বদলে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি মানচিত্র

যুদ্ধের কেন্দ্র এখন হরমুজ

বদলে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি মানচিত্র

ফন্ট সাইজ:

ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ যে লক্ষ্য নিয়ে শুরু হয়েছিল, এখন তা অনেকটাই বদলে গেছে। শুরুতে ইরানের সরকার পরিবর্তনের সম্ভাবনা কিংবা দেশটির পারমাণবিক ও সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করার মতো লক্ষ্য সামনে থাকলেও, প্রায় ছয় মাস পর এখন সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডোর হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ।
তাই এখন মূল প্রশ্ন একটাই- হরমুজ প্রণালি কি আন্তর্জাতিক জলপথ হিসেবেই থাকবে, নাকি ইরান ঠিক করবে কে এই পথ ব্যবহার করতে পারবে এবং কোন শর্তে?
ইরান এখন পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি অবরোধ করেনি। তবে দেশটি ড্রোন ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে বাণিজ্যিক জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করছে। এতেই আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কার্যত স্থবির হয়ে পড়ছে এবং বহুদিনের একটি ধারণা ভেঙে যাচ্ছে যে, যুদ্ধকালেও হরমুজ প্রণালি আন্তর্জাতিক নৌপথ হিসেবে সচল থাকবে।
উদাহরণ হিসেবে ২০২৫ সালের জুনে ইরান-ইসরাইলের মধ্যে ১২ দিনের সংঘাতের সময়ও হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই বাস্তবতা বদলে গেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের হামলা ঠেকানো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত কঠিন, ব্যয়বহুল এবং দীর্ঘমেয়াদি একটি সামরিক অভিযান হবে।
ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা যেমন বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে একই ধরনের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মাধ্যমে লোহিত সাগরের বাণিজ্য ব্যাহত করেছিল, তেমনি কৌশল এখন ব্যবহার করছে ইরান।
তখন যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক জোট গড়ে বিমান হামলা চালিয়েও প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ঠেকাতে পারেনি কিংবা বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর আস্থা পুরোপুরি ফিরিয়ে আনতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটনের সঙ্গে সমঝোতার পরই হুতিরা হামলা বন্ধ করেছিল। বিশ্লেষকদের মতে, এবার হরমুজের ক্ষেত্রে একই ধরনের কিন্তু আরও কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।

কেন হরমুজ এত গুরুত্বপূর্ণ?
বিশ্বের মোট জাহাজ চলাচলের প্রায় ১০ শতাংশ হয় বাব আল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে। অন্যদিকে হরমুজ দিয়ে বিশ্বব্যাপী প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি বাণিজ্য পরিচালিত হয়।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পও ইরানের সঙ্গে স্বল্পস্থায়ী একটি সমঝোতা ঘোষণার আগে সতর্ক করেছিলেন, হরমুজে বড় ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হলে তা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে “বিপর্যয়” ডেকে আনতে পারে।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইরানের কৌশল হলো বৈশ্বিক জ্বালানির দাম বাড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে চাপের মুখে ফেলা, যাতে শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটন হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের প্রভাব মেনে নিতে বাধ্য হয়।
যদি ইরান এই জলপথের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে, তাহলে দেশটি প্রতিবছর বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ট্রানজিট ফি আদায়ের পাশাপাশি বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহও নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে।

দীর্ঘমেয়াদে পাল্টা পরিকল্পনা
তবে বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে এই কৌশল উল্টো ইরানের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ এবং জ্বালানি কোম্পানিগুলো এখন এমন পাইপলাইন, বন্দর ও পরিবহন করিডোর নির্মাণে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে, যাতে হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে তেল ও গ্যাস রপ্তানি করা যায়। এই উদ্যোগগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রও সরাসরি সমর্থন দিচ্ছে।
যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ৩০ লাখ ব্যারেল জ্বালানি হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হতো। এই পথের ওপর নির্ভরশীল ছিল ইরাক, কুয়েত, কাতার ও বাহরাইনের রপ্তানি। পাশাপাশি সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতও এই রুট ব্যাপকভাবে ব্যবহার করত।
কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলে যাচ্ছে। বিভিন্ন দেশ একাধিক বিকল্প রপ্তানি পথ তৈরির পরিকল্পনা করছে, যাতে ভবিষ্যতে হরমুজের ওপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে।
বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান গোল্ডম্যান স্যাকসের এক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৮ সালের শেষ নাগাদ বিদ্যমান ও নতুন বিকল্প রুটগুলো মিলিয়ে বর্তমানে হরমুজ দিয়ে যে পরিমাণ তেল পরিবহন হয়, তার প্রায় ৬০ শতাংশ বহনের সক্ষমতা তৈরি হতে পারে।

বিভিন্ন দেশের পরিকল্পনা
ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় হরমুজে উত্তেজনার অভিজ্ঞতা থেকে সৌদি আরব বহু বছর আগে পূর্বাঞ্চল থেকে লোহিত সাগর পর্যন্ত পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন নির্মাণ করেছিল। বর্তমান সংকটে এই পাইপলাইন দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৭০ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি সম্ভব হয়েছে।
এখন সৌদি সরকার এই পাইপলাইন আরও সম্প্রসারণের ঘোষণা দিয়েছে। এতে ২০২৯ সালের মধ্যে অতিরিক্ত ১০ থেকে ২০ লাখ ব্যারেল পরিবহনের সক্ষমতা যুক্ত হবে। ফলে মোট সক্ষমতা দাঁড়াবে প্রতিদিন প্রায় ৯০ লাখ ব্যারেল।
এদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতেরও হরমুজের দক্ষিণে একটি বিদ্যমান পাইপলাইন রয়েছে, যা বর্তমানে প্রতিদিন ১৮ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন করতে পারে। ২০২৭ সালের মধ্যে এই সক্ষমতা দ্বিগুণ করে ৩৬ লাখ ব্যারেলে উন্নীত করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে।
এ ছাড়া সম্প্রতি ইরাকের প্রধানমন্ত্রী হোয়াইট হাউসে সফর করে সিরিয়ার সহযোগিতায় নতুন পাইপলাইন পুনর্র্নিমাণ ও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন। কিরকুক থেকে তুরস্কের ভূমধ্যসাগরীয় বন্দর জেইহান পর্যন্ত বিদ্যমান পাইপলাইন পুনরায় সক্রিয় করার উদ্যোগও নেয়া হয়েছে।
পাশাপাশি ইরাক একই সঙ্গে জর্ডানের আকাবা বন্দর পর্যন্ত নতুন পাইপলাইন নির্মাণের কাজও দ্রুত এগিয়ে নিচ্ছে।
ইতিহাসের শিক্ষা
বিশ্লেষণে ২০০৬ সালে চালু হওয়া বাকু-তিবলিসি-জেইহান (বিটিসি) পাইপলাইনের উদাহরণও তুলে ধরা হয়েছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে নির্মিত এই পাইপলাইন আজারবাইজান, জর্জিয়া ও তুরস্ক হয়ে ভূমধ্যসাগরে তেল পরিবহনের নতুন পথ তৈরি করে এবং রাশিয়ার ওপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেয়।
অন্যদিকে ইউরোপ দীর্ঘদিন রাশিয়ার জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল ছিল। পরবর্তীতে মস্কো সেই নির্ভরতাকেই রাজনৈতিক চাপ হিসেবে ব্যবহার করে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো ইরানের ক্ষেত্রে একই ভুল আর করতে চায় না বলেই বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, নতুন পাইপলাইন নির্মাণে অর্থায়ন, নিরাপত্তা, নির্মাণ বিলম্বসহ নানা চ্যালেঞ্জ থাকলেও সামগ্রিক প্রবণতা স্পষ্ট। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এখন ধরে নিচ্ছে যে ভবিষ্যতে হরমুজ প্রণালি সবসময় নির্ভরযোগ্যভাবে খোলা থাকবে- এমন নিশ্চয়তা আর নেই।
ফলে তারা একাধিক বিকল্প রপ্তানি পথ গড়ে তুলতে চায়, যাতে কোনো একক জলপথের ওপর নির্ভরশীল থাকতে না হয়। বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইরানের বর্তমান কৌশল এই ধারণার ওপর নির্ভর করছে যে বিশ্বের সামনে হরমুজ প্রণালির কোনো বাস্তব বিকল্প নেই।
কিন্তু যদি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো বিকল্প পাইপলাইন ও রপ্তানি করিডোর সফলভাবে গড়ে তুলতে পারে, তাহলে ভবিষ্যতে হরমুজের কৌশলগত গুরুত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে ইরান যে প্রভাব অর্জন করতে চায়, শেষ পর্যন্ত সেই কৌশলই তার ভূরাজনৈতিক প্রভাব কমিয়ে দিতে পারে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন