দুই মেয়াদে টানা এক দশক দায়িত্ব পালনের পর চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বর জাতিসংঘের (ইউএন) মহাসচিবের পদ ছাড়বেন আন্তোনিও গুতেরেস। তার উত্তরসূরি হওয়ার দৌড়ে বর্তমানে রয়েছেন ছয়জন প্রার্থী। তবে যিনি নির্বাচিত হবেন, তাকে এমন এক সময়ে দায়িত্ব নিতে হবে যখন জাতিসংঘের কার্যকারিতা, প্রভাব এবং আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র প্রশ্ন উঠছে।
জাতিসংঘের ভাষ্য অনুযায়ী, মহাসচিবের দায়িত্ব হলো একই সঙ্গে কূটনীতিক, অধিকারকর্মী, শীর্ষ প্রশাসনিক কর্মকর্তা এবং প্রধান নির্বাহী (সিইও) হিসেবে কাজ করা। এই পদধারী জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের কার্যক্রম তদারকি করেন। নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান দায়িত্ব আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখা।
মহাসচিব নির্বাচনে নিরাপত্তা পরিষদের সুপারিশের ভিত্তিতে ভোট দেয় জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ। তবে নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য- চীন, ফ্রান্স, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র- ভেটো ক্ষমতা রাখায় এই পদে নির্বাচিত হওয়ার পথ অত্যন্ত কঠিন।
গুতেরেসের উত্তরসূরি কে হতে পারেন তা নিয়ে ইতোমধ্যে জল্পনা চলছে।
মিশেল ব্যাশেলেট (চিলি)
চিলির প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট মিশেল ব্যাশেলেট (২০০৬–২০১০ এবং ২০১৪–২০১৮) এবার জাতিসংঘের প্রথম নারী মহাসচিব হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ২০১৬ সালে গুতেরেসের কাছে একাধিক নারী প্রার্থী পরাজিত হওয়ার পরও তিনি আশাবাদী।
৭৪ বছর বয়সী ব্যাশেলেট চলতি বছরের শুরুতে বলেন, ভদ্রভাবে বললে বলতে হয়, তখন হয়তো বিশ্ব প্রস্তুত ছিল না। এখন কি প্রস্তুত? আমি আশা করি, হ্যাঁ। তিনি বলেন, একজন নারী মহাসচিব নির্বাচিত হলে তা বিশ্ববাসীর জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা এবং বহু মানুষের জন্য আশার প্রতীক হবে।
২০১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত তিনি জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ছিলেন। এ সময় তিনি বহু গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক ইস্যুতে কাজ করেছেন।
নিরাপত্তা পরিষদের অচলাবস্থা দূর করার কোনো ‘জাদুকরী সমাধান’ তাঁর কাছে নেই বলে স্বীকার করলেও, নিজের দীর্ঘ অভিজ্ঞতাকেই তিনি সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে তুলে ধরেছেন।
রাফায়েল মারিয়ানো গ্রোসি (আর্জেন্টিনা)
আর্জেন্টিনার কূটনীতিক রাফায়েল মারিয়ানো গ্রোসি তার কর্মজীবনের বড় অংশ কাটিয়েছেন পারমাণবিক ও আণবিক জ্বালানি খাতে। ২০১৯ সালে তিনি জাতিসংঘ সংশ্লিষ্ট স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) মহাপরিচালক হন।
বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে পারমাণবিক যুদ্ধের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে গ্রোসি মনে করেন, এই খাতে তার অভিজ্ঞতা একটি বড় সুবিধা। সুইজারল্যান্ডভিত্তিক সংবাদমাধ্যম জেনেভা সলিউশন্স’কে তিনি বলেন, আপনি যে পৃথিবীতে বাস করছেন, সেটিকে বুঝতে হবে।
গ্রোসি জাতিসংঘের চলমান ইউএন৮০ সংস্কার উদ্যোগকে সমর্থন করেন। তার মতে, নতুন করে সবকিছু গড়ে তোলার প্রয়োজন নেই; বরং বিভিন্ন সংস্থার একীভূতকরণ এবং একই ধরনের একাধিক কাঠামো কমিয়ে ব্যয় হ্রাস করা উচিত।
মারিয়া ফার্নান্দা এস্পিনোসা (ইকুয়েডর)
স্পেনে জন্ম নেয়া মারিয়া ফার্নান্দা এস্পিনোসা ইকুয়েডরের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী। ৬১ বছর বয়সী এই কূটনীতিক একজন কবি, প্রাবন্ধিক এবং টেকসই উন্নয়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক বিশেষজ্ঞ। কর্মজীবনের শুরুতে তিনি আমাজন অঞ্চলের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সঙ্গে কাজ করেছেন।
