জোট শরিকদের ক্ষোভ-দাবি, ভাবছে বিএনপি

জোট শরিকদের ক্ষোভ-দাবি, ভাবছে বিএনপি

ফন্ট সাইজ:

ক্ষমতায় অংশীদার করা এবং নির্বাচনপূর্ব প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী জাতীয় সরকার গঠনসহ বিএনপি’র কাছে নানা দাবি জানিয়েছেন যুগপৎ আন্দোলনের শরিক জোট ও দলগুলোর শীর্ষ নেতারা। নির্বাচনের পর জাতীয় সরকার গঠন না করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তারা। একইসঙ্গে সরকার পরিচালনায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যেসব কর্মসূচি নিয়েছেন তার প্রশংসাও করেছেন নেতারা। সরকারি কার্যক্রমের পাশাপাশি রাজনৈতিক তৎপরতা বাড়ানোর পরামর্শ দিয়ে তারা বলেছেন, সরকার একলা চলো নীতি দিলে ব্যর্থতার দায়ভার জোট শরিকরা নেবে না। গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে গঠিত সরকার যাতে দায় এবং প্রতিশ্রুতি ভুলে না যায় সে বিষয়েও সতর্ক করেছেন তারা। সোমবার রাতে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জোট শরিক দলের নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় ও নৈশভোজে অংশ নেন। যুগপৎ আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় বিএনপি’র সরকার গঠনের পর জোট নেতাদের সঙ্গে এটি প্রথম বৈঠক। জাতীয় নির্বাচনে জোট শরিকদের নির্ধারিত আসনে নির্বাচনের সুযোগ দিয়েছিল বিএনপি। পরে সরকারেও শরিক দলের তিন নেতাকে মন্ত্রিসভায়ও স্থান দিয়েছেন তারেক রহমান। কিন্তু অন্যান্য দলের নেতারাও সরকারের অংশীদারিত্ব চাইছেন।

সোমবারের বৈঠকেও তারা আকারে-ইঙ্গিতে এমন দাবি করেন। কেউ কেউ জাতীয় সরকার গঠনের দাবি করেন। যদিও জাতীয় সরকারের বিষয়ে সরকার প্রধানের পক্ষ থেকে ইতিবাচক কোনো ইঙ্গিত মেলেনি। তবে জোট নেতাদের বিভিন্ন দাবি ও পরামর্শের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। বিএনপি’র পক্ষ থেকেও এ নিয়ে ভাবা হচ্ছে। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, সরকার গঠনের পর এমন একটি আয়োজনে দেরি হলেও সামনে তিনি নিয়মিত জোট নেতাদের সঙ্গে বসতে চান। সরকার পরিচালনায় তাদের পরামর্শও গ্রহণ করা হবে। শরিক দলের নেতাদের বিভিন্নভাবে মূল্যায়নও করা হবে।

ভোজসভায় স্বাগত বক্তব্য দেন বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এ ছাড়া শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন জাতীয় পার্টির (জাফর) চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দার, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সম্পাদক সাইফুল হক, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মুফতি মহিউদ্দিন ইকরাম। প্রধানমন্ত্রী শরিক নেতাদের টেবিলে গিয়ে তাদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন এবং তাদের খোঁজ-খবর নেন। কুশল বিনিময় পর্বের পর নেতাদের নিয়ে রাতে খাবার খান প্রধানমন্ত্রী। বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও যুগপৎ আন্দোলনে থাকা দুই দল জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জেএসডি ও জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম অংশ নেয়নি। জেএসডি’র পক্ষ থেকে বৈঠকে অংশ না নেয়ার কারণ বিএনপিকে জানানো হয়েছে। জাতীয় নির্বাচনে আসন নিয়ে জটিলতা তৈরি হওয়ার পর থেকে বিএনপি’র সঙ্গে দলের নেতাদের সম্পর্ক ভালো যাচ্ছে না।

বৈঠকে অংশ নেয়া কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা হয়েছে মানবজমিনের। তারা জানিয়েছেন, বৈঠকে শরিক দলের নেতারা বলেছেন- বিএনপি’র সঙ্গে জোট শরিকদের মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব তৈরি হয়েছে। অবিশ্বাস, সন্দেহ, অনাস্থা এবং ক্ষোভের জায়গা তৈরি হয়েছে। বলেছেন, এটা কি শুধু নৈশভোজ। না কি ফেয়ারওয়েল ডিনার। জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, এটা ওয়েলকাম ডিনার। সূত্রটি জানায়, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, আমাদের কিছু ত্রুটি এবং ঘাটতি হয়েছে। এজন্য তিনি দুঃখপ্রকাশ করেছেন। বলেছেন, শরিকদের সঙ্গে জুলাই ও ৩১ দফা নিয়ে একসঙ্গে কাজ করতে চান এবং একসঙ্গে চলতে চান। যেখানে ঘাটতি রয়েছে, তা শরিকদেরও চিন্তা করতে বলেছেন, বিএনপি এবং সরকারও চিন্তা করবে বলে জানিয়েছেন। পাশাপাশি জোট শরিকদের সঙ্গে আবারো বসবেন বিষয়ে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না মানবজমিনকে বলেন, আমি বলেছি, আমি ক্ষমতার অংশীদারিত্ব চাই না। আপনারা একা চলতে পারলে চলেন। কিন্তু আপনারা যদি ব্যর্থ হন, তাহলে কিন্তু এর দায়ভার আমরা নেবো না। কারণ রাষ্ট্রের জন্য এত মানুষ জীবন দিয়েছেন, একটি সুন্দর রাষ্ট্র গঠনের জন্য।

বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক মানবজমিনকে বলেন, অর্থনৈতিক দিক থেকে তারা যে পজিটিভ উদ্যোগ নিয়েছে, সেজন্য সরকারকে আমরা ধন্যবাদ দিয়েছি। প্রধানমন্ত্রী যে কাজের সংস্কৃতি গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন- বলেছি, এটা মানুষ ইতিবাচক হিসেবে নিয়েছে। বলেছি, কিন্তু রাজনৈতিক দিক থেকে মনে হয় সরকার পিছিয়ে পড়ছে। সংস্কার, ৩১ দফা, জুলাই- এসব নিয়ে সরকার যে সমালোচনার সম্মুখীন হচ্ছে- সরকার এগুলোকে মোকাবিলা করতে পারছে না। কিন্তু এগুলো আমরা দিয়েছি। উল্টো এখন আমরাই অভিযুক্ত হয়ে যাচ্ছি। সাইফুল হক বলেন, আমি বলেছি- রাজনৈতিক প্রশ্নে আরও মনোযোগ দরকার। কারণ, ভুল বার্তা দেয়ার চেষ্টা হচ্ছে। আর সারা দেশে আমরা সরকারকে দেখছি, কিন্তু বিএনপিকে দেখছি না। তাহলে মাঠ কি বিরোধী দল এবং জামায়াতের জন্য ছেড়ে দিলেন কিনা? যুগপৎ আন্দোলনের শরিকদলগুলোও আগের মতো মাঠে নেই।

১২ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতা ও জাতীয় পার্টির (জাফর) চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দার মানবজমিনকে বলেন, আমরা বলেছি, ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে আমরা যারা একসঙ্গে ছিলাম- তাদের মধ্যে ঐক্যে আরও সুদৃঢ় করা প্রয়োজন। কারণ, জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে ষড়যন্ত্র চলছে। প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে একমত হয়েছেন। বিএনপি’র এবং যুগপৎ আন্দোলনের জোট ও দলগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক সমঝোতার দূরত্ব তৈরি হয়েছে বলেও বৈঠকে আলোচনায় এসেছে।

গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক মো. মিজানুর রহমান মানবজমিনকে বলেন, দীর্ঘদিন আমরা যারা একসঙ্গে আন্দোলন করেছি, তাদের মধ্যে কথা ছিল- একসঙ্গে আন্দোলন, নির্বাচন এবং জাতীয় সরকার গঠন করবো। বিএনপি সেই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এ বিষয়ে খুব একটা গুরুত্ব দেয়া হয়নি। আমরা আন্দোলনের সময় কেন্দ্র থেকে জেলা পর্যন্ত সমন্বয় করে কাজ করেছি। এখন সেই সমন্বয় নেই।

জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা)’র সভাপতি খন্দকার লুৎফর রহমান মানবজমিনকে বলেন, যুগপৎ আন্দোলন আমরা যারা একসঙ্গে করেছি, তাদের বিএনপি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে- একসঙ্গে চলবে এবং জাতীয় সরকার গঠন করবে। কিন্তু এ বিষয়ে এখনো কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী কিছু না বললেও, তিনি বলেছেন- আমরা একঙ্গে ছিলাম, একসঙ্গে থাকবো এবং একসঙ্গে কাজ করবো।

উল্লেখ্য, নির্বাচনের আগে আসন বণ্টনসহ নানা ইস্যুতে জোটের শীর্ষ নেতাদের নিয়মিত বৈঠক হয়। এসব বৈঠকে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানও অংশ নেন।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন