যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের বিদ্যুৎ অবকাঠামোয় হামলা চালায়, তাহলে লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ বন্ধ করে দেয়ার জন্য ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে প্রস্তুত থাকতে বলেছে ইরান। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত তিনটি সূত্র বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) রয়টার্সকে এ তথ্য জানিয়েছে।
সূত্রগুলোর মতে, ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে এবং সেই বার্তা হুতি মিত্রদের কাছে পৌঁছে দেয়া হয়েছে। দুইজন জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা এবং এ বিষয়ে জ্ঞাত একটি আঞ্চলিক সূত্র পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সম্প্রতি হুতিদের কাছে তেহরানের এই অনুরোধ পৌঁছে দেয়া হয়েছে।
তবে কীভাবে বার্তাটি পাঠানো হয়েছে বা মঙ্গলবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের হুমকির আগে নাকি পরে, সে বিষয়ে তারা বিস্তারিত জানাননি। এ বিষয়ে রয়টার্সের প্রশ্নের তাৎক্ষণিক কোনো জবাব দেয়নি ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা হুতি গোষ্ঠীর মুখপাত্র।
বাব আল-মান্দেব প্রণালির কাছে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন
হুতিদের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানায়, লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বার বাব আল-মান্দেব প্রণালির কাছে ইয়েমেনের হোদেইদাহ অঞ্চল ও এডেন উপসাগরসংলগ্ন পাহাড়ি এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন মোতায়েন করে জাহাজে হামলার সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে হুতিরা। এখন তারা শুধু নির্দেশের অপেক্ষায় রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি ইতোমধ্যে বন্ধ থাকায় যদি হুতিরা লোহিত সাগরে জাহাজ বা বন্দর লক্ষ্য করে হামলা শুরু করে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের দুটি প্রধান তেল রপ্তানি পথই একসঙ্গে অচল হয়ে পড়বে। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে।
ওই সূত্র আরও দাবি করে, ইয়েমেনে অবস্থানরত ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) প্রতিনিধিরাই বাব আল-মান্দেব প্রণালি কখন বন্ধ করা হবে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন।
সৌদি-হুতি উত্তেজনা আবারও বেড়েছে
ওই অঞ্চলে উত্তেজনা বৃদ্ধির আরেকটি ইঙ্গিত হিসেবে সোমবার সৌদি আরবের নিয়ন্ত্রণাধীন একটি বিমানবন্দরে হামলার অভিযোগ তুলে দেশটির দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে হুতিরা। এর মধ্য দিয়ে প্রায় চার বছর ধরে কার্যকর থাকা সৌদি ও হুথিদের যুদ্ধবিরতি কার্যত ভেঙে যায়।
ঝুঁকি বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান ভেরিস্ক ম্যাপলক্রফটের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক প্রধান বিশ্লেষক টরবইর্ন সলভেড্ট বলেন, এই সময়ে সৌদি ও হুতিদের মধ্যে নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
তার ভাষায়, যদি সংঘাত আরও তীব্র হয়ে লোহিত সাগরের তেল রপ্তানি অবকাঠামো ও জাহাজ চলাচলে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল রপ্তানির একমাত্র বড় বিকল্প পথও হুমকির মুখে পড়বে।
রিয়াদের ঘনিষ্ঠ দুটি আঞ্চলিক সূত্র জানায়, ইরান ও হুতিদের হুমকিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে সৌদি। তাদের মতে, লোহিত সাগর ইস্যুতে হুতিরা এখন ইরানের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে সমন্বয় করছে।
জ্বালানি বাজারে নতুন সংকটের শঙ্কা
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার পর ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হতো।
এরপর সৌদি আরব পাইপলাইনের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তেল লোহিত সাগরের দিকে সরিয়ে নেয়। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৭ শতাংশ জ্বালানি সরবরাহ এই জলপথ দিয়ে হয়।
গাজা যুদ্ধ চলাকালে হুতিদের হামলার কারণে অনেক আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানি লোহিত সাগরের পরিবর্তে আফ্রিকা ঘুরে দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল পথে জাহাজ চলাচল করতে বাধ্য হয়েছিল।
বর্তমানে সৌদি আরব তার প্রায় ৭০ শতাংশ জ্বালানি রপ্তানি লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দর দিয়ে করছে। ফলে ওই রুটে হামলা হলে বৈশ্বিক তেলের বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে।
একটি আঞ্চলিক সূত্রের ভাষ্য, বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করে যুক্তরাষ্ট্রকে চাপে ফেলাই ইরানের কৌশলের অংশ। লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল এবং সৌদির তেল রপ্তানিকে হুমকির মুখে ফেলে ওয়াশিংটনের ওপর চাপ বাড়াতে চাইছে তেহরান।
ওই সূত্রের দাবি, বাব আল-মান্দেব প্রণালি বন্ধ করা খুব কঠিন হবে না। যে কারও হাতে একটি রাইফেল থাকলেই জাহাজ চলাচল ব্যাহত করা সম্ভব। এ জন্য অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্রেরও প্রয়োজন নেই, বলেন তিনি।
হুতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের পাল্টাপাল্টি অবস্থান
ইরান হুতি গোষ্ঠীকে তাদের আঞ্চলিক ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ বা ‘প্রতিরোধ অক্ষ’-এর অংশ হিসেবে বিবেচনা করে। এই জোটে লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং ইরাকের কয়েকটি শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠীও রয়েছে।
তবে হুতিরা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতে সরাসরি অংশ নেয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, ইরান হুথিদের অস্ত্র, অর্থ ও প্রশিক্ষণ দিয়ে সহায়তা করছে এবং হিজবুল্লাহর মাধ্যমে এই সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হয়। তবে তেহরান এ অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে আসছে।
