প্রাণঘাতী ভাইরাস হামের থাবায় খালি হয়ে গেছে শত শত মায়ের বুক। অন্তর্বর্তী সরকারের ভুলে প্রতিদিনই ঝরছে কচি কচি শিশুর প্রাণ। বর্তমান সরকার শিশুদের দ্রুত টিকা দিলেও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি হামের সংক্রমণ। গত ২৪ ঘণ্টায়ও ঝরেছে চার শিশুর প্রাণ। এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ ও আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ৭৯৭টি শিশু। তথ্য বলছে,
বিশ্বব্যাপী গত ২০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ সংখ্যক হামের প্রাদুর্ভাব দেখা গেছে ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালে। গত মার্চ পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী হামে মৃত্যুতে শীর্ষে ছিল বাংলাদেশ। দেশে গত কয়েক মাসের পরিসংখ্যান বলছে, প্রতিদিন গড়ে ৪ থেকে ৫টি শিশু মারা যাচ্ছে। এ ছাড়া প্রতিদিনই বাড়ছে হামের উপসর্গ ও আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। জনমনে প্রশ্ন উঠেছে, মৃত্যুর এই মিছিল থামবে কবে? তবে বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সহসাই নিয়ন্ত্রণে আসছে না হাম। তবে টিকা কার্যক্রম রীতিমতো চালিয়ে ৯০ শতাংশ নিশ্চিত করতে পারলে এ বছরের মধ্যেই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে আগে হামে আক্রান্তদের মধ্যে প্রতি হাজারে তিনজনের মৃত্যু হতো। এবার তা ১০ জনে পৌঁছেছে। আমাদের দেশে মৃত্যুর হার বেশি হওয়ার কারণ স্বাস্থ্যব্যবস্থা। ইউনিয়ন ও গ্রাম পর্যায়ে যে স্বাস্থ্যব্যবস্থা থাকার কথা তা নেই। পাশাপাশি করোনার পর আর্থিকভাবে মানুষের অবস্থা খারাপ হচ্ছে। জীবন চালাতে খাবারের সঙ্গে কম্প্রোমাইজ করতে হচ্ছে। এতে ভয়াবহ পুষ্টি ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। এসব কারণে শিশু বা মায়ের ইমিউনিটি কমে যাচ্ছে। আর মৃত্যুহার বাড়ছে। তারা বলেন, হাম সংক্রমণ করোনার চেয়েও দ্রুত হয়।
টিকা দিলেও তাৎক্ষণিকভাবে সেটার কার্যকারিতা পাওয়া যায় না। দুই থেকে তিন সপ্তাহ সময় লাগে। বর্তমান সংকট মোকাবিলায় ৯০ ভাগ শিশুকে টিকার আওতায় আনতে হবে। হাসপাতালের সেবাকে প্রান্তিক পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, হামে মৃত্যু কমাতে সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো শিশুদের নিয়মিত দুই ডোজ হামের টিকা নিশ্চিত করা এবং যেখানে টিকাদানের হার কম, সেখানে গণটিকাদান অভিযান পরিচালনা করা। অগ্রগতি সত্ত্বেও এখনো বিপুলসংখ্যক শিশু টিকার সুরক্ষার বাইরে রয়েছে বলেও সংস্থাটি জানিয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বে প্রায় ২ কোটি ৯০ লাখ শিশু হামের বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত ছিল।
কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হামের চিকিৎসা দেন ডা. আহমাদ হাবিবুর রহমান। তিনি মানবজমিনকে বলেন, হাম নিয়ে সচেতন বাবা-মায়েদের শিশুরা মারা যায় না। সাধারণত বেশির ভাগ অসচেতনতার জন্য শিশুরা মারা যায়। হাম হলে প্রথমে শিশুদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। ফলে তাদের পাতলা পায়খানা, নিউমোনিয়ার মতো সমস্যাগুলো হয়। প্রাথমিক লক্ষণ দেখা দিলে ইমিডিয়েটলি ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলে মৃত্যুঝুঁকি কমে যায়। কিন্তু আমাদের দেশের মা-বাবারা এদিক সেদিক থেকে ওষুধ কিনে জোড়াতালি দিয়ে চিকিৎসা নেয়ার চেষ্টা করে। বেশি জটিল হয়ে গেলে আইসিইউ খোঁজেন।
