বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনার কাছে ২-১ গোলে হারের পর কৌশল নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়া ইংল্যান্ডের প্রধান কোচ টমাস টুখেল এবার কড়া জবাব দিয়েছেন। তিনি দাবি করেছেন, পরাজয়ের জন্য তার কৌশল নয়, বরং ইংলিশ ফুটবলারদের ‘ডিএনএ’-তেই দুর্বলতা রয়েছে।
টুখেল বলেন, নিজেদের পায়ে বল রেখে ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করাটা হয়তো আমাদের ডিএনএ-তে নেই, যেমনটা স্পেন, আর্জেন্টিনা কিংবা ব্রাজিলের ফুটবলারদের ডিএনএ-তে থাকে।
একই সঙ্গে টুখেল জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি শতভাগ নিশ্চিতভাবেই আগামী দুই বছর পর অনুষ্ঠিত ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ (ইউরো) পর্যন্ত ইংল্যান্ডের কোচ হিসেবে দায়িত্ব চালিয়ে যেতে চান।
আর্জেন্টিনার বিপক্ষে সেমিফাইনালে ইংল্যান্ড ১-০ গোলে এগিয়ে থেকেও শেষ পর্যন্ত ২-১ ব্যবধানে হেরে যায়। ম্যাচের পর টুখেলের বিরুদ্ধে রক্ষণাত্মক কৌশল গ্রহণের অভিযোগ ওঠে। অনেকেই মনে করেন, তার সিদ্ধান্তই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
তবে টুখেল সেই সমালোচনা প্রত্যাখ্যান করেছেন। কড়া ভাষায় দিয়েছেন এর জবাব। তিনি বলেছেন, সমস্যা দলের ফরমেশনে ছিল না, বরং চাপের মুখে বলের দখল ধরে রাখতে না পারাই ছিল মূল কারণ।
তিনি বলেন, সেই মুহূর্তে আমার মনে হয়েছে, বিশ্বের কোনো কৌশলই আমাদের সাহায্য করতে পারত না। কারণ আমরা খুবই নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছিলাম। শারীরিক লড়াইয়ে পিছিয়ে গিয়েছিলাম, প্রতিপক্ষের দৌড় থামাতে পারিনি এবং তাদের ক্রসও ছিল অসাধারণ মানের।
টুখেলের মতে, গোল হজম করার পরই ম্যাচের গতি পুরোপুরি বদলে যায়।
তিনি বলেন, আমি এখনো পরিসংখ্যান দেখিনি, তবে গোল খাওয়ার পরই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ বদলে যায় এবং আমাদের বল দখলের হার দ্রুত কমে যায়।
তিনি আরও বলেন, আমরা আর ব্যক্তিগত লড়াই (ডুয়েল) জিততে পারছিলাম না। তাই ধীরে ধীরে আরও নিচে নেমে রক্ষণ করতে বাধ্য হয়েছি। এটা কখনোই পরিকল্পনা ছিল না, কিন্তু বাস্তবে সেটাই হয়েছে।
বল নিয়ন্ত্রণ আমাদের ডিএনএ-তে নেই’
টুখেলের মতে, স্পেন, আর্জেন্টিনা কিংবা ব্রাজিলের খেলোয়াড় মতো বল দখলে রেখে ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করার স্বাভাবিক প্রবণতা ইংল্যান্ডের নেই।
তার ভাষায়, বল দখলে রাখা তখন খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু বল নিয়ন্ত্রণ করে খেলা পরিচালনা করা হয়তো আমাদের ডিএনএ-তে নেই, যেমনটা স্প্যানিশ কিংবা আর্জেন্টাইন-ব্রাজিলিয়ান ফুটবলারদের ডিএনএ-তে রয়েছে।
রক্ষণে পাঁচজন নামানোর সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা
সেমিফাইনালে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে থাকার সময় ম্যাচের আরও ৩০ মিনিটের বেশি বাকি থাকতে টুখেল চার ডিফেন্ডারের বদলে পাঁচ ডিফেন্ডারের রক্ষণে চলে যান। গোলদাতা অ্যান্থনি গর্ডনকে তুলে এনে এজরি কনসাকে নামানো হয়।
এমন সিদ্ধান্তকে রক্ষণাত্মক বলে সমালোচনা করা হলেও টুখেল বলেন, উদ্দেশ্য ছিল ঠিক উল্টো।
তিনি বলেন, আমরা পাঁচ ডিফেন্ডার নিয়ে আরও নিষ্ক্রিয় হতে চাইনি। বরং উইঙ্গারদের দ্রুত চাপে ফেলা এবং রক্ষণে ফাঁক কমানোই ছিল লক্ষ্য। আমরা খেলোয়াড়দের আরও সক্রিয় হতে উৎসাহিত করেছি, কিন্তু আমরা সেটা কার্যকরভাবে করতে পারিনি।
ক্লান্তিও ছিল বড় কারণ
বিশ্বকাপে অন্য যেকোনো দলের তুলনায় সবচেয়ে বেশি ভ্রমণ করেছে ইংল্যান্ড। পাঁচ সপ্তাহে দলটি প্রায় ১৪ হাজার ৩৬৫ মাইল ভ্রমণ করেছে।
এছাড়া প্রচণ্ড গরম, উচ্চতায় খেলা এবং একটি ম্যাচে একজন কম নিয়ে খেলতে হওয়ার মতো বিষয়গুলোও খেলোয়াড়দের ওপর প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করেন টুখেল।
তিনি বলেন, পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে আমরা শারীরিকভাবে কিছুটা ভুগেছি। গরমে খেলা, উচ্চতায় খেলা, একজন কম নিয়ে ম্যাচ শেষ করা- সব মিলিয়ে শেষ পর্যন্ত এর মূল্য দিতে হয়েছে।
ইউরো জয়ের স্বপ্ন এখনো অটুট
সমালোচনা সত্ত্বেও ইংল্যান্ডের এই দলকে নিয়ে আশাবাদী টুখেল। তার বিশ্বাস, নিজের অধীনে দলটি এখনো বড় কোনো শিরোপা জিততে সক্ষম।
তিনি বলেন, শতভাগ। এখনো উন্নতির অনেক জায়গা রয়েছে এবং আমি সেই কাজ করতে খুবই আগ্রহী।
তিনি আরও বলেন, আমার বিশ্বাস, আমরা বলের ওপর আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারব এবং দেখাতে পারব আমরা কতটা ভালো ফুটবলার।
শেষে টুখেল বলেন, আমি অনুশীলনে এবং বিশ্বকাপেও সেই সামর্থ্যের ঝলক দেখেছি। আমার বিশ্বাস, আমাদের ভেতরে আরও একটি উচ্চতর পর্যায়ে ওঠার ক্ষমতা রয়েছে। সেই স্তরে পৌঁছাতে পারলেই আমরা বড় শিরোপা জিততে পারব।
