ভারতে শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে সোচ্চার ‘তেলাপোকাদের’ প্রবল আন্দোলনের চাপে নতি স্বীকার করেছে মোদি সরকার। ঘোষিত হয়েছে তারুণ্যের জয়। শাসকদলের অহংকার আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সত্যের কাছে পরাজিত হয়েছে। ৩৬ দিনের দেশ কাঁপানো আন্দোলনের জয় হয়েছে। তেলাপোকা জনতা পার্টির (সিজেপি) প্রধান অভিজিৎ দীপকের কথা অনুয়ায়ী, তেলাপোকার সঙ্গে ঝামেলা করবেন না।
আন্দোলনকারী তেলাপাকাদের দাবি মেনে শনিবার (২৫শে জুলাই) দুপুরে ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। তেলাপোকা পার্টির প্রতিনিধিদের দেয়া সরকারের সময়সীমার মধ্যেই শিক্ষামন্ত্রীর এই পদত্যাগ। এরপরই হয়েছে তৃতীয় দফায় সরকারের সঙ্গে তেলাপোকা জনতা পার্টির বৈঠক।
বৈঠকের পর একটি যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তেলাপোকা জনতা পার্টি (সিজেপি) তাদের অবস্থান কর্মসূচি প্রত্যাহার করার কথা ঘোষণা করেছে। সংবাদ সম্মেলনে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জেপি নাড্ডা ও জিতেন্দ্র সিংকে পাশে নিয়ে সিজেপি’র মুখপাত্র সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কা সাংবাদিকদের জানান, সরকার তাদের দাবিগুলো রক্ষা করবে- এই ‘সদিচ্ছা’ নিয়েই সিজেপি প্রতিবাদ শেষ করেছে।
আশুতোষ রাঙ্কা বলেছেন, ৩৬ দিনের বিক্ষোভের পর সরকার আমাদের সব দাবি মেনে নিয়েছে। আমরা সবাইকে শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভস্থলগুলো থেকে সরে যাওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।
দলটির মুখপাত্ররা আরও বলেছেন যে, সরকার তাদের আশ্বাস দিয়েছে যে শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা পুলিশি মামলাগুলো প্রত্যাহার করা হবে, ভবিষ্যতে তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হবে না এবং নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় আত্মহত্যা করা শিক্ষার্থীদের পরিবারকে নিয়ম ও বিধি অনুযায়ী সর্বোচ্চ ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে।
রাজনৈতিক পর্বেক্ষকদের মতে, শনিবার শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ নরেন্দ্র মোদি সরকারকে সংকট থেকে বেরিয়ে আসার পথ দেখিয়েছে। নিট-ইউজি প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাটি রাজনৈতিক সংকটে পরিণত হওয়ার পর থেকেই পরিত্রাণের উপায় খুঁজছিল সরকার।
কংগ্রেস এই পদত্যাগকে ‘ভারতের জেন জি প্রজন্মের বিজয়’- বলে অভিহিত করেছে। আম আদমি পার্টির নেতা কেজরিওয়াল বলেছেন, এটি ভারতের গণতন্ত্রের জন্য বড় জয়।
ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের পর কেন্দ্রীয় সরকার প্রথম প্রতিক্রিয়ায় পরিষদীয় মন্ত্রী কিরেন রিজিজু ছাত্রকল্যাণ ও শিক্ষা সংস্কারের প্রতি তার কয়েক দশকের অঙ্গীকারের প্রশংসা করে তার নেতৃত্বকে ‘জনজীবন ও ছাত্রকল্যাণের সঙ্গে আজীবন সম্পৃক্ততার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত’- বলে অভিহিত করেছেন।
তবে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ একটি বিরল ঘটনা। প্রকৃতপক্ষে, এটি এতটাই বিরল যে, এর সমান্তরাল খুঁজে পেতে হলে একেবারে ২০১৮ সালে ফিরে যেতে হবে, যখন কেন্দ্রীয় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে এম জে আকবর পদত্যাগ করেছিলেন।
কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগের সংবাদ প্রচার হওয়া মাত্র শনিবার নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে ‘তেলাপোকা জনতা পার্টি’র প্রতিবাদস্থলে বিক্ষোভকারীরা উল্লাসে ফেটে পড়েছিল। এদিন গোটা এলাকা প্রতিবাদী মানুষের সমাগমে পরিণত হয়েছিল জনসমুদ্রে।
কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের পর কংগ্রেস বলেছে, ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ ‘তরুণদের বিজয়’ এবং ‘ভারতের জেন জি প্রজন্মের বিজয়’। তাদের দাবি, এই বিজয় সেই কোটি কোটি তরুণের, যারা দেশজুড়ে শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে সোচ্চার হয়েছিল।
দলটি বলেছে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ‘অহংকার’ যুবকদের সত্যের কাছে পরাজিত হয়েছে এবং তার ‘মিথ্যা’ উন্মোচিত হয়েছে। একই সঙ্গে কংগ্রেস বলেছে, তরুণ বিক্ষোভকারীরা একজন ‘অযোগ্য ও দুর্নীতিগ্রস্ত’ শিক্ষামন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেছে।
দলটি আরও বলেছে, বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী এবং কংগ্রেস নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রথমদিন থেকেই রাজপথ থেকে সংসদ পর্যন্ত তরুণদের জন্য ন্যায়বিচারের লড়াই করে আসছে এবং শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার না হওয়া পর্যন্ত এই লড়াই চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেছে। দলটি আরও দাবি করেছে যে, বিক্ষোভকারী তরুণদের বিরুদ্ধে লাঠিচার্জ ও পেলেট গান ব্যবহারের অভিযোগে মোদি যেন ক্ষমা চান।
কংগ্রেস সভাপতি এবং রাজ্যসভার বিরোধীদলীয় নেতা মল্লিকার্জুন খাড়গে লাখ লাখ তরুণ-তরুণী ও ‘ঐক্যবদ্ধ বিরোধী দল’ সহ অন্যদের প্রচেষ্টার প্রশংসা করেছেন।
তিনি বলেছেন, ভারতের ‘ছাত্রদের প্রতিধ্বনি’ অবশেষে দাম্ভিক ক্ষমতার দোরগোড়ায় পৌঁছেছে। এটি আমাদের সেই লাখ লাখ তরুণের বিজয়, যারা শিক্ষাব্যবস্থা ঠিক করার জন্য দেশজুড়ে রাস্তায় আওয়াজ তুলেছিল। এটি সত্যের বিজয় এবং মোদির একগুঁয়েমির পরাজয়। এটি সেই সমস্ত পরিবারের বিজয়, যারা এই দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারের কারণে তাদের রক্ত, তাদের সন্তানদের হারিয়েছেন। এটি ঐক্যবদ্ধ বিরোধী দলের বিজয়, যারা ছাত্রদের স্বার্থে সংসদ থেকে রাস্তা পর্যন্ত আওয়াজ তুলেছিল। এখন আমাদের তরুণ প্রজন্মের কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং যারা তাদের উপর লাঠি, ব্যাটন ও পেলেট গান চালিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে মোদির কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার পালা।
ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তকে উদ্দেশ্য করে অভিজিৎ দীপকে বলেছেন, আমি প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তকে ধন্যবাদ জানাতে চাই। তিনি যদি আমাদের তেলাপোকা না বলতেন, আমি ভারতে আসতাম না। এই আন্দোলন শুরুই হতো না।
১৫ই মে সুপ্রিম কোর্টের একটি শুনানিতে প্রধান বিচারপতি মন্তব্য করেছিলেন যে, তেলাপোকার মতো কিছু তরুণ আছে, যারা কোনো চাকরি পায় না এবং এই পেশায় তাদের কোনো স্থান নেই।
সূর্যকান্ত পরে বলেন যে, মন্তব্যটি শুধুমাত্র জাল আইন ডিগ্রিধারীদের উদ্দেশ করে করা হয়েছিল, সাধারণভাবে বেকার যুবকদের নয়। এরপর তিনি পুনরায় বলেছেন যে, গণমাধ্যমের একাংশ তার বক্তব্য বিকৃতভাবে উদ্ধৃত করেছে। কিন্তু এই স্পষ্টীকরণ মন্তব্যটির ভাইরাল হওয়া থামাতে খুব একটা কাজে আসেনি।
দীপকে, যিনি তখন বোস্টনভিত্তিক একজন ছাত্র ছিলেন এবং পূর্বে আম আদমি পার্টির যোগাযোগ কৌশলবিদ হিসেবে কাজ করতেন, পরের দিন এক্স-এ একটি বুদ্ধিদীপ্ত জবাব পোস্ট করেন।
১৬ই মে, তিনি ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ চালুর ঘোষণা দেন এবং এটিকে ‘বাইরের সমস্ত ‘ ‘তলাপোকাদের’ জন্য একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বর্ণনা করেন। এর যোগ্যতার মানদণ্ড হিসেবে উল্লেখ করা হয় বেকার, অলস, সারাক্ষণ অনলাইনে থাকা এবং পেশাগতভাবে ক্ষোভ প্রকাশে সক্ষম হওয়া।’
নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় ক্ষোভ বাড়তে থাকায় মে মাসের শেষের দিকে এই ব্যঙ্গাত্মক পোস্টটি গতি লাভ করে এবং দীপকে জুনের শুরুতে যন্তর মন্তরের কাছে ব্যক্তিগতভাবে বিক্ষোভে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য ভারতে ফিরে আসেন।
পরীক্ষা ব্যবস্থার অনিয়মের জেরে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের মূল দাবি আরও জোরালো হয় যখন শিক্ষাবিদ-সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুক গত ২৮শে জুন অনির্দিষ্টকালের জন্য অনশনে যোগ দেন। কেন্দ্র থেকে লিখিত আশ্বাস পাওয়ার পর ওয়াংচুক ২৬ দিন অনশন চালিয়েছিলেন এবং এই সপ্তাহের শুরুতে তিনি তা শেষ করেন।
এদিকে, শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান তার দুই পৃষ্ঠার পদত্যাগপত্রে লিখেছেন, আমার প্রিয় তরুণ বন্ধুরা, চার দশকেরও বেশি সময় আমি ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক এবং শিক্ষা সংস্কারের কাজে নিজেকে উৎসর্গ করেছি। আমি সবসময় বিশ্বাস করেছি যে একটি শক্তিশালী, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং দূরদর্শী শিক্ষা ব্যবস্থা একটি শক্তিশালী জাতি গঠনের ভিত্তি। তবে ২০২৬ সালের ৩রা মে অনুষ্ঠিত এনইইটি-ইউজি (নিট-ইউজি) পরীক্ষায় অনিয়মের ঘটনা সামনে আসে। বিষয়টি সম্পর্কে অবিলম্বে ব্যবস্থা নিয়ে ভারত সরকার তদন্তের দায়িত্ব সিবিআইকে দেয়, পরীক্ষা বাতিল করে এবং পুনঃপরীক্ষার তারিখ ঘোষণা করে। পাশাপাশি আগামী বছর থেকে এই পরীক্ষা সম্পূর্ণ কম্পিউটারভিত্তিক পদ্ধতিতে নেয়ার সিদ্ধান্তও হয়।
তিনি আরও লিখেছেন, এই পুরো সময়ে আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার ছিল ২০ লাখেরও বেশি শিক্ষার্থীর জন্য পরীক্ষাটি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা। ভারত সরকার, বিভিন্ন রাজ্য সরকার এবং বিশেষ করে জেলা প্রশাসনের সমন্বিত প্রচেষ্টায় তা সম্ভব হয়েছে। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সহযোগিতায় ২১শে জুন ২০২৬ তারিখে পরীক্ষাটি সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।
তিনি লিখেছেন, প্রথমদিন থেকেই আমি এই ঘটনার সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিয়েছি এবং কখনও পরিস্থিতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিইনি। আমি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলাম, যেন ‘পরীক্ষা মাফিয়া’র কারণে কোনো মেধাবী শিক্ষার্থীর সম্ভাবনা নষ্ট না হয় এবং কোনো শিক্ষার্থীর প্রতি অন্যায় না ঘটে।
১৬ই জুলাই প্রকাশিত নিট-ইউজি পরীক্ষার ফলাফল সন্তোষজনক হয়েছে উল্লেখ করে ধর্মেন্দ্র তার পদত্যাগপত্রে বলেন, সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের বহু মেধাবী শিক্ষার্থী সফলতা অর্জন করেছে। কিন্তু এই সময়েও কিছু দায়িত্বশীল পদে থাকা ব্যক্তি প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করার এবং শিক্ষার্থীদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছেন। এই ঘটনা আমাকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছে।
