বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের মহারণ শেষ। ট্রফি জয়ের স্বপ্নভঙ্গের বেদনা বুকে নিয়ে বিদায় নিয়েছে দুই পরাশক্তি- ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স। ১৯৬৬ সালের পর প্রথম কোনো বড় শিরোপা ঘরে তোলার যে সোনালী স্বপ্ন থমাস টুখেলের ইংল্যান্ড দেখছিল, তা আর্জেন্টিনার কাছে হেরে আরও একবার ধুলোয় মিশে গেছে। অন্যদিকে গতবারের রানার্সআপ ফ্রান্সকেও বিদায় নিতে হয়েছে স্পেনের দুর্দান্ত ফুটবলের কাছে হার মেনে। দুই শিবিরের খেলোয়াড় ও সমর্থকদের হৃদয় ভাঙার এই ক্ষত এখনো বেশ তাজা। তবে ট্রফি জয়ের আশা শেষ হয়ে গেলেও টুর্নামেন্ট কিন্তু এখনই শেষ হয়ে যাচ্ছে না। সাধারণত সেমিফাইনালে হেরে যাওয়ার পর দলগুলোর জন্য দ্রুত বাড়ির বিমান ধরাই থাকে মূল লক্ষ্য। তবে এর আগে ব্রোঞ্জ পদকের একটি সান্ত্বনা লড়াইয়ে নামতে হচ্ছে দুই ইউরোপিয়ান জায়ান্টকে। আজ রাত ৩টায় তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে মুখোমুখি হবে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স। আপাতদৃষ্টিতে ম্যাচটিকে স্রেফ নিয়মরক্ষার মনে হলেও, একটু গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে এই ম্যাচের রোমাঞ্চ কোনো অংশে কম নয়। ফুটবল বিশ্বের দর্শকদের জন্য এই ম্যাচটি দেখার অন্তত চারটি অকাট্য কারণ বের করেছে বৃটিশ গণমাধ্যম বিবিসি।
গোল্ডেন বুটের রাজকীয় লড়াই
শিরোপা হাতছাড়া হলেও ব্যক্তিগত অর্জনের সবচেয়ে বড় মুকুট ‘গোল্ডেন বুট’ পাওয়ার প্রতিযোগিতা এখনো পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। আর এই দৌড়ে অত্যন্ত সুবিধাজনক অবস্থানে আছেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। এই বিশ্বকাপে দুর্দান্ত ছন্দে খেলেছেন ফরাসি অধিনায়ক । ইতিমধ্যে ৮টি গোল করে লিওনেল মেসির সঙ্গে যৌথভাবে শীর্ষ গোলদাতার তালিকায় রয়েছেন তিনি। তবে গোল সংখ্যা সমান হলেও অ্যাসিস্টের দিক থেকে মেসি তার সাবেক পিএসজি সতীর্থ এমবাপ্পের চেয়ে কিছুটা এগিয়ে আছেন। তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচের গোলও গোল্ডেন বুটের জন্য সমানভাবে গণনা করা হয়। ফলে এই ম্যাচে গোল করতে পারলে এমবাপ্পের সামনে এককভাবে শীর্ষে যাওয়ার বিশাল সুযোগ থাকবে। যদিও তার পরদিন ফাইনালে মেসির সামনে জবাব দেয়ার সুযোগ থাকবে। অন্যদিকে, ইংলিশ শিবিরে হ্যারি কেইন এবং জুড বেলিংহাম ৬টি করে গোল নিয়ে খুব বেশি পিছিয়ে নেই। তাদের গোল্ডেন বুট জিততে হলে হয়তো এক ম্যাচে হ্যাটট্রিক করতে হবে, যা কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, ১৯৯০ সালের বিশ্বকাপে ইতালির সালভাতোরে স্কিলাচি এই ইংল্যান্ডের বিপক্ষেই সান্ত্বনামূলক তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে গোল করে টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার গোল্ডেন বুট নিজের করে নেন। এমবাপ্পে বা কেইনের সামনেও এখন সেই একই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটানোর সুযোগ রয়েছে।
৬০ বছর পর সেরা অর্জনের সুবর্ণ সুযোগ
ফাইনালে খেলতে না পারার আক্ষেপ ইংলিশ সমর্থকদের অনেকদিন পোড়াবে সত্য। তবে এই ম্যাচের মাধ্যমে টুখেলের দলের সামনে ইতিহাস গড়ার দারুণ এক সুযোগ রয়েছে। টুর্নামেন্টের শুরুতে সমর্থকরা যে সোনালী স্বপ্নের জাল বুনেছিলেন, ব্রোঞ্জ পদক হয়তো তার সমকক্ষ নয়। তবে ফ্রান্সকে হারাতে পারলে বিগত ৬০ বছরের ইতিহাসে বিশ্বকাপে এটিই হবে ইংল্যান্ড পুরুষ ফুটবল দলের সবচেয়ে বড় সাফল্য।
১৯৬৬ সালে ঘরের মাঠে বিশ্বকাপ জয়ের পর আর কখনোই বিশ্বকাপের শীর্ষ তিনে জায়গা করে নিতে পারেনি থ্রি লায়নরা। এর আগে ইংল্যান্ড দল দুবার বিশ্বকাপের তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে খেলে এবং দুবারই তাদের পরাজয় নিয়ে মাঠ ছাড়তে হয়। ১৯৯০ সালে ববি রবসনের অধীনে ইতালি এবং ২০১৮ সালে গ্যারেথ সাউথগেটের অধীনে বেলজিয়ামের কাছে হেরে চতুর্থ অবস্থানে থেকে টুর্নামেন্ট শেষ করে তারা। এবার টুখেলের দলের সামনে সুযোগ রয়েছে সেই দীর্ঘ অপবাদ ঘুচিয়ে অন্তত ব্রোঞ্জ পদক গলায় ঝুলিয়ে দেশের মাটিতে পা রাখার।
নতুন মুখ ও সাইডবেঞ্চের পরীক্ষা
দীর্ঘ এবং অত্যন্ত ক্লান্তিকর এক বিশ্বকাপ সূচি পার করে ফুটবলারদের চোট ও ক্লান্তির মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। এই ম্যাচে ফাইনালের মতো স্নায়ুচাপ নেই। ফলে দুদলের কোচই চাইবেন টুর্নামেন্টে এখন পর্যন্ত বেঞ্চে বসে থাকা প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের বাজিয়ে নিতে। এটি দলের নিয়মিত তারকাদের কিছুটা বিশ্রাম দেয়ার পাশাপাশি নতুনদের প্রতিভা প্রদর্শনের দুর্দান্ত এক মঞ্চ হতে পারে।
ইংল্যান্ডের তরুণ মিডফিল্ডার কোবি মাইনুর কথাই ধরা যাক। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের এই উদীয়মান তারকা চলতি বিশ্বকাপে এখনো একটি মিনিটও খেলার সুযোগ পাননি। ডেকলান রাইসের সামপ্রতিক অসুস্থতা এবং ম্যাচের কম চাপের কারণে টুখেল হয়তো এবার মাইনুকে তার স্বপ্নের বিশ্বকাপ অভিষেকের সুযোগ করে দেবেন। একইভাবে পুরো টুর্নামেন্টে মাত্র ৬ মিনিট খেলা ওলি ওয়াটকিন্স শুরু থেকেই মাঠে নামতে পারেন।
অন্যদিকে ফরাসি শিবিরে এনগোলো কান্তের বয়স এখন ৩৫ বছর। এটিই হতে যাচ্ছে তার ক্যারিয়ারের সম্ভব্য শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচ। কান্তের বিদায়ী মঞ্চ রাঙাতে দিদিয়ের দেশম তাকে দলে রাখতে পারেন।
আসন্ন দীর্ঘ ফুটবল খরা ও তৃষ্ণা মেটানোর সুযোগ
বিশ্বজুড়ে ক্লাব ফুটবল কখনো পুরোপুরি বন্ধ হয় না। তবে বিশ্বকাপের মতো এমন হাইভোল্টেজ ও বিশ্বমানের আন্তর্জাতিক ফুটবলের রোমাঞ্চ পেতে দর্শকদের লম্বা সময় অপেক্ষা করতে হবে। আগামী রোববারের ফাইনালের পর প্রায় চার সপ্তাহের জন্য বড় ফুটবল আসরে এক ধরনের শূন্যতা তৈরি হবে। কোটি ভক্তের কাঙ্ক্ষিত ইংলিশ প্রিমিয়ার লীগ শুরু হবে আগামী ২১শে আগস্ট থেকে। আন্তর্জাতিক ফুটবলের সূচিতে পরিবর্তনের কারণে জাতীয় দলের ম্যাচ দেখতে দর্শকদের অপেক্ষা করতে হবে সেপ্টেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত। ফলে ফুটবলভক্তদের জন্য তীব্র এই ফুটবল খরা শুরু হওয়ার আগে বিশ্বমানের দুটি দল ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের মধ্যকার এই হাইভোল্টেজ ম্যাচটি উপভোগ করা হবে দ্বিতীয় শেষ সুযোগ। বিষাদ ভুলে তাই আরও একবার টিভির সামনে বসার এটিই সেরা সময়।