ভ্যাকসিন ব্যবস্থাপনার বৈশ্বিক জোট গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিন ইনিশিয়েটিভের (গ্যাভি) সিএসও কনস্টিওন্সি স্টিয়ারিং কমিটির চেয়ার ডা. নিজাম উদ্দীন আহম্মেদ মানবজমিনকে বলেন, একটি শিশুকে টিকা দেয়ার তিন সপ্তাহ পর শরীরে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়। ফলে মার্চ বা এপ্রিলে যারা টিকা পেয়েছে, তাদের প্রটেকশন লেভেল এখন তৈরি হয়েছে। সঠিকভাবে টিকা কার্যক্রম চালিয়ে গেলে আগামী এক-দুই মাসের মধ্যে পরিস্থিতি অনেক কমে আসবে। আগস্টের শেষের দিকে এটি উল্লেখযোগ্যভাবে নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। এই বিশেষজ্ঞ বলেন, একজন হাম আক্রান্ত শিশু থেকে সর্বনিম্ন ১৮ জন সংক্রমিত হতে পারে। এ কারণে নিয়ন্ত্রণের আগেই তা ছড়িয়ে পড়েছে। এ ছাড়া দেশে লম্বা সময় ধরে কোনো বিশেষ ক্যাম্পেইন বা টিকাদান কর্মসূচি হয়নি। যা আরেকটি বড় কারণ।
তিনি বলেন, এবার মৃত শিশুদের একটি বড় অংশই ছয় মাসের কম বয়সী। কারণ তারা মায়ের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় ইমিউনিটি পায়নি। আমাদের দেশে নিম্নআয়ের বা প্রান্তিক পরিবারের মায়েরা প্রায়ই রক্তাস্বল্পতা অবস্থায় সন্তান জন্ম দেন। এজন্য শিশুটির রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম হয়। এ ছাড়া গত দুই বছর শিশুদের ভিটামিন-এ সাপ্লিমেন্টেশনেও ঘাটতি ছিল। বাদ পড়া বা অসচেতন পরিবারের শিশুদের মধ্যেই সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার বেশি দেখা যাচ্ছে। ডাটা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, যারা কোনো টিকাই পায়নি, অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া এবং যারা টিকা সম্পর্কে কিছুই জানে না- তাদের শিশুরাই বেশি মারা যাচ্ছে।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মির্জা মো. জিয়াউল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, হাম নিয়ন্ত্রণে আসার কোনো সুনির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেয়া সম্ভব না। তবে চলমান টিকাদান কর্মসূচির সুফল এবং শিশুদের পুষ্টির মান উন্নত করার মাধ্যমে খুব দ্রুতই নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে বলে আশা করা যায়। তিনি বলেন, মাঠপর্যায়ে রেকর্ড পরিমাণ টিকাদানের ফলে ইতিমধ্যে জনগণের মাঝে ‘হার্ড ইমিউনিটি’ বা রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হতে শুরু করেছে। হামের কারণে সরাসরি কোনো রোগীর মৃত্যু হয় না। মৃত্যুর মূল কারণ পুষ্টিহীনতা ও নিউমোনিয়া। যেসব শিশু চরম পুষ্টিহীনতায় ভোগে তাদের শারীরিক জটিলতা বহুগুণ বেড়ে যায়। পাশাপাশি নিউমোনিয়া বা অন্যান্য আনুষঙ্গিক জটিলতা দেখা দেয়, কেবল তখনই মৃত্যুর ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। তিনি আরও বলেন, শিশুদের পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা গেলে হামের এই ধাক্কা বা জটিলতা অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব। তাই এই মুহূর্তে ভ্যাকসিনের পাশাপাশি শিশুদের পুষ্টির মান উন্নয়ন করা সবচেয়ে বেশি জরুরি।
আইইডিসিআর-এর সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন মানবজমিনকে বলেন, হাম অনেক আগে মহামারি পর্যায়ে গিয়েছে। যদিও এখন একটু কমেছে। তবে প্রতিদিন একাধিক শিশু মারা যাচ্ছে। তিনি বলেন, এ পরিস্থিতির উন্নতি তখনই হবে যখন আমরা ৯৫ ভাগ শিশুকে টিকার আওতায় আনতে পারবো। সরকার এটা এখনো করতে পারেনি। যদিও এটি সরকার সরাসরি স্বীকার করে না। তবে শুনেছি, সামনের মাসে টাইফয়েড টিকার সঙ্গে হামের টিকা দেয়া হবে। এতেই পরিস্থিতি বোঝা যায়। ৬ মাসের কম বয়সী শিশুরাও আক্রান্ত হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, ৬ মাসের কম বয়সী শিশুদের টিকা দিলে খুব বেশি কার্যকর হয় না। এ বিষয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণার প্রয়োজন। গবেষণা চলছে। ফলাফল অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নিতে হবে।
