বিশ্বকাপ উন্মাদনা প্রাণহানি বেড়ে ১৪

বিশ্বকাপ উন্মাদনা প্রাণহানি বেড়ে ১৪

ফন্ট সাইজ:

ফুটবল বিশ্বকাপকে ঘিরে দেশ জুড়ে চলছে উৎসবের আমেজ। ছোট-বড়, তরুণ থেকে প্রবীণ- সব বয়সী মানুষ প্রিয় দলের জার্সি পরে শোভাযাত্রা, বড় পর্দায় খেলা দেখা এবং বিজয় উদ্‌যাপনে অংশ নিচ্ছেন। তবে আনন্দ-উৎসবের এই আবহের পাশাপাশি এবার বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে দেশে উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে প্রাণহানির ঘটনাও। প্রিয় দলের জয়-পরাজয়কে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, পতাকা টাঙাতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়া, বিজয় উদ্‌যাপন, বড় পর্দায় খেলা দেখে বাড়ি ফেরার পথে সড়ক দুর্ঘটনা এবং অন্যান্য ঘটনায় দেশে প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪ জনে। এর আগে এ সংখ্যা ছিল ১১।

সর্বশেষ ১৫ই জুলাই রাতে আর্জেন্টিনার সেমিফাইনাল জয়ের পর বিজয় উদ্‌যাপন ও বড় পর্দায় খেলা দেখে বাড়ি ফেরার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় আরও তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে চারজন, পতাকা টাঙানো ও বিজয় উদ্‌যাপনের সময় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে চারজন, সড়ক দুর্ঘটনায় তিনজন, অতিরিক্ত উচ্ছ্বাসে একজন, গোলপোস্ট বা অনুরূপ দুর্ঘটনায় একজন এবং ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে একজন নিহত হয়েছেন।
গত ১৫ই জুলাই রাতে নেত্রকোণায় আর্জেন্টিনার জয়ের পর আনন্দ মিছিলের ভিডিও করতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে দীপ্ত চৌধুরী (২৩) নামে এক কলেজ শিক্ষার্থী বিদ্যুৎস্পৃৃষ্ট হয়ে প্রাণ হারান।

নেত্রকোণা সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের সম্মান তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন তিনি। বন্ধুদের সঙ্গে বড় পর্দায় খেলা উপভোগ করতে যান। খেলা শেষে আর্জেন্টিনার বিজয়ে এলাকাবাসী তাৎক্ষণিকভাবে মিছিলের প্রস্তুতি নেয়। রাত ৩টার দিকে আনন্দ মিছিল বের হলে দীপ্ত ছবি ও ভিডিও ধারণ করার জন্য শহীদ মিনার মোড়ে অবস্থিত সিঙ্গার শোরুমের দ্বিতীয় তলায় ওঠেন। ভিডিও করার সময় পাশে থাকা বৈদ্যুতিক তারে জড়িয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে তিনি নিচে পড়ে যান। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে নেত্রকোণা সদর হাসপাতালে নেয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। একই রাতে বড় পর্দায় খেলা দেখে মোটরসাইকেলে বাসায় ফেরার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় দুই সাংবাদিক প্রাণ হারান। তারা হলেন- দৈনিক আমার প্রাণের বাংলাদেশ পত্রিকার সাংবাদিক রবিউল আলম রাজু এবং সংবাদ দিগন্ত পত্রিকার সাংবাদিক সাকিবুল হাসান।

বিশ্লেষকরা বলছেন, খেলাকে ঘিরে অসহিষ্ণুতা, উগ্র সমর্থন এবং অসতর্ক উদ্‌যাপন- এসব প্রাণহানির অন্যতম কারণ। তারা বিশ্বকাপের বাকি সময় জনসমাগমে খেলা দেখা, বিজয় মিছিল এবং পতাকা টাঙানোর ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানিয়েছেন। একইসঙ্গে প্রাণহানি ও সংঘর্ষ এড়াতে খেলাকে শুধু বিনোদনের উপকরণ হিসেবে দেখে অতিরিক্ত আবেগতাড়িত না হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন তারা।

সংঘর্ষে প্রাণহানি: গত ৭ই জুলাই রাত ১১টার দিকে কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের ধনপুর এলাকায় আর্জেন্টিনা-মিশর ফুটবল ম্যাচ দেখা নিয়ে আর্জেন্টিনা সমর্থকদের হামলায় মো. শরিফুল ইসলাম (৩৫) নামে এক অটোচালক নিহত হন। নীলফামারী থেকে স্ত্রী ও দুই কন্যাসন্তানকে নিয়ে কুমিল্লায় এসেছিলেন তিনি। পরিবারের সদস্যদের মুখে হাসি ফোটাতে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালাতেন। পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারীকে হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়েছে তার পরিবার।

এর আগে গত ১লা জুলাই রাতে রাজধানীর আদাবরে নবোদয় হাউজিং এলাকায় ব্রাজিলের খেলা দেখার সময় বাঁশি বাজানোকে কেন্দ্র করে আবুল বাশার বাদশা নামে এক বিএনপি নেতাকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় নবোদয় হাউজিং ইউনিট বিএনপি’র সভাপতি সাদ্দাম গুরুতর আহত হন। একই রাতে সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলায় ফুটবল খেলা দেখার সময় চিৎকার করাকে কেন্দ্র করে চাচাতো ভাইয়ের ছুরিকাঘাতে আলম আহমদ (২৮) নামে এক যুবক নিহত হন। এদিকে, ব্রাজিল-জাপান ফুটবল ম্যাচকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে 
আশুলিয়ায় নাহিদ হাসান নামে এক কিশোরকে ছুরিকাঘাত করে হত্যার পর বালুচাপা দিয়ে রাখা হয়।

পতাকা টাঙাতে গিয়ে নিহত: গত ১৯শে জুন ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে ব্রাজিলের পতাকা টাঙাতে গিয়ে মাহিন শেখ নামে এক স্কুলছাত্র মারা যান। ১৫ই জুন চট্টগ্রামে আর্জেন্টিনার পতাকা টাঙাতে গিয়ে রামহরি বৈষ্ণবের মৃত্যু হয়। এর আগে গত ৯ই জুন মানিকগঞ্জ সদর উপজেলায় বিশ্বকাপ ফুটবল উপলক্ষে ব্রাজিলের পতাকা টাঙাতে গিয়ে বিদ্যুতায়িত হয়ে ফয়সাল (১৮) নামে এক তরুণের মৃত্যু হয়।

আরও কয়েকটি প্রাণহানির ঘটনা: গত ৭ই জুলাই মিশরের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার নাটকীয় জয়ের পর অতিরিক্ত উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে গিয়ে ঝিনাইদহের শৈলকুপা পৌরসভার বালিয়াডাঙ্গা গ্রামের রসুল উদ্দীন (৪০) নামের এক ভ্যানচালকের মৃত্যু হয়। তিনি মেসির একনিষ্ঠ সমর্থক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। গত ৩রা জুলাই চট্টগ্রাম নগরীর হালিশহর এলাকায় গোলপোস্ট ভেঙে মাহিদুল ইসলাম (২০) নামে এক তরুণের মৃত্যু হয়। একই দিন নড়াইলে কিশোরদের ফুটবল খেলা নিয়ে বিরোধের জেরে মোস্তফা কাজী নামে এক বৃদ্ধকে কুপিয়ে ও হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এর আগে ১৩ই জুন ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলায় ব্রাজিল ফুটবল দলের সমর্থকদের শোভাযাত্রায় অংশ নিয়ে সড়ক দুর্ঘটনায় মো. ইসমাইল (২৫) নামে এক যুবক নিহত হয়েছেন।

সংঘর্ষের ঘটনা: ১৫ই জুলাই রাতে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের খেলা নিয়ে ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে হবিগঞ্জে দুই গ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন। এদিকে, ৮ই জুলাই রাতে সিরাজগঞ্জ পৌরশহরে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ ঘটে। এতে প্রায় ১৫ জন আহত হন এবং কয়েকটি বাড়িঘরে হামলা চালানো হয়। ৭ই জুলাই রাতে চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ে আর্জেন্টিনা-মিশর ম্যাচ ঘিরে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে দু’জন আহত হন। গুরুতর আহত ব্রাজিল সমর্থক মাঈনুদ্দিন মিঠুকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া, একই দিন রাতে টাঙ্গাইলের মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়েও একই ম্যাচকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সহকারী প্রক্টরসহ অন্তত ১০ জন আহত হন। সংঘর্ষ চলাকালে একাডেমিক ভবনে ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে। এদিন রাতে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়েও দুই বিভাগের শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, খেলা বিনোদনের অংশ, তাতে জয়-পরাজয় থাকবে- এটি মেনে নেয়ার মানসিকতায় ঘাটতি আছে আমাদের। তবে এটি শুধু ক্রীড়াক্ষেত্রে নয়; জাতিগতভাবেই আমরা রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক কোনো ক্ষেত্রেই জয়-পরাজয় স্বাভাবিকভাবে নিতে পারি না। এ কারণে এ ধরনের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন