গত এক মাসেরও বেশি সময় ধরে জীবন আবর্তিত হতো খেলার নির্দিষ্ট সূচিকে ঘিরে। দিনের পরিকল্পনাগুলো সাজানো, মিটিং পেছানো, আর বিরতিগুলো অস্বাভাবিক দীর্ঘ রূপ নিয়েছিল এক ওপেন সিক্রেট কারণে। রাত-দিন চব্বিশ ঘণ্টা সচল থাকা গ্রুপ চ্যাটগুলোতে ভরপুর ছিল মিম, কৌশলী বিশ্লেষণ আর এমন সব পূর্বাভাসে যা খেলা শুরুর কয়েক মিনিটের মধ্যেই হয়তো ভুল প্রমাণিত হয়েছে। বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ভক্তের জন্য পুরুষদের ফিফা বিশ্বকাপ কেবল একটি টুর্নামেন্ট ছিল না, এটি হয়ে উঠেছিল দৈনন্দিন জীবনের নিয়মিত অংশ।
গত রবিবারে নিউইয়র্কের সেন্ট্রাল পার্কে আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে স্পেনের জয়ের পর স্পেনের ভক্ত শ্রীশ বেরেডি উদযাপনের মাঝে বলেন, প্রতিদিন কাজ শেষ করে আপনি ভাবেন, কখন খেলা হবে। কিন্তু আর খেলা নেই। শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বকাপও যেন চোখের পলকে বিদায় নিল। সকালের চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে আর সময়সূচি চেক করার সুযোগ নেই। অফিসে জাতীয় দলের জার্সি পরে যাওয়ার আর কোনো অজুহাত নেই। ইনজুরি টাইমের গোলের পর পাশে থাকা অপরিচিত কাউকে জড়িয়ে ধরার দৃশ্যও আর নেই, কিংবা রেফারির কোনো বিতর্কিত সিদ্ধান্ত পুরো বিকেল নষ্ট করে দেয়ার মতো ঘটনাও ঘটবে না। অন্য এক স্পেন ভক্ত আমির হেসে বলেন, দিনগুলো এখন বেশ একঘেয়েভাবে কেটে যাবে।
আমরা প্রতিদিন এই খেলাগুলো দেখতে দেখতে এতে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম। আমির একাই কেবল এমন অনুভব করছেন তা নয়। বিশ্বের সবচেয়ে বড় এই ক্রীড়া টুর্নামেন্ট ভক্তদের মনে এক পরিচিত অনুভূতি রেখে যায়, যাকে বলা হয় ‘স্পোর্টস ফ্যানস ব্লুজ’ বা খেলাপাগলদের বিষাদময় অবস্থা। মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, কয়েক সপ্তাহের তীব্র ও সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় নেয়া উত্তেজনার পর এই মানসিক উত্তেজনার পতন খুবই স্বাভাবিক।
মনোবিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই উল্লেখ করে আসছেন, বড় ক্রীড়া প্রতিযোগিতাগুলো শক্তিশালী মানসিক এবং সামাজিক বন্ধনের পরিবেশ তৈরি করে। ভক্তরা তাদের সময়, ব্যক্তিগত আকাক্সক্ষা এবং প্রত্যাশা প্রতিটি ম্যাচে বিনিয়োগ করে। দল ট্রফি তুলুক কিংবা বুকভাঙা বিদায় নিক, দৈনন্দিন এই অভ্যাসের আকস্মিক ক্ষতি তাদের এক অপ্রত্যাশিত শূন্যতার মধ্যে ফেলে দেয়। শ্রীশ বেরেডি আরও বলেন, নিশ্চিতভাবেই এটি এক ধরণের বিষন্নতা। আপনি পুরো একটি মাস মাঠে যান, জার্সি কেনেন, পরবর্তী ম্যাচ নিয়ে তর্ক