক্তি রয়েছেন, যিনি লাশ কাটার কাজ করেন। তিনি সরাসরি বলেন, ‘টাকা না দিলে লাশ কেটে রেখে দেবো, সেলাই করবো না। বাড়ি নিয়ে গিয়ে নিজেরা সেলাই করে নিয়েন। পরে বাধ্য হয়েই টাকা দিতে হয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, এভাবেই ময়নাতদন্তের জন্য আসা প্রায় প্রতিটি লাশকে কেন্দ্র করে চলছে অর্থ আদায়ের এই বাণিজ্য। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মর্গের এক কর্মী জানান, পুরো কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করেন জীবন ওরফে জানু লাল। তিনি আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে সহকারী হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত। তার সঙ্গে সেলিনা নামে আরেক বহিরাগত নারী কাজ করেন। এই দু’জনই মর্গের অধিকাংশ কার্যক্রম পরিচালনা করেন। ওই কর্মীর দাবি, তাদের কর্মকাণ্ডের পেছনে হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. নাশাত জাবীনের আশ্রয়-প্রশ্রয় রয়েছে। প্রতি মাসে তাকে ৩০ হাজার টাকা দিতে হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তিনি আরও বলেন, স্বজনদের দিয়ে আতর, ডিটারজেন্ট, সাবানসহ যেসব সামগ্রী কিনিয়ে আনা হয়, সেগুলোর বেশির ভাগই ব্যবহার করা হয় না। ময়নাতদন্ত শেষে সেগুলো দোকানে ফেরত দিয়ে টাকা নিয়ে নেন জীবন। এ বিষয়ে দোকানিদের সঙ্গে তাদের আলাদা সমঝোতা রয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

তবে জানু লাল এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আমরা আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে কাজ করি। কোনো বেতন পাই না। কাজ শেষে যে যা দেয়, তা দিয়েই সংসার চলে। কেউ ৫০০ টাকা দেয়, কেউ ১ হাজার টাকা বকশিশ দেয়। এটাই আমাদের আয়। এর বাইরে অন্য কিছু জানি না। অন্যদিকে, নাম প্রকাশ না করার শর্তে মর্গ-সংশ্লিষ্ট আরেক ব্যক্তি বলেন, ম্যাডাম আগেই বলে দিয়েছেন, প্রতি মাসে তাকে ৩০ হাজার টাকা দিতে হবে। কিন্তু আমাদের তো কোনো বেতন নেই। এই টাকা কোথা থেকে দেবো? তাই বাধ্য হয়ে লাশ নিয়ে আসা লোকজনের কাছ থেকে নিতে হয়। ম্যাডামকে দেয়ার পর যা থাকে, তা দিয়েই আমাদের চলতে হয়। কিন্তু কোনো অভিযোগ উঠলেই সব দোষ আমাদের ঘাড়ে পড়ে।

অভিযোগের বিষয়ে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. নাশাত জাবীন কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি বলেন, পরিচালক স্যারের অনুমতি ছাড়া আমি কোনো কথা বলতে পারবো না। কোনো প্রশ্ন থাকলে অনুমতি নিয়ে আসবেন। এ বিষয়ে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক নন্দ দুলাল সাহা বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও মর্মান্তিক। আমিও লাশ জিম্মি করে টাকা নেয়ার অভিযোগ শুনেছি। এটা মোটেও ঠিক হচ্ছে না। তবে নিজেকে নিরুপায় দাবি করে তিনি বলেন, মর্গটি পুরোপুরি মেডিকেল কলেজের আওতাধীন। এর সার্বিক দায়-দায়িত্ব মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষের। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তেমন কিছু করার সুযোগ নেই। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার দায়িত্ব মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষেরই।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন