ভারত-বৃটেন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি কার্যকর, চাপে পড়বে বাংলাদেশ?

বিবিসির প্রতিবেদন

ভারত-বৃটেন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি কার্যকর, চাপে পড়বে বাংলাদেশ?

ফন্ট সাইজ:

ভারত ও বৃটেনের মধ্যে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) বুধবার (১৫ জুলাই) থেকে কার্যকর হয়েছে। বিশ্বের পঞ্চম ও ষষ্ঠ বৃহত্তম অর্থনীতির মধ্যে হওয়া এই চুক্তিকে ঘিরে ইতিমধ্যেই ব্যবসা-বাণিজ্যে নতুন উদ্দীপনা দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে ভারতের বস্ত্র, পোশাক, জুতা, সামুদ্রিক পণ্য এবং মদ আমদানিকারক খাতগুলো এই চুক্তির সুফল পাওয়ার আশায় প্রস্তুতি শুরু করেছে।

ভারতের অন্যতম বৃহৎ হোম টেক্সটাইল প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ওয়েলস্পান লিভিং- যারা উইম্বলডনের চ্যাম্পিয়নদের ব্যবহৃত তোয়ালে তৈরি করে, তারা বলছে, চুক্তি কার্যকর হওয়ার ফলে বৃটেনে তাদের ব্যবসা উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারিত হবে।
প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) দীপালি গোয়েঙ্কা বিবিসিকে বলেন, বৃটেনের অনেক বড় খুচরা বিক্রেতা সম্প্রতি ভারতে এসে আগামী কয়েক বছরের ব্যবসায়িক পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেছেন।
তিনি বলেন, আগে আমরা মূলত যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতাদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি যৌথ পরিকল্পনা করতাম। এখন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির কারণে বৃটেনের ক্রেতারাও একইভাবে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করছে।

৯৯ শতাংশ ভারতীয় পণ্যে শুল্ক ছাড়
এই চুক্তির আওতায় বৃটেনে রপ্তানি হওয়া ভারতের ৯৯ শতাংশ পণ্যের ওপর শুল্ক সম্পূর্ণ তুলে দেয়া হয়েছে অথবা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হয়েছে। একই সঙ্গে ভারতের বাজারে যুক্তরাজ্যের ৯০ শতাংশ আমদানিকৃত পণ্যের ওপরও শুল্ক কমানো বা প্রত্যাহার করা হয়েছে।

বৃটিশ সরকার এই চুক্তিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ছাড়ার পর বৃটেনের সবচেয়ে বড় ও অর্থনৈতিকভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি হিসেবে উল্লেখ করেছে।
দেশটির সরকারের হিসাব অনুযায়ী, দীর্ঘমেয়াদে এই চুক্তির ফলে বৃটেনের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) বছরে প্রায় ৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন পাউন্ড (প্রায় ৬ দশমিক ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) এবং ভারতের জিডিপি বছরে প্রায় ৫ দশমিক ১ বিলিয়ন পাউন্ড সমপরিমাণ বৃদ্ধি পেতে পারে।

বস্ত্র ও পোশাক খাতে বড় সুযোগ
শ্রমনির্ভর শিল্প যেমন টেক্সটাইল, তৈরি পোশাক, জুতা, গাড়ি ও সামুদ্রিক পণ্য রপ্তানিকারকরা এই চুক্তিকে বড় সুযোগ হিসেবে দেখছেন। দীপালি গোয়েঙ্কা বলেন, আমি আশা করছি, এখন বৃটেনে আমাদের রপ্তানি দ্বি-অঙ্কের হারে (ডাবল ডিজিট) বাড়বে।
তিনি জানান, এতদিন ভারতীয় হোম টেক্সটাইল পণ্যের ওপর বৃটেনে ১২ শতাংশ আমদানি শুল্ক দিতে হতো। অন্যদিকে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান ডেভেলপিং কান্ট্রিজ ট্রেডিং স্কিমের ( ডিসিটিএস) আওতায় শুল্কমুক্ত সুবিধা পেত।
তার ভাষায়, শুধু হোম টেক্সটাইল খাতেই বৃটেনের বাজারে পাকিস্তানের অংশীদারিত্ব প্রায় ৫৫ শতাংশ, আর ভারতের মাত্র ৬ থেকে ৭ শতাংশ। এখন সেই ব্যবধান কমিয়ে আনার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

স্কচ হুইস্কির দামও কমতে পারে
চুক্তির ফলে বৃটেন থেকে আমদানি করা স্কচ হুইস্কির ওপর ভারতের আরোপিত ১৫০ শতাংশ আমদানি শুল্ক তাৎক্ষণিকভাবে কমে ৭৫ শতাংশে নেমে এসেছে। আগামী ১০ বছরে তা ধাপে ধাপে ৪০ শতাংশে নেমে আসবে।

দিল্লিভিত্তিক আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান মডার্ন ড্রিংকস প্রাইভেট লিমিটেডের কর্মকর্তা অবনীত সিং বলেন, এটি ছোটখাটো পরিবর্তন নয়, বরং বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তন।
তিনি জানান, বর্তমানে ব্যবসায়ীরা বৃটেনে সরবরাহকারীদের সঙ্গে প্রয়োজনীয় সার্টিফিকেট অব অরিজিন, শুল্কসংক্রান্ত কাগজপত্র, কাস্টমস বিধি এবং পরিবহন ব্যবস্থাপনা ঠিকঠাক করার কাজ করছেন, যাতে নতুন শুল্ক কাঠামোর সুবিধা প্রথম দিন থেকেই পাওয়া যায়।
তার মতে, আপাতত এটি প্রস্তুতির সময়। প্রকৃত লাভ কতটা হবে, তা বোঝা যাবে ব্যবসায়ীরা বাস্তবে কতটা শুল্ক সাশ্রয় করতে পারছেন, সেটি স্পষ্ট হওয়ার পর।

সুফল ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হবে
তবে বাণিজ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই চুক্তির প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে বিপ্লব ঘটাবে না; বরং ধীরে ধীরে এর সুফল পাওয়া যাবে। দিল্লিভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভর (জিটিআরআই) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভারত বৃটেনে ১৩ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। তবে এর অর্ধেকেরও বেশি পণ্য আগে থেকেই ‘মোস্ট ফেভার্ড নেশন’ (এমএফএন) সুবিধার আওতায় শুল্কমুক্ত ছিল।
অন্যদিকে একই সময়ে ভারত বৃটেন থেকে ১১ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। এর মধ্যে ৪৫ শতাংশের বেশি ছিল রূপা, যা এই চুক্তির আওতার বাইরে রাখা হয়েছে।

জিটিআরআইয়ের প্রতিষ্ঠাতা অজয় শ্রীবাস্তব বলেন, প্রকৃত সাফল্য তখনই বোঝা যাবে, যখন আগে ৪ থেকে ১৬ শতাংশ শুল্ক দেয়া লাগত- এমন পণ্য যেমন টেক্সটাইল, তৈরি পোশাক, জুতা, কার্পেট, গাড়ি, সামুদ্রিক খাদ্য, আঙুর ও আমের রপ্তানি আদেশ, রপ্তানির পরিমাণ এবং মুনাফা বাড়তে শুরু করবে। আগামী এক থেকে তিন বছরের মধ্যে এ বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, চুক্তি কার্যকর হলেও কিছু সমস্যা রয়ে গেছে। যেমন, বৃটেন নিজস্ব ইস্পাত শিল্পকে সুরক্ষা দিতে নির্দিষ্ট কোটার অতিরিক্ত ইস্পাত আমদানির ওপর শুল্ক বহাল রেখেছে।

এ ছাড়া বৃটেনের প্রস্তাবিত কার্বন বর্ডার অ্যাডজাস্টমেন্ট মেকানিজম (সিবিএএম) ভারতীয় রপ্তানিকারকদের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
অজয় শ্রীবাস্তব বলেন, এফটিএর কারণে শুল্ক শূন্যে নেমে এলেও কার্বন-সম্পর্কিত সীমান্ত কর কার্যকর হলে সংশ্লিষ্ট খাতে ভারতীয় পণ্যের প্রকৃত ব্যয় আবার বেড়ে যেতে পারে।

ছোট ব্যবসার জন্য সচেতনতা জরুরি
ভারতে অতীতে বিভিন্ন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির সুবিধা পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি। কারণ অনেক ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তা নতুন নিয়ম সম্পর্কে জানেন না। ধারণা করা হয়, ভারতের যোগ্য রপ্তানির মাত্র ২০ থেকে ৩০ শতাংশ এফটিএর সুবিধা ব্যবহার করতে পারে, যদিও আমদানির ক্ষেত্রে এই হার অনেক বেশি।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, একজন ভারতীয় পোশাক রপ্তানিকারককে নিজ উদ্যোগে বৃটেনের ক্রেতাকে জানাতে হবে যে, আগে শার্টের ওপর ১২ শতাংশ শুল্ক থাকলেও এখন তা শূন্য হয়েছে। এরপর সেই অনুযায়ী নতুন মূল্য ও চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উৎপত্তির নিয়ম এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র সম্পর্কে ব্যবসায়ীদের প্রশিক্ষণ দেয়া জরুরি। না হলে শুল্ক কমলেও রপ্তানি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাড়বে না।

তৈরি পোশাক খাতে ভারতের সম্ভাবনা
গবেষণা প্রতিষ্ঠান কেয়ারএজ রিসার্চ বলছে, এই চুক্তি ভারতের তৈরি পোশাক (আরএমজি) শিল্পের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এসেছে। বর্তমানে বৃটেনে তৈরি পোশাক আমদানির সবচেয়ে বড় অংশীদার চীন। তবে উৎপাদন ব্যয় ও শ্রম খরচ বৃদ্ধির কারণে চীনের প্রতিযোগিতা কমছে। পাশাপাশি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার কারণে অনেক আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড বিকল্প উৎস খুঁজছে।
এমন পরিস্থিতিতে কেয়ারএজের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বৃটেনে তৈরি পোশাক আমদানির বাজারে ভারতের অংশীদারিত্ব ২০২৪ সালের ৬ শতাংশ থেকে বেড়ে নিকট ও মধ্যমেয়াদে প্রায় ১২ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।

প্রতিষ্ঠানটির মতে, এই মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির ফলে ভারত ও বৃটেনের মধ্যে মোট দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য প্রবৃদ্ধি বর্তমান ১০-১২ শতাংশের পরিবর্তে বছরে প্রায় ১৫ শতাংশে উন্নীত হতে পারে। একই সঙ্গে উভয় দেশের ভোক্তারা আরও উন্নতমানের পণ্য এবং বৈচিত্র্যময় পণ্যের সুবিধা পাবেন।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন