দেশের অর্থনীতি বর্তমানে নানাবিধ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ, ব্যাংকিং খাতের তারল্য সংকট, ঋণের উচ্চ সুদহার, বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা অর্থনীতির গতি মন্থর করে দিয়েছে। এমন বাস্তবতায় অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকদের অভিন্ন মত হলো- শুধু ব্যাংকনির্ভর অর্থায়নের ওপর ভরসা করলে কাঙ্ক্ষিত শিল্পায়ন ও বিনিয়োগ সম্ভব নয়। ব্যাংক ও পুঁজিবাজারকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে না দেখে পরিপূরক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। বিশ্বের উন্নত অর্থনীতিগুলোতে দীর্ঘমেয়াদি শিল্প ও অবকাঠামো অর্থায়নের বড় অংশই আসে পুঁজিবাজার থেকে। অন্যদিকে বাংলাদেশে শিল্প উদ্যোক্তারা এখনো মূলত ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরশীল। ফলে ব্যাংকিং খাতে চাপ বাড়ছে, ঋণের সুদহারও উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি কার্যকর, স্বচ্ছ, গভীর ও আস্থাভিত্তিক পুঁজিবাজার গড়ে উঠলে দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সংগ্রহ সহজ হবে, ব্যাংকের ওপর চাপ কমবে এবং বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে নতুন গতি আসবে।
তবে এ লক্ষ্য অর্জনে বড় বাধা বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট। গত এক দশকে বাজারে কারসাজি, দুর্বল নিয়ন্ত্রণ, তালিকাভুক্ত কোম্পানির সুশাসনের ঘাটতি, নতুন কোম্পানির অভাব এবং নীতিগত অসামঞ্জস্যের কারণে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের বড় অংশ বাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। ফলে বাজারের ব্যপ্তি যেমন বাড়েনি, তেমনি বিদেশি বিনিয়োগও প্রত্যাশিত মাত্রায় আসেনি। এ অবস্থায় বাজারকে পুনর্গঠনের লক্ষ্যে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) বেশ কিছু সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বাজারে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, নজরদারি জোরদার, করপোরেট গভর্ন্যান্স উন্নয়ন, ডিজিটাল তদারকি, নতুন পণ্য চালু এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ। একই সঙ্গে ভালো কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে আনতে বিভিন্ন নীতিগত প্রণোদনার বিষয়ও আলোচনায় রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু নিয়ন্ত্রক সংস্কার যথেষ্ট নয়। করনীতি, কোম্পানি আইন, সরকারি বন্ড বাজার, করপোরেট বন্ড, মিউচুয়াল ফান্ড, পেনশন ও বীমা তহবিলের অংশগ্রহণ-সব ক্ষেত্রেই সমন্বিত সংস্কার প্রয়োজন। একই সঙ্গে বাজারে জবাবদিহি ও আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, দেশের অর্থনীতিকে টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে ব্যাংক ও পুঁজিবাজার এই দুই খাতকেই সমানভাবে শক্তিশালী করতে হবে। তার মতে, দীর্ঘমেয়াদি শিল্পায়ন ও বিনিয়োগের জন্য ব্যাংকঋণের পাশাপাশি একটি গভীর ও কার্যকর পুঁজিবাজার অপরিহার্য। সরকার বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, নীতিগত সংস্কার, ব্যবসা সহজীকরণ এবং সুশাসন নিশ্চিত করার মাধ্যমে পুঁজিবাজারকে অর্থনীতির অন্যতম প্রধান অর্থায়নের উৎস হিসেবে গড়ে তুলতে চায়। তিনি বলেন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও আস্থা প্রতিষ্ঠাই হবে সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার।
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান মাসুদ খান বলেছেন, বাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনাই এখন কমিশনের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য। এ জন্য বাজার তদারকি আধুনিকীকরণ, কারসাজির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, করপোরেট গভর্ন্যান্স নিশ্চিতকরণ এবং তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর তথ্য প্রকাশে স্বচ্ছতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, পুঁজিবাজারকে শুধু শেয়ার লেনদেনের বাজার হিসেবে নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সংগ্রহের কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। এজন্য ভালো ও বড় কোম্পানিকে বাজারে আনতে কমিশন কাজ করছে।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চ (সিএসইআর)-এর চেয়ারপারসন এবং ল্যাবএইড হাসপাতাল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাকিফ শামীম বলেছেন, একটি শক্তিশালী পুঁজিবাজার ছাড়া টেকসই শিল্পায়ন সম্ভব নয়। তার মতে, দেশীয় ও বিদেশি উদ্যোক্তাদের আস্থা অর্জনের জন্য নীতির ধারাবাহিকতা, কর কাঠামোর স্থিতিশীলতা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার দক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে করপোরেট বন্ড বাজার, ভেঞ্চার ক্যাপিটাল এবং বিকল্প বিনিয়োগের সুযোগ সম্প্রসারণের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি। তিনি বলেন, বাজারে আস্থা ফিরলে দেশীয় সঞ্চয় উৎপাদনমুখী বিনিয়োগে রূপ নেবে।
সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন বলেছেন, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ব্যাংক ও পুঁজিবাজারকে প্রতিযোগী নয়, বরং পরিপূরক হিসেবে দেখতে হবে। তার মতে, ব্যাংক মূলত স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি অর্থায়নের জন্য উপযুক্ত, কিন্তু বড় শিল্প, অবকাঠামো ও দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পের অর্থায়নে পুঁজিবাজারের বিকল্প নেই। তিনি বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী, পেনশন ফান্ড, বীমা তহবিল এবং করপোরেট বন্ড বাজারকে শক্তিশালী করা গেলে অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি মূলধনের জোগান বাড়বে। এতে ব্যাংকিং খাতের ওপর চাপও কমবে এবং সামগ্রিক আর্থিক খাত আরও ভারসাম্যপূর্ণ হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সংস্কারের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনর্গঠন করা। সুশাসন, স্বচ্ছতা, আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ, মানসম্পন্ন কোম্পানির তালিকাভুক্তি এবং নীতির স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা গেলে পুঁজিবাজার দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হতে পারে। বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় তাই শক্তিশালী ব্যাংকিং ব্যবস্থার পাশাপাশি একটি আধুনিক, কার্যকর ও আস্থাভিত্তিক পুঁজিবাজার গড়ে তোলাই সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক এজেন্ডা।
সিএসইআরের বিশ্লেষণ:
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চ (সিএসইআর)-এর চেয়ারপারসন সাকিফ শামীম সম্প্রতি পুঁজিবাজার নিয়ে সংস্থাটির বিশ্লেষণ তুলে ধরেন। এতে বলা হয়, বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে এক জটিল রূপান্তরের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। যেখানে টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে কেবল ব্যাংকনির্ভর অর্থায়নই যথেষ্ট নয়। শিল্পায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং উদ্ভাবনী খাতের বিকাশের জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি মূলধন যা কেবল ব্যাংকিং খাতের মাধ্যমে পূরণ করা সম্ভব নয়। ফলে একটি কার্যকর, স্বচ্ছ, গভীর ও আস্থাভিত্তিক পুঁজিবাজার এখন আর বিলাসিতা নয় বরং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অপরিহার্য পূর্বশর্ত।
বর্তমানে বাংলাদেশ উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ, ব্যাংকিং খাতের তারল্য সংকট, ঋণের উচ্চ সুদহার, বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মতো বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। এমন বাস্তবতায় অর্থনীতিকে টেকসই প্রবৃদ্ধির পথে ফিরিয়ে আনতে হলে ব্যাংক ও পুঁজিবাজার উভয়কে পরস্পরের পরিপূরক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি শিল্প ও অবকাঠামো অর্থায়নের বড় অংশই আসে পুঁজিবাজার থেকে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সেই বাস্তবতাকে আমলে নিয়ে এগুতে হবে।
বাংলাদেশের পুঁজিবাজার দীর্ঘদিন ধরেই তার প্রকৃত সম্ভাবনার তুলনায় অনেক পিছিয়ে রয়েছে। ২০১০ সালের বাজার ধসের অভিঘাত আজও পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। পরবর্তী সময়ে বাজারে কয়েক দফা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা দেখা গেলেও তা স্থায়ী হয়নি। বিশেষ করে ২০২১ সালে সূচকের ঊর্ধ্বগতি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন আশাবাদ সৃষ্টি করেছিল, কিন্তু মূল্যস্ফীতি, তারল্য সংকট, উচ্চ সুদহার, ডলারের চাপ এবং নীতিগত অনিশ্চয়তার কারণে সেই ইতিবাচক ধারা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ফলস্বরূপ অসংখ্য ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন এবং বাজারের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা আরও দুর্বল হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে একটি দেশের পুঁজিবাজার কেবল শেয়ার কেনাবেচার প্ল্যাটফর্ম নয়; এটি সেই দেশের অর্থনৈতিক সুশাসন, নীতিগত স্থিতিশীলতা এবং বিনিয়োগ পরিবেশের প্রতিফলন। শক্তিশালী পুঁজিবাজার শিল্পায়নকে ত্বরান্বিত করে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে, উদ্যোক্তাদের মূলধন সংগ্রহ সহজ করে এবং অর্থনীতিকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তোলে। বিপরীতে দীর্ঘস্থায়ী আস্থাহীনতা ও দুর্বল বাজার পুরো অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের বর্তমান সংকটের পেছনে একাধিক কাঠামোগত দুর্বলতা কাজ করছে। তালিকাভুক্ত অনেক প্রতিষ্ঠানের আর্থিক প্রতিবেদনের মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। করপোরেট গভর্ন্যান্সের ঘাটতি, তথ্য প্রকাশে বিলম্ব, দুর্বল নিরীক্ষা ব্যবস্থা এবং কিছু ক্ষেত্রে শেয়ারমূল্য কারসাজি ও ইনসাইডার ট্রেডিংয়ের অভিযোগ বাজারের বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
অন্যদিকে বাজার এখনও অতিমাত্রায় খুচরা বিনিয়োগকারীনির্ভর। শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর অংশগ্রহণ সীমিত হওয়ায় বাজারে অস্থিরতা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। একই সঙ্গে ভালো ও লাভজনক অনেক কোম্পানি এখনও শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়নি, যেকারণে বিনিয়োগের মানসম্মত বিকল্পও সীমিত রয়ে গেছে। বাজারে পণ্যের বৈচিত্র্যের অভাবও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করছে। পুঁজিবাজার সংস্কারের প্রথম শর্ত হলো সুশাসন প্রতিষ্ঠা। এরই ধারাবাহিকতায়, তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন আর্থিক প্রতিবেদন ও নিরীক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে, স্বাধীন পরিচালকদের ভূমিকা কার্যকর করতে হবে এবং সংখ্যালঘু শেয়ারহোল্ডারদের অধিকার আরও শক্তিশালীভাবে সুরক্ষিত করতে হবে।
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ, সিডিবিএল, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ড-এর মধ্যে আরও কার্যকর সমন্বয় গড়ে তুলতে হবে, যাতে পুঁজিবাজার উন্নয়ন একটি সমন্বিত নীতিগত কাঠামোর আওতায় পরিচালিত হয়। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে একটি আধুনিক পুঁজিবাজার প্রযুক্তিনির্ভর না হয়ে টেকসই হতে পারে না। যদিও বাংলাদেশে অনলাইন ট্রেডিং চালু হয়েছে, তবে ডিজিটাল সেবার পরিধি এখনও সীমিত। একটি সমন্বিত ডিজিটাল ক্যাপিটাল মার্কেট প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা প্রয়োজন, যেখানে বিনিয়োগকারী নিবন্ধন, ই-কেওয়াইসি, শেয়ার লেনদেন, আইপিও আবেদন, ডিভিডেন্ড গ্রহণ এবং কর-সংক্রান্ত সেবা একই প্ল্যাটফর্মে পাওয়া যাবে। জাতীয় পরিচয়পত্র, ব্যাংক হিসাব এবং মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের সঙ্গে এই প্ল্যাটফর্মের সংযোগ বিনিয়োগকে আরও সহজতর করবে।
পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিগ ডেটা অ্যানালিটিক্স এবং রিয়েল-টাইম মার্কেট সার্ভেইল্যান্স ব্যবস্থার মাধ্যমে সন্দেহজনক লেনদেন, অস্বাভাবিক মূল্য পরিবর্তন এবং সম্ভাব্য বাজার কারসাজি দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হবে, যা বাজার তদারকিকে আরও কার্যকর ও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলবে। বাংলাদেশের পুঁজিবাজারকে শুধুমাত্র শেয়ারবাজার হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না; এটিকে একটি বহুমাত্রিক মূলধন বাজারে পরিণত করতে হবে। করপোরেট বন্ড, গ্রিন বন্ড, সুকুক, অবকাঠামো বন্ড এবং মিউনিসিপ্যাল বন্ডের বাজার সম্প্রসারণের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের নতুন উৎস তৈরি করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে এক্সচেঞ্জ ট্রেডেড ফান্ড, রিয়েল এস্টেট ইনভেস্টমেন্ট ট্রাস্ট, ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ট্রাস্ট এবং অন্যান্য আধুনিক আর্থিক পণ্য ধীরে ধীরে চালুর উদ্যোগ নিতে হবে। দেশের সম্ভাবনাময় স্টার্টআপ ও ক্ষুদ্র এবং মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য আরও কার্যকর অল্টারনেটিভ বা এসএমই বোর্ড গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সহজে মূলধন সংগ্রহ করতে পারে। একই সঙ্গে লাভজনক ও সুপরিচিত দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার জন্য কর-প্রণোদনা ও নীতিগত সুবিধা দেয়া প্রয়োজন। ভবিষ্যতের পুঁজিবাজারকে পরিবেশ, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও সুশাসন ভিত্তিক বিনিয়োগবান্ধব হিসেবেও গড়ে তুলতে হবে। একটি পরিপক্ব পুঁজিবাজার কখনও কেবল খুচরা বিনিয়োগকারীদের ওপর নির্ভরশীল থাকে না। পেনশন ফান্ড, বীমা কোম্পানি, মিউচুয়াল ফান্ড, প্রভিডেন্ট ফান্ড এবং অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে নীতিগত প্রণোদনা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য নীতিগত স্থিতিশীলতা, স্বচ্ছতা, আন্তর্জাতিক মানের করপোরেট গভর্ন্যান্স, সহজ মূলধন প্রত্যাবাসন ব্যবস্থা এবং বিনিয়োগবান্ধব করনীতি নিশ্চিত করতে হবে। বিদেশি বিনিয়োগ শুধু মূলধনই আনে না; এটি বাজারে আস্থা, দক্ষতা ও আন্তর্জাতিক মানও নিয়ে আসে।
উন্নত ও উদীয়মান অর্থনীতির বৈশ্বিক পুঁজিবাজারগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, সেগুলো মূলত কঠোর সুশাসন, উচ্চ প্রযুক্তি, পণ্যের বৈচিত্র্য এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়। আন্তর্জাতিক বাজারগুলোতে কঠোর নিয়ন্ত্রক কাঠামো এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নজরদারি নিশ্চিত করা হয়, যার ফলে ইনসাইডার ট্রেডিং বা কৃত্রিম কারসাজির সুযোগ থাকে না বললেই চলে। উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জ কিংবা ন্যাশডাক-এর কথা বলা যায়। সেখানে অ্যাপল, মাইক্রোসফট বা টেসলার মতো বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো আইপিও-এর মাধ্যমে বিলিয়ন ডলার মূলধন সংগ্রহ করে তাদের বৈশ্বিক সম্প্রসারণ ঘটাচ্ছে। এই বাজারগুলোতে শেয়ারের পাশাপাশি বন্ড, ডেরিভেটিভস, এবং ইটিএফ-এর মতো হাজারো বৈচিত্র্যময় আর্থিক পণ্য রয়েছে। আবার এশিয়ার অন্যতম শীর্ষ পরাশক্তি জাপানের টোকিও স্টক এক্সচেঞ্জ কিংবা প্রতিবেশী ভারতের ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জ-এর উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। ভারতের এনএসই গত দুই দশকে প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন, কঠোর তদারকি এবং ডেরিভেটিভস মার্কেটের উন্নয়নের মাধ্যমে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ সক্রিয় বাজারে পরিণত হয়েছে। সেখানে সাধারণ মানুষের সঞ্চয়কে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়ে পুঁজিবাজারে সফলভাবে টেনে আনা হয়েছে। বৈশ্বিক পুঁজিবাজারের এই সফল মডেলগুলো প্রমাণ করে যে, স্বচ্ছতা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থার পরিবেশ তৈরি করতে পারলে একটি বাজার কীভাবে দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পুঁজির মূল আকর্ষণ হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে এখনও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বিনিয়োগকারী গুজব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা তথাকথিত 'টিপস'-এর ওপর নির্ভর করে বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নেন। এই সংস্কৃতি দীর্ঘমেয়াদে বাজারকে অস্থিতিশীল করে তোলে। তাই আর্থিক সাক্ষরতাকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে মৌলিক আর্থিক শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা, গণমাধ্যমে বিনিয়োগ সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার উদ্যোগে বিনামূল্যে অনলাইন প্রশিক্ষণ প্ল্যাটফর্ম চালু করা সময়ের দাবি। তথ্যনির্ভর বিনিয়োগ সংস্কৃতি গড়ে উঠলেই কেবল দীর্ঘমেয়াদে বাজারে স্থায়ী আস্থা ফিরে আসবে।
পুঁজিবাজার সংস্কারকে কোনো বিচ্ছিন্ন প্রশাসনিক উদ্যোগ হিসেবে দেখা উচিত নয়; এটি হতে হবে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক রূপান্তরের একটি কেন্দ্রীয় কৌশল। এলডিসি-পরবর্তী সময়ে শিল্পায়ন, প্রযুক্তি উদ্ভাবন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং জলবায়ু সহনশীল অর্থনীতি গড়ে তুলতে বিপুল পরিমাণ দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে।
পুঁজিবাজার সংস্কার কোনো একক নিয়ন্ত্রক সংস্থার দায়িত্ব নয়; এটি দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক কাঠামো পুনর্গঠনের অন্যতম পূর্বশর্ত। বাংলাদেশ যদি উচ্চ-মধ্যম আয়ের অর্থনীতিতে রূপান্তরিত হতে চায় এবং দীর্ঘমেয়াদি টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে চায়, তবে একটি স্বচ্ছ, প্রযুক্তিনির্ভর, গভীর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পুঁজিবাজার গড়ে তোলার বিকল্প নেই। সংস্কারের উপযুক্ত সময় আগামীকাল নয় এখনই।