এছাড়া তিনি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন।
বৃটেনের দ্য অবজারভার পত্রিকাকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, বর্তমানে জাতিসংঘের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আর্থিক সংকট। তার ভাষায়, জাতিসংঘকে সংস্কার করতে হবে, রূপান্তর ঘটাতে হবে, নইলে টিকে থাকা কঠিন হবে। এস্পিনোসা আঞ্চলিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা এবং ইউরোপের আর্থিক ও কূটনৈতিক সহায়তার ওপর জোর দিতে চান।
রেবেকা গ্রিনস্প্যান (কোস্টারিকা)
কোস্টারিকার সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট রেবেকা গ্রিনস্প্যান বর্তমানে জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সম্মেলনের (আঙ্কটাড) মহাসচিব। ২০২২ সালে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর যুদ্ধরত পক্ষগুলোর মধ্যে ইউক্রেনীয় শস্য রপ্তানি অব্যাহত রাখতে যে চুক্তি হয়েছিল, তা আলোচনার মাধ্যমে বাস্তবায়নে তার ভূমিকা আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়।
গ্রিনস্প্যানের মতে, জাতিসংঘকে আরও সাহসী হতে হবে। লন্ডনে চ্যাথাম হাউস আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, আমলাতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো স্বভাবগতভাবে ঝুঁকি নিতে চায় না। কিন্তু নতুন ধারণা বাস্তবায়ন করতে হলে ঝুঁকি নিতেই হবে।
তিনি নিরাপত্তা পরিষদে বিশেষ করে আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার আরও বেশি প্রতিনিধিত্বের পক্ষেও মত দিয়েছেন।
ম্যাকি সাল (সেনেগাল)
৬৪ বছর বয়সী ম্যাকি সাল ২০১২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সেনেগালের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। এর আগে তিনি দেশটির প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
তার শাসনামলে সেনেগালে উল্লেখযোগ্য অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলেও দ্বিতীয় মেয়াদে বিরোধী নেতা উসমান সোনকো’কে কারাবন্দি করার ঘটনায় বিক্ষোভ শুরু হলে তার জনপ্রিয়তা কমে যায়। ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন পিছিয়ে দেয়ার ব্যর্থ চেষ্টা আরও প্রাণঘাতী বিক্ষোভের জন্ম দেয়, যা তাকে নিজ দেশে বিতর্কিত ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে।
প্রথমদিকে সেনেগালের বর্তমান সরকার তার প্রার্থিতাকে সমর্থন না করলেও গত মাসে অবস্থান পরিবর্তন করে তার পক্ষে সমর্থন ঘোষণা করে।
ক্যারোলিন রদ্রিগেজ বার্কেট (গায়ানা)
সবশেষে প্রার্থিতার ঘোষণা দেন ক্যারোলিন রদ্রিগেজ বার্কেট। জুনের মাঝামাঝি তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় যোগ দেন। বর্তমানে তিনি জাতিসংঘে গায়ানার স্থায়ী প্রতিনিধি। এর আগে তিনি জাতিসংঘে বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেছেন এবং গায়ানার পররাষ্ট্রমন্ত্রীও ছিলেন। তিনি আমেরিকার আদিবাসী জনগোষ্ঠী আমেরিন্ডিয়ান সম্প্রদায়ের সদস্য এবং এ সম্প্রদায়সংশ্লিষ্ট সরকারি দায়িত্বও পালন করেছেন।
গায়ানার প্রেসিডেন্ট ইরফান আলী তার প্রার্থিতার লক্ষ্য ব্যাখ্যা করে বলেন, রদ্রিগেজ বার্কেটের লক্ষ্য হলো বহুপাক্ষিক সহযোগিতা আরও শক্তিশালী করা, জাতিসংঘকে আরও কার্যকর ও দ্রুত সাড়া দিতে সক্ষম করে তোলা, অন্তর্ভুক্তিমূলক বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং সমসাময়িক বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জাতিসংঘকে আরও সক্ষম করে তোলা।

মনিরুজ্জামান
৪২ মিনিট আগেআমার দৃষ্টিতে ডঃ মুহাম্মদ ইউনূস সাহেব এই পদের জন্য একজন যোগ্য ব্যক্তি,তাই বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তাকে প্রার্থী ঘোষণা করা হউক।