করেন এবং আড্ডায় সময় কাটান। তারপর বিশ্বকাপ শেষ হয়ে যায় এবং আড্ডার কোনো টপিক খুঁজে পেতে কষ্ট হয়। বিষয়টি বেশ নাটকীয় এবং অনেকের কাছে কিছুটা অযৌক্তিক মনে হতে পারে। আপনার ঘরবাড়ি ঠিক আছে, পরিবার ভালো আছে, বন্ধুরা আছে, চাকরিটাও আছে। তবুও মনের ভেতর যেন কিছুর একটা অভাব থেকে যায়। কয়েক সপ্তাহ ধরে এই টুর্নামেন্ট ভক্তদের এমন একটি যৌথ অভিজ্ঞতা দিয়েছে যা বর্তমান যুগে বেশ বিরল। পুরো দেশ একসঙ্গে আনন্দ করেছে, শোক পালন করেছে।
পরিবারগুলো এক হয়েছে, নতুন করে বন্ধুত্বের পুনর্মিলন ঘটেছে। এমনকি যে সহকর্মীরা খুব একটা কথা বলতেন না, তারাও হঠাৎ করে দলের ফরমেশন বা লাল কার্ডের সিদ্ধান্ত নিয়ে নিজস্ব মতামত ব্যক্ত করেছেন। ফাইনালের পর সেন্ট্রাল পার্ক থেকে ভক্তরা যখন ধীরে ধীরে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন তাসফিক তানিম নামের এক ভক্ত বলেন, বিশ্বকাপের মতো অন্য কোনো কিছুই সকলকে এভাবে এক সুতোয় গাঁথতে পারে না। এটি চলে গেলে আপনি কেবল হাইলাইটস দেখেন আর পুরনো স্মৃতি রোমন্থন করেন। আর এই কারণেই চারপাশের এই নীরবতা এত অদ্ভুত ঠেকে। পেনাল্টি মিস থেকে আসা আনন্দ, হতাশা, রাগ কিংবা ক্ষণিক স্বস্তি দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে গেঁথে যায়। তারপর রাতারাতি সব আগের মতো স্বাভাবিক হয়ে যায়। তবে এই স্বাভাবিক জীবনে নাটকীয়তার অভাব রয়েছে।
সম্পূর্ণ অপরিচিত কাউকে জড়িয়ে ধরার মতো উপলক্ষ্য নেই বললেই চলে। ফুটবল প্রেমী গ্লেন ভিওলা বলেন, উন্মাদনার জোয়ারে আপনি এতটাই ভেসে যান যে মনে হয় এটি বুঝি কখনোই শেষ হবে না। কিন্তু পরের দিন সকালে উঠে ভাবেন, আরে আজ তো কোনো খেলা নেই! আর তারপরই উপলব্ধি হয় যে এর জন্য আপনাকে আবার চার বছর অপেক্ষা করতে হবে, সত্যি এটা কঠিন। তবে স্বস্তির খবর হলো, এই অনুভূতি বেশিদিন স্থায়ী হয় না। মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই শূন্যতা কাটানোর সেরা উপায় হলো বিশ্বকাপের সেই বিশেষ মুহূর্তগুলোকে ধরে রাখা। বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা, গ্রুপ চ্যাটগুলো সচল রাখা এবং নতুন কিছুর প্রতীক্ষায় থাকা। খুব শীঘ্রই জার্সিগুলো আবার আলমারিতে উঠে যাবে, কথোপকথন অন্য বিষযে চলে যাবে এবং অন্য কোনো বড় ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নিশ্চিতভাবেই সবার নজর কেড়ে নেবে।
কিন্তু আপনি যদি এখনও ফোন হাতে নিয়ে উপলব্ধি করেন যে আজ কোনো খেলা নেই এবং মনে এক অপ্রত্যাশিত হতাশা জাগে, তবে জেনে রাখুন আপনি একা নন। এই মুহূর্তে আপনি ছাড়া আরও অনেকেই হয়তো ভাবছে, এখন কী করা যায়?
(সিএনএনের প্রতিবেদন অবলম্বনে)
