এবার পশ্চিম আফ্রিকার দেশ মালিতে সামরিক অভিযান চালানো কথা ভাবছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। দেশটি মালিতে আল-কায়েদাসংশ্লিষ্ট জঙ্গিগোষ্ঠী জামা’আত নুসরাত আল-ইসলাম ওয়াল মুসলিমিনের (জেএনআইএম) বিরুদ্ধে হামলা চালাতে পারে। মার্কিন সংবাদপত্র দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে।
রিপোর্ট, এই পরিকল্পনাটি অনুমোদন পেলে ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেয়ার পর এটি হবে অষ্টম দেশ, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক হামলা চালাবে।
মালি পশ্চিম আফ্রিকার একটি মুসলিম প্রধান দেশ। দেশটির প্রায় ৯৫ শতাংশ মানুষ ইসলাম ধর্ম অনুসরণ করেন। এই দেশের রাজধানী বামাকো এবং ঐতিহাসিক শহর টিম্বাকতু ইসলামি শিক্ষা ও সংস্কৃতির এক প্রাচীন কেন্দ্র।
জেএনআইএম ২০১৭ সালে আত্মপ্রকাশের পর থেকে একাধিক প্রাণঘাতী হামলা, অপহরণ ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের দায় স্বীকার করেছে। আল-কায়েদার মিত্র সংগঠনটি সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিম আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে হামলা বাড়িয়েছে।
গত মাসে তারা নাইজারের রাজধানীর একটি বিমানবন্দরে প্রাণঘাতী হামলা চালায়। এছাড়া মালির অভ্যন্তরে জ্বালানি অবরোধ, বিভিন্ন এলাকা অবরুদ্ধ করা এবং সহিংস কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
‘শান্তির প্রেসিডেন্ট’ পরিচয়ের মধ্যেই নতুন সামরিক পরিকল্পনা
নিজেকে ‘শান্তির প্রেসিডেন্ট’ হিসেবে তুলে ধরা এবং ‘শক্তির মাধ্যমে শান্তি’ নীতির কথা বললেও ট্রাম্প প্রশাসন বর্তমানে ইরানের সঙ্গে চলমান দীর্ঘ সংঘাতের মধ্যেই মালিতে সামরিক পদক্ষেপের বিষয়টি বিবেচনা করছে বলে জানিয়েছে দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট।
হামলার এই অনুমোদন মিললে ২০২৫ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান পরিচালিত দেশগুলোর তালিকায় মালিও যুক্ত হবে।
এর আগে ট্রাম্প প্রশাসন ইরাক, নাইজেরিয়া, সোমালিয়া, সিরিয়া, ভেনেজুয়েলা ও ইয়েমেনে হামলার নির্দেশ দিয়েছে।
এছাড়া ক্যারিবীয় অঞ্চল ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে মাদক পাচারের অভিযোগে নৌযানে অভিযান চালিয়ে ২০০ জনের বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ মালি?
মালি আফ্রিকার অন্যতম বৃহৎ স্বর্ণ উৎপাদনকারী দেশ। এছাড়া দেশটিতে বিপুল লিথিয়াম মজুত রয়েছে, যা বিদেশি কোম্পানিগুলোর আগ্রহের কেন্দ্র।
মালি, বুরকিনা ফাসো ও নাইজার বর্তমানে সামরিক শাসিত দেশগুলোর জোট অ্যালায়েন্স অব সাহেল স্টেটসের সদস্য।
সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দেশগুলো পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক কমিয়ে নিরাপত্তা সহযোগিতার জন্য রাশিয়ার দিকে ঝুঁকেছে।
কারা সামরিক হামলার পক্ষে?
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মালিতে জেএনআইএমের বিরুদ্ধে হামলার পক্ষে অবস্থান নেয়া ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সন্ত্রাসবিরোধী বিষয়ক জ্যেষ্ঠ পরিচালক ও প্রেসিডেন্টের ডেপুটি সহকারী সেবাস্টিয়ান গোরকা।
তবে হোয়াইট হাউস আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি যে প্রেসিডেন্ট সামরিক পদক্ষেপের অনুমোদনের কথা ভাবছেন।
হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা ইন্ডিপেনডেন্ট’কে বলেছেন, সাহেল অঞ্চলের দেশগুলো সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সফল হোক, সেটিই যুক্তরাষ্ট্র চায়। তবে মালির অবনতিশীল নিরাপত্তা পরিস্থিতির জন্য তিনি রাশিয়াকে দায়ী করে বলেন, নিরাপত্তা সহযোগী হিসেবে রাশিয়া কার্যকর প্রমাণিত হয়নি।
তিনি আরও বলেন, আফ্রিকার অন্যান্য দেশও যেন সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় রাশিয়ার ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নেয়।
যুক্তরাষ্ট্রের আহ্বান
ট্রাম্প প্রশাসন সাহেল জোটভুক্ত দেশ এবং পশ্চিম আফ্রিকার অন্যান্য উপকূলীয় দেশগুলোকে সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সরঞ্জাম ও সেবা কেনার আহ্বান জানিয়েছে।
একই সঙ্গে মালিকে সহায়তা করতে ন্যাটো এবং আঞ্চলিক মিত্রদেরও এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছে ওয়াশিংটনের প্রশাসন।
এদিকে রিপোর্টে বলা হয়েছে, চলতি বছর জেএনআইএম বামাকোসহ বিভিন্ন এলাকায় একাধিক হামলা চালিয়েছে। আত্মঘাতী হামলায় দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী নিহত হয়েছেন বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এ মাসে মালির সেনাবাহিনী ও রাশিয়ার আফ্রিকা কর্পস বাহিনীর সঙ্গে কয়েক দিন ধরে জেএনআইএমের সংঘর্ষ হয়। এ সময় সংগঠনটি একটি সামরিক হেলিকপ্টার ভূপাতিত করে এবং একটি গ্রামের বাসিন্দাদের জোরপূর্বক সরিয়ে দেয়।
গত সপ্তাহে জেএনআইএম একটি যৌথ সামরিক বহরে অতর্কিত হামলা চালায়। এতে আফ্রিকা কর্পসের সদস্যরা পিছু হটতে বাধ্য হন এবং বহু মালি সেনাকে ফেলে যান। পরে জঙ্গিরা তাদের অনেককে আটক করে হত্যা করে।
মানবাধিকার পরিস্থিতি
আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডাটার (এসিএলইডি)তথ্য অনুযায়ী, গত বছর জেএনআইএম ও অন্যান্য জঙ্গিগোষ্ঠীর হামলায় অন্তত ২৩২ জন বেসামরিক মানুষ নিহত হন। অন্যদিকে একই সময়ে মালির সেনাবাহিনী ও রুশ ভাড়াটে বাহিনীর অভিযানে ৯২৫ জন বেসামরিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে এসিএলইডির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কৌশল নিয়ে প্রশ্ন
গত বছর ট্রাম্প প্রশাসন মালি, বুরকিনা ফাসো ও নাইজারের সামরিক সরকারগুলোর সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় ও সামরিক সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়। এর লক্ষ্য ছিল, আফ্রিকার খনিজসম্পদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবেশাধিকার বাড়ানো এবং রাশিয়া ও চীনের প্রভাব মোকাবিলা করা।
তবে এই কৌশল কতটা কার্যকর, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
সুফান সেন্টারের জ্যেষ্ঠ গবেষক ওয়াসিম নাসর দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট’কে বলেন, আরও একবার সামরিক সমাধানের পথ বেছে নিলে সমস্যার সমাধান হবে না। ফ্রান্স ১০ বছর এই কৌশল অনুসরণ করেছে, রাশিয়া পাঁচ বছর ধরে একই চেষ্টা করছে। কিন্তু পরিস্থিতি শুধু আরও খারাপ হয়েছে।
