৪৫ বছর পর পাকড়াও জিয়া হত্যার দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি

৪৫ বছর পর পাকড়াও জিয়া হত্যার দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি

ফন্ট সাইজ:

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান হত্যা মামলার অন্যতম মূল হোতা মেজর মোজাফফর হোসেন (অব.)কে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। মঙ্গলবার মধ্যরাতে রাজধানীর বনানী ডিওএইচএস এলাকা থেকে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের সদস্যরা তাকে গ্রেপ্তার করেন। রাতভর মিন্টো রোডের ডিবি কার্যালয়ে রাখার পর আইনগত প্রক্রিয়া শেষে কোর্ট মার্শাল সম্পন্ন করার জন্য তাকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে সরাসরি গুলি করা এই মোজাফ্‌ফর দীর্ঘ ৪৫ বছর ধরে পলাতক ছিল। গ্রেপ্তারের বিষয়টি মানবজমিনকে নিশ্চিত করেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ-ডিএমপি’র অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) মো. শফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, মঙ্গলবার রাতে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে আমরা জানতে পারি দীর্ঘদিন পালিয়ে থাকা প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান হত্যা মামলার অন্যতম হোতা মোজাফ্‌ফর বনানী ডিওএইচএস এলাকায় অবস্থান করছেন। পরে আমাদের গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল সেখানে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করে। রাতে তাকে ডিবি কার্যালয়ে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তিনি যেহেতু একজন সাবেক সেনা কর্মকর্তা, তাই তাকে সেনা আইনের আওতায় বিচারের জন্য সেনাবাহিনীর কাছে হস্থান্তর করা হয়েছে। তার বিষয়ে যাবতীয় বিচারিক কার্যক্রম তারাই নিবেন।

১৯৮১ সালের ২৯শে মে বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান দুইদিনের সফরে চট্টগ্রামে গিয়েছিলেন। নেতাকর্মীদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠকের পর ওইদিন মধ্যরাতে তিনি ঘুমাতে যান। পরদিন ৩০শে মে ভোরে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে একদল বিপথগামী সেনা কর্মকর্তা তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে নৃশংসভাবে গুলি করে হত্যা করে। ওই হত্যার অন্যতম পরিকল্পনাকারী এবং সরাসরি অংশ নেয়া তৎকালীন সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে মোজাফফর একজন। অভিযোগ আছে- মোজাফফরই প্রথম জিয়াউর রহমানকে শনাক্ত করেন, তাকে লক্ষ্য করে সরাসরি গুলি চালায়। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে হত্যার পর এই মোজাফ্‌ফরই চট্টগ্রাম সেনানিবাসের ২৪ পদাতিক ডিভিশনের তৎকালীন জিওসি মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুরকে টেলিফোন করে জানায়- ‘দ্য প্রেসিডেন্ট হ্যাজ বিন কিল্ড’। এরপর রেডিওতে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর খবর ঘোষণা করা হয়। হত্যার কয়েক ঘণ্টা পর তার লাশ গোপনে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেই পাহাড়ি এলাকায় তাকে কবর দেয়া হয়। পরে তৎকালীন সরকারের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়- ‘বিপ্লবী পরিষদ’ পরিচয় দেয়া কিছু বিপথগামী সেনাসদস্য প্রেসিডেন্ট জিয়াকে হত্যা করেছে।

এরপর সেনাবাহিনীর অভিযানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। তখন চট্টগ্রাম সেনানিবাসের জিওসি মেজর জেনারেল মঞ্জুরসহ অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারীদের সবাইকে ৩১শে মে দুপুর ১২টার মধ্যে আত্মসমর্পণ করার নির্দেশ দেন তখনকার সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। তবে ওই ঘোষণার পর তৎকালীন জিওসি মেজর জেনারেল মঞ্জুরসহ তার বেশক’জন সহযোগী সেদিন রাতেই চট্টগ্রাম সেনানিবাস ছেড়ে পালিয়ে যায়। পরদিন ১লা জুন জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডে জড়িত লেফটেন্যান্ট কর্নেল মতিউর রহমান ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল মেহবুব চট্টগ্রাম থেকে পালিয়ে যাওয়ার সময় সেনা বাহিনীর সদস্যদের গুলিতেই নিহত হয়। আর আত্মগোপনে চলে যাওয়া জিওসি মেজর জেনারেল মঞ্জুরকে ধরিয়ে দিতে পাঁচ লাখ টাকার পুরস্কার ঘোষণা করে সরকার।

এরপরই ২রা জুন ফটিকছড়ির একটি চা বাগান থেকে আটক হয় মঞ্জুর। সেখান থেকে তাকে থানায় নেয়া হয়। পরে অবশ্য সরকারের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়, চট্টগ্রাম সেনানিবাসে একদল উচ্ছৃঙ্খল সৈন্যের হাতে জেনারেল মঞ্জুর নিহত হয়েছেন। আর ক্যাপ্টেন মোসলেহ উদ্দিন গ্রেপ্তার হয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়। অন্যদিকে বিদ্রোহে জড়িত থাকার অভিযোগে সামরিক আদালতে ১৮ সেনা কর্মকর্তার বিচার শুরু হয়। ওই বিচারে ব্রিগেডিয়ার মহসিন উদ্দীন আহমেদ, কর্নেল এম আব্দুর রশীদ, লে. কর্নেল এওয়াইএম মাহফুজুর রহমান, লে. কর্নেল এম দেলোয়ার হোসেন, লে. কর্নেল শাহ মো. ফজলে হোসেন, মেজর এজেড গিয়াসউদ্দীন আহমেদ, মেজর রওশন ইয়াজদানী ভূঁইয়া, মেজর কাজী মোমিনুল হক, মেজর এম মজিবুর রহমান, ক্যাপ্টেন মো. আব্দুস সাত্তার, ক্যাপ্টেন জামিল হক, লে. রফিকুল হাসান খানসহ ১৩ জন সেনা কর্মকর্তার মৃত্যুদণ্ড হয়। অন্যদেরকেও বিভিন্ন মেয়াদে দণ্ড দেয়া হয়। তৎকালীন মেজর মোজাফ্‌ফর হোসেন ও মেজর এসএম খালেদ তখন পালিয়ে যায়। তাদের দু’জনকে ধরিয়ে দিতেও সে সময় পুরস্কার ঘোষণা করে সরকার। একপর্যায়ে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে চলে যান মোজাফ্‌ফর। দীর্ঘদিন সেখানে আত্মগোপনে ছিলেন। ১৯৯৮ সালের পর তিনি আবারো সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। গোয়েন্দাদের ধারণা পরিচয় গোপন করে গত ৪৫ বছর দেশে-বিদেশে চলাচল করেছেন তিনি।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন