অচল পাকিস্তান শাসিত কাশ্মীর, বিপর্যস্ত জনজীবন

অচল পাকিস্তান শাসিত কাশ্মীর, বিপর্যস্ত জনজীবন

ফন্ট সাইজ:

টানা অবরোধ, ধর্মঘট এবং মোবাইল ও ইন্টারনেট সেবা বন্ধ থাকায় পাকিস্তান শাসিত কাশ্মীরের (আজাদ জম্মু ও কাশ্মীর-এজেকে) বিস্তীর্ণ এলাকা কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে পুঞ্চ বিভাগে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
চিকিৎসা, শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য, ব্যাংকিং থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ- সব ক্ষেত্রেই দেখা দিয়েছে সংকট। প্রতিবাদ-আন্দোলনের এই পরিস্থিতির ভয়াবহতা ফুটে উঠেছে পুঞ্চ বিভাগের কেরি কোট গ্রামের বাসিন্দা জহির ইকবালের অভিজ্ঞতায়।

ভাইকে বাঁচাতে মরিয়া লড়াই

গত জুনের মাঝামাঝি গভীর রাতে বুকে তীব্র ব্যথা নিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন জহির ইকবালের বড় ভাই। দুর্গম পাহাড়ি গ্রামে অ্যাম্বুলেন্স না পৌঁছানোয় তিনি, তার দুই ছেলে ও স্বজনরা মিলে রোগীকে একটি অস্থায়ী খাটে শুইয়ে কাঁধে করে দীর্ঘ পথ হেঁটে প্রধান সড়কে নিয়ে যান।

এরপর প্রতিবেশীদের মোটরসাইকেল থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করে এক বন্ধুর গাড়িতে করে তাকে ১০ কিলোমিটারেরও বেশি দূরের হাজিরা সরকারি হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকেরা প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে দ্রুত ইসলামাবাদের বড় হাসপাতালে নেয়ার পরামর্শ দেন।

কিন্তু সেখানেও দেখা দেয় নতুন সংকট। এরজন্য আরেকটি গাড়ি এবং অতিরিক্ত জ্বালানি সংগ্রহ করতে হয়। শেষ পর্যন্ত প্রায় ১৪০ কিলোমিটার দূরের ইসলামাবাদের একটি সরকারি হাসপাতালে পৌঁছানোর পর তার ভাই চিকিৎসা পান এবং বর্তমানে সুস্থ হয়ে উঠছেন।

কেন এই সংকট?

গত জুনে জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটি (জেএএসি) নিষিদ্ধ করার পর থেকেই অঞ্চলটিতে বিক্ষোভ, ধর্মঘট ও সংঘর্ষ শুরু হয়। সংগঠনটি কাশ্মীরি শরণার্থীদের জন্য সংরক্ষিত আইনসভার ১২টি আসন বাতিলসহ বিভিন্ন দাবিতে আন্দোলন করছিল
এরপর কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা বিক্ষোভ ও সংঘর্ষে আন্দোলনকারী এবং দেশটির আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যসহ বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটে। অঞ্চলটিতে আগামী ২৭ জুলাই থেকে শুরু হওয়ার কথা ধাপে ধাপে আইনসভা নির্বাচন।

তবে পুঞ্চ বিভাগের মানুষের মতে, নির্বাচন নয়- বরং পথ অবরোধ ও ইন্টারনেট বন্ধই তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় সংকটে পরিণত হয়েছে।

দেড় মাস ধরে ইন্টারনেট বন্ধ

এজেকেজুড়ে গত ৫ জুন থেকে মোবাইল ও ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবা বন্ধ রয়েছে। জহির ইকবাল বলেন, তাদের গ্রামের ব্যবসা-বাণিজ্য সীমিত হওয়ায় ইন্টারনেট বন্ধের প্রভাব শহরের তুলনায় কিছুটা কম হলেও শিক্ষার্থী ও ব্যবসায়ীদের জন্য এটি ভয়াবহ সমস্যা তৈরি করেছে।
তিনি বলেন, বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর থেকে কাজ প্রায় নেই বললেই চলে। বিদেশে ও ইসলামাবাদে থাকা আত্মীয়দের পাঠানো অর্থেই আমাদের সংসার চলছে।

প্রতিবেশী সুদনোতি জেলার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মালিক নিয়াজ আহমদ বলেন, সড়ক অবরোধের কারণে সরকারি ভর্তুকির গম সরবরাহ কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে।
তিনি জানান, যেখানে ভর্তুকি মূল্যে প্রতি মণ (প্রায় ৩৭ কেজি) গমের আটা পাওয়ার কথা ছিল ২ হাজার ২০০ পাকিস্তানি রুপিতে, সেখানে এখন ব্যবসায়ীদের বাজারদরে প্রায় ৬ হাজার রুপি দিয়ে আটা কিনতে হচ্ছে।

শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত

পুঞ্চের পাল্লানদারি এলাকার একটি সরকারি স্নাতকোত্তর কলেজের অধ্যক্ষ মাসুদ খান বলেন, ইন্টারনেট বন্ধ থাকাই এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা।

তিনি বলেন, মোবাইল নেটওয়ার্কও ঠিকমতো কাজ করে না। ফোনে কথা বলতে গেলেও বারবার সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

তিনি জানান, পাকিস্তানের মেডিকেল কলেজে ভর্তি পরীক্ষার মাঝপথে বাকি তিনটি পরীক্ষা স্থগিত করা হয়। ছয় সপ্তাহেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এখনও নতুন তারিখ ঘোষণা হয়নি।

মাসুদ খানের ভাষায়, পরীক্ষা না হলে ফল প্রকাশ হবে না, ভর্তি হবে না। পুরো একটি শিক্ষাবর্ষ নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে এই অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা।

ব্যবসা প্রায় ধ্বংস

মুজাফফরাবাদের আইনজীবী উসমান গুল জানান, ৯ জুন তার বিবাহোত্তর সংবর্ধনা অনুষ্ঠান ছিল। কিন্তু ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় ব্যাংক ও এটিএম কার্যত অচল হয়ে পড়ে। নিজের ব্যাংক হিসাবে টাকা থাকা সত্ত্বেও তিনি তা তুলতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত বন্ধুদের কাছ থেকে নগদ টাকা ধার করে প্রয়োজনীয় খরচ চালাতে হয় এবং অনুষ্ঠান স্থগিত করতে বাধ্য হন।
তিনি বলেন, সরকার একদিকে নগদবিহীন লেনদেন ব্যবহারে উৎসাহ দেয়, অন্যদিকে সংকট তৈরি হলেই প্রথম কাজ হিসেবে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়।

মুজাফফরাবাদের মুদ্রণ ব্যবসায়ী মালিক দাউদ বলেন, ৫ জুন থেকে তার ব্যবসা ‘সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে’। তিনি জানান, কর্মীদের প্রায় দুই ঘণ্টা দূরে গিয়ে মোবাইল নেটওয়ার্ক খুঁজতে হয়, যাতে গ্রাহক ও সরবরাহকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়।

তার দাবি, নির্বাচনকেন্দ্রিক ব্যবসার সবচেয়ে ব্যস্ত সময়ে ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় ১ কোটি ৫০ লাখ থেকে ২ কোটি পাকিস্তানি রুপি পর্যন্ত ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

সরকারের দাবি বনাম বাস্তবতা

পাক সরকারি কর্মকর্তাদের দাবি, অধিকাংশ এলাকায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। মুজাফফরাবাদ ও মিরপুর বিভাগের বেশিরভাগ এলাকায় চলাচলে কোনো বাধা নেই এবং নির্বাচনী প্রচারও চলছে ।

তবে পুঞ্চ ও সুদনোতির বাসিন্দাদের বক্তব্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাদের অভিযোগ, কোথাও কার্যকর ইন্টারনেট নেই, মোবাইল নেটওয়ার্কও অত্যন্ত দুর্বল, আর সড়ক অবরোধের কারণে জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সংকট অব্যাহত রয়েছে।

নির্বাচন নিয়ে ভিন্ন মত

জহির ইকবাল জানিয়েছেন, তিনি এবার নির্বাচনে ভোট দেবেন না। তার অভিযোগ, যারা আমাদের ওপর নির্যাতন চালাচ্ছে, তাদের জন্য আমরা কেন ভোট দেব?

অন্যদিকে ব্যবসায়ী মালিক দাউদের মত ভিন্ন। তিনি বলেন, আমি অবশ্যই ভোট দেব। এসব সমস্যার সমাধান সংসদের মাধ্যমেই হওয়া উচিত, সড়ক অবরোধ করে নয়।
আর সালমা আহমদের মতে, নির্বাচন নয়, মানুষের সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে দীর্ঘদিনের ইন্টারনেট বন্ধ।

তিনি প্রশ্ন রাখেন, আর কতদিন এভাবে চলবে? কয়েকটি ঘটনার জন্য পুরো জনগণকে কেন ভোগান্তি পোহাতে হবে?

শিক্ষক মাসুদ খানের উদ্বেগ আরও গভীর। তিনি বলেন, একটি পুরো প্রজন্মের শিক্ষাবর্ষ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এর দায় কে নেবে? এই শিশুদের ভবিষ্যতের কথা কে ভাবছে?

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন