আরেক ফ্রন্টে যুদ্ধের শঙ্কা, ‘কাঁপছে বিশ্ববাজার’

সিএনএনের রিপোর্ট

আরেক ফ্রন্টে যুদ্ধের শঙ্কা, ‘কাঁপছে বিশ্ববাজার’

ফন্ট সাইজ:

ইরান সমর্থিত ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের বাব আল-মান্দেব প্রণালি অবরোধের হুমকি এমন এক সময়ে এসেছে, যখন মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক তেলের বাজার ইতিমধ্যেই বড় ধরনের অস্থিরতার মুখে রয়েছে।
সম্প্রতি হুতিরা হরমুজ প্রণালির বিকল্প গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বাব আল-মান্দেব বন্ধ করে দেয়ার হুমকি দিয়েছে। ইরানের কারণে হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার পর হুতিদের এই হুমকি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

যদিও হুতিরা এখন পর্যন্ত তাদের ঘোষিত অবরোধ কার্যকর করতে পারেনি বা করেনি। তবে তাদের এই হুমকির কারণেই কিছু জাহাজ লোহিত সাগর ছেড়ে দক্ষিণমুখী যাত্রা বাতিল করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি হুতিরা কার্যকরভাবে বাব আল-মান্দেব প্রণালি অবরোধ করতে সক্ষম হয়, তাহলে ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাতে নতুন একটি যুদ্ধফ্রন্ট তৈরি হতে পারে।
এতে যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন ফ্রন্টে সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করতে হতে পারে, যা একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিরাপদ রাখতে মার্কিন সক্ষমতার ওপরও চাপ সৃষ্টি করবে। এছাড়া হুতিদের এই হুমকির কারণে ইউরোপে সৌদির ডিজেল রপ্তানিও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে।

তেলের দামে বড় উল্লম্ফন
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন করে সংঘাত শুরুর পর চলতি মাসেই আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২০ ডলারের বেশি বেড়েছে। বুধবার (২২ জুলাই) দাম সাময়িকভাবে ৯৫ ডলার ছাড়িয়ে যায়, যা জুনের শুরু থেকে সর্বোচ্চ।
বাব আল-মান্দেব পথও অকার্যকর হয়ে গেলে তেলের দাম আরও বেড়ে যেতে পারে। হরমুজ প্রণালির মতো বাব আল-মান্দেবও বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ। সবচেয়ে সরু অংশে এর প্রস্থ মাত্র ১৪ মাইল, যা হরমুজের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ সংকীর্ণ।
তথ্য বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, গত এক মাসে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৬২ লাখ ব্যারেল তেল বাব আল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়েছে।

সৌদি আরবের বিকল্প রুটও ঝুঁকিতে
সাধারণ পরিস্থিতিতে তেলের বড় একটি অংশ পারস্য উপসাগর দিয়ে যেত। তবে যুদ্ধের কারণে সৌদি তাদের বিশাল ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন ব্যবহার করে লোহিত সাগরের তীরবর্তী ইয়ানবু বন্দরে তেল পাঠাচ্ছে।
আরবিসি ক্যাপিটাল মার্কেটসের বৈশ্বিক কৌশল বিভাগের প্রধান হেলিমা ক্রফট বলেন, সৌদি প্রতিদিন প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ ব্যারেল তেল এই বিকল্প পথে সরিয়ে নিচ্ছে।
তার ভাষায়, যদি এই পথও অচল হয়ে যায়, তাহলে বৈশ্বিক তেল সরবরাহে সংকট অনেক বেশি গুরুতর হবে। তখন আমরা আবার এমন পরিস্থিতির কথা বলব, যেখানে বের হওয়ার আর কোনো পথ থাকবে না।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিদিন ৪০ লাখ ব্যারেল তেল বাজার থেকে হারিয়ে গেলে তার প্রভাব হবে অত্যন্ত বড়। এটি প্রায় সেই পরিমাণ, যতটা তেল চীন যুদ্ধের সময় আমদানি কমিয়ে দিয়েছিল। সেই আমদানি হ্রাসই এতদিন তেলের দাম তুলনামূলক নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করেছে।

ব্যারেলপ্রতি দাম ১০০ ডলার ছাড়ানোর শঙ্কা
পিকারিং এনার্জি পার্টনারসের প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা ড্যান পিকারিংয়ের মতে, বাব আল-মান্দেব পুরোপুরি অবরুদ্ধ হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি আরও ৫ থেকে ১০ ডলার বাড়তে পারে। সেক্ষেত্রে দাম সহজেই ১০০ ডলার অতিক্রম করবে।
যদি জাহাজগুলো লোহিত সাগর হয়ে দক্ষিণ দিকে যেতে না পারে, তাহলে তাদের একমাত্র বিকল্প হবে সুয়েজ খাল হয়ে উত্তর দিকে ভূমধ্যসাগরে প্রবেশ করা। কিন্তু সেই পথ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সৌদি তেল পৌঁছানোর জন্য কার্যকর নয়।
লিপো অয়েল অ্যাসোসিয়েটসের প্রেসিডেন্ট অ্যান্ডি লিপোভের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন প্রায় ২৫ থেকে ৩৫ লাখ ব্যারেল সৌদি তেল ইয়ানবু বন্দর থেকে বাব আল-মান্দেব হয়ে রপ্তানি করা হয়।
বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো, যেগুলো নিজেরা খুব কম তেল উৎপাদন করে, এই সরবরাহ সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

ইউরোপের ডিজেল সরবরাহেও ঝুঁকি
কেপলারের অপরিশোধিত তেল বিশ্লেষণ বিভাগের প্রধান হোমায়ুন ফালাকশাহি জানান, ইয়েমেন সীমান্তসংলগ্ন সৌদি শোধনাগারগুলো থেকে প্রতিদিন প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার ব্যারেল ডিজেল সুয়েজ খাল হয়ে ইউরোপে যায়। হুতিদের হামলার ঝুঁকির কারণে এই সরবরাহও অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এবং একই সময়ে ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় রাশিয়ার কয়েকটি তেল শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর গত কয়েক সপ্তাহে ডিজেলের দামও ব্যারেলপ্রতি ৪০ সেন্টের বেশি বেড়েছে।

হুমকির প্রভাব
গত মঙ্গলবার হুথিরা সৌদি জাহাজগুলোর উদ্দেশে বেতার বার্তায় লোহিত সাগর এড়িয়ে চলার সতর্কতা দেয়। সামুদ্রিক নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান উইন্ডওয়ার্ড ইন্টেলিজেন্স জানিয়েছে, ঘোষণার পর অন্তত পাঁচটি তেলবাহী জাহাজ মাঝপথ থেকে ফিরে গেছে।
এছাড়া মঙ্গলবার ইয়ানবু বন্দর থেকে চীনের উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়া একটি তেলবাহী ট্যাংকারও ইয়েমেন উপকূলের কাছে পৌঁছে হুতিদের হুমকির মুখে ফিরে যায় বলে সিএনএনকে জানিয়েছেন ফর্চুন ৫০০ কোম্পানির ঝুঁকি ব্যবস্থাপক।

যুক্তরাষ্ট্রের সতর্কবার্তা
এদিকে মঙ্গলবার হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বলেন, হুতিরা যদি আরও বড় ধরনের পদক্ষেপ নেয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী হস্তক্ষেপ করতে পারে।
তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত তা ঘটেনি। ঘটতে পারে, তবে আমরা এসব পরিস্থিতি সামলে নিতে জানি। আমরা আগেও হুতিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছি এবং এরপর থেকে তাদের কাছ থেকে তেমন কিছু শোনা যায়নি।
তবে বর্তমানে মার্কিন নৌবাহিনী ইরানের বিভিন্ন বন্দর অবরোধের কাজে ব্যস্ত রয়েছে এবং একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল সচল রাখার চেষ্টাও করছে।
সাম্প্রতিক কয়েক দিনে ইরানের হামলার কারণে একাধিক তেলবাহী ট্যাংকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

জুনের মাঝামাঝি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর যেখানে প্রতিদিন প্রায় ৫০ থেকে ৭০টি জাহাজ চলাচল করছিল, বর্তমানে তা নেমে এসেছে হাতে গোনা কয়েকটিতে।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি যুক্তরাষ্ট্রকে একই সঙ্গে হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব- দুই গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক সংকট মোকাবিলা করতে হয়, তাহলে উভয় প্রণালিতেই তেলবাহী জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা আরও কঠিন হয়ে পড়বে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন