মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলায় অসম্পন্ন মনু নদী প্রতিরক্ষা বাঁধ নিয়ে আতঙ্কিত তীরবর্তী এলাকার লাখো মানুষ। অতিবৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢল নামলে আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটাতে হয় তাদের। ভারতের ত্রিপুরার পাহাড়ি অঞ্চল থেকে উৎপত্তি হয়ে প্রথমে কুলাউড়া, রাজনগর ও মৌলভীবাজার সদর উপজেলার মধ্যদিয়ে প্রবাহিত হয়ে কুশিয়ারায় মিলিত হয় খরস্রোতা মনু নদী। এই নদীর বিভিন্ন স্থানে বাঁধ মেরামতসহ নানা সংস্কার কাজের লক্ষ্যে ৫ বছর আগে পানি উন্নয়ন বোর্ড হাজার কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করে। চলমান প্রকল্পটির কাজ সিংহভাগ শেষ হয়েছে।
তবে নতুন করে বিভিন্ন স্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কুলাউড়ার ৪টি স্থান পৃত্থিমপাশা ইউনিয়নের শিকড়িয়া, শরীফপুর ইউনিয়নের নিশ্চিন্তপুর, দত্তগ্রাম ও তেলিবিল সীমান্তের নোম্যান্স ল্যান্ডের কাছাকাছি হওয়ায় বিএসএফ বাঁধ মেরামতে বাধা দিচ্ছে। ফলে অরক্ষিত এইসব প্রতিরক্ষা বাঁধ ঘিরে উদ্বিগ্ন তীরবর্তী বাসিন্দারা। অতিবৃষ্টি ও উজানে ভারতের পাহাড়ি ঢলে গত সপ্তাহে পৃত্থিমপাশা ইউনিয়নের শিকড়িয়া (২০২৪ সালে ভাঙনকৃত) বাঁধ দিয়ে পানি প্রবেশ হলে ৫/৬টি গ্রাম প্লাবিত হয়। এতে ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাটসহ আউশধানী জমির ক্ষতি হয়।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট ও স্থানীয়রা জানান, ভারতের ত্রিপুরা থেকে উৎপন্ন হয়ে বয়ে আসা মনুনদীর অবস্থান ও প্রবেশ পথ সীমান্তবর্তী এলাকাতে হওয়ায় দুই দেশের নদী ও নদী সুরক্ষাবিষয়ক নানা ইস্যুতে জটিলতা বাঁধের কাজে ধীরগতি এনেছে। পৃত্থিমপাশা ইউনিয়নের শিকড়িয়া, আলীনগর, গজভাগ এলাকার বাসিন্দা ইউপি সদস্য তাহির আলী, সংগঠক ফয়জুল হক, জিয়াউর রহমান ফরিদ জানান, শিকড়িয়ার বেড়িবাঁধটি ২০২৪ সালের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সে বছর বাঁধের যে ১০০ ফুট অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা এখন পর্যন্ত সংস্কার করা হয়নি। বিএসএফের বাধায় কাজ বন্ধ রয়েছে। বর্তমানে ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধ দিয়ে চলাচলের জন্য স্থানীয়রা বাঁশের সাঁকো তৈরি করেছেন। সীমান্তঘেঁষা ত্রিপুরার লাটিয়াপোড়া অংশে বাঁধে ভাঙন দেখা দিলে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ মেরামতে জোর প্রস্তুতি নিলেও বাংলাদেশ অংশের বিষয়টি অনিশ্চয়তায় পড়েছে।
বিষয়টি গত ১৩ই জুলাই চলতি সংসদ অধিবেশনে পয়েন্ট অব অর্ডারে উপস্থাপন করেন মৌলভীবাজার ২ আসনের সংসদ সদস্য শওকতুল ইসলাম। এছাড়াও কুলাউড়ার রাজাপুর, বেলেরতল, ছৈদল এলাকার বাঁধগুলোও ঝুঁকিপূর্ণ রয়েছে। ২০১৮, ২২ ও ২৪ সালে বন্যায়ও টিলাগাঁও, হাজীপুর, শরীফপুর ও পৃত্থিমপাশা ইউনিয়ন ও রাজনগর ও মৌলভীবাজার সদরের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। গত সপ্তাহে রাজনগরের উজিরপুর এলাকায় ১২০ ফুটের মতো ভাঙন দেখা দেয়। এতে রাস্তাঘাটসহ ১০/১২টি গ্রামে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী খালেদ বিন অলিদ বলেন, মনু নদী প্রতিরক্ষা বাঁধের কাজ এখন পর্যন্ত ৮০ শতাংশ শেষ হয়েছে। নানা জটিলতার কারণে কাজ কিছুটা বিলম্বিত হচ্ছে। কুলাউড়ার ৪টি স্থানে ৪বার লোকবল নিয়ে গেছি কাজ করতে যাই কিন্তু বিএসএফের বাধায় সম্ভব হয়নি।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ-ভারত শীর্ষ পর্যায়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। এসব স্থানে কাজ করার অনুমতি চেয়ে ২০২৩ সালে যৌথ নদী কমিশন ঢাকার পক্ষ থেকে নয়াদিল্লিতে চিঠিও দিয়েছিল। দুই দেশের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে আলোচনা চলমান রয়েছে। শুধু কুলাউড়া উপজেলাকে রক্ষা করতেই ২৮টি প্যাকেজে ৩০৭ কোটি টাকার প্রকল্পের কাজ চলমান আছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সানজিদা আক্তার বলেন, মনু নদীর বৃহৎ প্রকল্পের কাজ দ্রুত শেষ করতে জেলা উন্নয়ন সভায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে।
বিএসএফের বাধা নিরসনের জন্য সরকারের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে জানানো হয়েছে। শ্রীমঙ্গল ব্যাটালিয়নের (৪৬ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সরকার আসিফ মাহমুদ জানান, সীমান্তবর্তী বেড়িবাঁধের ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত অংশে মাটি ভরাটের কাজে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ঠিকাদারকে বিজিবি সহযোগিতা করবে।
