ঢাকা সফরে আসছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গর। তার এই সফর বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেকরা। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের রাশিয়া সফর এবং গত জুনে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ঢাকা সফরের পর বাংলাদেশের কূটনীতি কোন পথে এগোচ্ছে তা যথাযথভাবে বুঝতে চাইছে ওয়াশিংটন।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এমন নানা সমীকরণ মূল্যায়নের লক্ষ্যেই আগামী ৩০শে জুলাই তিনদিনের সফরে ঢাকা আসছেন ট্রাম্পের আঞ্চলিক এই দূত। তাদের মতে, সার্জিও গরের এই সফর দৃশ্যত রুটিন ওয়ার্ক হলেও এর পেছনে আরও কিছু বিষয় রয়েছে। ওয়াশিংটন মূলত নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতি নীতির অভিমুখ বুঝতে চাইছে। সার্জিও গর সফরের প্রথমদিনেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে বৈঠক করবেন। এছাড়া নাগরিক সমাজ ও রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময়ের পাশাপাশি সফরের শেষদিনে কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শনের কথা রয়েছে তার।
বেইজিং অক্ষ নাকি ভারসাম্য: গত ফেব্রুয়ারিতে নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বেইজিং সফর এবং রাশিয়ার সঙ্গে ড. খলিলুর রহমানের কূটনৈতিক যোগাযোগ ওয়াশিংটনের নজর এড়ায়নি। বিশ্ব রাজনীতিতে সম্পর্ক বজায়ের ক্ষেত্রে চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে নিজেদের সম্পর্কের দিকটাও গুরুত্ব দেয় মার্কিন সরকার। ফলে ঢাকা কি আন্তর্জাতিক সম্পর্কে ভারসাম্য রক্ষা করছে, নাকি বেইজিং-মস্কো অক্ষের দিকে একটু বেশি ঝুঁকছে- তা সরাসরি বুঝে নিতে চান সার্জিও গর। বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্পের এই বিশেষ দূত আদতে বুঝতে চান স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদে ঢাকার মূল কৌশলগত অগ্রাধিকার কী হতে যাচ্ছে।
এআরটি বাণিজ্যচুক্তি ও অর্থনৈতিক বার্তা: এই সফরের অর্থনৈতিক তাৎপর্যও সুদূরপ্রসারী। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পাদিত সম্পূরক বাণিজ্যচুক্তি বা ‘এআরটি’র একটি স্পর্শকাতর শর্ত হলো- বাজারভিত্তিক নয় এমন কোনো দেশের সঙ্গে বাংলাদেশ মুক্ত বাণিজ্য বা বিশেষ অগ্রাধিকারমূলক চুক্তি করলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে বিদ্যমান সুবিধায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বিশ্লেষকদের ধারণা, চীন সফর থেকে প্রাপ্ত চুক্তি ও সমঝোতা কীভাবে বাস্তবায়ন করছে ঢাকা, তা নিয়ে মার্কিন দূতের সফর টেবিলে স্পষ্ট আলোচনা হতে পারে। এটি ঢাকার জন্য বাণিজ্য ও কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একধরনের নতুন সমীকরণ তৈরি করছে।
নয়াদিলি ও আঞ্চলিক হিসাব-নিকাশ: সার্জিও গর মূলত দিল্লিকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। তিনি দিল্লিতে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত হিসেবে কর্মরত। বাংলাদেশের নতুন সরকার আসার পর শুরুতে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের বরফ গলার আভাস থাকলেও, বর্তমানে দু’দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে একধরনের শীতলতা বিরাজ করছে। সরকারি পর্যায়ে ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে সরাসরি যোগাযোগের গতি কমে যাওয়ায়, ট্রাম্পের দূত এই দুই প্রতিবেশীর ভবিষ্যৎ সম্পর্কের পথরেখাও মেপে নিতে চান। যুক্তরাষ্ট্র ভারতের হয়ে এখানে কোনো প্রভাব রাখবে, নাকি সরাসরি নিজেই ঢাকার ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে চাইবে- তা এই সফরেই স্পষ্ট হতে পারে।
আগের সফরের ধারাবাহিকতা: চলতি বছরের মার্চে দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুর এবং মে মাসে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের সহকারী বাণিজ্য প্রতিনিধি ব্রেন্ডান লিঞ্চের ঢাকা সফরের ধারাবাহিকতা হিসেবেই সার্জিও গরের সফর বিবেচিত হচ্ছে। শ্রীলঙ্কা ও নেপালে নতুন সরকার আসার পরও সার্জিও গর ঠিক একইভাবে সফর করে বাণিজ্য, সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও কৌশলগত চুক্তি নিয়ে কথা বলেছিলেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্পের বিশেষ দূতের এই সফর কেবল কুশলবিনিময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। এটি ওয়াশিংটন-ঢাকা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ভবিষ্যৎ সমীকরণ কোন দিকে মোড় নেবে, সেটার এক বড় পরীক্ষা হতে যাচ্ছে এই তিনদিন।
