অধ্যাপক ড. খন্দকার মোহাম্মদ আশরাফুল মুনিম নেত্রকোণা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় ভাইস চ্যান্সেলর (ভিসি)। ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে তিনি এই দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও প্রাক্তন চেয়ারম্যান। একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষে এই শিক্ষাবিদ ওয়াটারলু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর এবং লিডস্ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। টেকসই উন্নয়ন, পরিবেশ ও টেকসই কৃষি, এপ্লাইড ইকোনোমেট্রিকস এবং এপ্লাইডস ম্যাক্রোইকোনমিকস তার গবেষণাক্ষেত্র। তিনি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে নানা স্বপ্ন দেখেন। তার রয়েছে সুনির্দিষ্ট ভিশন। সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা-গবেষণা, সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে বিচরণ, ভবিষ্যত পরিকল্পনাসহ সার্বিক বিষয়ে কথা হয় অধ্যাপক ড. খন্দকার মোহাম্মদ আশরাফুল মুনিম-এর সঙ্গে। এসময় উপাচার্য এই বিশ্ববিদ্যালয় ঘিরে তার স্বপ্নের কথাও তুলে ধরেন।
নেত্রকোণা বিশ্ববিদ্যালয় ২০১৮ সালে যাত্রা শুরু করে। এতদিন ধরে চারটি বিভাগ, ৬৫০ শিক্ষার্থী এবং ১২ জন শিক্ষক নিয়ে চলছিল বিশ্ববিদ্যালয়টি। ফলে প্রতিষ্ঠানটির যে স্বাভাবিক বিকাশ, সেটি থমকে ছিল।
উপাচার্য বলেন, ‘এই প্রেক্ষিতে ২০২৬ সালের শুরুতে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) থেকে আমরা নতুন ৬টি বিভাগের অনুমোদন লাভ করি। স্বাভাবিকভাবে এখন শিক্ষার্থী সংখ্যা বাড়ছে, শিক্ষক সংখ্যা অর্ধশত ছাড়িয়েছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যাও এখন পূর্বের চেয়ে বেড়েছে। ইতিমধ্যে আমাদের একাডেমিক কার্যক্রম স্থায়ী ক্যাম্পাসে স্থানান্তরিত হয়েছে। বয়সে নবীন হলেও সবমিলিয়ে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে নেত্রকোণা বিশ্ববিদ্যালয় এখন স্বতন্ত্র পরিচয় লাভ করতে শুরু করেছে।’
অধ্যাপক খন্দকার মুনিম বলেন, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কত ছোট, দেশের কোন প্রান্তে অবস্থিত, কী কী সংকট রয়েছে- এসব বিষয়কে পেছনে ফেলে একটি বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে এগিয়ে যাওয়াই আমাদের লক্ষ্য। একথা দ্বিধাহীনভাবে বলা যায়, মেধাবী ও দক্ষ শিক্ষকরাই বিশ্ববিদ্যালয়ের এই এগিয়ে চলার পথে নেতৃত্ব দেবেন। তাদের সঙ্গে যুক্ত হবেন শিক্ষার্থীরা। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে দেশের সুপ্রতিষ্ঠিত ৯টি বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাজুয়েটরা শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেছেন। তাদের অধিকাংশেরই নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে দারুণ সব রেজাল্ট (প্রথম থেকে তৃতীয় অবস্থান) রয়েছে। বিদেশের স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের ডিগ্রি ও পিএইচডি রয়েছে এমন শিক্ষকও যোগ দিয়েছেন এখানে। ইউরোপ আমেরিকায় পড়তে গেছেন, যাচ্ছেনÑ এমন শিক্ষকের সংখ্যাও কম নয়। আমার বিশ্বাস, এই শিক্ষকরাই আগামী দিনে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে পার্থক্য গড়ে দেবেন।’
তিনি বলেন, ‘নেত্রকোণা বিশ্ববিদ্যালয়কে আমরা একটি আবাসিক রূপ দিতে চাই। আমাদের হাতে একটি পূর্ণাঙ্গ মাস্টারপ্লান রয়েছে। এই মহাপরিকল্পনার সঙ্গে আমরা কোনও কম্প্রোমাইজ করতে চাই না। জ্ঞান উৎপাদন, বিতরণ ও নতুন জ্ঞান সন্ধানের পাশাপাশি ভাটি অঞ্চলের ঐতিহ্য ও প্রাণ-প্রকৃতি রক্ষায় আমাদের দায় রয়েছে। ইতিমধ্যে কয়েক হাজার বৃক্ষরোপণ সম্পন্ন হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ২১ শতাংশ জলাশয় রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।’
শিক্ষা ও গবেষণার মানোন্নয়নের উদ্যোগের বিষয়ে উপাচার্য বলেন, বিশ্বব্যাপী শিক্ষা ও গবেষণায় যে প্রবণতা চলছে, সেগুলোকে আমরা ধারণ করতে আগ্রহী। শিক্ষকরা যেন পৃথিবীর স্বনামধন্য জার্নালগুলোতে গবেষণা প্রবন্ধ লেখেন, এখানে যেন শিক্ষক-শিক্ষার্থী যৌথ গবেষণা হয়, ভালো-ভালো কাজগুলো যেন বাংলা ভাষায় অনূদিত হয়- সে লক্ষ্যে আমাদের সার্বক্ষণিক তাগিদ রয়েছে। ছোট প্রতিষ্ঠান হিসেবে আমাদের আর্থিক সক্ষমতা সীমিত; তবু আমরা প্রতিবছর শিক্ষকদের গবেষণায় আর্থিক প্রণোদনা দিয়ে যাচ্ছি। প্রতিটি অনুষদে জার্নাল প্রকাশ করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে দু’টি জার্নাল প্রকাশিত হয়েছে। জার্নালগুলোতে নেত্রকোণা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-গবেষকরা লিখছেন। সেখানে বহুমুখী জ্ঞানের সমাবেশ ঘটছে।’
অধ্যাপক মুনিম বলেন, ‘একথা সত্য যে, এতদিনেও বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি একাডেমিক ভবন নির্মাণ সম্ভব হয়নি। অন্তত একটি একাডেমিক ভবন থাকলেও অনেক সমস্যার সমাধান হতো। এতদিন যারা এসব নির্মাণ কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তাদের কাছে একাডেমিক ভবনের চেয়ে অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়ন গুরুত্ব পেয়েছেÑ যা সত্যিই দুঃখজনক। তবে, আমরা একাডেমিক প্রয়োজন মেটানোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দেখছি। আমাদের অন্তত একটি একাডেমিক ভবন আশু প্রয়োজন। লাইব্রেরি ভবন, ছাত্র হল, ছাত্রী হল, প্রশাসনিক ভবন ইত্যাদি নির্মাণকাজ সম্পন্ন করার লক্ষ্যে আমরা বিস্তারিত পুনঃপরিকল্পনা (আরডিপিপি) দাখিল করেছি। এ বিষয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকসহ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। আমরা অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং ইউজিসির সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রাখছি। আশা করছি, শিগগিরই একটি সুন্দর সমাধান হবে।’
তিনি জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী কেন্দ্র (টিএসসি) ও ক্যাফেটেরিয়া ভবন উদ্বোধন হয়েছে। একাডেমিক ভবন না থাকায় ভবন দু’টিকে প্রাথমিকভাবে শ্রেণিকক্ষে রূপান্তর করা হয়েছে। নির্মাণাধীন গ্রন্থাগার ভবনের একটি অংশকেও শ্রেণিকক্ষের জন্য বরাদ্দ করার পরিকল্পনা রয়েছে। শ্রেণিকক্ষ সংকট আপাতত থাকছে না। পর্যায়ক্রমে শিক্ষার্থীদের আবাসন নিশ্চিত করা হবে।
তিনি বলেন, ‘আমরা চাই, প্রাথমিকভাবে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে জাতীয় পর্যায়ের শিক্ষক-বুদ্ধিজীবী ও জ্ঞাণকাণ্ডের বিভিন্ন শাখার ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে সাক্ষাৎ-পরিচয় ঘটুক। সেমিনার, কর্মশালা ও বক্তৃতামালার আওতায় পণ্ডিতজনেরা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত আসছেন এবং কথা বলছেন। তাদের সঙ্গে আমাদের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মিথষ্ক্রিয়া তৈরি হচ্ছে। আমরা মনে করি, স্থানীয় পর্যায় থেকে জাতীয় পর্যায়ে উত্তরণে এটি প্রাথমিক ধাপ।’
