ভারতে সরকারি পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগকে কেন্দ্র করে ব্যাপক আন্দোলনের চাপে দেশটির কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ করেছেন। এরপরেই দেশটির প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন চলমান এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয়া ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে।
শনিবার (২৫ জুলাই) দিল্লির যন্তর মন্তরের মঞ্চে সমর্থকদের উদ্দেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে দিপকে বলেন, আমাদের ‘তেলাপোকা’ বলার জন্য ধন্যবাদ। আমি ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তকে ধন্যবাদ জানাতে চাই। তিনি যদি আমাদের তেলাপোকা না বলতেন, তাহলে আমি ভারতে ফিরতাম না। এই আন্দোলনেরও সূচনা হতো না।
হিন্দুস্তান টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই মন্তব্যের সূত্রপাত গত ১৫ মে দেশটির সুপ্রিম কোর্টে সিনিয়র অ্যাডভোকেট মনোনয়ন-সংক্রান্ত এক শুনানিতে। সেই সময় প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত মন্তব্য করেছিলেন, এমন কিছু তরুণ রয়েছে, যারা তেলাপোকার মতো, তাদের কোনো চাকরি নেই এবং পেশায়ও তাদের কোনো জায়গা নেই।
তবে পরবর্তী সময়ে তিনি দাবি করেন, মন্তব্যটি বেকার তরুণদের উদ্দেশে নয়; বরং ভুয়া আইন ডিগ্রিধারীদের উদ্দেশে করা হয়েছিল। এছাড়া তিনি দাবি করেন, গণমাধ্যমের একটি অংশ তার বক্তব্য ভুলভাবে উপস্থাপন করেছে।
তবে তিনি তার এই মন্তব্যের ব্যাখ্যা দিলেও মন্তব্যটি দ্রুত দেশটির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়।
ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট থেকে রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম
সেই সময় যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনে অবস্থানরত শিক্ষার্থী এবং আম আদমি পার্টির সাবেক যোগাযোগ কৌশলবিদ অভিজিৎ দিপকে পরদিনই এক্সে ব্যঙ্গাত্মক প্রতিক্রিয়া জানান।
তিনি ১৬ মে ককরোচ বা তেলাপোকা জনতা পার্টি (সিজেপি) গঠনের ঘোষণা দেন। তিনি এটিকে পৃথিবীর সব ‘তেলাপোকাদের’ জন্য একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বর্ণনা করেন।
দলটির সদস্য হওয়ার জন্য তিনি মজার ছলে কয়েকটি ‘যোগ্যতার’ কথাও উল্লেখ করেন। সেখানে বলা হয়, বেকার হতে হবে, অলস হতে হবে, সব সময় অনলাইনে থাকতে হবে এবং পেশাদারের মতো ক্ষোভ প্রকাশ করতে জানতে হবে। এরপরেই দ্রুত দেশটিতে অনলাইনে সিজেপি ব্যাপকভাবে জনপ্রিয়তা পায়।
এরপর মে মাসের শেষ দিকে দেশটিতে নিট প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ ঘিরে জনরোষ বাড়তে থাকলে সিজেপির ব্যঙ্গাত্মক প্রচারণাও ব্যাপক সমর্থন পেতে শুরু করে।
পরবর্তীতে জুনের শুরুতে অভিজিৎ দিপকে ভারতে ফিরে এসে যন্তর মন্তরের কাছে আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। সেই সময় দেশটির পরিবেশবিদ ও সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুকও অনশন শুরু করেন।
তিনি ২৮ জুন থেকে অনির্দিষ্টকালের অনশন শুরু করেন। এরপর টানা ২৬ দিন অনশন চালানোর পর চলতি সপ্তাহে তিনি তা প্রত্যাহার করেন। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার লিখিতভাবে কয়েকটি আশ্বাস দেয়ার পর তিনি অনশন ভাঙেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটির সরকারের আশ্বাসগুলোর মধ্যে ছিল, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা না করা, সংসদে পরীক্ষা সংস্কার ও জবাবদিহি নিয়ে আলোচনা এবং প্রশ্নফাঁস-সংক্রান্ত ঘটনায় আত্মহত্যা করা শিক্ষার্থীদের পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণ বিবেচনা করা।
এদিকে ওয়াংচুক অনশন প্রত্যাহার করলেও সিজেপি শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে অনড় থাকে। এরই মধ্যে ২০ জুলাই আন্দোলনকারীদের ওপর লাঠিচার্জ করে পুলিশ। যদিও সরকার দীর্ঘদিন কঠোর অবস্থানে ছিল, শেষ পর্যন্ত সেই অবস্থান থেকে সরে আসে। শেষমেশ শনিবার পদত্যাগের ঘোষণা দেন ধর্মেন্দ্র প্রধান।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে দেয়া পদত্যাগপত্রে ধর্মেন্দ্র প্রধান লিখেছেন, শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করেই আমি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তিনি আরও দাবি করেন, যন্তর মন্তরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে চলমান পরিস্থিতি যেন ‘রাষ্ট্রবিরোধী উপাদান’ কাজে লাগাতে না পারে, সেটিও তার সিদ্ধান্তের একটি বিবেচ্য বিষয় ছিল।
