অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসন আইনের সীমাবদ্ধতা ও রাষ্ট্রহীনতার সুস্পষ্ট আইনি স্বীকৃতির অভাবে আট হাজারেরও বেশি মানুষ বছরের পর বছর অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবন কাটাচ্ছেন। নাগরিকত্ব না থাকায় তারা শিক্ষা, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা এবং স্থায়ী বসবাসের সুযোগ পেতে নানা জটিলতার মুখে পড়ছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিবাসন ব্যবস্থার এই ফাঁকফোকর পূরণে রাষ্ট্রহীন ব্যক্তিদের জন্য একটি জাতীয় আইনি কাঠামো জরুরি। এই বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি ২৩ বছর বয়সী রোহিঙ্গা তরুণী আসমা নাঈম উল্লাহর জীবন। দীর্ঘ ১১ বছর রাষ্ট্রহীন হিসেবে অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসের পর চলতি বছরের মে মাসে তিনি ও তার পরিবার অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকত্ব লাভ করেন।
আসমা বলেন, আমি নিজেকে রাষ্ট্রহীন মনে করি না, কারণ আমি জানি আমার পরিচয় কী। আমি জানি আমি কোথা থেকে এসেছি। কিন্তু সেখানে আমাকে গ্রহণ করা হয় না।
রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের সদস্য আসমা এমন এক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি, যাদের ১৯৮২ সালে মিয়ানমারের সামরিক সরকার নাগরিকত্ব কেড়ে নেয়। এরপর থেকে রোহিঙ্গারা বিশ্বের বৃহত্তম রাষ্ট্রহীন জনগোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে। গত এক দশকে তাদের ওপর গণহত্যা, গণধর্ষণ, নির্বিচার হত্যা ও গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়ার ঘটনায় প্রায় ১২ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। মিয়ানমারে কোনো সরকারি পরিচয়পত্র ছাড়াই বেড়ে ওঠেন আসমা। ফলে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ ছিল সীমিত। পরিবারের সদস্যদের এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় যেতে হলেও বিশেষ অনুমতি নিতে হতো। ২০১৩ সালে জীবন বাঁচাতে পরিবারটি মিয়ানমার ছেড়ে থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া হয়ে সমুদ্রপথে অস্ট্রেলিয়ার উদ্দেশে যাত্রা করে। তিমুর সাগরে শতাধিক যাত্রীবাহী একটি কাঠের নৌকায় থাকা অবস্থায় অস্ট্রেলিয়ার সীমান্ত কর্তৃপক্ষ তাদের আটক করে। পরে ডারউইনের উপকূলীয় আটককেন্দ্রে রাখা হয় এবং আশ্রয়ের আবেদন মূল্যায়নের পর সিডনিতে পুনর্বাসন করা হয়। দীর্ঘ অপেক্ষার পর নাগরিকত্ব হাতে পেয়ে আসমা বলেন, আমি আর সেই অপরিচিত, অনির্দিষ্ট রাষ্ট্রহীন ব্যক্তি নই। অবশেষে আমার একটি জাতীয়তা হয়েছে। এখন আমার কাছে এমন একটি দলিল আছে যা প্রমাণ করে আমিও অন্য সবার মতো সমান মূল্যবান।
'২০২৬ আসমার পরিবারের সোনালী বছর'
আসমার মা সাজেদা নাগরিকত্ব পাওয়ার অনুভূতিকে ‘নবজাতকের মতো নতুন জীবন’ পাওয়ার সঙ্গে তুলনা করেছেন। পরিবারের কাছে ২০২৬ সাল তাই সোনালী বছর। এখন তারা নিজেদের পরিচয় দেন—অস্ট্রেলিয়ান রোহিঙ্গা। আসমা সিডনি ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি থেকে জনস্বাস্থ্যে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন। বর্তমানে তিনি অস্ট্রেলিয়ান রোহিঙ্গা উইমেনস ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে রোহিঙ্গা নারী ও শিশুদের ক্ষমতায়নে কাজ করছেন। তবে তার অনেক স্বজন এখনও বাংলাদেশের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে বসবাস করছেন বলে তিনি এবিসিকে জানান।