উপাচার্য বলেন, ‘শিক্ষা সহায়ক কার্যক্রমের জন্য প্রাথমিকভাবে নেত্রকোণা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং ক্যারিয়ার ক্লাবসহ তিনটি সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন কার্যক্রম শুরু করেছে। আমরা আশা করি, এসকল সংগঠন একসময় শিক্ষার্থীদের পদভাবে মুখরিত হবে। সংগঠনের সংখ্যা ও পরিধিও বৃদ্ধি পাবে।’
খন্দকার মোহাম্মদ আশরাফুল মুনিম আরও জানান, নেত্রকোণা বিশ্ববিদ্যালয়ে অটোমেশনের কাজ চলমান। এখানে প্রায় শতভাগ নথিপত্রের কাজ ডি-নথিতে (ডিজিটাল নথি) সম্পন্ন হয়। পরীক্ষা সংক্রান্ত যাবতীয় কাজ ডিজিটাল মাধ্যমে নিয়ে আসা হয়েছে। এতে একদিকে যেমন দ্রুতগতিতে পরীক্ষার ফল প্রদান সম্ভব হবে, অন্যদিকে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাও বৃদ্ধি পাবে। এছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ে অত্যাধুনিক ল্যাব স্থাপন এবং ক্যাম্পাসের মূল স্থাপনাগুলোকে বিনামূল্যে ওয়াইফাইয়ের আওতায় নিয়ে আসতে কাজ হচ্ছে। ইতোমধ্যে ইন্টারনেট প্রাপ্যতা নিশ্চিতকল্পে বিডিরেন’র কাজের পরিধি বাড়ানো হয়েছে।
এক প্রশ্নের জাবাবে উপাচার্য বলেন, ‘এই অঞ্চলের সাংস্কৃতিক সম্ভাবনা বিপুল। বহু পুরোনো ঐতিহ্যের সঙ্গে নতুন প্রাণ এখানে মিলিত হয়েছে। ফলে এই দুইয়ের মাঝে নেত্রকোণা বিশ্ববিদ্যালয় সেতুবন্ধের কাজ করবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে অতিসম্প্রতি ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আশা করা যায়, বিভাগটি এই অঞ্চলের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সন্ধানকে অগ্রধিকার দেবে। এছাড়াও এ অঞ্চলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আরও কিছু উদ্যোগ যেমন, এতদ্সংশ্লিষ্ট কিছু বিভাগ ও ইনস্টিটিউট স্থাপন আমাদের পরিকল্পনায় রয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘শিক্ষায় প্রধানত দুটি দিক বিদ্যমানÑ এক. মনুষ্যত্বের দিক, দুই. প্রশিক্ষণের দিক। বিশ্ববিদ্যালয়ে এই দু’টি দিকেরই খুব প্রয়োজন। আশা করি, নেত্রকোণা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা এই দু’টি দিকের সমন্বয় সাধনে সফল হবে। কারিগরি দক্ষতা উন্নয়নের পাশাপাশি মনুষ্যত্বের বিকাশও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে এই দার্শনিক দিকটি উপেক্ষা করলে চলে না। আর প্লেসমেন্ট অনেকগুলো বিষয় যেমন, শিক্ষার্থীদের নিজ নিজ দক্ষতা, শিক্ষক ও এলামনাইদের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক, ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া পারস্পারিক সহযোগিতা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সুনামের সঙ্গে সম্পৃক্ত। ধীরে ধীরে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় এগুলো অর্জনে সক্ষম হবে।
নেত্রকোণা বিশ্ববিদ্যালয় এখন তার ভিত্তি রচনার কাল অতিক্রম করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ সময়ে একাগ্রতা প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকল অংশীজনকে ধৈর্য্য, আগ্রহ, পরিশ্রম, সহিষ্ণুতা ও সহযোগিতাপূর্ণ মনোভাব নিয়ে নিজ নিজ কাজ করতে হবেÑ তবে বিশ্ববিদ্যালয়টি তার কাক্সিক্ষত সময়ে কাক্সিক্ষত গন্তব্যে পৌঁছতে পারবে।
