সমাজের আট-দশটা পরিবারের মতো জীবনযাপন নয় তাদের। অভাব-অনটনের মধ্য দিয়ে কাটে বেশির ভাগ সময়। একজনের বাবা কৃষক। বাবা পরিবারের খরচ মেটাতে হিমশিম খান। বাধ্য হয়েই অটো চালান। আরেকজনের বাবা সংসার চালায় মাছ বিক্রি করে। হিমশিম খেতে হয় বলে মা মানুষের বাড়িতে কাজ করেন। তৃতীয়জনের পরিবারের একমাত্র অবলম্বন বড় ভাই। এই টানাপোড়েনের মধ্যেও ফুটবল নিয়ে থেমে নেই তিন প্রতিভাবান কিশোরের স্বপ্নযাত্রা। তিন পরিবারের ঘাম-শ্রমকে একবিন্দুতে এনেছে নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসের ফাইনাল। বালক বিভাগে বরিশালকে ৩-১ গোলে হারিয়ে ফাইনালে পা রেখেছে সিলেট অঞ্চল। এই দলের তিন কুঁড়ি তারা।
সুনামগঞ্জ উপজেলা থেকে প্রতিভা অন্বেষণের মঞ্চে উঠে আসা সপ্তম শ্রেণির জুনায়েদ আহমেদ মুন্নার গল্পটা কম অনুপ্রেরণাদায়ক নয়। সিলেট জেলা লীগে খেলা তাহসিন আহমেদ দীপুর হাত ধরে ১০ বছর বয়সে এ কিশোরের ফুটবল যাত্রার শুরু। এরপর ভর্তি হয় নিউ আজাদী ক্লাবে। সেখানের খরচ চালানো মুন্নার জন্য কষ্ট হয়ে পড়ে। তার দুরবস্থা চোখে পড়ে ক্লাবটির কোচ মনিরুজ্জামান ভূবনের। ক্লাবের সমস্ত খরচ বহনের দায়িত্ব নেন তিনি। সংগ্রামের গল্পটা এখানেই শেষ নয়। পরিবারের হাল ধরতে প্রতিদিন সকালে অনুশীলন শেষে দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত অটো চালায় মুন্না। দুই মাস টাকা জমিয়ে কিনেছে ক্রীড়া সরঞ্জাম। জীবনসংগ্রামের মাঝেও ফুটবল মাঠে উজ্জ্বল মুন্না।
নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসের উপজেলা পর্যায়ে এক অ্যাসিস্ট, জেলা পর্যায়ে দুই গোলের পর সিলেটকে ফাইনালে তুলতে বড় ভূমিকা রাখে লেফট উইংয়ে খেলা এ কিশোর। লিওনেল মেসির পাঁড় সমর্থক মুন্না, বাংলাদেশের মধ্যে পছন্দ হামজা চৌধুরীকে। ভবিষ্যতে জাতীয় দলে খেলার স্বপ্ন দেখে সে। মুন্নার ভাষায়, ‘মনে তো অনেক স্বপ্নই বয়ে বেড়াই। অটো চালিয়ে ফুটবল খেলছি। ইনশাল্লাহ, একদিন জাতীয় দলের হয়ে খেলবো।’ কখনো জাতীয় স্টেডিয়ামে বসে খেলা দেখার সুযোগ হয়নি মুন্নার। সেই ইচ্ছা নিয়ে খানিক আক্ষেপ করে মুন্না জানায়, ‘জাতীয় স্টেডিয়ামে যদি হামজার খেলা দেখতে পেতাম, তাহলে একটি ইচ্ছে পূরণ হতো।’
সিলেট অঞ্চলের হয়ে ডিফেন্ডিং মিডফিল্ড পজিশনে খেলা আক্তার হোসেনের জীবনও অনেকটা এরকম। বাবা সমুদ আলী গ্রামে মাছ বিক্রি করেন। মানুষের বাড়িতে কাজ করেন জীবনের মা। শাহজালাল উপশহর স্কুলে পড়া সপ্তম শ্রেণিতে পড়া এ কিশোরের পথচলা শুরু চার বছর বয়সে। এরপর সিলেট উপশহর স্পোর্টিং ক্লাবে ভর্তি হয়। শুরুর দিকে বুট কিনতে পারেননি। স্কুলের ক্যাডস পড়ে অনুশীলন করতো আক্তার। এ কষ্ট দেখে মা বাসায় কাজ করে বুট জোতাসহ অন্য সরঞ্জাম কিনে দেন। প্রতিদিন অনুশীলনে যাওয়া আসায় খরচ হয় ২৫০ টাকা। পথটাও সহজ নয়। নৌকায় করে নদী পার হতে হয়। এই কষ্ট আর মায়ের উপহারের প্রতিদান দিতে দেরি করেনি আক্তার।
নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসের জেলা পর্যায়ে মৌলভিবাজারের বিপক্ষে সিলেটের জয়সূচক গোলটি করেন। সেই গোলটিও ছিল চোখধাঁধানো। বক্সের অনেক দূর থেকে মৌলভিবাজারের জাল কাঁপান আক্তার। অদূর ভবিষ্যৎে জাতীয় দলের জার্সি গায়ে জড়ানোর লক্ষ্য ১৪ বছর বয়সী এ কিশোরের। আক্তারের ভাষায়, ‘সিলেট থেকে অনেকে জাতীয় দলে খেলছে। আমিও একদিন বাংলাদেশের হয়ে খেলবো, গোল করে নাম উজ্জ্বল করবো।’
কৃষক পরিবারের সন্তান আব্দুল শহিদেরও একই স্বপ্ন। মূলত তার বড় ভাইয়ের ওপরে পরিবারের সমস্ত ভার। তৃতীয় শ্রেণি থেকে এখানে অনুশীলন করে শহিদ। প্রতিভার প্রমাণ দিয়ে পঞ্চম শ্রেণিতে থাকাকালীন জেলার বয়সভিত্তিক দলে জায়গা করে নেয়। বড় হয়ে বাবার কষ্ট আর ভাইয়ের সংগ্রামকে সার্থক করতে চায় শহিদ, ‘বাবা এখন আগের মতো কাজ করতে পারছেন না। ভাই একাই সংসার চালান। বড় হয়ে দু’জনের দুঃখ দূর করতে চাই। ফাইনাল জিতলে আমার ভাই ভীষণ খুশি হবেন।’
