সবাইকে কেন চুমু দিতে বললেন এই আলোকচিত্রী?

সবাইকে কেন চুমু দিতে বললেন এই আলোকচিত্রী?

ফন্ট সাইজ:

লাল রঙের ঝলমলে সাজসজ্জা আর ক্লাবের ম্লান আলোয় ছয় জোড়া তরুণ-তরুণী একে অপরকে চুম্বনে আবদ্ধ। যেন সময়ের সীমানা পেরিয়ে আসা কোনো সিনেমার দৃশ্য। ভিনটেজ কাঠের অভ্যন্তরে চোখ বন্ধ করে পরস্পরকে জড়িয়ে থাকা এসব যুগলকে ক্যামেরাবন্দি করেছেন আলোকচিত্রী আন্দ্রেয়া মার্তি।
তবে এই ছবিগুলোর উদ্দেশ্য কেবল রোমান্টিক মুহূর্ত তুলে ধরা নয়। মার্তির ভাষায়, তিনি চেয়েছেন ছবিগুলোর মাধ্যমে মানুষের আকাঙ্ক্ষা, ঘনিষ্ঠতার অনুভূতি এবং আবেগের অভাব তুলে ধরতে।
তার আলোকচিত্র সিরিজের নাম ‘এভরিওয়ান ইজ বিউটিফুল অ্যান্ড নো ওয়ান ইজ হর্নি’।

সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২১ সালে ভাইরাল হওয়া একই শিরোনামের একটি প্রবন্ধ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে এই নামকরণ করা হয়। সেই প্রবন্ধে বলা হয়েছিল, আধুনিক ব্লকবাস্টার সিনেমায় নায়ক-নায়িকারা আগের চেয়ে অনেক বেশি নিখুঁত দেখালেও তাদের মধ্যে যৌন আকর্ষণ বা রোমান্টিক টানাপোড়েন যেন ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে।
এক সাক্ষাৎকারে মার্তি বলেন, গণমাধ্যমে আমরা অসংখ্য সুন্দর মানুষ দেখি, কিন্তু তাদের মধ্যে কোনো টান, আকাঙ্ক্ষা বা আবেগ অনুভব করি না।

লন্ডনের ইউনিভার্সিটি অব দ্য আর্টসে স্নাতকোত্তর পড়ার সময় গত বছর তিনি এই প্রজেক্টটি শুরু করেন। গবেষণার সময় তিনি এমন অনেক গবেষণাপত্র পড়েন, যেখানে বলা হয়েছে জেনারেশন জেড আগের প্রজন্মের তুলনায় কম যৌনসম্পর্কে জড়াচ্ছে, ডেটিংয়ে অনাগ্রহী এবং বেশি নিঃসঙ্গতায় ভুগছে।
তবে তিনি কোনো প্রজন্ম সম্পর্কে একক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে চান না। তার ভাষায়, সবাইকে একভাবে বিচার করতে চাই না। কিছু সম্প্রদায় অবশ্যই যৌনতা নিয়ে বেশি খোলামেলা। কিন্তু আমার অভিজ্ঞতায় মানুষের মধ্যে এক ধরনের নিঃসঙ্গতা এবং অন্যের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনে অক্ষমতা দেখা যাচ্ছে।

মার্তির মতে, এর অন্যতম কারণ হলো নিজেকে সব সময় আরও নিখুঁত করে তোলার চাপ। তিনি বলেন, সবাই ক্যালোরি গুনছে, সুন্দর দেখাতে চাইছে, ক্যারিয়ারে সফল হতে চাইছে। ফলে সংবেদনশীলতা, আবেগ বা ঘনিষ্ঠতার জন্য যেন সময়ই নেই। আমার কাজের বড় একটি বিষয়ই হলো ‘সংবেদনশীলতা’কে একটি দর্শন হিসেবে তুলে ধরা।
মার্তি জানান, তার এই সিরিজের ছবিগুলো তোলা হয়েছে লন্ডনের ঐতিহাসিক বেথনাল গ্রিন ওয়ার্কিং মেনস ক্লাব-এ, যেখানে বর্তমানে ড্র্যাগ শো, বার্লেস্ক এবং ডিস্কো অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

কাস্টিং পরিচালক মেলিসা ওজচোলাকের সহায়তায় প্রকৃত প্রেমিক-প্রেমিকাদের এই প্রজেক্টে অংশ নিতে রাজি করান মার্তি। তিনি বলেন, প্রকৃত যুগলদের ব্যবহার করায় তাদের মধ্যে ভালোবাসা ও স্বাভাবিক ঘনিষ্ঠতা ছবিতে ফুটে উঠেছে। তবে শুটিংয়ের আগে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জও ছিল। অনেকেই শুটিংয়ের ঠিক আগে অংশগ্রহণ বাতিল করেন, কারণ এরই মধ্যে তাদের সম্পর্ক ভেঙে গিয়েছিল।
আট ঘণ্টাব্যাপী ফটোশুটে ক্লাবের বিভিন্ন জায়গায়- সিঁড়ি, দরজার সামনে কিংবা লাল আলোর আবহে বিভিন্ন মুহূর্তে যুগলদের ক্যামেরাবন্দি করেন তিনি।

মার্তির মতে, লন্ডনের বেথনাল গ্রিন ক্লাবটি যেন সময়ের এক জীবন্ত ক্যাপসুল। পুরোনো টাইলসের মেঝে, মঞ্চের বিশাল লাল হৃদয় আকৃতির সাজসজ্জা এবং দেয়ালজুড়ে ঝুলে থাকা পার্টির অলংকরণ জায়গাটিকে অন্যরকম আবহ দিয়েছে।
হেসে তিনি বলেন, জায়গাটা একটু এলোমেলো, এমনকি কিছুটা অগোছালোও। কিন্তু পরে বুঝেছি, এটি ইতিহাসে ভরা এবং সত্যিই একটি আইকনিক স্থান।

সিএনএন জানিয়েছে, মার্তির ছবিগুলোতে নস্টালজিয়ার ছাপ স্পষ্ট। ষাটের দশকের ফ্যাশন, আশির দশকে ক্লাব সংস্কৃতি নিয়ে আলোকচিত্রী টম উডের কাজ এবং তার নিজের মায়ের স্মৃতিচারণ- সবকিছুই এই প্রকল্পকে প্রভাবিত করেছে।
মার্তি পূর্বের স্মৃতি স্মরণ করে বলেছেন, মা প্রায়ই বলতেন, আগে ক্লাবের রাতের শেষে ধীরগতির গান বাজত, যাতে সবাই একসঙ্গে ধীরে নাচতে পারে। আমি মূলত সেই অনুভূতিটাই নতুনভাবে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছি।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন