লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস প্রোগ্রামের আওতায় দেশের ৬৪ জেলায় একটি করে পারফর্মিং আর্টস কলেজ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। বৃহস্পতিবার দিনাজপুর সংগীত কলেজে শিক্ষক সমাবেশে এই সিদ্ধান্তের কথা জানান জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর (ভিসি) প্রফেসর ড. এ. এস. এম. আমানুল্লাহ। তিনি বলেন, একটি জাতির উন্নয়ন শুধু অর্থনৈতিক অগ্রগতির ওপর নির্ভর করে না; এর ভিত্তি নির্মিত হয় সুস্থ সংস্কৃতি, মানবিক মূল্যবোধ, নৈতিক শিক্ষা এবং জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনের মাধ্যমে। সুস্থ সংস্কৃতির চর্চা ও গুণগত শিক্ষার সমন্বয়ই পারে একটি মেধাভিত্তিক, মানবিক, অসাম্প্রদায়িক ও বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে। ড. আমানুল্লাহ বলেন, বর্তমান বিশ্বে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা, সৃজনশীলতা, নৈতিকতা ও সাংস্কৃতিক চেতনায় সমৃদ্ধ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
সংস্কৃতিচর্চা একজন শিক্ষার্থীর মনন, ব্যক্তিত্ব ও নেতৃত্বের গুণাবলি বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই শিক্ষা ও সংস্কৃতিকে পরস্পরের পরিপূরক হিসেবে বিবেচনা করে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় বিভিন্ন সংস্কার ও উন্নয়নমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। নানা প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে এগিয়ে যাওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের শ্রেণিকক্ষে ফিরিয়ে এনে বিভিন্ন ধরনের মব কালচার, দলীয় কোন্দল এবং শিক্ষকদের অপমানের মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কোমর সোজা করে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। এখন সময় উচ্চশিক্ষাকে যুগোপযোগী ও দক্ষতাভিত্তিক করে দেশের জন্য কার্যকর মানবসম্পদ গড়ে তোলার। উচ্চশিক্ষা খাতের দীর্ঘদিনের সংকটের প্রসঙ্গ তুলে ভিসি বলেন, আমরা এমন একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত শিক্ষা ব্যবস্থা পেয়েছি, যেখানে অনেক সময় নিজেরাই হতাশ হয়ে পড়েছিলাম। স্বাধীনতার ৫৪ বছর পর শিক্ষা খাতে জাতীয় বাজেটের ২ শতাংশ বরাদ্দ নিশ্চিত হয়েছে। শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নে আরও বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, কারণ মানবসম্পদ উন্নয়নই টেকসই উন্নয়নের সবচেয়ে বড় ভিত্তি। তিনি বলেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে যে ধরনের পড়াশোনা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে, তা দিয়ে বাংলাদেশের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব নয়। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে যথাযথ সংস্কার বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনা সম্ভব। সে লক্ষ্যেই আমরা দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা চালুর উদ্যোগ নিয়েছি।
ড. আমানুল্লাহ আরও বলেন, প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে প্রায় ১০ লাখ মানুষ বিদেশে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে যান। এর মধ্যে সাড়ে তিন থেকে চার লাখ কর্মী মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কাজ করেন। তাদের বিদেশে যাওয়ার আগে আরবি ভাষায় দক্ষ করে গড়ে তোলা গেলে রেমিট্যান্স আয় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেতে পারে। বর্তমানে প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো রেমিট্যান্সের বড় একটি অংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে। কর্মীদের ভাষাগত দক্ষতা নিশ্চিত করা গেলে এই আয় আরও বহুগুণ বাড়ানো সম্ভব। এই গালফ স্টেট থেকে বর্তমানে ১০ থেকে ১২ বিলিয়ন ডলার অর্থ আসে, কর্মীদের ভাষা শিখিয়ে পাঠালে সেটি ২৪ থেকে ২৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হবে।
ড. আমানুল্লাহ বলেন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, চীনসহ বিভিন্ন দেশে কর্মসংস্থানের জন্য যাওয়া তরুণদের সংশ্লিষ্ট দেশের ভাষায় প্রশিক্ষিত করা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে মান্দারিন ভাষায় দক্ষতা অর্জন করলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উন্নত কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। আলোচনা সভা শেষে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ঘোষিত চলমান গ্রিন ক্যাম্পাস ও ওয়ান স্টুডেন্ট, ওয়ান ট্রি কর্মসূচির অংশ হিসেবে কলেজ ক্যাম্পাসে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে অংশ নেন ভিসি। এ সময় পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় তিনি একটি বনজ ও একটি ফল গাছের চারা রোপণ করেন। অনুষ্ঠানে হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (হাবিপ্রবি) শিক্ষক এবং দিনাজপুর সংগীত ডিগ্রি কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতি প্রফেসর ড. নওশের ওয়ানের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি ছিলেন দিনাজপুর সদর আসনের সংসদ সদস্য সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম। বিশেষ অতিথি ছিলেন দিনাজপুর জেলা পরিষদের প্রশাসক অ্যাডভোকেট মো. মোফাজ্জল হোসেন দুলাল, দিনাজপুর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক বখতিয়ার আহমেদ কচি।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আঞ্চলিক সমন্বয় দপ্তরের পরিচালক মো. আমিনুল আক্তার, প্রধান প্রকৌশলী মো. মিজানুর রহমান এবং ভাইস-চ্যান্সেলর দপ্তরের অতিরিক্ত রেজিস্ট্রার মো. নজরুল ইসলাম, কলেজ অধ্যক্ষ মো. হাছান মাহমুদ। এছাড়া জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, গণ্যমান্য ব্যক্তি এবং সুধীজন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। আলোচনা সভা শেষে কলেজের শিক্ষার্থী এবং স্থানীয় শিল্পীদের পরিবেশনায় এক মনোমুগ্ধকর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়। অনুষ্ঠানে কলেজের সংগীত বিভাগের শিক্ষার্থীরা প্রধান অতিথি ও প্রধান আলোচককে ফুলের তোড়া এবং উত্তরীয় পরিয়ে বরণ করে নেন। পরে কলেজের পক্ষ থেকে তাদের সম্মাননা ক্রেস্ট প্রদান করা হয়।
