দেশ রূপান্তর
‘হাসিনাকে প্রত্যর্পণে সাড়া নেই থমকে গেছে কূটনৈতিক চেষ্টা’-এটি দৈনিক দেশ রূপান্তরের প্রথম পাতার খবর। প্রতিবেদনে বলা হয়, জুলাই হত্যা মামলায় ফাঁসির দণ্ড পাওয়া ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘ডিসেম্বরে দেশে ফেরা’র ঘোষণা নিয়ে চলছে নানামুখী বিশ্লেষণ। বিএনপিসহ মাঠে সক্রিয় দলগুলোর পক্ষ থেকে আসছে বিভিন্ন বক্তব্য। শেখ হাসিনার বক্তব্য স্রেফ রাজনৈতিক কৌশল কি না তা নিয়েও বিতর্ক আছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্র্যাইবুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম মনে করেন, ভারতে নির্বাসনে থাকার কারণে শেখ হাসিনার পক্ষে স্বেচ্ছায় দেশে ফেরার কোনো সুযোগ নেই। তার ফেরার বিষয়টি নির্ভর করছে বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় ভারত সরকারের সাড়া দেওয়ার ওপর। সেক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়ায় শেখ হাসিনাকে ফেরত দেবে দিল্লি। দেশে পাঠানোর পর সরাসরি তাকে কারাগারে যেতে হবে। সরকারের শীর্ষপর্যায়ের একাধিক মন্ত্রীর প্রকাশ্য বক্তব্যেও একই কথা বলা হচ্ছে। তবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কয়েকটি সূত্র নিশ্চিত করেছে, প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় ভারত শেখ হাসিনাকে ফেরত দেবে এমন আশা সরকার অনেক আগেই ছেড়ে দিয়েছে। এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ দিকেও বিষয়টি নিয়ে হাল ছেড়ে দেয় ঢাকা। এখন বিষয়টি পুরোপুরি নির্ভর করছে দুই দেশের রাজনৈতিক সমঝোতা এবং শেখ হাসিনার সিদ্ধান্তের ওপর। কূটনৈতিক পথে এর কোনো সুরাহা হওয়া সম্ভব নয় বলে মনে করছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের দিনেই একটি সামরিক পরিবহন বিমানে বাংলাদেশ ছেড়ে ভারতে চলে যান শেখ হাসিনা। এরপর অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তাকে দেশে ফেরত আনতে দিল্লিকে কয়েক দফা চিঠি দেয় ঢাকা। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পরও বিষয়টি নিয়ে দুই দেশের কূটনৈতিক চ্যানেলে যোগাযোগ হয়েছে। তবে বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠাতে দিল্লির কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর গত বছরের ডিসেম্বর এনডিটিভিকে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে থাকার বিষয়টি সম্পূর্ণ তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। জয়শঙ্করকে প্রশ্ন করা হয়, শেখ হাসিনা কি যত দিন ইচ্ছা তত দিন ভারতে থাকতে পারবেন? জবাবে তিনি বলেন, ‘তিনি নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে এখানে এসেছেন। আমার মনে হয়, সেই পরিস্থিতিই ভবিষ্যতে তার জন্য কী হবে সেটা নির্ধারণে ভূমিকা রাখবে। তবে শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্তটা তাকেই নিতে হবে।’
‘দেশে ফেরা’ নিয়ে রয়টার্সকে দেওয়া শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক বক্তব্য নিয়ে জল্পনা-কল্পনার মধ্যে সর্বশেষ গত মঙ্গলবার ভারত সরকারের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া গেছে। সেখানে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল জানান, এই বিষয়টিতে তাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে কোনো পরিবর্তন আসেনি। যেকোনো প্রত্যর্পণ একটি আইনি বিষয়, সে অনুযায়ী এর নিষ্পত্তি করা হবে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, রণধীর জয়সোয়ালের বক্তব্য থেকে বোঝা যাচ্ছে, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের ইস্যুতে ভারতের মনোভাব আগের মতোই আছে। দুই দেশের মধ্যে পলাতক আসামিদের দ্রুত এবং সহজে বিনিময়ের জন্য বাংলাদেশ ও ভারত ২০১৩ সালে একটি প্রত্যর্পণ চুক্তি সই করে। ২০১৬ সালে এটি সংশোধন করা হয়। চুক্তিটি দুই দেশের মধ্যে বন্দি বিনিময় প্রক্রিয়া সহজ করলেও এর কিছু ধারা শেখ হাসিনাকে ফেরানোর পথে জটিলতা তৈরি করেছে।
দুই দেশের চুক্তি অনুযায়ী বন্দি প্রত্যর্পণের ক্ষেত্রে দ্বৈত অপরাধের নীতি প্রযোজ্য হতে হবে, অর্থাৎ অপরাধটি উভয় দেশে শাস্তিযোগ্য হতে হবে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা হলো, যাকে হস্তান্তরের জন্য অনুরোধ জানানো হচ্ছে তার বিরুদ্ধে অভিযোগটি ‘রাজনৈতিক প্রকৃতি’র হয়ে থাকলে যেকোনো দেশ সেই অনুরোধ খারিজ করতে পারবে। শেখ হাসিনা ইস্যুতে এই ধারাগুলোকেই সামনে রেখে কূটনৈতিক ভাষায় ‘আইন অনুযায়ী’ চলার কথা বলছে ভারত। ফলে দিল্লি শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় ফেরত দেবে এমন আশা অনেক আগেই হারিয়ে ফেলেছে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র দেশ রূপান্তরকে জানায়, দিল্লিতে আশ্রয় নেওয়া শেখ হাসিনাকে ফেরত চেয়ে অন্তর্বর্তী সরকার ও বিএনপি সরকার একাধিকবার ভারতে চিঠি চালাচালি করেছে। অনানুষ্ঠানিক আলোচনাতেও বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। তবে কখনোই ভারত সরকারের সাড়া মেলেনি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘খুব পরিষ্কার ভাষায় বললে শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার ব্যাপারে দিল্লি অসহযোগিতা করেছে। তাই বিষয়টি বাংলাদেশ সরকারের হাতে নেই বললেই চলে। ভারত সরকার আগ্রহী হলে এবং শেখ হাসিনা নিজে ফিরে আসতে চাইলেই কেবল বিষয়টি ঘটা সম্ভব। এর বাইরে কোনো সুযোগ নেই। আবার শেখ হাসিনা ফাঁসির দ-প্রাপ্ত আসামি হওয়ায় দুই দেশের রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়া তিনি স্বেচ্ছায় দেশে ফিরতে চাইবেন কি না সেটিও বড় প্রশ্ন।’
এ প্রসঙ্গে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশের একজন নাগরিক তার দেশে ফিরবেন এটি খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। এক্ষেত্রে সরকারের বাধা দেওয়ার সুযোগ নেই। সরকার অপেক্ষা করছে।’
সম্প্রতি রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা দাবি করেছেন, তিনি ডিসেম্বরে স্বেচ্ছায় দেশে ফিরবেন। তবে গত বছরের জানুয়ারিতে তার পাসপোর্ট বাতিল করে অন্তর্বর্তী সরকার। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানায়, এ অবস্থায় দেশে ফিরতে চাইলে দিল্লির বাংলাদেশ হাইকমিশনে তাকে ট্রাভেল পাসের আবেদন করতে হবে। সেই পাস দেওয়া হবে কি না সেটি নির্ভর করে সরকারের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর। এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হলে সরকার কী করবে সে বিষয়ে পরিষ্কার জবাব দেননি পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শেখ হাসিনাকে ফেরাতে সরকারের পক্ষ থেকে কূটনীতিক প্রচেষ্টায় কোনো ঘাটতি নেই, সেটা আগেই জানিয়েছি।’
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সাবেক কূটনীতিক মুন্সি ফয়েজ আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরা নিয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল যে অবস্থান জানিয়েছেন সেটি আসলে শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের প্রক্রিয়া ঝুঁলিয়ে রাখা। দেশটির পক্ষ থেকে পরিষ্কার করা হয়েছে, তারা শেখ হাসিনাকে ফেরত দেবে না। শেখ হাসিনার দেশে ফিরে আসা বা ফিরিয়ে নিয়ে আসার বিষয়টি সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছার ওপরও নির্ভর করে। কারণ তিনি দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি। ফলে এই ইস্যুতে অনেকগুলো প্রশ্ন আছে। আছে রাজনৈতিক ব্যাপারও। এখনই কিছু বলা যাবে না, ভবিষ্যতের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।’
একই প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শেখ হাসিনা বাংলাদেশের নাগরিক। বাংলাদেশে ফিরতে চান। এখানে আইন বাধা কেন হবে? তবে এক্ষেত্রে কূটনীতিক ও রাজনৈতিক কিন্তু থাকতে পারে।’
প্রথম আলো
‘দীর্ঘ অসুস্থতায় অনেকে, বিদেশে চিকিৎসায় এখনো ৩৯ জন’-এটি দৈনিক প্রথম আলোর প্রথম পাতার খবর। প্রতিবেদনে বলা হয়, কেমন আছেন? মুঠোফোনে মো. রকিব উদ্দিন বলেন, ‘ভালো আছি। তবে শরীরটা পুরোপুরি ভালো না।’ শরীর কি খুবই খারাপ? তিনি বলেন, ‘মাংসপেশিতে মোচড় দেয়। বাঁ পা ছোট হয়ে গেছে। রাতে ঠিকমতো ঘুম হয় না। পঙ্গু হাসপাতালে কয়েক দিন আগে মেডিক্যাল বোর্ড বসেছিল। ডাক্তারেরা বলেছেন, আমি পুরোপুরি ভালো হব না। বিদেশে গিয়েও খুব লাভ হবে না।’
সর্বশেষ সরকারি হিসাবে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় পুলিশের গুলি ও সহিংসতায় শহীদ হন ৮৪৩ জন, আহত হন ১৪ হাজার ৩৭০ জন। আহত ব্যক্তিদের মধ্যে একজন উত্তরার বাসিন্দা মো. রকিব উদ্দিন। তিনি এখন ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী।
জুলাইয়ের উত্তাল দিনগুলোয় ছাত্র–জনতার সঙ্গে রাজপথে ছিলেন মো. রকিব উদ্দিন। ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই বিকেলে উত্তরার আজমপুরে রবীন্দ্র সরণিতে আন্দোলনরত ছাত্র–জনতার ওপর পুলিশ গুলি চালায়। অনেকের সঙ্গে আহত হন উত্তরা হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী মো. রকিব উদ্দিন। গুলি লেগেছিল সামনের দিক থেকে—কোমরে। তখন তাঁর উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা চলছিল।
মো. রকিব উদ্দিন বলেন, ‘প্রথমে আমাকে উত্তরার ক্রিসেন্ট হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখান থেকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। তারপর জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে। সেখান থেকে রাত দুইটার দিকে আমাকে পঙ্গু হাসপাতালে নেওয়া হয়।’ এরপর দীর্ঘদিন তিনি ওই হাসপাতালে ছিলেন। এ পর্যন্ত তাঁর পায়ে ও কোমরে তিনটি বড় অস্ত্রোপচার হয়েছে। কোমরের অস্থিসন্ধি প্রতিস্থাপনের বিষয়টিও চিকিৎসকদের চিন্তার মধ্যে আছে।
জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানের (পঙ্গু হাসপাতাল) পরিচালক অধ্যাপক আবুল কেনান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আহত ব্যক্তিদের অনেকেই ফলোআপের জন্য নিয়মিত আসেন। তাঁরা অগ্রাধিকার পান। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শের ভিত্তিতে চিকিৎসা দেওয়া হয়।’
মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের অধীন জুলাই গণ–অভ্যুত্থান অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আঘাতের তীব্রতা ও শারীরিক ক্ষতির গুরুত্বের বিবেচনায় গণ–অভ্যুত্থানে আহত ব্যক্তিদের তিন শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। তবে আহত প্রত্যেক ব্যক্তিকে একটি করে ‘হেলথ কার্ড’ দেওয়া হয়েছে। এই কার্ড ব্যবহারে করে তিনি দেশের যেকোনো সরকারি হাসপাতাল থেকে ও সরকার নির্ধারিত বেসরকারি হাসপাতাল থেকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিতে পারবেন।
আহতরা ৩ শ্রেণির
জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় আহত ব্যক্তিদের তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করেছে সরকার। সবচেয়ে মারাত্মকভাবে বা অতি গুরুতর আহত ব্যক্তিরা ‘ক’ শ্রেণিভুক্ত। তাঁদের আঘাত সারা জীবনের জন্য প্রতিবন্ধিতা ডেকে এনেছে। যেমন চোখ নষ্ট হওয়া, হাত-পা কাটা পড়া বা শরীরের কোনো বড় অঙ্গের স্থায়ী অকার্যকারিতা।
‘ক’ শ্রেণিভুক্ত আহত ব্যক্তিরা প্রতি মাসে ২০ হাজার টাকা করে ভাতা পান। এ ছাড়া তাঁদের এককালীন ৫ লাখ টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। তাঁদের সংখ্যা ৯৯০।
এরপর আছেন ‘খ’ শ্রেণিভুক্ত আহত ব্যক্তিরা। তাঁরা গুরুতর আহত হয়েছেন, কিন্তু ‘ক’ শ্রেণির মতো স্থায়ী বা সম্পূর্ণ প্রতিবন্ধিতার শিকার হননি। তাঁদের চিকিৎসা দীর্ঘমেয়াদি এবং সেরে উঠতে অনেক সময় লাগছে। উত্তরার মো. রকিব উদ্দিন জানান, তিনি ‘খ’ শ্রেণিভুক্ত আহত। তাঁরা প্রতি মাসে ১৫ হাজার টাকা করে ভাতা পান। এ ছাড়া তাঁদের এককালীন ৩ লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়। তাঁদের সংখ্যা ১ হাজার ৪১৭।
আর আছেন ‘গ’ শ্রেণিভুক্ত আহত ব্যক্তিরা। তাঁরা সাধারণ বা মাঝারি ধরনের আহত হয়েছেন। তাঁদের আঘাতের ধরন তুলনামূলক কম মারাত্মক। তাঁরা প্রতি মাসে ১০ হাজার টাকা করে ভাতা পান। এ ছাড়া তাঁদের এককালীন ১ লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। তাঁরা সংখ্যায় ১১ হাজার ৯৬৩।
বিদেশে চিকিৎসা
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর জুলাই যোদ্ধাদের চিকিৎসার বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পায়। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, চীন থেকে বিভিন্ন ধরনের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের ছোট–বড় দল বাংলাদেশে আসে। তারা পঙ্গু হাসপাতাল, জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি থাকা আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসায় পরামর্শ দেন, কখনো কখনো চিকিৎসায় অংশ নেন। তবে উন্নত চিকিৎসার জন্য অনেকেরই বিদেশ যাওয়া অনিবার্য হয়ে পড়ে।
জুলাই গণ–অভ্যুত্থান অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্যে দেখা যাচ্ছে, এ পর্যন্ত গুরুতর আহত ১৫৪ জনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, রাশিয়া ও তুরস্কে পাঠানো হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ১০৫ জন দেশে ফেরত এসেছেন। এখনো ৩৯ জন বিদেশে আছেন। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তাঁরা সবাই থ্যাইল্যেন্ডে আছেন। তাঁরা প্রায় সবাই গুলিতে আহত হয়েছিলেন। তাঁরা অর্থোপেডিক চিকিৎসা নিচ্ছেন। ১৫ মার্চ পর্যন্ত সরকার তাঁদের জন্য খরচ করেছে ৩৪৮ কোটি ৯৩ লাখ ৯৯ হাজার ২০৭ টাকা।
যুগান্তর
দৈনিক যুগান্তরের প্রধান শিরোনাম ‘ফুটবল-রাজ্যে মেসিই রাজা’। প্রতিবেদনে বলা হয়, ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী যদি গদ্যময় হয়, তাহলে ফুটবলের রাজ্যে পৃথিবী এখন মেসিময়। ৩৯-এর এক তরুণ সবুজ গালিচায় হাঁটছেন। বুদ্ধিদীপ্ত ফুটবলীয় ঐশ্বর্যের গল্প লিখছেন। এই বিশ্বকাপ তাকে যত দেখছে, ততই অবাক হচ্ছে। সবাই বলছে, এ কোন লিও। রোজারিওর সেই ছেলে, অংকুরে যার স্বপ্নে বাদ সেধেছিল হরমোনজনিত রোগ! সেই ছেলেটি ৪০ ছুঁইছুঁই বয়সে পৌঁছে নিজের ষষ্ঠ বিশ্বকাপের ছাদের নিচে এসে দাঁড়ালেন।
তবে তিনি আর আগের সেই মেসি নন! তার ফুটবল-যৌবন হয়তো নেই। কিন্তু যে মেসিকে দেখছে এই বিশ্বকাপ, তিনি এক অত্যাশ্চর্য জাদুকর। বয়স হয়তো তাকে বলছে-‘বাবুজি ধীরে চল্ না...’, কিন্তু তার যে ঈর্ষণীয় ফুটবল প্রতিভা, সেটি তাকে এক অমূল্য উপহার দিয়েছে। সেটি হলো ফুটবলীয় বুদ্ধিমত্তা।
যার সর্বশেষ সংস্করণ প্রতিভাত হয়েছে এই বিশ্বকাপের দ্বিতীয় সেমিফাইনালে। আটলান্টায় ১-০ গোলের লিডে ইংল্যান্ড যখন গাইছে-‘ইটস কামিং হোম’, এই ম্যাচের চিত্রনাট্যকার তখন মুচকি হাসছেন। ইংল্যান্ড হয়তো ভুলেই গিয়েছিল, মাঠে ‘রাজা’ আছেন। হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা তিনি। হ্যারি কেইনরা যখন আর্জেন্টিনার ‘আলো’ নিভে যাওয়ার অপেক্ষায়, ঠিক তখনই মেসি মাঠের রাজা হয়ে উঠলেন।
ফুটবলে একজন কোচ থাকেন ডাগআউটে। আরেকজন মাঠে। মেসি তখন মাঠে আর্জেন্টিনার কোচ। বাঁশিটা হাতে নিলেন। ৮৫ ও ৯২ মিনিটে তার দুটি জাদুকরী অ্যাসিস্টে এনজো ফার্নান্দেজ এবং লাওতারো মার্তিনেজের গোল। মেসি যেন গোল নয়, রসগোল্লা বানিয়ে দিয়েছিলেন। তার দুই সতীর্থ টপ করে গিলে ফেললেন। ইংল্যান্ড হতবাক। লন্ডন স্তব্ধ। বুয়েনস এইরেসে যৌবন গর্জন। টেমস নদীর ঢেউয়েরও আফসোস-‘ইটস নট কামিং হোম’। সেই ১৯৬৬ থেকে অপেক্ষায় ইংল্যান্ড। খরা ঘুচবে। সাহেবদের খরাজর্জর দুঃসময় আরও দীর্ঘায়িত করলেন ম্যাজিশিয়ান মেসি।
এজন্যই তিনি ফুটবলের রাজা। আর্জেন্টিনার হৃৎপিণ্ড। ৯০ মিনিটের ম্যাচে ৯৪ টাচ। আর্জেন্টিনার আক্রমণ যদি হয় গান, তাহলে মেসি সেই গানের স্বরলিপি। সেমিফাইনালের আলো ঝলমলে মঞ্চে সবাই পার্শ্বচরিত্র। মেসি সেখানে ‘লার্জার দ্যান লাইফ’। জীবনের চেয়েও বড় চরিত্র। ফাইনালে ওঠার লড়াইকে যদি একটি বিশাল ক্যানভাসের সঙ্গে তুলনা করা হয়, তাহলে মেসির দুটি অ্যাসিস্ট তাতে তুলির শেষ আঁচড়। এই দুটি অ্যাসিস্ট আর্জেন্টাইন মহানক্ষত্রকে তার পূর্বসূরি দিয়েগো ম্যারাডোনার চার ধাপ উপরে বসিয়ে দিয়েছে। বিশ্বকাপের ইতিহাসে সব মিলিয়ে মেসি এখন ১২টি অ্যাসিস্টের মালিক। ম্যারাডোনা গোলে সহায়তা করেছেন আটবার। এও এক জাদু যে, এই বিশ্বকাপে মেসি দৌড়াচ্ছেন কম, সুযোগ তৈরি করছেন বেশি। সেমিফাইনাল পর্যন্ত সাত ম্যাচে জাদুকর ৩৩টি শট নিয়েছেন। সুযোগ তৈরি করে দিয়েছেন ২১টি। ১৯৮৬ বিশ্বকাপে ম্যারাডোনার অবদান ছিল এরচেয়ে কম। আরেকটি আশ্চর্যের বিষয়, মেসি মাঠে যেন হাঁটছেন। কিন্তু বল তার পায়ে গেলে বিদ্যুতায়িত হয়ে যান তিনি। গোটা পৃথিবী তখন বদলে যায়। চাঁদ ফিসফিস করে জ্যোৎস্নাকে বলে, নাচ তো একটু। মেসি এখন ম্যাজিক দেখাবে।
তার শৈশবের আইডল পাবলো আইমার সেই কবে বলেছিলেন, ‘দ্য লাস্ট মেসি ইজ অলওয়েজ দ্য বেস্ট মেসি।’ আইমারের সেই অমৃত বাণী আজও প্রাসঙ্গিক। এই বিশ্বকাপকে যাদের ‘শেষ নৃত্যে’র মঞ্চ বলা হয়েছে, সেসব ফুটবলশিল্পীর অন্যতম মেসি। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপ মেসির বর্ণিল ক্যারিয়ারকে পূর্ণতা দিয়েছে, তার হাতে সোনালি ট্রফি তুলে দিয়ে। ২০২৬ যদি আবারও তার মাথায় মুকুট পরিয়ে দেয়, দুজন অন্তত অদৃশ্য কোনো গ্রহ থেকে দেখে বিহ্বল হবেন। একজন অবশ্যই দিয়েগো ম্যারাডোনা। যাকে জয় উৎসর্গ করেছেন মেসি।
আরেকজন তার দাদি-যিনি শৈশবে নাতির পায়ে বল তুলে দিয়ে সমুদ্র দেখিয়ে বলেছিলেন, ‘ওই দ্যাখো, ঢেউয়ের দাপট। ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়ো।’
মেসির পায়ে বল আজও ঢেউয়ে রূপ নেয়। নিউইয়র্ক-নিউজার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে রবিবাসরীয় ফাইনালে সেই ঢেউয়ের দাপটে স্পেন যদি ভেসে যায়, একটুও অবাক হবেন না। কারণ মেসি যে সত্যিই ‘কিং’।
কালের কণ্ঠ
‘আট অর্থবছরে এলএনজিতেই ব্যয় ২৩ বিলিয়ন ডলার’-এটি দৈনিক কালের কণ্ঠের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে কয়েক বছর ধরেই টানাটানি। ডলার সংকটে অর্থনীতির প্রায় সব খাতে ধাক্কা লাগে।
এখন পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে সত্য, তবে এর দর যেভাবে লাগামহীন বেড়ে ১২৫ টাকায় গিয়ে ঠেকেছে, তাতে ভুগছে পুরো অর্থনীতি। অথচ ডলারের এই সংকটের সময়েও রাষ্ট্রের বিপুল অঙ্কের ডলার চলে যাচ্ছে শুধু তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির পেছনে। তথ্য বলছে, গত আট অর্থবছরে এক এলএনজির পেছনেই খরচ হয়েছে ২২.৬৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। টাকার অঙ্কে যা প্রায় দুই লাখ ৭৭ হাজার ৪৫২ কোটি টাকা, যা অর্থনীতির অনেকটা ‘রাক্ষস’ হিসেবেই আবির্ভূত হয়েছে! অনেকে বলছেন, এটি এখন অর্থনীতির সক্ষমতা কুরে কুরে খাচ্ছে! শুধু তা-ই নয়, একই সময়ে সরকারকে এ খাতে ভর্তুকিও দিতে হয়েছে ৫১ হাজার ৩৬৬ কোটি টাকা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এত বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ের ফলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহ অব্যাহত রাখতে সরকারকে বড় অঙ্কের ভর্তুকিও বহন করতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম বেড়ে গেলে এই চাপ আরো তীব্র হয়ে ওঠে। মার্কিন-ইরান যুদ্ধে দরবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রয়েছে।
পেট্রোবাংলার গ্যাস সরবরাহের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, গত ছয় বছরেই দেশীয় গ্যাসের দৈনিক সরবরাহ সাড়ে ২৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট থেকে প্রায় ১৬০০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমেছে। অন্যদিকে, এই সময়ে বিদ্যুৎ ও শিল্প খাতে গ্যাসের ব্যবহার ব্যাপকহারে বেড়েছে। ফলে এই ঘাটতি পূরণে নিয়মিতভাবে স্পট মার্কেট ও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে এলএনজি আমদানি করা হচ্ছে। তবে এলএনজি দেশীয় গ্যাসের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি ব্যয়বহুল হওয়ায় গ্যাস সরবরাহের সামগ্রিক ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
বর্তমানে দেশে গ্যাসের মোট চাহিদা প্রায় চার হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট। গত বুধবার জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয় দুই হাজার ৬৮৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। এর মধ্যে এক হাজার ৩৭ মিলিয়ন ঘনফুট আসছে এলএনজি থেকে। অর্থাৎ মোট সরবরাহের ৩৯ শতাংশ এখন আমদানীকৃত গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। অথচ বিপুল ব্যয়ে এলএনজি আমদানি এবং হাজার হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়ার পরও দেশে প্রতিদিন প্রায় দেড় হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। ফলে শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও আবাসিক খাত, সবখানেই জ্বালানি সংকট দীর্ঘমেয়াদি রূপ নিচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো না গেলে আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে এলএনজির ওপর নির্ভরতা বেড়ে দাঁড়াবে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশে। তখন এলএনজির এই ব্যয় সামাল দেওয়া বাংলাদেশের পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে।
অর্থনীতিবিদ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এলএনজি স্বল্প ও মধ্যমেয়াদে প্রয়োজনীয় হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি স্থায়ী সমাধান নয়। যদি দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানো না যায়, তাহলে ভবিষ্যতে এলএনজি আমদানির ব্যয় আরো বাড়বে। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ, বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, শিল্প খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হ্রাস এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
এ বিষয়ে পেট্রোবাংলার পরিচালক (অর্থ) এ কে এম মিজানুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যেহেতু দেশীয় গ্যাস উৎপাদন নেট হিসাবে কমে যাচ্ছে, তাই সেই ঘাটতি পূরণে এলএনজি আমদানি বাড়াতে হচ্ছে। গত বছর আমরা ১০৩টি এলএনজি কার্গো আমদানি করেছি, আর চলতি বছর ১১৫টি কার্গো আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে। ভবিষ্যতে আরেকটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) স্থাপন করা গেলে আমদানির সক্ষমতা আরো বাড়ানো সম্ভব হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এফএসআরইউ চালু হওয়ার পর যাতে পাইপলাইনের সীমাবদ্ধতার কারণে কোনো সমস্যা না হয়, সে জন্য ফেনী থেকে বাখরাবাদ পর্যন্ত প্রায় ৯০ কিলোমিটার গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণের একটি প্রকল্প অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নেওয়া হচ্ছে। গ্যাস উন্নয়ন তহবিলের অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে এবং বর্তমানে এর সম্ভাব্যতা সমীক্ষা (ফিজিবিলিটি স্টাডি) চলছে।’
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশে ২০১৮ সালে প্রথমবারের মতো বাণিজ্যিকভাবে এলএনজি আমদানি শুরু হয়। তখন এটি ছিল দেশীয় গ্যাসের ঘাটতি পূরণের একটি পরিপূরক ব্যবস্থা। কিন্তু মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে সেটিই এখন জাতীয় জ্বালানি ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান ভরসায় পরিণত হয়েছে। উৎপাদন কমতে থাকায় প্রতিবছর বাড়ছে এলএনজি আমদানির পরিমাণ, সেই সঙ্গে বাড়ছে সরকারের ভর্তুকির বোঝাও।
সমকাল
দৈনিক সমকালের প্রধান শিরোনাম ‘আশ্রয়কেন্দ্রে অনিয়মের ঠাঁই’। খবরে বলা হয়, চট্টগ্রাম, খুলনা ও বরিশাল বিভাগের ১৬ জেলার ৮৬টি উপজেলায় নির্মিত ২২০ আশ্রয়কেন্দ্রের সবকটির অবস্থা নাজুক। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় মানুষকে সহায়তা দিতে একটি প্রকল্পের আওতায় এসব আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছিল। এখন আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর কোনোটিই ব্যবহারের জন্য শতভাগ উপযোগী নয়। অনেক আশ্রয়কেন্দ্রে পানির ব্যবস্থা নেই। পরিবেশও অস্বাস্থ্যকর। কোনো আশ্রয়কেন্দ্রে বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা হয়নি। এ কারণে ৫৫৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এসব স্থাপনা বন্যার মতো দুর্যোগের সময় দুর্গতদের নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারেনি।
'উপকূলীয় ও ঘূর্ণিঝড়প্রবণ এলাকায় বহুমুখী আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ (দ্বিতীয় পর্যায়)' প্রকল্পের কাজ শেষে প্রভাব মূল্যায়ন প্রতিবেদনে এসব অনিয়ম পেয়েছে পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ আইএমইডি। প্রকল্পের নির্মাণকাজ শেষ হয় ২০২২ সালের জুন মাসে। গত এপ্রিলে সরেজমিন পরিদর্শন, প্রকল্পের দলিলাদি, উপকারভোগীদের সঙ্গে আলোচনা, প্রকল্পের সমাপ্তি প্রতিবেদন, অনুমোদিত নকশা পর্যালোচনা করে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়। তৃতীয় পক্ষ হিসেবে বিআইএসআর কনসালট্যান্টস লিমিটেড আইএমইডির পক্ষে এ কাজ করেছে।
প্রতিবেদনে বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জের তিনটি আশ্রয়কেন্দ্রের উদাহরণ দেওয়া হয়। এগুলো হলো সেলিমাবাদ ডিগ্রি কলেজ-কাম বহুমুখী ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র, তোরাব আলী মেমোরিয়াল মাধ্যমিক বিদ্যালয় ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র ও সোনাখালী আজিজিয়া সিনিয়র মাদ্রাসা ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র এসব কেন্দ্রের কোনোটিতেই প্রকল্পের প্রধান চার কার্যক্রমের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। কেন্দ্রগুলোতে গভীর নলকূপ স্থাপন করা হয়নি। গবাদি পশুর আশ্রয়কেন্দ্র নেই। অ্যাপ্রোচ রোড নেই। সোলার প্যানেল নষ্ট হয়ে আছে।
আইএমইডির প্রতিবেদনের তথ্য যাচাই করতে সমকালের পক্ষ থেকে কয়েকটি আশ্রয়কেন্দ্রে খোঁজ নেওয়া হয়েছে। গত বুধবার সরেজমিন গিয়ে সোনাখালী আজিজিয়া সিনিয়র মাদ্রাসা ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রটিকে পরিত্যক্ত অবস্থায় পাওয়া গেছে। কেন্দ্রটির দরজা-জানালা খুলে গেছে। কেন্দ্রটির নির্মাণের কার্যাদেশ পাওয়া মূল ঠিকাদার কাজ না করে শুকুর আলী নামে স্থানীয় একজন ঠিকাদারের কাছে তা বিক্রি করে দেন।
গত কয়েক দিনে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলার আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নেন দুর্গত অনেকে। গত সোমবার সেখানে আশ্রিতদের দুর্ভোগ দেখা গেছে। বন্যার পানি সরে যাওয়ার আগেই অনেকে আশ্রয়কেন্দ্র ছেড়েছেন। অনেকে জানিয়েছেন, বিদ্যুৎহীন রাত তাদের কাছে ভয়ানক ছিল। মোবাইল ফোনের আলোতে প্রয়োজনীয় কাজ সারতে হয়েছে। স্থানীয় একটি ক্লাবের পক্ষ থেকে খাবারের ব্যবস্থা করায় কিছুটা উপকার হয়েছে তাদের।
কক্সবাজারের পেকুয়ার উজানটিয়া বহুমুখী কমিউনিটি আশ্রয়কেন্দ্রের অবস্থা আরও নাজুক। ছাদের পলেস্তারা খসে পড়েছে। পিলারেও ফাটল। ঝুঁকি জেনেও বানভাসি মানুষ সেখানে আশ্রয় নেন। এবারের বন্যায় ২০০ পরিবার সেখানে আশ্রয় নেয়। স্থানীয়রা জানান, দুর্গত মানুষের পরিবর্তে আশ্রয়কেন্দ্রটি মাদকসেবী ও কিশোর গ্যাংয়ের আস্তানা হিসেবেই বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে।
প্রকল্পটি নেওয়ার উদ্দেশ্য ছিল দরিদ্র, অসহায়, সম্বলহীন জনগোষ্ঠীকে দুর্যোগকালীন আশ্রয় দেওয়া। দুর্যোগে গবাদি পশু ও গৃহস্থালি সামগ্রীর সুরক্ষা দেওয়া। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে নেওয়া প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর। ২০১৬ সালের জুলাইয়ে প্রকল্পের নির্মাণকাজ শুরু হয়। শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০১৯ সালের জুনে।
ইত্তেফাক
‘বাংলাদেশ এখনো রাজস্ব, আর্থিক খাত ও মূল্যস্ফীতিজনিত বড় চ্যালেঞ্জের মুখে’-এটি দৈনিক ইত্তেফাকের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, বাংলাদেশ এখনো রাজস্ব, আর্থিক খাত ও মূল্যস্ফীতিজনিত বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি বলে উল্লেখ করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সংস্থাটি জানিয়েছে বাংলাদেশকে নতুন ঋণ দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা আগামী মাসগুলোতে চলতে থাকবে। এই আলোচনা হবে ঋণের সম্ভাব্য আকার, পরিধি এবং এর সঙ্গে সম্পর্কিত সংস্কার অঙ্গীকার নিয়ে। পাঁচ দিনের ঢাকা সফর শেষে আইএমএফ মিশন এক বিবৃতিতে গতকাল বৃহস্পতিবার এ তথ্য জানিয়েছে। সফর শেষে আইএমএফ এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, মিশন মনে করছে, বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি কমে সাড়ে ৩ শতাংশে নামতে পারে । রাজস্ব ও ব্যাংকিং খাতের চাপ অব্যাহত থাকলে মধ্য মেয়াদে তা ৩ শতাংশেরও নিচে নেমে যেতে পারে। রাজস্ব আহরণ জোরদার এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা দূর করতে সংস্কার এগিয়ে নেওয়া গেলে মধ্যম মেয়াদে অর্থনীতির সম্ভাবনা উন্নত হবে। প্রসঙ্গত, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকার সাড়ে ৬ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।
বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধে নতুন অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করতে আইএমএফের একটি প্রতিনিধিদল গত ১২ জুলাই ঢাকায় আসে। গতকাল বৃহস্পতিবার তারা অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে সমাপনী বৈঠক করেন। সফরে সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক ও আর্থিক পরিস্থিতি পর্যালোচনার পাশাপাশি সরকারের সংস্কার অগ্রাধিকার নিয়ে আলোচনা হয়। এর আগে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নেওয়া ঋণ পাঁচ কিস্তি নেওয়ার পর দুই পক্ষের সম্মতিতে স্থগিত করা হয়।
এদিকে গতকাল আইএমএফ প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকের পর সাংবাদিকদের অর্থমন্ত্রী বলেন, অর্থনৈতিক সংস্কার একবারে নয় বরং পরিস্থিতি, অগ্রাধিকার এবং নির্বাচিত সরকারের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে। বৈঠকের বিষয়ে জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী বলেন, একটি নির্দিষ্ট কর্মসূচির (প্রোগ্রাম) ভিত্তি কী হবে, তা নিয়ে ইতিমধ্যে আলোচনা হয়েছে। আগে যেসব নীতিগত বিষয় তুলে ধরা হয়েছে, সেগুলোর ওপরই এই কর্মসূচির ভিত্তি দাঁড়াবে। অর্থমন্ত্রী বলেন, নির্বাচিত সরকারের প্রতি সম্মান (রেসপেক্ট টু দ্য ইলেক্টেড গভর্নমেন্ট) বজায় রেখেই সংস্কারের কাজ পরিচালিত হবে। একই সঙ্গে প্রয়োজন অনুযায়ী ধাপে ধাপে পরিবর্তন আনা হবে। যখন যেটা প্রয়োজন হবে, তখন সেটাই করা হবে। ইতিমধ্যে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। বাকি পরিবর্তনগুলোও সময় ও প্রয়োজন অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে।
নির্বাচিত সরকারের অগ্রাধিকার ও প্রয়োজনের ভিত্তিতে অর্থনৈতিক সংস্কার কার্যক্রম ধাপে ধাপে এগিয়ে নেওয়া হবে। ঢাকায় আইএমএফের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন সংস্থাটির কর্মকর্তা ইভ ক্রজনার। সরকারের নতুন আইএমএফ-সমর্থিত কর্মসূচির অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে এ সফর অনুষ্ঠিত হয়। সফরের উদ্দেশ্য ছিল সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক ও আর্থিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা এবং সরকারের সংস্কার অগ্রাধিকার নিয়ে আলোচনা।
বিবৃতিতে ইভ ক্রজনার বলেন, বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং তাদের নীতিগত অগ্রাধিকার নিয়ে আমাদের গঠনমূলক আলোচনা হয়েছে। তথ্য-সংগ্রহমূলক সফরের মাধ্যমে সরকারের নীতিগত পরিকল্পনা, অর্থনৈতিক সংস্কারের অগ্রাধিকার এবং সক্ষমতা উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে আরো ভালো ধারণা পাওয়া গেছে। নতুন সম্ভাব্য কর্মসূচির পরিধি, ঋণের আকার এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংস্কার অঙ্গীকার নিয়ে আগামী কয়েক মাসে আলোচনা হবে। তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশ এখনো রাজস্ব, আর্থিক খাত ও মূল্যস্ফীতিজনিত বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, যা মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে আরো তীব্র হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যমূল্য বৃদ্ধি এবং সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়িয়েছে এবং ভর্তুকি ব্যয় বাড়িয়েছ। এর ফলে সরকারের সীমিত রাজস্ব সক্ষমতার ওপর আরো চাপ সৃষ্টি হয়েছে। আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যের ওপরও চাপ তৈরি হয়েছে। যদিও প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স শক্তিশালী রয়েছে। ব্যাংকিং খাতের চাপও এখনো উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে।
তার মতে, সামাজিক সুরক্ষা ও উন্নয়ন ব্যয় বাড়ানোর জন্য রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি এবং ভর্তুকি ব্যবস্থার যৌক্তিক সংস্কার প্রয়োজন। একই সঙ্গে রাজস্ব সংস্কারের প্রভাব থেকে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দিতে লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সহায়তা জোরদার করা দরকার। মূল্যস্ফীতি কমানো এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পুনর্গঠনের জন্য কঠোর মুদ্রানীতি ও বিচক্ষণ রাজস্বনীতি অব্যাহত রাখা উচিত।
নয়া দিগন্ত
দৈনিক নয়া দিগন্তের প্রধান শিরোনাম ‘জুলাইকে ধারণ ও ফ্যাসিবাদবিরোধী অভূতপূর্ব রাজনৈতিক ঐক্য’। প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান কেবল একটি শাসন পরিবর্তনের ঘটনা ছিল না; এটি ছিল ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে টেকসই রাজনৈতিক সংস্কার ও গণ-আকাক্সার এক ঐতিহাসিক সন্ধিণ। দীর্ঘদিনের ভোটাধিকার হরণ, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের দলীয়করণ এবং ভিন্নমত দমনের পটভূমিতে জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার যে রক্তয়ী সংগ্রাম গড়ে ওঠে, তা দেশের রাজনীতির গতিপথ পুরোপুরি বদলে দেয়। এই অভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে ভিন্নমতের রাজনৈতিক দল, ছাত্রসমাজ, নাগরিক সমাজ ও পেশাজীবীদের মধ্যে এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে উঠেছে। আবু সাঈদের শাহাদতের দিন ঐক্যের এই চেতনায় গতকাল সারা দেশে পালিত হয়েছে জুলাই শহীদ দিবস।
সংসদীয় বিতর্ক ও রাজনৈতিক ঐক্যের সুর
অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার এই সমঝোতা ও জাতীয় পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতি সবচেয়ে স্পষ্ট রূপ পায় সদ্য সমাপ্ত জাতীয় সংসদের অধিবেশনে। জাতীয় সংসদে জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনা রা এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী অবস্থান নিয়ে প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্যে এক অভিন্ন সুর ধ্বনিত হয়।
সংসদে রাজনৈতিক দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়ে এবং আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতার ত্যাগকে স্বীকৃতি জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন, ‘জুলাইয়ের আন্দোলন কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের জয় বা পরাজয় ছিল না; এটি ছিল ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে দেশের প্রতিটি নাগরিকের অধিকার ও মর্যাদার লড়াই। জুলাই বিপ্লব আমাদের শিা দিয়েছে যে, শাসনের মূল চালিকাশক্তি হতে হবে জনগণের সম্মতি এবং জবাবদিহিতা। সংসদে আমাদের মতপার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু জুলাইয়ের আত্মত্যাগ এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী চেতনাকে সমুন্নত রাখার প্রশ্নে আমরা কোনো আপস করব না।’
