ভূ-রাজনীতিকে ভূ-অর্থনৈতিক বাস্তবতার ওপর ভিত্তি করে গড়তে হবে

পিপিআরসি সংলাপে বিশেষজ্ঞরা

ভূ-রাজনীতিকে ভূ-অর্থনৈতিক বাস্তবতার ওপর ভিত্তি করে গড়তে হবে

ফন্ট সাইজ:

কার্যকর ভূ-রাজনীতি গড়ে তুলতে হলে বিমূর্ত বা আদর্শবাদী আলোচনা বাদ দিয়ে ভূ-অর্থনৈতিক বাস্তবতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে তুলতে হবে। বাংলাদেশকে এখন থেকে ভূ-রাজনীতি পরিচালনা করতে হবে কঠোর ভূ-অর্থনৈতিক বাস্তবতার নিরিখে। জটিল আঞ্চলিক অচলাবস্থা সমাধান ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ, চীন, ভারত ও মিয়ানমারের মধ্যে চতুর্পক্ষীয় কাঠামোর মাধ্যমে কৌশলগত পদক্ষেপ নেয়া জরুরি।

শনিবার বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) আয়োজিত ‘আজকের এজেন্ডা’ শীর্ষক ভার্চ্যুয়াল সংলাপে উঠে এসেছে এমন অভিমত। ‘মেরুকৃত বিশ্বে কৌশলগত পথ: বাংলাদেশের জন্য কী সমীকরণ?’ শীর্ষক এই সংলাপে দেশ-বিদেশের সাবেক কূটনীতিক, অর্থনৈতিক বিশ্লেষক, প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ ও গবেষকেরা অংশ নেন।

অনুষ্ঠানের সঞ্চালক ও পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, আদর্শবাদী কথার চেয়ে ভূ-অর্থনৈতিক বাস্তবতার ওপর ভিত্তি করেই কার্যকর ভূ-রাজনীতি গড়ে তুলতে হবে। আঞ্চলিক অচলাবস্থা নিরসনে বিমূর্ত বিতর্কের বাইরে গিয়ে মাঠপর্যায়ের সমাধানের দিকে নজর দেয়া জরুরি। অস্থিতিশীল দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্ত স্থিতিশীল করা এবং আঞ্চলিক সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচনে বাংলাদেশ, চীন, ভারত ও মিয়ানমারের চতুর্পক্ষীয় কাঠামোর অধীনে ‘ক্যাওকফিউ-চট্টগ্রাম ট্রান্সশিপমেন্ট অর্থনৈতিক করিডোর’ প্রতিষ্ঠার তাগিদ দেন তিনি।

সাবেক রাষ্ট্রদূত ও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্য্যালয়ের এসআইপিজির জ্যেষ্ঠ গবেষণা ফেলো মোহাম্মদ সুফিউর রহমান বলেন, প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে চীনের দ্রুত অগ্রগতি বিশ্ব ভূ-রাজনীতিকে পুনর্গঠন করছে। ২০২৪ সালে বিশ্বের ৬০০ শতাংশেরও বেশি পেটেন্ট আবেদন চীনে হয়েছে এবং শীর্ষ পাঁচটি উদ্ভাবন কেন্দ্রের তিনটিই সেখানে অবস্থিত। তিনি তিস্তা প্রকল্পের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ এবং বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দেন।
ভারতের ওপি জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. শ্রীরধা দত্ত বলেন, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের বর্তমান অবস্থা কোনো পক্ষেরই দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের অনুকূল নয়। ঐতিহাসিক বোঝা ও শাসনব্যবস্থার সামঞ্জস্যের বাইরে গিয়ে দুই দেশের মধ্যে আস্থা পুনর্র্নিমাণ, সীমান্ত চলাচল সহজ করা ও পারস্পরিক নিরাপত্তা উদ্বেগে মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন।

জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়ে জোর দিয়ে অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল ফজলে এলাহী আকবর বলেন, উন্নত অস্ত্র সংগ্রহের পাশাপাশি রাডার ও স্যাটেলাইট ব্যবস্থার পূর্ণ একীকরণ প্রয়োজন। নিষ্ক্রিয় কূটনীতির পরিবর্তে নিজেদের প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি ও প্রতিরোধ ক্ষমতাকে অগ্রাধিকার দেয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

গবেষক ও লেখক আলতাফ পারভেজ অস্থিতিশীল উত্তর আরাকানের চিত্র তুলে ধরে সতর্ক করেন, স্থানীয় নিরাপত্তা ও সম্প্রদায়কে উপেক্ষা করে কোনো আন্তঃসীমান্ত করিডোর সফল হতে পারে না। যেকোনো সরাসরি সংযোগ কার্যকর করতে বাংলাদেশ, রোহিঙ্গা, আরাকান আর্মি, চীন ও তাতমাদোসহ সব স্থানীয় অংশীদারের অংশগ্রহণ প্রয়োজন।
জাপান-বাংলাদেশ চেম্বার অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি আবদুল হক বলেন, দেশে প্রতি বছর প্রায় ২৫ লাখ মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। তাই বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে বাংলাদেশকে কৌশলগত ও নীতিগত ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।

কানাডার লরেনশিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক সাদেকুল ইসলাম রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময়ে তাড়াহুড়ো করে বাণিজ্য চুক্তি না করার পরামর্শ দেন। তিনি উল্লেখ করেন, অন্তর্র্বতীকালীন সময়ে আলোচনাকৃত যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ বাণিজ্য কাঠামো কোনো ভালো চুক্তি ছিল না এবং এতে দেশ অসম শর্তে আটকে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
ভূ-রাজনৈতিক পরামর্শক ম্যাট ইয়াংও সংলাপে প্যানেলিস্ট হিসেবে যুক্ত হয়ে আঞ্চলিক শক্তি ও জ্বালানি নিরাপত্তার ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করেন।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন