ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়ে ফাইনালে ওঠার পথে একের পর এক রেকর্ড গড়েছে আর্জেন্টিনা। আর তার কেন্দ্রে অবধারিতভাবেই লিওনেল মেসি। ছিল রেকর্ডের ফুলঝুরি। সেগুলো পাঠকদের সামনে তুলে ধরা হলো-
প্রথমবারের মতো ইউরোপ-দক্ষিণ আমেরিকার সেরাদের লড়াই
১৯শে জুলাইয়ের ফাইনালে মুখোমুখি হবে ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকার বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এমন ফাইনাল এই প্রথম। সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে স্পেনের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার পরিসংখ্যান ৬ জয়, ২ ড্র, ৬ হার। তবে বিশ্বকাপের একমাত্র দেখায় জিতেছিল আর্জেন্টিনা। ১৯৬৬ সালের গ্রুপ পর্বে, ২-১ গোলে। প্রাক-টুর্নামেন্ট ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে আর্জেন্টিনা ছিল ১ নম্বরে, স্পেন ২ নম্বরে। ১৯৯২ সালে র্যাঙ্কিং চালুর পর এই প্রথম শীর্ষ দুই দল মুখোমুখি হচ্ছে বিশ্বকাপে।
একের পর এক দলীয় কীর্তি
বিশ্বকাপে এক আসরে একাধিকবার দ্বিতীয়ার্ধের স্টপেজ টাইমে জয়সূচক গোল করার প্রথম নজির স্থাপন করেছে আর্জেন্টিনা। এবার বিশ্বকাপ জিতলে ১৯৩৪ ও ১৯৩৮ সালে ইতালি এবং ১৯৫৮ ও ১৯৬২ সালে ব্রাজিলের পর টানা দুটি বিশ্বকাপ জেতা তৃতীয় দেশ হবে আর্জেন্টিনা। সপ্তমবারের মতো ফাইনালে উঠলো তারা। আর ১৯৮৬-৯০ সালের পর প্রথমবার টানা দুই বিশ্বকাপে ফাইনাল খেলবে আলবিসেলেস্তেরা। ফাইনাল উপস্থিতির হিসাবে এখন ব্রাজিলের পাশে দ্বিতীয় স্থানে আর্জেন্টিনা। শীর্ষে জার্মানি (৮ বার)। টানা ১৩ ম্যাচে দুই বা তার বেশি গোল করার বিশ্বকাপ রেকর্ডও এখন আর্জেন্টিনার দখলে। এত দিন এই তালিকায় শীর্ষে ছিল উরুগুয়ে, ১৯৩০-৫৪ সময়ে টানা ১১ ম্যাচ নিয়ে।
রেকর্ডময় মেসি
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ১২টি ডুয়েল জিতেছেন মেসি। ২০১৪ সালের পর কোনো বিশ্বকাপ ম্যাচে তার সর্বোচ্চ আর অতিরিক্ত সময় ছাড়া কোনো ম্যাচে ২০১০ সালের পর সর্বোচ্চ। ২০২২ বিশ্বকাপ থেকে শুরু করে টানা ১১টি বিশ্বকাপ ম্যাচে গোল অথবা অ্যাসিস্ট করেছেন মেসি। গত ৬০ বছরের মধ্যে এটি দীর্ঘতম ধারাবাহিকতা। বিশ্বকাপ নকআউট পর্বে মেসির অ্যাসিস্ট এখন ১০টি। তালিকার দ্বিতীয় স্থানে থাকা যেকোনো খেলোয়াড়ের চেয়ে ছয়টি বেশি। পেলে ও আঁতোয়ান গ্রিজমান আছেন যৌথভাবে দ্বিতীয়, চারটি করে অ্যাসিস্ট নিয়ে। এই ম্যাচে ৯টি ড্রিবল সফল করেছেন মেসি। চলতি বিশ্বকাপে এক ম্যাচে যেকোনো খেলোয়াড়ের মধ্যে সর্বোচ্চ। এবারের বিশ্বকাপে গোলের হিসেবে কিলিয়ান এমবাপ্পের সঙ্গে যৌথভাবে শীর্ষে মেসি। দুজনের আটটি করে গোল। অ্যাসিস্টে চারটি নিয়ে আছেন দ্বিতীয় স্থানে। শীর্ষে থাকা মাইকেল ওলিসের চেয়ে একটি কম। গত বিশ্বকাপেও গোল-অ্যাসিস্টে যৌথ শীর্ষে থাকতে মাত্র এক গোল দূরে ছিলেন তিনি। ২০১০ সালে টমাস মুলারের পর এই কীর্তি আর কারও নেই। আর্জেন্টিনার হয়ে খেলা ১৩টি বড় টুর্নামেন্টের মধ্যে ৮টিতেই ফাইনালে উঠেছেন মেসি। সাফল্যের হার ৬১.৫ শতাংশ। গত ৬০ বছরে বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে একাধিক অ্যাসিস্ট করা চতুর্থ খেলোয়াড় মেসি। ক্যারিয়ারে
৩৩টি বিশ্বকাপ ম্যাচ খেলে ৩৩টি গোল-সম্পৃক্ততা (২১ গোল, ১২ অ্যাসিস্ট) তার। বিশ্বকাপ ইতিহাসে এই তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে থাকা কিলিয়ান এমবাপ্পের সম্পৃক্ততা ২৫টি। চলতি বিশ্বকাপে ২৫টি সুযোগ তৈরি করেছেন মেসি। গত ৬০ বছরে এক আসরে সর্বোচ্চ সুযোগ তৈরির রেকর্ড (৩১টি)। যৌথভাবে নেদারল্যান্ডসের ইয়োহান ক্রুইফ (১৯৭৪) ও পর্তুগালের আন্তোনিও সিমোয়েস (১৯৬৬)-এর। আর্জেন্টাইনদের মধ্যে সর্বোচ্চ ৩০টি সুযোগ তৈরির রেকর্ড ম্যারাডোনার, ১৯৮৬ সালে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৮.৩৫ কিলোমিটার দৌড়েছেন মেসি। এই বিশ্বকাপে অতিরিক্ত সময়ে না গড়ানো কোনো ম্যাচে তার সর্বোচ্চ দৌড়।
বয়স শুধুই সংখ্যা
৩৯ বছর ২১ দিন বয়সে বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল খেলা সবচেয়ে বয়স্ক আউটফিল্ড খেলোয়াড় এখন মেসি। সব মিলিয়ে তৃতীয় বয়স্ক খেলোয়াড়, শীর্ষে ১৯৯০ সালে পিটার শিলটন (৪০ বছর ২৮৯ দিন) ও ১৯৮২ সালে দিনো জফ (৪০ বছর ১৩০ দিন)। রোববারের ফাইনালে খেললে কাফুর পাশে বসবেন মেসিÑতিনটি বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলা একমাত্র দুই খেলোয়াড় হিসেবে। এই ম্যাচে মেসির প্রত্যাশিত অ্যাসিস্ট (এক্সপেক্টেড অ্যাসিস্ট) ছিল ০.৮৬। পুরো ইংল্যান্ড দলের সম্মিলিত সংখ্যার চেয়েও বেশি।
সতীর্থদের সঙ্গে বিশেষ বন্ধন
এনজো ফার্নান্দেজ হলেন প্রথম আর্জেন্টাইন খেলোয়াড়, যাকে বিশ্বকাপে দুইবার অ্যাসিস্ট করলেন মেসি। এর আগে আলাদা দশজন খেলোয়াড়ের কাছে অ্যাসিস্ট করার কীর্তি আছে তার। লাউতারো মার্টিনেজকে বিশ্বকাপে প্রথমবার অ্যাসিস্ট করলেন মেসি। তবে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে লাওতারোকে মেসির ১০ম অ্যাসিস্ট। তার ক্যারিয়ারে কোনো সতীর্থকে করা সর্বোচ্চ অ্যাসিস্ট সংখ্যা এটি।
সাব হিসেবে মার্টিনেজের ইতিহাস
একই টুর্নামেন্টে বদলি হিসেবে নেমে একাধিক গোল করা প্রথম আর্জেন্টাইন লাউতারো মার্টিনেজ। তার গোলসহ এই বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে বদলি খেলোয়াড়দের করা যোগ করা সময়ের জয়সূচক গোলের সংখ্যা দাঁড়ালো চারে (শুধু নির্ধারিত সময়ের ম্যাচ ধরে)। ১৯৭০ সালে বদলি নিয়ম চালুর পর আগের সব বিশ্বকাপ মিলিয়ে এমন গোল ছিল মাত্র তিনটি।
ইংল্যান্ডের তেতো পরিসংখ্যান
সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে টানা পাঁচ ম্যাচ জয়হীন থাকার পর অবশেষে জিতলো আর্জেন্টিনা। ১৯৮৬ বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনালের পর এই প্রথম ইংল্যান্ডকে হারাল তারা। বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে সব মিলিয়ে চারবার উঠে তিনবারই বিদায় নিলো ইংল্যান্ড। একমাত্র ১৯৬৬ সালে নিজেদের মাটিতে তারা ফাইনালে উঠেছিল এবং শিরোপাও জিতেছিল। এই ম্যাচে মাত্র পাঁচটি শট নিয়েছে ইংল্যান্ড। গত ৬০ বছরে কোনো বিশ্বকাপ ম্যাচে তাদের সর্বনিম্ন। গর্ডনের গোল থেকে মার্টিনেজের জয়সূচক গোল পর্যন্ত সময়ে বল দখলে ইংল্যান্ড ছিল মাত্র ১২ শতাংশ, আর্জেন্টিনার দখলে ৮৮ শতাংশ। এই বিশ্বকাপে এর চেয়ে কম দখল ছিল শুধু কাতারের। ৯ জনে নেমে যাওয়া ৬-০ গোলের হারের ম্যাচে ১১ শতাংশ।
কেইনের সান্ত্বনার রেকর্ড
হতাশার রাতেও একটি ব্যক্তিগত মাইলফলক ছুঁয়েছেন হ্যারি কেইন। আউটফিল্ড খেলোয়াড় হিসেবে ইংল্যান্ডের হয়ে সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলার রেকর্ড এখন তার। ১২১তম ম্যাচ খেলে পেছনে ফেলেছেন ওয়েইন রুনিকে (১২০)। থ্রি লায়ন্সদের ইতিহাসে তার চেয়ে বেশি ম্যাচ খেলেছেন শুধু গোলরক্ষক পিটার শিলটন (১২৫টি)।