আসমা বলেন, আমি এমন একটি অবস্থানে পৌঁছাতে চাই, যেখানে আর কোনো মানুষকে রাষ্ট্রহীন করে রাখা সম্ভব হবেনা। রাষ্ট্রহীনতা থেকে নাগরিকত্বের এই যাত্রা কেবল একটি পরিবারের গল্প নয় বরং বিশ্বজুড়ে পরিচয় ও নাগরিক অধিকারের জন্য সংগ্রামরত লাখো মানুষের আকাঙ্ক্ষার প্রতিচ্ছবি। মেলবোর্ন ল স্কুলের পিটার ম্যাকমুলিন সেন্টার অন স্টেটলেসনেস-এর গবেষণায় দেখা গেছে, অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসকারী অধিকাংশ রাষ্ট্রহীন ব্যক্তি এক দশকেরও বেশি সময় আগে আশ্রয়ের জন্য দেশটিতে এসেছেন। কেন্দ্রটির সহযোগী পরিচালক কেটি রবার্টসন এবিসিকে জানান, ২০২৫ সালের সরকারি হিসাব অনুযায়ী অস্ট্রেলিয়ায় ৮ হাজার ১৮৩ জন রাষ্ট্রহীন ব্যক্তি রয়েছেন। তবে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। কারণ দেশটিতে রাষ্ট্রহীনতার কোনো অভিন্ন আইনি সংজ্ঞা বা রাষ্ট্রহীন ব্যক্তিদের শনাক্ত করার আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থা নেই।
তার ভাষায়, ২০১৩ সালে অপারেশন সভরিন বর্ডারস চালুর পর নতুন করে খুব কম রাষ্ট্রহীন ব্যক্তি অস্ট্রেলিয়ায় প্রবেশ করেছেন। কিন্তু রোহিঙ্গা, ফেইলি কুর্দি, উপসাগরীয় দেশগুলোর বেদুইন এবং ফিলিস্তিনিদের মতো জনগোষ্ঠী দীর্ঘমেয়াদি আইনি অনিশ্চয়তার কারণে শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে নানা প্রতিবন্ধকতার মুখে রয়েছেন। তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্রহীন ব্যক্তিরা বছরের পর বছর আইনি অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবন কাটাচ্ছেন। রাষ্ট্রহীনতার বিষয়টি এখনো যথাযথভাবে মূল্যয়ন হয় না। ফলে অনেকেই অভিবাসন ব্যবস্থার ফাঁকফোকরে হারিয়ে যাচ্ছেন। রিফিউজি অ্যাডভাইস অ্যান্ড কেসওয়ার্ক সার্ভিসেস (RACS)-এর পরিচালক সারাহ ডেল এই বিষয়ে একমত পোষণ করেন এবং অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসন ব্যবস্থায় আনুষ্ঠানিক পরিচয়পত্রবিহীন ব্যক্তিদের জন্য কোনো সুস্পষ্ট পথের অভাবের কথা উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, এর ফলে তাদের জন্য ভিসা পাওয়া এবং পরবর্তী ধাপের জন্য আবেদন করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে। অভিবাসন আইন বিশেষজ্ঞ ও শরণার্থী অধিকারকর্মীরা অস্ট্রেলিয়ার আইনে রাষ্ট্রহীন ব্যক্তিদের সুস্পষ্ট সংজ্ঞা অন্তর্ভুক্ত করা এবং তাদের স্থায়ী বসবাসের একটি কার্যকর পথ তৈরির দাবি জানিয়েছেন। তারা রাষ্ট্রহীন ব্যক্তিদের আনুষ্ঠানিকভাবে শনাক্ত করার জন্য একটি জাতীয় রাষ্ট্রহীনতা কাঠামো প্রণয়নের আহ্বান জানিয়েছেন। ক্যানবেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাগরিকত্ব আইন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক কিম রুবেনস্টাইন এবিসিকে বলেন, বর্তমান আইনে অস্ট্রেলিয়ায় জন্ম নেওয়া এবং অন্য কোনো দেশের নাগরিকত্ব না পাওয়া ব্যক্তি নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে পারেন। তবে এই বিধান আন্তর্জাতিক রাষ্ট্রহীনতা কনভেনশনের মানদণ্ড পূরণে যথেষ্ট নয়। তার মতে, আইনটি আরও বিস্তৃত করা হলে রাষ্ট্রহীনতা কমানোর বিষয়ে অস্ট্রেলিয়ার অঙ্গীকার আরও শক্তিশালী হবে। আমরা এমন একটি সুবিন্যস্ত ও সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া দেখতে চাই, যাতে অভিবাসন ও নাগরিকত্ব ব্যবস্থার প্রতিটি ধাপে রাষ্ট্রহীন ব্যক্তিদের পরিচয় আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি পায়।
