একটি সোনালি, সফল এবং দীর্ঘ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটলো। তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে ইংল্যান্ডের কাছে ৬-৪ গোলের হারের পর ফ্রান্স জাতীয় দলের কোচের পদ থেকে বিদায় নিলেন দিদিয়ের দেশম। আর এর মাধ্যমেই অবসান ঘটলো ফরাসি ডাগআউটে তার ১৪ বছরের গৌরবময় শাসনের। তবে এই বিদায়ের রেশ কাটতে না কাটতেই ফরাসি ফুটবলে নতুন ভোরের আগমনী বার্তা শোনা যাচ্ছে। বিশ্ব গনমাধ্যমে শোনা যাচ্ছে, আগামী ১লা সেপ্টেম্বর থেকে দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন কিংবদন্তি জিনেদিন জিদান।
টানা তৃতীয়বারের মতো ফ্রান্সকে বিশ্বকাপের ফাইনালে তোলার লক্ষ্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান দেশম। ২০১৮তে রাশিয়া বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন এবং ২০২২ সালে কাতারে রানার্সআপ হওয়া ফরাসিরা এবারও ছিল অন্যতম হট ফেবারিট। গ্রুপ পর্বের বৈতরণী পার করে নকআউটে সুইডেনকে ৩-০, প্যারাগুয়েকে ১-০ এবং কোয়ার্টার ফাইনালে
মরক্কোকে ২-০ গোলে হারিয়ে সেমিফাইনালে ওঠে ব্লুজরা। তবে স্পেনের কাছে ২-০ গোলের হারে ফাইনালের স্বপ্ন ভেঙে যায় তাদের। ব্রোঞ্জ মেডেলের লড়াইয়ে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথমার্ধে ৪-০ গোলে পিছিয়ে পড়ে ফ্রান্স। তবে দ্বিতীয়ার্ধে কিলিয়ান এমবাপ্পের জোড়া গোল, উসমানে দেম্বেলে ও বারকোলার স্ট্রাইকে লড়াই করেও ৬-৪ ব্যবধানে হেরে চতুর্থ হয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয় দেশম বাহিনীকে।
আর এই পরাজয়ের মধ্য দিয়েই শেষ হলো ফরাসি ফুটবলের অন্যতম সফল এক কোচের ক্যারিয়ার। কোটি কোটি ফরাসি মানুষকে ট্রফি বা সান্ত্বনার ব্রোঞ্জ উপহার দিতে না পারার আক্ষেপ নিয়ে এই কিংবদন্তি কোচ বলেন, ‘খেলাধুলার জায়গায় থেকে হতাশা অবশ্যই আছে। কোটি কোটি ফরাসি মানুষকে আনন্দ দেয়ার সুযোগ ছিল আমাদের সামনে। এটা বিশ্বকাপ, এর চেয়ে সুন্দর আর কিছু হতে পারে না। তবে ব্যক্তিগত সম্পর্কের জায়গা থেকে, গত আট সপ্তাহের এই অভিযানটি ছিল দারুণ ও অসাধারণ।’ দেশমের বিদায়ের পর ফরাসি ফুটবল ফেডারেশন (এফএফএফ) এক আবেগঘন বিবৃতিতে এই কিংবদন্তিকে তাদের সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা ও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেছে। বিবৃতিতে এফএফএফ বলে, ‘২০১২ সাল থেকে ফ্রান্সের হেড কোচ হিসেবে দিদিয়ের দেশমের এই ব্যতিক্রমী ও অসামান্য অবদানের জন্য ফেডারেশন তাকে স্যালুট এবং ধন্যবাদ জানাচ্ছে। দেশমের বিদায়ের মাধ্যমে ব্লুজ এবং ফরাসি ফুটবলের সেবায় ২৫ বছরের এক অনন্য প্রতিশ্রুতির সমাপ্তি ঘটলো। কিছু ক্যারিয়ার থাকে যা কোনো প্রতিষ্ঠান বা দেশের ইতিহাসকে চিরকালের জন্য খোদাই করে দেয়। দেশম ছিলেন কঠোর শৃঙ্খলা, নিয়মানুবর্তিতা এবং দলগত ঐক্যের প্রতীক।’ খেলোয়াড় ও কোচ- উভয় ভূমিকাতেই দেশম ফরাসি ফুটবলের চেহারা বদলে দিয়েছিলেন।
১৯৯৮ সালে অধিনায়ক হিসেবে ফ্রান্সকে প্রথম বিশ্বকাপ এবং ২০০০ সালে ইউরো জেতানো দেশম, ২০১৮ সালে কোচ হিসেবে ফ্রান্সকে এনে দেন দ্বিতীয় বিশ্বজয়। এছাড়া ২০২১ সালে তার অধীনেই ন্যাশনস লীগ জেতে ফ্রান্স। ফরাসি কোচ হিসেবে সর্বোচ্চ ১৮৫টি ম্যাচে ডাগআউটে ছিলেন তিনি, যার মধ্যে ১২০টি ম্যাচেই জয় পেয়েছে দল। হেলমুট শনের রেকর্ড ভেঙে বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ২৬টি ম্যাচ পরিচালনার কীর্তিও এখন দেশমের ঝুলিতে। ফেডারেশন তাদের বিবৃতিতে আরও লেখে, ‘১৮৫ ম্যাচ বা ১২০ জয়ের বাইরেও দেশম ফরাসি ফুটবলে পারফরম্যান্সের এমন এক সংস্কৃতি তৈরি করে গেছেন, যা আগামী প্রজন্মের জন্য বেঞ্চমার্ক হয়ে থাকবে।’
দেশম অধ্যায়ের শেষের পর ফরাসি ক্রীড়া দৈনিক ‘লেকিপ’ -এর এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ফ্রান্স জাতীয় দলের দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন সাবেক ফরাসি অধিনায়ক জিনেদিন জিদান। ২০২১ সালে রিয়াল
মাদ্রিদের কোচের পদ ছাড়ার পর থেকে কোনো দলের দায়িত্ব নেননি জিজু। স্প্যানিশ ক্লাবটির হয়ে টানা তিনটি চ্যাম্পিয়ন্স লীগ জেতা এই ফরাসি মাস্টারমাইন্ড দীর্ঘদিন ধরেই দেশমের উত্তরসূরি হিসেবে ফুটবলবিশ্বের প্রথম পছন্দ ছিলেন। যদিও ফেডারেশনের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি। তবে ফুটবল মহলে জোর গুঞ্জন, আগামী সেপ্টেম্বর থেকেই শুরু হতে যাচ্ছে ফরাসি ফুটবলে জিজু-যুগের।
