সৌভাগ্যবান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন অবশেষে পদত্যাগ করেছেন। অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ থেকে রাষ্ট্রপতির আসনে অধিষ্ঠিত হওয়া নিঃসন্দেহে একটি ব্যতিক্রমী রাজনৈতিক যাত্রা। এর পূর্বে বেশ কয়েকজন বিচারপতি রাষ্ট্রপতি হয়েছেন; তবে জেলা জজ থেকে রাষ্ট্রপতি হওয়ার ক্ষেত্রে তিনিই প্রথম। মাঝখানে কয়েক বছর দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কমিশনার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। দীর্ঘ চাকরি জীবনে সততা, নৈতিকতা ও প্রশাসনিক ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে নানা বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু রাজনীতির নির্মম বাস্তবতা হলো- বিতর্ক কখনো কখনো মানুষের পথ রুদ্ধ করে, আবার কখনো ভাগ্যের অদৃশ্য সিঁড়ি হয়ে ক্ষমতার সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে দেয়। সেই সৌভাগ্যের অদৃশ্য শক্তিই যেন তার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষক হিসেবে কাজ করেছে।
রাষ্ট্রপতি পদে তার মনোনয়ন আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মীর কাছেই ছিল বিস্ময়ের বিষয়। কারণ এটি কোনো দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রস্তুতির ফল ছিল না, না ছিল কোনো প্রকাশ্য রাজনৈতিক প্রত্যাশার ধারাবাহিকতা; বরং শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানার পারিবারিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই তিনি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে মনোনীত হন। বলা যায়, তিনি রাষ্ট্রপতি হওয়ার স্বপ্ন দেখার আগেই রাষ্ট্রপতি হওয়ার বাস্তবতায় পৌঁছে গিয়েছিলেন।
একসময় তিনি সংসদ সদস্য হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন; কিন্তু রাজনীতির অদ্ভুত রসায়নে সংসদের আসন নয়, পৌঁছে গেলেন তিনি বঙ্গভবনের আসনে। তার রাষ্ট্রপতি জীবনের আরেকটি অনন্য দিক হলো- তিনি ভিন্ন রাজনৈতিক বাস্তবতার তিনজন সরকার প্রধানের শপথ পরিচালনা করেছেন। শেখ হাসিনা, ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং তারেক রহমান। রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে তার সাংবিধানিক সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এটি নিঃসন্দেহে একটি বিরল অধ্যায়।
আরও একটি রাজনৈতিক বৈপরীত্য তার পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। তিনি আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির পিতা হিসেবে স্বীকৃতির ধারণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন; আবার বিএনপি’র রাজনৈতিক অনভূতির কেন্দ্রে থাকা জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে উল্লেখ করেও উভয়ের কাছে গ্রহণযোগ্যতা অর্জনের চেষ্টা করেছেন। ফলে তিনি আওয়ামী লীগ ও বিএনপি’র মধ্যে একটি সেতুবন্ধনের প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হয়েছেন।
প্রায় ৩৯ মাস রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন শেষে তার পদত্যাগপত্র এখন নতুন আলোচনার বিষয়। কারণ এটি শুধু একটি পদত্যাগের আনুষ্ঠানিক নথি নয়; এটি একজন রাষ্ট্রপতির নিজের ভূমিকার ব্যাখ্যা, নিজের সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি এবং ইতিহাসের কাছে নিজের অবস্থান তুলে ধরার একটি প্রচেষ্টা।
পদত্যাগপত্রটি পর্যালোচনা করলে এতে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ভূমিকা, শপথের অঙ্গীকার, রাষ্ট্রের বৈধতার উৎস এবং জনগণের সার্বভৌম আকাঙ্ক্ষার মধ্যে বিদ্যমান কয়েকটি গভীর তাত্ত্বিক টানাপড়েন স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
১. প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা:
পদত্যাগপত্রে রাষ্ট্রপতি উল্লেখ করেছেন- “আমার সুদীর্ঘ ও ইতিবাচক ভূমিকার কারণে দেশে কোনো সাংবিধানিক বিপর্যয় ঘটেনি।” এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি তার কার্যকালীন ভূমিকা ও সিদ্ধান্তগুলোকে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং সংকট মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। অর্থাৎ, তিনি নিজেকে এমন এক রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে চিত্রিত করেছেন, যিনি সংকটকালে রাষ্ট্রকে সম্ভাব্য বিপর্যয় থেকে উদ্ধার করেছেন।
কিন্তু রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে কোনো রাষ্ট্রপ্রধানের ভূমিকা কেবল বিদ্যমান রাষ্ট্রকাঠামোর স্থিতিশীলতা রক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বিশেষত ৫ই আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান কোনো সাধারণ রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তন ছিল না; এটি ছিল দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংকট, জনগণের ক্ষোভ এবং রাষ্ট্রের নৈতিক বৈধতার প্রশ্ন থেকে উদ্ভূত একটি ঐতিহাসিক গণজাগরণ।
এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠবে-রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক দায়িত্ব কি কেবল বিদ্যমান কাঠামোর ধারাবাহিকতা বজায় রাখা, নাকি জনগণের সার্বভৌম আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রাষ্ট্রের মৌলিক রূপান্তরের পথ সুগম করা?
৫ই আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের সময় ব্যাপক প্রাণহানি, কারফিউ জারি, নির্বিচারে গুলি এবং প্রতিরক্ষা বাহিনীকে মাঠে নামানোর মতো ঘটনাবলির প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তির ভূমিকা নিয়ে নৈতিক ও সাংবিধানিক প্রশ্ন অনিবার্যভাবে সামনে আসে।
রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক শপথ কেবল রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার শপথ নয়; এটি জনগণের অধিকার, সংবিধানের মর্যাদা এবং রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি রক্ষার অঙ্গীকার। তাই ইতিহাসের বিচারে প্রশ্ন থাকবে-তিনি কি কেবল বিদ্যমান ক্ষমতার কাঠামো রক্ষা করেছেন, নাকি জনগণের ন্যায়সঙ্গত আকাঙ্ক্ষা ও রাষ্ট্রের মৌলিক রূপান্তরের দাবির পাশে দাঁড়িয়েছেন?
সমালোচনামূলক দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়, রাষ্ট্রপতির অবস্থান গণ-অভ্যুত্থানের অন্তর্নিহিত রূপান্তরমুখী আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করতে ব্যর্থ হয়েছে; বরং বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামোর সীমার মধ্যে সংকটকে আবদ্ধ রাখার প্রচেষ্টা জনগণের উত্থাপিত নতুন রাজনৈতিক সম্ভাবনাকে সংকুচিত করেছে মাত্র।
এই প্রশ্নটি কেবল রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত ভূমিকার নয়; বাংলাদেশের রাষ্ট্রবিকাশের দীর্ঘ ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। সশস্ত্র মুক্তি সংগ্রামের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেও স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের ঘোষিত লক্ষ্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচারের ভিত্তিতে রাষ্ট্র বিনির্মাণের আকাঙ্ক্ষা-প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। ’৭১-এ রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জিত হলেও রাষ্ট্রের প্রশাসনিক, আইনি কাঠামো পূর্ববর্তী উপনিবেশিক শোষণ ও নিপীড়নমূলক বন্দোবস্তের মধ্যেই বহাল থাকে।
’২৪-এর রক্তাক্ত জুলাই গণ-অভ্যুত্থান জনগণের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী রাষ্ট্র পুনর্গঠনের এক বিরল ঐতিহাসিক সুযোগ সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি সেই রূপান্তরমুখী সম্ভাবনাকে বিদ্যমান সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার মধ্যেই আবদ্ধ রাখায় ইতিহাসের সেই বিরল সুযোগ অপূর্ণ থেকে যায়। ফলে তিনি জাতিকে পুরোনো বন্দোবস্তের ভয়াবহতার মধ্যে রেখে এবং সেই অপূর্ণ রাষ্ট্র রূপান্তরের ঐতিহাসিক দায় ও গ্লানি নিজের কাঁধে নিয়েই বিদায় নিলেন।
২. সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ: রাষ্ট্রপতি সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদের আওতায় সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের পরামর্শ গ্রহণকে তার সিদ্ধান্তের সাংবিধানিক ভিত্তি হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। আপাতদৃষ্টিতে এটি সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার একটি প্রয়াস প্রতীয়মান হতে পারে।
কিন্তু এর মধ্যেই একটি মৌলিক সাংবিধানিক প্রশ্ন নিহিত রয়েছে। আপিল বিভাগের পরামর্শ একটি আইনি মতামত হলেও, তা গণ-অভ্যুত্থানের রাজনৈতিক ও নৈতিক বৈধতার স্বীকৃতি বা জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতার (Constituent Power) নির্ধারক নয়। কারণ আদালত প্রতিষ্ঠিত সাংবিধানিক কাঠামোর (Constituted Power) অধীনে কাজ করে; কিন্তু গণ-অভ্যুত্থান সেই কাঠামোর বৈধতার মৌলিক ভিত্তি নিয়েই প্রশ্ন তোলে।
হ্যান্স কেলসেনের (Hans Kelsen) ‘Grundnorm’ তত্ত্ব অনুযায়ী, কোনো সফল মৌলিক রাজনৈতিক পরিবর্তন বিদ্যমান আইন ব্যবস্থার ভিত্তিকে পরিবর্তিত করতে পারে। আর Emmanuel Sieyes-এর ‘Constituent Power&_ ধারণা অনুসারে, জনগণই রাষ্ট্রের মূল ক্ষমতার উৎস; সংবিধান ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানসমূহ জনগণের সেই মৌলিক ক্ষমতা থেকেই বৈধতা লাভ করে। সুতরাং ১০৬ অনুচ্ছেদের আশ্রয় গ্রহণের ক্ষেত্রে মূল প্রশ্ন হলো-
যখন জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা রাষ্ট্রের মৌলিক পরিবর্তনের দাবি তোলে, তখন বিদ্যমান আইনি কাঠামোর ব্যাখ্যার মধ্যেই সেই ঐতিহাসিক পরিবর্তনের বৈধতা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। কারণ, গণ-অভ্যুত্থানের অংশীজনদের ‘আকাঙ্ক্ষা’ বিদ্যমান উপনিবেশিক কাঠামোর বিপরীতে একটি নতুন ‘সামাজিক চুক্তি’কে অনিবার্য করে তোলে।
সমগ্র বিবেচনায়, রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগপত্রটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিক বিদায়পত্র নয়; এটি একটি আত্মপক্ষ সমর্থনমূলক দলিল (Apologetic Document)। এই দলিলে বিদায়ী রাষ্ট্রপতি নিজেকে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং রাষ্ট্রকে সম্ভাব্য বিপর্যয় থেকে সুরক্ষাকারী ভূমিকার মধ্যে উপস্থাপন করেছেন।
কিন্তু ইতিহাসের বিচারে এই দলিল বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সংকটের দু’টি মৌলিক দ্বন্দ্বকে স্পষ্টভাবে সামনে নিয়ে এসেছ্তে
১. স্থিতিশীলতা বনাম রূপান্তর (Stability vs. Transformation)
২. সাংবিধানিক ক্ষমতা বনাম জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা (Constituted Power vs. Constituent Power)
এই পদত্যাগপত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তাৎপর্য এখানেই যে, এটি রাষ্ট্রের দু’টি ভিন্ন বৈধতার ধারণাকে মুখোমুখি দাঁড় করায়- একদিকে বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামোর ধারাবাহিকতা, অন্যদিকে জনগণের সার্বভৌম আকাঙ্ক্ষা। রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানসমূহের বৈধতা শেষ পর্যন্ত জনগণের কাছ থেকেই উৎসারিত হয়। তাই জনগণ যখন রাষ্ট্রের মৌলিক রূপান্তরের দাবি তোলে, তখন কেবল বিদ্যমান আইনি কাঠামোর ধারাবাহিকতা বজায় রাখাই যথেষ্ট নয়; সেই গণ-আকাঙ্ক্ষার যথাযথ সাংবিধানিক প্রতিফলন নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের একটি মৌলিক দায়িত্ব।
পরিশেষে, ইতিহাসে এই পদত্যাগপত্র কীভাবে সংরক্ষিত হবে- তার উত্তর বর্তমান রাজনৈতিক বিতর্কে নয়, বরং সময়ের নিরপেক্ষ বিচারে নির্ধারিত হবে। এটি একদিকে একজন রাষ্ট্রপতির নিজের ভূমিকার ব্যাখ্যা হিসেবে সংরক্ষিত থাকবে; অন্যদিকে এটি এমন এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের দলিল হিসেবেও বিবেচিত হবে, যখন রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, জনগণের সার্বভৌম আকাঙ্ক্ষা এবং ক্ষমতার বৈধতার প্রশ্ন মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছিল।
ইতিহাস সাধারণত কোনো রাষ্ট্রনায়কের নিজের ভাষ্যকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে গ্রহণ করে না; বরং তার সিদ্ধান্ত, তার সাংবিধানিক অবস্থান এবং সেই সিদ্ধান্তের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের আলোকে মূল্যায়ন করে।
শেষ পর্যন্ত ইতিহাসের বিচার হবে-এই পদত্যাগপত্র কি কেবল একটি তথাকথিত সাংবিধানিক সংকটের সমাপ্তির দলিল, নাকি একটি রাষ্ট্রের রূপান্তরের মুহূর্তে পুরোনো বন্দোবস্ত ও নতুন গণ-আকাঙ্ক্ষার সংঘাতের ঐতিহাসিক সাক্ষ্য।
লেখক: গীতিকবি, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
[email protected]