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে জোর দিয়ে বলেন, রাষ্ট্রযন্ত্রের গুণগত পরিবর্তন, বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা এবং একটি স্থায়ী গণতান্ত্রিক কাঠামো বিনির্মাণই জুলাইয়ের শহীদদের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা প্রদর্শন।
একই সুর ধ্বনিত হয় জাতীয় সংসদ ভবনে বিরোধীদলীয় আসন থেকেও। সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা বজায় রেখেও ফ্যাসিবাদবিরোধী প্রশ্নে জাতীয় ঐক্যের গুরুত্ব তুলে ধরে বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান সংসদে বলেন, ‘রাজনীতিতে সরকার ও বিরোধী দলের দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু একটি স্বৈরাচারমুক্ত, বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার ইস্যুতে আমরা একবিন্দুতে অবস্থান করছি। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান রাজনৈতিক দলগুলোকে শিখিয়েছে- দলীয় স্বার্থের চেয়ে দেশের মানুষের ভোটাধিকার ও বাকস্বাধীনতা অনেক বড়। এই ঐক্যের শক্তিতে ভর করেই আমাদের নিশ্চিত করতে হবে যে, বাংলাদেশে যেন আর কোনো দিন কোনো ধরনের ফ্যাসিবাদের পুনরুত্থান ঘটতে না পারে।’
সংসদে প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতার এই পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও অভিন্ন অঙ্গীকার প্রমাণ করে যে, জুলাই চেতনা বাংলাদেশের রাজনীতিতে কেবল সঙ্ঘাত নয়, বরং একটি গঠনমূলক জাতীয় ঐক্যের রাজনৈতিক সংস্কৃতি রচনা করেছে।
ঐক্যের মূল ভিত্তি ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিবর্তন
এই ঐক্যের প্রধান ভিত্তি হলো-ফ্যাসিবাদ, কর্তৃত্ববাদ ও দমনমূলক ব্যবস্থার স্থায়ী অবসান ঘটানো। জুলাই-পরবর্তী সময়ে দেশের ডান, বাম, মধ্যপন্থী কিংবা ইসলামপন্থী দলগুলোর মধ্যে নীতিগত ও কৌশলগত পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও কয়েকটি মৌলিক প্রশ্নে একটি সুদৃঢ় জাতীয় ঐকমত্য গড়ে উঠেছে: রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সংস্কার: নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ ও প্রশাসনিক কাঠামোর নিরপেতা নিশ্চিতকরণ; বিচারের মুখোমুখি করা: অতীতে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘন, গুম ও দমনপীড়নের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের আইনানুগ বিচার নিশ্চিত করা; নাগরিক অধিকার রা: মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং বিরোধী রাজনীতির চর্চার স্থান সুনিশ্চিত করা। জাতীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক সংলাপ, গবেষণা, স্মারক আলোচনা ও নাগরিক সমাবেশেও বারবার এটি প্রতিধ্বনিত হচ্ছে যে-জুলাই কেবল একটি সাময়িক আন্দোলনের ইতিহাস নয়, এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সংবিধান ও রাষ্ট্রদর্শনের মূল চালিকাশক্তি।
বণিক বার্তা
পুলিশের ভূমিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে ‘ব্যাটল রাইফেল’-এটি দৈনিক বণিক বার্তার প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, জুলাই আন্দোলনের সময় বাংলাদেশ পুলিশ ৭ পয়েন্ট ৬২ মিলিমিটার রাইফেলের মতো ‘ব্যাটল রাইফেল’ ব্যবহার করে।
যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহার উপযোগী এ ধরনের মারণাস্ত্রের যথেচ্ছ ব্যবহার অনেক শিক্ষার্থী ও নাগরিকের জীবন কেড়ে নেয়। নাগরিকদের এমন জীবনহানিতে পুলিশের ভূমিকা ব্যাপকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়। বিশ্লেষকদের মতে, ২০১৪ সালের পর থেকে রাজনৈতিক আন্দোলন দমনে পুলিশকে ক্রমান্বয়ে যেভাবে সামরিকীকরণ করা হয়েছিল, জুলাই অভ্যুত্থানে তারই চরম বহিঃপ্রকাশ দেখা যায়।
আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যাটল রাইফেল ব্যবহারের প্রাণঘাতী একটি অধ্যায় ছিল রাজধানীর যাত্রাবাড়ী। ২০২৪ সালের ১৯ থেকে ২১ জুলাই—তিনদিনে যাত্রাবাড়ীতে আন্দোলনকারীদের দমাতে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৪৯৫ রাউন্ড গুলি ছোড়া হয় ৭ পয়েন্ট ৬২ এমএম চায়না রাইফেল থেকে। এতে শতাধিক প্রাণহানি ঘটে। যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহার উপযোগী অত্যাধুনিক এ মারণাস্ত্র দিয়ে প্রতি মিনিটে ৩০-৪০ রাউন্ড গুলি চালানো যায়। উল্লেখ্য, ২০২২ সালে পুলিশ বাহিনীর জন্য ১৮ হাজার ৭ পয়েন্ট ৬২ মিমি রাইফেল আমদানি করা হয়। ২০২৪ সালের ২ মে জাতীয় সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেন, ‘পুলিশকে স্মার্ট বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে বিভিন্ন ধরনের যুগোপযোগী আগ্নেয়াস্ত্র দেয়া হচ্ছে। পয়েন্ট ৩০৩ রাইফেলের পরিবর্তে এখন ৭ পয়েন্ট ৬২ মিলিমিটার রাইফেল ব্যবহৃত হচ্ছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পুলিশ বাহিনীর অস্ত্রভাণ্ডারে ব্যাটল রাইফেলের মতো উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন আগ্নেয়াস্ত্র থাকলেও সেগুলোর ব্যবহার কঠোর নীতিমালার আওতায় সীমিত বলে জানিয়েছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। সাধারণত জিম্মি উদ্ধার, সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান বা উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ বিশেষ অভিযানে বিশেষায়িত ইউনিট এসব অস্ত্র ব্যবহার করে। জাতিসংঘের অস্ত্র ব্যবহার নীতিমালায়ও সর্বশেষ বিকল্প হিসেবে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নীতি অনুসরণের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় প্রকাশিত বিভিন্ন ভিডিও, প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তদন্তে অভিযোগ ওঠে, আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী যুদ্ধাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। বিশেষ করে পুলিশ সদস্যদের হাতে ব্যাটল রাইফেল ও স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র দেখা যাওয়ায় বাহিনীর বলপ্রয়োগের নীতি ও প্রশিক্ষণ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়। বাংলাদেশ পুলিশে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন অস্ত্রের অন্তর্ভুক্তি ঘটে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী সরকারের আমলে। ২০১৪ সাল এবং পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক আন্দোলন দমাতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার সক্ষমতা বাড়ানোর যুক্তিতে এসব অস্ত্র সংগ্রহ শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে উগ্রবাদবিরোধী অভিযানের পাশাপাশি রাজনৈতিক আন্দোলন মোকাবেলায়ও এমন অস্ত্রের ব্যবহার বাড়ানো হয়। ২০১৪ সালে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর পুলিশের আধুনিকায়নের নামে বাহিনীতে যুক্ত করা হয় ৭ পয়েন্ট ৬২ এমএম চায়না রাইফেল, এসএমজি, এলএমজি, বিডি-৮ অ্যাসল্ট রাইফেল, টরাস ৯ এমএমের মতো যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহার্য অস্ত্র।
পুলিশের হাতে এ ধরনের অস্ত্র তুলে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয় ২০১৪ সালের ২৬ অক্টোবর। এক সভায় পুলিশের পক্ষে অংশ নেন তৎকালীন এআইজি মো. হারুন অর রশিদ। সভায় বাহিনীতে অত্যাধুনিক মারণাস্ত্রের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন এ পুলিশ কর্মকর্তা। ২০১৫ সালে প্রথম দফায় ইতালি থেকে অত্যাধুনিক অস্ত্র ও গুলি আমদানি করা হয়। এরপর পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন দেশ থেকে আনা হয় আরো অত্যাধুনিক মারণাস্ত্র ও গুলি। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে দরপত্রের মাধ্যমে পুলিশের কাছে থাকা ৭ পয়েন্ট ৬২ এমএম রাইফেলের জন্য কাভার কেনা হয়। ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশ পুলিশ ২ কোটি ৪৯ লাখ পিস প্রাণঘাতী গুলি কেনে। অন্যদিকে একই সময়ে টিয়ার গ্যাস ও রাবার বুলেটের মতো সরঞ্জাম কেনা হয় ৩০ লাখ ইউনিট।
জুলাই আন্দোলনে বিভিন্ন ঘটনায় হওয়া মামলার এজাহারের তথ্য অনুযায়ী, ১৮ থেকে ২১ জুলাই পর্যন্ত পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বিভিন্ন বাহিনী রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, উত্তরা, কদমতলী, রামপুরা, ধানমন্ডি ও চট্টগ্রামের চান্দগাঁও এলাকায় ছাত্র আন্দোলন দ্রুত সময়ে দমাতে স্পেশাল পারপাস অটোমেটিক শটগান (স্পার্স), ৭ পয়েন্ট ৬২ এমএম চায়না রাইফেল, এসএমজি, এলএমজি, বিডি-৮ অ্যাসল্ট রাইফেল, টরাস ৯ এমএম ও ৯ পয়েন্ট ১৯ এমএম সিজে পিস্তল থেকে ১৭ হাজার ২৯ রাউন্ড বুলেট ছুড়েছে।
প্রাণঘাতী এসব অস্ত্র ব্যবহার করে ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে ১ হাজার ৫৬৩ রাউন্ড, মোহাম্মদপুরে ২৯৮ ও সিসা বুলেট ২ হাজার ৯৮৪ রাউন্ড, উত্তরায় ৩৯০, ধানমন্ডিতে ৩৩৭ ও শাহবাগে ৪৩ রাউন্ড বুলেট ছোড়া হয়। যেসব স্পটে সবচেয়ে বেশি প্রাণঘাতী আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার হয় তার মধ্যে যাত্রাবাড়ী, মোহাম্মদপুর ও উত্তরা অন্যতম।
জুলাই আন্দোলনে ব্যাটল রাইফেল ও সাঁজোয়া যান ব্যবহার করে যেভাবে মাঠে নামানো হয়েছিল, সেটিই জনগণের সঙ্গে পুলিশের দূরত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে। গণতান্ত্রিক দেশগুলোয় জনসমাবেশ বা আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে ধাপে ধাপে বলপ্রয়োগের নীতি অনুসরণ করা হয়। কিন্তু এসব ধাপ অনুসরণ না করে সরাসরি প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার পরিস্থিতিকে আরো ভয়াবহ করে তোলে —ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও সাবেক উপদেষ্টা
জুলাই আন্দোলনে ব্যাপক হারে ব্যাটল রাইফেল ব্যবহারের অভিযোগের পর পুলিশ বাহিনীর ভূমিকা, পেশাদারত্ব, বলপ্রয়োগের নীতি ও জবাবদিহি নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি হয়।
ব্যাটল রাইফেলের ব্যবহার জনগণের সঙ্গে পুলিশের দূরত্ব তৈরি করেছে বলে মনে করেন নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও সাবেক উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনে ব্যাটল রাইফেল ও সাঁজোয়া যান ব্যবহার করে পুলিশকে যেভাবে মাঠে নামানো হয়েছিল, সেটিই জনগণের সঙ্গে পুলিশের দূরত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে। গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে জনসমাবেশ বা আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে ধাপে ধাপে বলপ্রয়োগের নীতি অনুসরণ করা হয়। প্রথমে সতর্কবার্তা, এরপর জলকামান, টিয়ার শেল, সাউন্ড গ্রেনেড বা সীমিত লাঠিচার্জের মতো কম প্রাণঘাতী পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। কিন্তু এসব ধাপ অনুসরণ না করে সরাসরি প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার পরিস্থিতিকে আরো ভয়াবহ করে তোলে।’
তিনি আরো বলেন, ‘দুর্গম বা উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নিরাপত্তার স্বার্থে পুলিশের কাছে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন অস্ত্র থাকতে পারে। তবে সেই অস্ত্র সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য নয়। আইনও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয়তা, আনুপাতিকতা ও সর্বশেষ বিকল্প হিসেবে ব্যবহারের কথা বলেছে।’
আজকের পত্রিকা
দৈনিক আজকের পত্রিকার প্রধান শিরোনাম ‘ইঞ্জিনসংকট: রেলে পণ্য পরিবহন কমছে’। খবরে বলা হয়, লোকোমোটিভ (ইঞ্জিন) সংকটের কারণে রেলওয়ের কনটেইনার পরিবহন কার্যক্রম ব্যাপক চাপে পড়েছে। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ঢাকা রুটে নিয়মিত ট্রেন চলাচল ব্যাহত হওয়ায় কনটেইনার পরিবহন কমে বন্দরে তৈরি হচ্ছে জট। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে রেলের আয়, বেসরকারি ব্যবসা-বাণিজ্য এবং আমদানি পণ্যের সরবরাহব্যবস্থায়। গত মে মাসে চট্টগ্রাম-ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে কনটেইনার ট্রেনের ট্রিপ হয় ৬২টি, যা গত প্রায় দেড় বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।
রেলওয়ের অভ্যন্তরীণ সূত্র বলছে, লোকোমোটিভের সংকটই এ পরিস্থিতির মূল কারণ। পর্যাপ্ত ইঞ্জিন না থাকায় প্রয়োজন অনুযায়ী কনটেইনার ট্রেন পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না।
রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে চট্টগ্রাম-ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে কনটেইনার ট্রেন চলাচল মাসভেদে ওঠানামা করেছে। জানুয়ারিতে ১১৩টি ও ফেব্রুয়ারিতে ১১১টি ট্রিপ পরিচালিত হয়। মার্চ ও এপ্রিলে সর্বোচ্চ ১৪০টি করে ট্রিপ হলেও এর পর থেকে ধীরে ধীরে কমতে থাকে। মে মাসে ১০৫টি, জুনে ৯১টি, জুলাইয়ে ৮৪টি, আগস্টে ১০৭টি, সেপ্টেম্বরে ১১৮টি, অক্টোবরে ৮৪টি, নভেম্বরে ৯৫টি এবং ডিসেম্বরে মাত্র ৭৩ ট্রিপ চলেছে।
চলতি বছরেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। জানুয়ারিতে ১০৪টি, ফেব্রুয়ারিতে ১০৬টি এবং মার্চে ১১৯টি ট্রিপের পর এপ্রিল মাসে তা কমে ১০২টিতে নেমে আসে। মে মাসে ট্রিপ হয় মাত্র ৬২টি।
বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘লোকোমোটিভের স্বল্পতার কারণেই চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটে কনটেইনার ট্রেন পরিচালনা আগের মতো করা যাচ্ছে না। যাত্রীবাহী ট্রেন বন্ধ রাখা সম্ভব নয়। তাই প্রথমে যাত্রীবাহী ট্রেন পরিচালনার জন্য লোকোমোটিভ বরাদ্দ দিতে হয়, এরপর যা থাকে, তা দিয়েই কনটেইনার ট্রেন চালাতে হয়। প্রতিদিন কনটেইনার ট্রেন পরিচালনায় তিন থেকে চারটি লোকোমোটিভের প্রয়োজন হয়। কিন্তু আমরা কোনো দিন দুটি, আবার কোনো দিন তিনটি দিতে পারি। এ কারণেই কনটেইনার পরিবহন কিছুটা কমেছে।’
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫ সালের মার্চ ও এপ্রিলে সর্বোচ্চ ১৪০টি ট্রিপ পরিচালনার পর থেকে কনটেইনার ট্রেনের চলাচলে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা দেয়। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে ট্রিপের সংখ্যা ১০০-এর বেশি থাকলেও এপ্রিল থেকে কমতে শুরু করে।
গত ২৯ জুন বাংলাদেশ রেলওয়ের (পূর্বাঞ্চল) প্রধান কার্যালয়ে (সিআরবি) পাঠানো অভ্যন্তরীণ এক জরুরি বার্তায় বলা হয়েছে, চট্টগ্রামের চিটাগং গুডস পোর্ট ইয়ার্ডে (সিজিপিওয়াই) বর্তমানে ১৩টি কনটেইনার ট্রেনের রেকে ৫৪৬ টিইইউস কনটেইনার লোড অবস্থায় রয়েছে। পাশাপাশি তিনটি তেলবাহী ট্রেনের রেকও দীর্ঘদিন ধরে আটকে আছে। বার্তায় বলা হয়, এসব কনটেইনার দ্রুত সরাতে প্রতিদিন অন্তত ৬-৭টি লোকোমোটিভ প্রয়োজন। কিন্তু ইঞ্জিনের অভাবে এগুলো সময়মতো পরিবহন করা যাচ্ছে না। এ কারণে কনটেইনার ও তেলবাহী রেক ইয়ার্ডে আটকে রয়েছে।
পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম গুডস পোর্ট ইয়ার্ডের ধারণক্ষমতা ৮৮৭ টিইইউস হলেও লোকোমোটিভ সংকটের কারণে একসময় সেখানে প্রায় দ্বিগুণ (১ হাজার ৬৫৮ টিইইউস) কনটেইনার জমে যায়।
বন্দর কর্তৃপক্ষের হিসাবে, প্রতিদিন অন্তত ৪ জোড়া কনটেইনার ট্রেন পরিচালনা করে প্রায় ২০০ টিইইউস কনটেইনার ঢাকায় পাঠানো প্রয়োজন। তবে বাস্তবে অনেক দিন ১-৩ জোড়া ট্রেন চালানো হয়েছে। কোনো কোনো দিন একটিও চলেনি। ফলে অনেক কনটেইনার ৩-৪ সপ্তাহ পর্যন্ত বন্দরে আটকে থাকছে। এতে আমদানিকারকদের অর্থদণ্ড দিতে হচ্ছে। এ ছাড়া কাঁচামাল সরবরাহেও বিলম্ব ঘটছে।
রেলওয়ের সূত্র জানায়, বর্তমানে রেলওয়ের বহরে মোট ২৭১টি লোকোমোটিভ রয়েছে, যেগুলোর মধ্যে ১৭৭টি সচল। সচলগুলোর মধ্যে মিটারগেজ ইঞ্জিন ৯০টি ও ব্রডগেজ ৮৭টি। বাকিগুলো মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণে আছে। আবার লোকোমোটিভের মধ্যে মিটারগেজের প্রায় ৬৫ শতাংশ এবং ব্রডগেজের প্রায় ৪৫ শতাংশ মেয়াদোত্তীর্ণ।
রেলের কর্মকর্তারা বলছেন, বিকল লোকোমোটিভ মাঝেমধ্যেই মেরামত করা হলেও কোনো কোনোটি অল্প সময়ের মধ্যেই আবার বিকল হয়ে পড়ছে। এতে মেরামতকাজ ও যন্ত্রাংশের গুণগত মান এবং রক্ষণাবেক্ষণব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
বাংলাদেশ প্রতিদিন
‘ভামোস আর্জেন্টিনা!’-এটি দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, আর্জেন্টিনার ফুটবলারদের চোখ অশ্রুসজল। লটারো মার্টিনেজকে দেখে মনে হচ্ছিল চোখের জল লুকানোর সুযোগ খুঁজছেন। লিওনেল মেসি মাঝ মাঠে বসে পড়লেন। নিজের আবেগ আর ভালোবাসা প্রকাশের উপায় খুঁজলেন যেন। সতীর্থরা তাকে এসে জড়িয়ে ধরল। এমনই পরম আবেগে, যা দেখে চোখ ভিজে ওঠে শত্রু শিবিরেও। লিওনেল স্কালোনি? যাকে আর্জেন্টাইন ফুটবলাররা আদর করে ‘কাঁদুনে বাচ্চা’ বলে ডাকে, তিনি কই? লিওনেল মেসির নিখুঁত এক অ্যাসিস্টে লটারো মার্টিনেজ অতিরিক্ত সময়ে গোলটা করার পর চোখের অশ্রু লুকাতে আকাশের দিকে তাকিয়েছিলেন স্কালোনি। কোনো লাফালাফি নেই, উচ্ছ্বাস নেই। যেন নির্লিপ্ত এক কোচ। কিন্তু স্কালোনির ভিতরে তখন ঝড়। তার মুখে উচ্ছ্বাস ছিল না ঠিকই তবে চোখে ছিল স্বস্তি। দীর্ঘ পথ পেরিয়ে তার দল আবারও বিশ্বকাপের ফাইনালে। বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে আর্জেন্টিনার পুরো দল এমনই আবেগ আর উচ্ছ্বাসে ভেসে যায়। সঙ্গে ভাসিয়ে নিয়ে যায় বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি সমর্থকের। বাংলাদেশের অগণতি মানুষকেও। আর্জেন্টাইনরা ফুটবল নিয়েই বেঁচে থাকে। তাদের সুখ-দুঃখ সব ফুটবলের সঙ্গেই ছুটে চলে।
বহু বছর তারা দিয়েগো ম্যারাডোনাকে নিয়ে উচ্ছ্বাস করেছে। ম্যারাডোনার অবদানের কথা মনে রেখেছে। তাকে মাথায় তুলে রেখেছে। এখনো তাই করে। তবে ম্যারাডোনার নামের সঙ্গে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে আর্জেন্টাইনরা আরও একটা নামের সুর তোলে। তিনি লিওনেল মেসি। এখনো যেকোনো পোস্টারে ম্যারাডোনা স্থান পান। স্থান আছে লিওনেল মেসিরও। কারণ আর্জেন্টাইন ফুটবলকে ম্যারাডোনা এক টানে তুলে এনেছিলেন সবার ওপরে। আর মেসি? তিনি ম্যারাডোনার তুলে আনা ফুটবলকে নিয়ে গেছেন এমন এক উচ্চতায়, যেখানে যাওয়ার দুঃসাহস দেখাতে পারে কেবল আরও এক মেসি। সেই মেসি কবে আসবেন বলা কঠিন। আপাতত বুড়ো মেসির ম্যাজিক দেখেই দুচোখে শান্তি নামে ফুটবলপ্রেমীদের। যতদিন তিনি আছেন, ফুটবল বেঁচে থাকবে মেসির সঙ্গেই। বার্সেলোনা ছেড়ে পিএসজিতে যাওয়ার পর অনেকেই বলেছিলেন, মেসি যুগ শেষ। এরপর পিএসজি ছেড়ে আমেরিকায় চলে গেলেন মেসি।
সমালোচকরা বলল, তিনি হারিয়েই গেলেন! কিন্তু মেসি যেন ফুটবলকে পুনর্জন্ম দিলেন। বিশ্বকাপ এলে ফুটবল নিয়ে আলোচনা হবে, এটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু মেসি সেই আলোচনাটা নিয়ে গেলেন ভিন্ন মাত্রায়। শত্রুরাও এখন বলে, এই লোকটা সত্যিই ইতিহাসের সেরা। কেনই বা হবেন না? ৩৯ ঊর্ধ্ব এক ফুটবলার একটা ম্যাচে ১২ বার বল দখলের লড়াই জয় করেছেন। ৯টি সফল ড্রিবলিং করেছেন। গোলের সুযোগ তৈরি করেছেন ৪টি। পুরো ইংল্যান্ড দল মিলেও মেসিকে ছাড়িয়ে যেতে পারেনি। বিশ্বকাপের ইতিহাসে গোলের সুযোগ তৈরিকে মেসি আগেই ছিলেন শীর্ষে। সেই সংখ্যাটা তিনি নিয়ে গেছেন ৯৯-এ। দুইয়ে আছেন ম্যারাডোনা (৭১টি)। গোলের সুযোগ তৈরির সেঞ্চুরি ফাইনালের মঞ্চে নিশ্চয়ই সেরে নেবেন মেসি!
তবে আর্জেন্টিনা দল কি শুধুই মেসিনির্ভর। অনেকে কথাটা বলেন বটে। কিন্তু মেসি মাঠে থাকেন বলেই অন্যদের চেনা যায় না। এনজো ফার্নান্দেজ, জুলিয়েন আলভারেজ, লটারো মার্টিনেজরা একেকজন তারকা। মাঝ মাঠে ডি পল, ম্যাক অ্যালিস্টাররা তো আছেনই। ডিফেন্সে আছেন লিসান্দ্রো মার্টিনেজ, রোমেরো, মলিনা, ট্যাগলিয়ফিকো আর অতামেন্দিরা। গোলবারের সামনে পাগলা এমি মার্টিনেজ তো আছেনই। এই আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে থামানোও বেশ কঠিন হবে। সামনে অপরাজেয় স্পেন। ফাইনালের লড়াইয়ে এই স্পেন মেসিদের বড় বাধা। অবশ্য এই লড়াইটা আরও আগেই হওয়ার কথা ছিল। ইউরো কাপ চ্যাম্পিয়ন ও কোপা আমেরিকা চ্যাম্পিয়নের মধ্যে লড়াই। ফিফা যে লড়াইয়ের নাম দিয়েছে ফিনালিসিমা। যুদ্ধের কারণে সেই লড়াই নির্ধারিত সময়ে হয়নি। তবে স্পেন আর আর্জেন্টিনা সমর্থকদের হতাশ করেনি। বিশ্বকাপের ফাইনালে নিয়ে গেল ফিনালিসিমা।
এ লড়াই দুই মহাদেশের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের। এ লড়াই লিওনেল মেসির কিংবদন্তিকে আরও উঁচুতে নিয়ে যাওয়ার। সতীর্থরা চান মেসিকে আরও একবার বিশ্বকাপের স্বাদ দিতে। মেসি নিজেও চান আর্জেন্টিনাকে আরও একটা বিশ্বকাপ ট্রফি উপহার দিতে। আর মাত্র একটি ম্যাচ। ৯০ মিনিট। বড়জোড় ১২০ মিনিট। এর পরই হয়তো ইতিহাস আরও একবার নতুন করে লেখা হবে। মেসির হাতে আরেকটি বিশ্বকাপ উঠবে নাকি স্পেন থামিয়ে দেবে সেই স্বপ্ন? উত্তর মিলবে ফাইনালের পর। আপাতত ভক্তরা সুর করে গাইছে, ‘ভামোস আর্জেন্টিনা, ভামোস টিম মেসি’!! ছুটে চলো আর্জেন্টিনা, ছুটে চলো মেসি।
সহযোগীদের খবর
হাসিনাকে প্রত্যর্পণে সাড়া নেই, থমকে গেছে কূটনৈতিক চেষ্টা
অনলাইন ডেস্ক
অনলাইন
১ ঘন্টা আগে
১৭ জুলাই (শুক্রবার), ২০২৬, ৯ঃ১৪ (পূর্বাহ্ণ)
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
