ভালো মন্দে বিশ্বকাপ ২০২৬

ভালো মন্দে বিশ্বকাপ ২০২৬

ফন্ট সাইজ:

যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডায় যৌথভাবে আয়োজিত ৪৮ দলের ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ এ যাবৎ অনুষ্ঠিত ফুটবলের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আসর। ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো এই আসরটিকে মানব ইতিহাসের বৃহত্তম আয়োজন হিসেবে বর্ণনা করেন। একই সঙ্গে তিনি পুরো টুর্নামেন্টকে এক মাসের মধ্যে ১০৪টি ‘সুপার বোল’-এর সাথে তুলনা করেন। মাঠে দুর্দান্ত সব মুহূর্ত তৈরির পাশাপাশি বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা ও অন্যান্য সম্প্রচারক প্রতিষ্ঠানের জন্য শত কোটি ডলারের বাণিজ্যিক সুযোগ এনে দেয় এই আসর। এবারের ফিফা বিশ্বকাপে বেশ কিছু নতুন নিয়ম চালু করেছিলো ফিফা। কোন সিদ্ধান্ত মাঠে কেমন ফলাফল করেছে তার খতিয়ান নিম্নে তুলে ধরা হলো।

নতুন বিন্যাস ও ছোট দেশগুলোর রূপকথা
প্রথমবারের মতো বিশ্ব ফুটবলের ৪৮টি দেশ এই টুর্নামেন্টে অংশ নেয়, যেখানে কুরাসাও, কেপ ভার্দে, জর্ডান ও উজবেকিস্তানের মতো দেশগুলোর ঐতিহাসিক অভিষেক ঘটে। মাত্র সাড়ে পাঁচ লাখ জনসংখ্যার ছোট দ্বীপদেশ কেপ ভার্দে সাবেক বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন স্পেন ও উরুগুয়ের বিরুদ্ধে অবিস্মরণীয় ড্র তুলে নিয়ে গ্রুপ পর্ব পার করে। এছাড়া জার্মানির কাছে ৭-১ গোলে বিধ্বস্ত হওয়ার পর কুরাসাও শক্তিশালী ইকুয়েডরের বিরুদ্ধে পয়েন্ট ছিনিয়ে নেয় এবং ডিআর কঙ্গো পর্তুগালকে আটকে দিয়ে নকআউট পর্বে নিজেদের জায়গা নিশ্চিত করে। তবে ৭২টি গ্রুপ পর্বের ম্যাচের পর মাত্র ১৬টি দল বাদ পড়ায় প্রাথমিক পর্বটি কিছুটা একঘেয়ে ছিল বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। এছাড়া টাইব্রেকার হিসেবে ফিফা গোল পার্থক্যের বদলে ‘হেড-টু-হেড’ নিয়ম সামনে আনায় কিছু দল হিসাব-নিকাশ করে ড্র করার সুবিধা গ্রহণ করে।

নতুন সিডিং নীতিতে ফাইনালের পথ মসৃণ ছিলো আর্জেন্টিনা-স্পেনের
ফিফার নতুন সিডিং নীতির কারণে আসরের শুরু থেকেই শীর্ষ চার দল অর্থাৎ আর্জেন্টিনা, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও স্পেনকে বিশেষ সুবিধার অধীনে আলাদা কোয়ার্টারে রাখা হয়। এতে তাদের নকআউট পর্বের শুরুতে মুখোমুখি হতে হয়নি। টেনিস টুর্নামেন্টের আদলে এক ও দুই নম্বর দল হিসেবে আর্জেন্টিনা ও স্পেনকে এমনভাবে সাজানো হয়েছিল, যেন ফাইনালের আগে তাদের মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ না থাকে। এর ফলে ফিফা আর্জেন্টিনাকে গ্রুপ জে এবং ফ্রান্সকে গ্রুপ আই-তে পরিবর্তন করে। এই পরিবর্তনটি না করা হলে সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হতে হতো ফ্রান্সকে এবং আর্জেন্টিনার খেলা হতো স্পেনের বিরুদ্ধে।

বিজ্ঞাপনী বাণিজ্য ও কৌশলগত ‘হাইড্রেশন ব্রেক’
খেলোয়াড়দের সুরক্ষার কথা বলে গ্রীষ্মের প্রচণ্ড তাপে প্রতি অর্ধে তিন মিনিটের বাধ্যতামূলক ‘হাইড্রেশন ব্রেক’ চালু করা হয়, যা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত আধুনিক স্টেডিয়ামগুলোতেও বজায় রাখা হয়েছিল। তবে এই বিরতির মূল সুফল পেয়েছে মার্কিন সম্প্রচারকারী ও স্পনসর প্রতিষ্ঠানগুলো। যুক্তরাষ্ট্রে সম্প্রচার স্বত্ব পাওয়া ফক্স স্পোর্টসে মাত্র ৩০ সেকেন্ডের প্রতিটি বিজ্ঞাপন স্লটের দাম ছিল দুই লাখ থেকে তিন লাখ ডলার, যা যুক্তরাষ্ট্রের খেলা ও নকআউট পর্বের চূড়ান্ত দিনগুলোতে সাড়ে সাত লাখ ডলারে পৌঁছায়। এই বিজ্ঞাপনী বিরতির ফলে শুধু যুক্তরাষ্ট্র থেকেই সম্প্রচারকরা প্রায় ২৫ কোটি ডলার অতিরিক্ত আয় করে। পাশাপাশি কোচরা এই সময়টিকে ‘ট্যাকটিক্যাল টাইমআউট’ হিসেবে ব্যবহার করে ম্যাচের মূল গতিপথ বদলে দেয়ার সুযোগ পান।

কোলিনার সময় সাশ্রয়ী আইন
রেফারিদের প্রধান পিয়েরলুইজি কোলিনা খেলায় সময় অপচয় বন্ধে বেশ কিছু নতুন নিয়ম প্রণয়ন করেন। তিনি থ্রো-ইন, গোলকিক ও খেলোয়াড় বদলির সময় অপচয় বন্ধে কঠোর নির্দেশনা দেন। এর ফলে কাতার বিশ্বকাপের তুলনায় বল সচল থাকার হার ৫৭.৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬০.৪ শতাংশে দাঁড়ায়। বাড়তি সময় বাদ দিলে প্রতিটি ম্যাচ গড়ে ৯৬ মিনিট ২৪ সেকেন্ডে শেষ হয়, যা সমর্থকদের দ্রুত ও উপভোগ্য ফুটবল উপহার দিয়েছে।

রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ
মাঠের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি টুর্নামেন্টটি রাজনৈতিক বিতর্কেও জর্জরিত ছিল। মার্কিন ভিসানীতির কারণে বেশ কয়েকটি দেশের দর্শক স্টেডিয়ামে প্রবেশ করতে পারেননি। টুর্নামেন্ট শুরু হওয়ার আগেই সোমালি রেফারি ওমর আরতানকে মায়ামি বিমানবন্দরে নামতে বাধা দেয়া হয়। ইরান দল আসরে অংশ নিলেও তাদের প্রতি ম্যাচের জন্য মাত্র ২৪ ঘণ্টার ভিসা প্রদান করা হয়। তবে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বিতর্ক দেখা দেয় যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ফিফা সভাপতি ইনফান্তিনোকে ফোন করে মার্কিন খেলোয়াড় ফোলারিন বালোগানের লাল কার্ডের নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করার সুপারিশ করেন। পরবর্তীতে ফিফা ডিসিপ্লিনারি কমিটির সদস্য মোহাম্মদ আল-কামালি বালোগানের এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা আগামী ১২ মাসের জন্য স্থগিত করেন। এ ঘটনা আন্তর্জাতিক ফুটবলে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের এক নজিরবিহীন উদাহরণ সৃষ্টি করে।

টিকিট নিয়ে অসন্তোষ
টিকিটের অতিরিক্ত মূল্য এবং নিউ জার্সিতে যাতায়াত ট্রেনের চড়া ভাড়া নিয়ে বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। চড়া দাম সত্ত্বেও ফিফা জানিয়েছে মাঠগুলোতে ৯৯.৭ শতাংশ দর্শক উপস্থিতি ছিল এবং রেকর্ড ৬৫ লাখের বেশি মানুষ ম্যাচ উপভোগ করেন। তবে টিকিট নীতি ও দামের স্বচ্ছতা নিয়ে নিউ ইয়র্ক ও নিউ জার্সির অ্যাটর্নি জেনারেলরা ফিফার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করেন। অন্যদিকে ভিএআর প্রযুক্তির ব্যবহারে সিদ্ধান্ত আসার গতি দ্রুত হলেও মিশর ও আর্জেন্টিনার ম্যাচের মতো গুরুত্বপূর্ণ নকআউট পর্বগুলোতে রেফারিংয়ের মান নিয়ে বিভিন্ন দেশের কোচরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
(বিবিসির প্রতিবেদন অবলম্বনে)

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন