দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে মিঠামইন উপজেলা বিএনপি’র সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন এএইচএম জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীর। এর আগে ছিলেন উপজেলা বিএনপি’র সদস্য সচিব ও সাধারণ সম্পাদক। কলেজে পড়ার সময়েই জড়িয়েছিলেন ছাত্রদলের রাজনীতিতে। জেলা বিএনপি’র শ্রম বিষয়ক সম্পাদক ও যুগ্মসাধারণ সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। মিঠামইন উপজেলার সদর ইউনিয়নের কামালপুর গ্রামের ঐতিহ্যবাহী একটি পরিবারে জন্মগ্রহণ করা জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীর এভাবেই নিজেকে জড়িয়ে রেখেছিলেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আদর্শের রাজনীতিতে। কামালপুর গ্রামের মরহুম সিদ্দিকুর রহমানের পাঁচ ছেলের মধ্যে দ্বিতীয় এএইচএম জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীরের জন্য বিগত ফ্যাসিবাদী জমানা ছিল এক দুঃসহ অধ্যায়।
দুইবারের সাবেক প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ একই গ্রামের বাসিন্দা হওয়ায় জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীরকে পার করতে হয়েছে বৈরী সময়। ২০১৪ সালের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে নানা ষড়যন্ত্রে নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে পারেননি জাহাঙ্গীর। ফ্যাসিবাদী জমানায় সকল বিরুদ্ধ পরিবেশ আর প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করে উপজেলায় বিএনপি’র হাল ধরে রাখেন তিনি। স্বভাবতই ৫ই আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মধ্য দিয়ে জাহাঙ্গীর হয়ে ওঠেন উপজেলার রাজনীতির মধ্যমণি। কিন্তু তার এই ঈর্ষণীয় অবস্থানই হয়ে ওঠে অনেকের গাত্রদাহের কারণ। বিএনপি’র রাজনীতিতে নিবেদিতপ্রাণ অত্যন্ত মিশুক ও সরলপ্রাণ মানুষটিকে নিয়ে শুরু হয় অপপ্রচারের খেলা। জীবদ্দশায় সেই অপপ্রচারের জাল আর ছিন্ন করতে পারেননি জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীর। ১২ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপি ক্ষমতায় আসার মাত্র ১২ দিন পর ২৪শে ফেব্রুয়ারি বেড়িবাঁধের গাছ কেটে ফেলা নিয়ে টার্গেট অপপ্রচারের শিকার হয়ে দলের পদের উপর স্থগিতাদেশ পান জাহাঙ্গীর। পদ স্থগিত হওয়ার পরদিন ২৫শে ফেব্রুয়ারি তিনি গ্রেপ্তার হন।
এক মাসেরও বেশি সময় কারাভোগ শেষে জামিনে মুক্তির স্বাদ মিললেও পদ স্থগিতই ছিল তার। বৃহস্পতিবার বিকালে সেই পদের উপর স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারের একটি চিঠি যখন সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে, ঠিক একই সময়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের একটি শোকবার্তাও প্রচারিত হয়। সেই শোকবার্তার মানুষটিই হলেন- জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীর, যিনি বুধবার রাতে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। রাত সাড়ে ৯টার দিকে হাদিস মিয়া নামে এক বিএনপি কর্মীকে সঙ্গে নিয়ে মিঠামইন বাজার থেকে বাড়ি ফিরছিলেন তিনি। পথে বেড়িবাঁধ এলাকার বাগানবাড়ীর সামনে অতর্কিত হামলার শিকার হন জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীর। অপরিচিত সশস্ত্র তিন যুবক চাপাতি নিয়ে হামলে পড়ে তার ওপর। চাপাতি দিয়ে উপর্যুপরি কুপিয়ে তারা জাহাঙ্গীরের সারা শরীর ক্ষত-বিক্ষত করে। হামলা থেকে রেহাই পাননি তার সঙ্গে থাকা হাদিস মিয়াও। আশঙ্কাজনক অবস্থায় দু’জনকেই চিকিৎসার জন্য কিশোরগঞ্জ পাঠানো হয়। রাত সাড়ে ১১টার দিকে শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তাদের নিয়ে যাওয়ার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক জাহাঙ্গীরকে মৃত ঘোষণা করেন। এছাড়া হাদিস মিয়াকে হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য ভর্তি করা হয়। এদিকে এ ঘটনায় ভাড়াটে তিন খুনিকে আটক করেছে পুলিশ। তারা হচ্ছে, বরগুনা জেলার বামনা থানার চালিতাবুনিয়া গ্রামের মৃত সুলতানের ছেলে মো. হেলাল (২৫), লক্ষ্মীপুর জেলার রামগঞ্জ থানার দুধরাজপুর গ্রামের মো. নূর হোসেনের ছেলে মো. মহিন উদ্দিন (৩২) ও রামগঞ্জেরই মধ্যপাড়া গ্রামের রহমত উল্লাহ ওরফে খোকনের ছেলে মো. শাকিল হোসেন ওরফে শাহীন (২৫)। আটকের সময় তাদের কাছ থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি চাপাতি উদ্ধার করেছে পুলিশ।
পুলিশ জানিয়েছে, এই তিনজনই পেশাদার খুনি এবং ঢাকার ভাড়াটে অপরাধী চক্রের সদস্য। স্থানীয়রা বলছেন, অপপ্রচারের মাধ্যমে একটি অদৃশ্য শক্তি জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীরকে ঘায়েল করতে চেয়েছিলো। এতে ব্যর্থ হয়েই হয়তো তারা হত্যার ছক আঁকে এবং ভাড়াটে খুনি দিয়ে তা বাস্তবায়ন করে।
পুলিশ জানিয়েছে, প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে- আটক হওয়া তিনজনই ভাড়াটে খুনি। এরা ঢাকা থেকে হায়ার করা (ভাড়াটে) অপরাধী চক্রের সদস্য। তারা কিলিং মিশন নিয়ে তিনদিন আগে কিশোরগঞ্জে আসে। আগের দুইদিন জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীর কিশোরগঞ্জ জেলা শহরের বাসায় অবস্থান করায় খুনিরা জেলা শহরে তাকে হত্যার পরিকল্পনা করলেও তাদের পরিকল্পনা সফল করতে পারেনি। পরে তারা মিঠামইনে চলে যায়। বুধবার সকালে জাহাঙ্গীর মিঠামইনের গ্রামের বাড়িতে গেলে তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি হয় এবং পরিকল্পনা অনুযায়ী জাহাঙ্গীরের উপর হামলা চালিয়ে তাকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করে।
এদিকে এ ঘটনার খবর পেয়ে বৃহস্পতিবার সকালে কিশোরগঞ্জের শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে ছুটে যান কিশোরগঞ্জ-৪ (ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম) আসনের সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান। এ সময় তিনি স্বজনদের সান্ত্বনা দেন এবং অপরাধীরা কোনোভাবেই পার পাবে না বলে তাদের আশ্বস্ত করেন। পরে সংসদ সদস্য ফজলুর রহমান জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে গিয়ে জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিন এবং পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে গিয়ে পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমানকে জাহাঙ্গীর হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের কুশীলবদের চিহ্ণিত করে আইনের আওতায় আনার নির্দেশনা দেন। এ সময় জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিন ও পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এ ব্যাপারে কাজ করা হচ্ছে বলে সংসদ সদস্য ফজলুর রহমানকে আশ্বস্ত করেন। পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেছেন, অপরাধী যেই হোক না কেন, কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে কারা রয়েছে তা উদ্ঘাটনে জেলা পুলিশ তৎপর রয়েছে।
