গভীর সংকটে আবাসন খাত

গভীর সংকটে আবাসন খাত

ফন্ট সাইজ:

নির্মাণসামগ্রীর আকাশচুম্বী বাজারদর, উচ্চ সুদহার, রাজনৈতিক ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা এবং নতুন বাজেটের করনীতির কারণে বড় ধরনের মন্দার মুখে পড়েছে দেশের আবাসন খাত। একদিকে ক্রেতাদের আস্থা ও ক্রয়ক্ষমতা কমায় ফ্ল্যাট বিক্রি ও বুকিং আশঙ্কাজনক হারে কমছে, অন্যদিকে কাঁচামালের লাগামহীন দামের কারণে থমকে গেছে আবাসন প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্মাণকাজ। সংকটের ধারাবাহিকতায় এ খাতে খেলাপি ঋণের হার প্রায় ২৭ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে। আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব) এবং নিবন্ধন অধিদপ্তরের তথ্য থেকে এই খাতের ভয়াবহ সংকটের চিত্র ফুটে উঠেছে।

নিবন্ধনে বড় ধস, কমছে রাজস্ব: নিবন্ধন অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি বছরের প্রথমার্ধে সারা দেশে ফ্ল্যাট হস্তান্তর চুক্তি বা দলিল নিবন্ধন হয়েছে মাত্র ৪১ হাজার ৮০৪টি, যার ঘোষিত বাজারমূল্য ছিল প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা। এই লেনদেনের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ (২৯,৯১৩টি) ফ্ল্যাট নিবন্ধিত হয়েছে রাজধানী ঢাকায়। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩ সালে দেশব্যাপী ফ্ল্যাট নিবন্ধন হয়েছিল ১ লাখ ৪৬ হাজারটি (বাজারমূল্য ১ লাখ কোটি টাকা)। ২০২৪ সালে তা কমে দাঁড়ায় ১ লাখ ১২ হাজারে এবং ২০২৫ সালে আরও কমে ১ লাখ ৪ হাজারটিতে নেমে আসে। ২০২৫ সালের প্রথমার্ধের তুলনায় চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ফ্ল্যাট নিবন্ধন কমেছে ১৯.৬১ শতাংশ। আর ২০২৩ সালের একই সময়ের তুলনায় এই সংকোচনের হার ৪২.৭৩ শতাংশ। ফ্ল্যাট কেনাবেচায় এই ধসের কারণে সম্পত্তি রেজিস্ট্রেশন খাত থেকে সরকারের রাজস্ব আদায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমে গেছে বলে নিশ্চিত করেছেন নিবন্ধন অধিদপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (নিবন্ধন) নিপেন্দ্র নাথ সিকদার।

চুক্তি ও বুকিং বাতিল: গত দুই বছরে অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। আবাসন খাতের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালে আগের বছরের তুলনায় মোট বিক্রি ৩০-৩৫ শতাংশ কমেছে এবং ২০২৫ সালে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। রিহ্যাবের এক নেতা জানান, ডেভেলপাররা এখন জমির মালিকদের সঙ্গে যৌথ-উদ্যোগ চুক্তি অনেক কম করছেন। ২০২৫ সালে প্রায় এক হাজার চুক্তি বাতিল হওয়ার পর, চলতি বছরের প্রথমার্ধে শুধুমাত্র ঢাকাতেই জমির মালিক ও ডেভেলপারদের মধ্যে স্বাক্ষরিত প্রায় ৪৫০টি চুক্তি বাতিল হয়েছে। এ ছাড়া অর্থ পরিশোধ করেও ফ্ল্যাট না পাওয়ায় রিহ্যাবের কাছে ১ হাজার ৬০০টি অমীমাংসিত অভিযোগ জমা পড়েছে। এমনকি দেশের শীর্ষস্থানীয় আবাসন প্রতিষ্ঠানগুলোও এই ধাক্কা থেকে মুক্ত নয়। শেলটেক জানিয়েছে, ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে তাদের প্রায় ২৫ শতাংশ বুকিং বাতিল হয়েছে এবং নতুন ফ্ল্যাট বিক্রি কমেছে ১৫ থেকে ১৮ শতাংশ।

মাঝারি ও ছোট ডেভেলপারদের অবস্থা: অনেক প্রতিষ্ঠান অর্ধেকের বেশি ফ্ল্যাট বিক্রি করতে না পেরে ব্যাংক ঋণের আশায় নিজেদের অংশ বন্ধক রেখে প্রকল্প সচল রাখার চেষ্টা করছে। শেলটেকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর আহমেদ বলেন, বৈশ্বিক অস্থিরতা স্টিল ও সিমেন্টের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। আবার স্থানীয় উৎপাদকরাও উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। ফলে আগে যেখানে বছরে ৭ থেকে ৮টি প্রকল্প সফলভাবে সম্পন্ন করা যেতো, সেখানে এখন মাত্র তিনটি প্রকল্প শেষ করতে পেরেছে। তবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ধীরগতির পরও রূপায়ণ অ্যাসেট লিমিটেড এ বছর কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সাব্বির হোসেন খান বলেন, বছরের শুরু থেকে আমাদের বিক্রি কিছুটা বেড়েছে এবং বর্তমানে কোনো প্রকল্প বন্ধ নেই।

ঊর্ধ্বমুখী নির্মাণ ব্যয় ও ঋণের উচ্চ সুদ: ডেভেলপারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০২০ সালের মহামারি এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকে প্রধান নির্মাণসামগ্রীর দাম ৫০ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। বর্তমানে বাজারে প্রতি ব্যাগ সিমেন্ট ৫২০ থেকে ৫৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর প্রতি টন এমএস রডের দাম গ্রেডভেদে ৮৫,০০০ টাকা থেকে ১ লাখ ৮ হাজার টাকায় উঠেছে। ইস্পাতপণ্য উৎপাদক প্রতিষ্ঠান কেএসআরএম গ্রুপের পরিচালক (বিক্রয় ও বিপণন) মো. জসিম উদ্দিন বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে জাহাজ ভাড়া ও আমদানি খরচ বাড়ায় কাঁচামাল সরবরাহে সংকট তৈরি হয়েছে, যা রডের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। এর ওপর নতুন বাজেটে নির্মাণসামগ্রীর ওপর ১০ শতাংশ নিয়ন্ত্রক শুল্ক আরোপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকট এবং গৃহঋণের সুদহার ১৪ থেকে ১৭ শতাংশে উঠে যাওয়ায় মধ্যবিত্তের জন্য ফ্ল্যাট কেনা এখন স্বপ্নের অতীত। রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত একটি কোম্পানি বছর খানেক আগে তাদের দুটি প্রকল্পের অধীনে পরিকল্পিত ৪৮টি ফ্ল্যাটের মধ্যে ২২টির বিক্রয় চুক্তি সম্পন্ন করেছিল। তবে মাত্র তৃতীয় তলার ছাদ ঢালাই করার পর নির্মাণকাজ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়, কারণ বাকি ২৬টি ফ্ল্যাট আর বিক্রি করা সম্ভব হয়নি।

খেলাপি ঋণের প্রভাব: বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, তীব্র আর্থিক চাপের কারণে রিয়েল এস্টেট খাতে খেলাপি ঋণের হার ২৫ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। ২০২৫ সালে এ খাতে খেলাপি ঋণের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৬.৭০ শতাংশে, যা ২০২২ সালেও ছিল মাত্র ৭ থেকে ৯ শতাংশের মধ্যে। এই খাত সরাসরি প্রায় ৩৫ লাখ মানুষ জড়িত। এ ছাড়া ইস্পাত, সিমেন্ট, সিরামিকসহ ২৫০টিরও বেশি লিংকেজ শিল্প এর সঙ্গে জড়িত। আবাসন খাতের এই স্থবিরতার কারণে গত তিন মাসে ইস্পাত উৎপাদকরাই প্রায় সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকার ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে এবং সিমেন্ট কারখানাগুলোর উৎপাদন সক্ষমতাও কমেছে। ছোট ও মাঝারি ডেভেলপাররা যখন টিকে থাকার লড়াইয়ে হিমশিম খাচ্ছে, তখন আবাসন বাজারের বড় প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের আর্থিক সামর্থ্যের ওপর ভর করে টিকে রয়েছে। ঢাকার মগবাজার এলাকার একটি শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি ব্যাংকের ব্র্যাঞ্চ ম্যানেজার জানান, এই খাতের বড় বড় নামগুলোও এখন হোঁচট খেতে শুরু করেছে।

রিহ্যাবের দাবি: রিহ্যাব সভাপতি ড. আলী আফজাল জানান, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ফ্ল্যাটের সরকারি মূল্যের ওপর নতুন ১৫ শতাংশ মূলধনী মুনাফা কর (ক্যাপিটাল গেইন ট্যাক্স) আরোপ করা, কালোটাকা সাদা করার সুযোগ বন্ধ করা এবং কাঁচামালের শুল্ক বৃদ্ধি এই সংকটকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। আগে যেখানে প্রতি বর্গফুট ফ্ল্যাট ৮ হাজার টাকায় বিক্রি করা যেতো, এখন তার নির্মাণ ব্যয়ই দাঁড়াচ্ছে প্রায় ১৩ হাজার টাকা। এই সংকট থেকে আবাসন খাতকে বাঁচাতে সরকারের কাছে দ্রুত নীতি সহায়তার দাবি জানিয়েছে রিহ্যাব। এর মধ্যে চলমান প্রকল্পগুলো শেষ করতে ৩ হাজার কোটি টাকার একটি বিশেষ তহবিল গঠন, মধ্য ও নিম্ন-মধ্যবিত্তদের জন্য স্বল্প সুদে দীর্ঘমেয়াদি আবাসন ঋণের ব্যবস্থা করা এবং ব্যবসাবান্ধব কর কাঠামো প্রণয়নের জোর আহ্বান জানানো হয়েছে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন