নেশাখোরদের আড্ডাখানা পাটকেলঘাটার অডিটোরিয়াম

নেশাখোরদের আড্ডাখানা পাটকেলঘাটার অডিটোরিয়াম

ফন্ট সাইজ:

একসময় রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, শিক্ষামূলক কার্যক্রম ও সামাজিক আয়োজনের প্রাণকেন্দ্র ছিল সাতক্ষীরার তালা উপজেলার পাটকেলঘাটা অডিটোরিয়াম। প্রায় চার দশকেরও বেশি সময়ের ঐতিহ্য বহনকারী সরকারি এই মিলনায়তনটি এখন জরাজীর্ণ ও পরিত্যক্ত। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ভবনটি বর্তমানে নেশাখোর ও অসামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িতদের আড্ডাখানায় পরিণত হয়েছে। অথচ বারবার সংস্কারের প্রতিশ্রুতি মিললেও বাস্তবে কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেয়া হয়নি।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৭৯ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে তৎকালীন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. আফতাবুজ্জামান এমপি’র উদ্যোগে পাটকেলঘাটা হাইস্কুল প্রাঙ্গণে প্রায় এক হাজার দর্শক ধারণক্ষমতাসম্পন্ন অডিটোরিয়াম নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়। সে সময় তালা উপজেলা বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি প্রয়াত এবিএম আলতাফ হোসেন, তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক প্রয়াত মফিদুল ইসলাম, প্রয়াত আবু বক্কার, বিদ্যালয়ের তৎকালীন প্রধান শিক্ষক পশুপতিসহ ১০ সদস্যের একটি বাস্তবায়ন কমিটি গঠন করা হয়।

প্রায় এক বছর কাজ শেষে ১৯৮০ সালে জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে অডিটোরিয়ামটির উদ্বোধন করা হয়। বিশাল স্টেজ, দু’টি রেস্টরুম, প্রশস্ত জানালা ও টিনের ছাউনিযুক্ত ভবনটি দীর্ঘদিন পাটকেলঘাটা অঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, দর্জি প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি আয়োজনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল এই অডিটোরিয়াম। শুরুতে এর রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব ছিল পাটকেলঘাটা হাইস্কুল কর্তৃপক্ষের হাতে। তবে ১৯৯৬ সালে এর নিয়ন্ত্রণ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের অধীনে চলে যায়। এরপর থেকে অডিটোরিয়াম ব্যবহারের জন্য তালা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার অনুমতি বাধ্যতামূলক করা হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, অডিটোরিয়াম থেকে উপজেলা সদর অনেক দূরে হওয়ায় অনুমতি নেয়ার জটিলতা সৃষ্টি হয়। ফলে ধীরে ধীরে ব্যবহারকারীরা মুখ ফিরিয়ে নেন এবং বিকল্প খোলা স্থানে অনুষ্ঠান আয়োজনের প্রবণতা বাড়ে। একপর্যায়ে অডিটোরিয়ামটি প্রায় পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে।

২০০৮ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইঞ্জিনিয়ার শেখ মুজিবুর রহমান সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর অডিটোরিয়ামটি সংস্কারের উদ্যোগ নেন। ২০১১ সালের দিকে সংস্কারের জন্য দুই লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হলেও জরাজীর্ণ ভবনটির জন্য সেই অর্থ যথেষ্ট ছিল না। ফলে নামমাত্র সংস্কার হলেও ভবনটি আর ব্যবহার উপযোগী হয়ে ওঠেনি। এরপর বিভিন্ন সময়ে জনপ্রতিনিধিরা সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। বর্তমানে ভবনটির ছাদ, দেয়াল, দরজা-জানালা ও মেঝে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। সন্ধ্যার পর এটি নেশাখোর ও অসামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িতদের নিরাপদ আস্তানায় পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। পাটকেলঘাটা হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, অডিটোরিয়াম সংস্কারের জন্য বিদ্যালয়ের নিজস্ব কোনো তহবিল নেই।

সরকারি বরাদ্দ ছাড়া এটি সংস্কার সম্ভব নয়। যুগীপুকুর গ্রামের রেজাউল বিশ্বাস, জাসদ নেতা আবুল কালাম আজাদ মিলন, পাটকেলঘাটা প্রেস ক্লাবের সভাপতি আব্দুল মমিন এবং সাবেক সভাপতি শেখ জহুরুল হক বলেন, পাটকেলঘাটা অডিটোরিয়াম শুধু একটি ভবন নয়, এটি এ অঞ্চলের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অংশ। অবহেলায় এটি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। দ্রুত সংস্কার করে আবারো জনসেবায় ব্যবহার উপযোগী করা প্রয়োজন। তালা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জান্নাতুল আফরোজ স্বর্ণা বলেন, এই মুহূর্তে সংস্কারের জন্য আমাদের হাতে কোনো সরকারি বরাদ্দ নেই। ভবিষ্যতে বরাদ্দ পাওয়া গেলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন