প্রথম আলো
দৈনিক প্রথম আলোর প্রথম পাতার শিরোনাম ‘দুই বছরেও শেষ হয়নি ৮৬% মামলার তদন্ত। প্রতিবেদনে বলা হয়, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে হতাহতের ঘটনায় সারা দেশে মামলা হয়েছিল ১ হাজার ৮৬২টি। প্রায় দুই বছরে মাত্র ২৫৪ মামলার (১৩ দশমিক ৬৪ শতাংশ) তদন্ত শেষে প্রতিবেদন দিয়েছে পুলিশ। বাকি ৮৬ দশমিক ৩৬ শতাংশ মামলার তদন্ত এখনো শেষ হয়নি।
পুলিশের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে হতাহতের ঘটনায় করা মামলাগুলো তদন্ত করতে পুলিশ নানা রকম জটিলতার মুখে পড়েছে। কারণ, বেশির ভাগ ঘটনায় ময়নাতদন্ত ছাড়াই লাশ দাফন করা হয়েছে। এখন লাশ তুলে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পেতে সময় লাগছে। ঘটনার সময়ই ময়নাতদন্ত হলে গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যু বা মৃত্যুর সঠিক কারণ উল্লেখ থাকত। এখন দীর্ঘ সময় পর লাশের ময়নাতদন্ত হওয়ায় মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না।
এ ছাড়া মামলার বিবরণে ঘটনাস্থলের ভুল বর্ণনা, একই ব্যক্তি শহীদ হওয়ার ঘটনায় বিভিন্ন ঘটনাস্থল দেখিয়ে একাধিক মামলা হওয়া, অনেক মামলায় ঢালাও আসামি করা ইত্যাদি অসংগতির কারণে তদন্তকাজে বিলম্ব হচ্ছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি—অপরাধ) মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান প্রথম আলোকে বলেন, গণঅভ্যুত্থানে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ফরেনসিক প্রতিবেদন একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। হত্যাকাণ্ডের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পেতে সময় লাগছে। অনেকের লাশ বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়েছে। পরিচয় শনাক্ত না হওয়া পর্যন্ত সেসব ব্যক্তির মৃত্যুর ঘটনায় মামলা ও তদন্ত করাও সমস্যা। এসব নিয়ে জটিলতায় পড়তে হচ্ছে। এ ছাড়া বিভিন্ন ত্রুটি, পদ্ধতিগত জটিলতা ও ঘটনা সম্পর্কে পরিষ্কার চিত্র না পাওয়ায় অনেক মামলার তদন্ত শেষ করতে সময় লাগছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ৩০ জুন পর্যন্ত গণ-অভ্যুত্থানে হতাহতের ঘটনায় হওয়া ১ হাজার ৮৬২ মামলার মধ্যে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে মাত্র ১৯৯টির। অভিযোগের প্রমাণ না পাওয়ায় ৫৫টি মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছে পুলিশ। গণ-অভ্যুত্থানের ঘটনায় হত্যা মামলা হয়েছিল ৭৯৯টি। এসব মামলায় মোট আসামি ৩ লাখ ২৭ হাজার ৮৪১ জন। এর মধ্যে এজাহারভুক্ত আসামি ৬৫ হাজার ২১০ এবং সন্দেহভাজন আসামি ২ লাখ ৬২ হাজার ৬৩১ জন।
মামলাগুলো তদন্ত করছে থানা, পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই), পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), অ্যান্টিটেররিজম ইউনিট (এটিইউ) এবং গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
হত্যা মামলাগুলোর মধ্যে ৬৩টির ক্ষেত্রে প্রমাণ পাওয়ায় অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। আর ঘটনার সঙ্গে কারও সম্পৃক্ততা না পেয়ে ৩৭টি মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। এসব মামলায় অভিযোগপত্রভুক্ত আসামির সংখ্যা ৫ হাজার ৭৯৩।
পুলিশ সদর দপ্তর জানায়, গণ-অভ্যুত্থানে আহত হওয়ার ঘটনায় সারা দেশে মামলা হয়েছে ১ হাজার ৬৩টি। মোট আসামি ২ লাখ ৮২ হাজার ৮৭৯ জন। এর মধ্যে এজাহারভুক্ত ৮৯ হাজার ১২১ এবং সন্দেহভাজন ১ লাখ ৯৩ হাজার ৭৫৮। তদন্ত শেষে ১৫৪টি মামলার প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। ১৩৬টি মামলায় অভিযোগপত্র এবং ১৮টি মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছে পুলিশ। এতে অভিযোগপত্রভুক্ত আসামির সংখ্যা ১০ হাজার ২০২।
ঢালাও মামলায় নিরীহ মানুষও আসামি
২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে ছাত্র-জনতার ওপর নির্বিচার গুলি চালান আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। এ কারণে ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পুলিশের অনেক সদস্য আত্মগোপনে চলে যান। তখন পুরো পুলিশি কার্যক্রম ভেঙে পড়ে। পরে ধীরে ধীরে থানার কার্যক্রম শুরু হলে মামলা হতে থাকে। তবে সে সময় পুলিশের সঠিক তদারকির অভাবে অনেক মামলা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। পূর্বশত্রুতা, ব্যবসায়িক বিরোধ, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শায়েস্তা করা, চাঁদাবাজি, হয়রানি করতে ও বিদ্বেষের কারণে অনেক নিরীহ মানুষকে আসামি করা হয়েছে। মামলায় কাদের আসামি করা হবে, তা অনেক ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ করেছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতারা।
মামলায় ঢালাও আসামি করার বিষয়টি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে ২০২৪ সালের ১৪ অক্টোবর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়। যারা এ ধরনের মামলা করে অপতৎপরতা চালাচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নির্দেশ দেওয়া হয়। আর হয়রানিমূলকভাবে যাদের আসামি করা হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে না বলে সরকারের উচ্চপর্যায় ও পুলিশের পক্ষ থেকে বারবার বলা হয়। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ঘটনায় মামলার তদন্ত তদারকে বিশেষ মনিটরিং দল গঠন করে পুলিশ সদর দপ্তর।
ঢালাও আসামি
ঢাকার মিরপুর মডেল থানা-সংলগ্ন মিরপুর শপিং কমপ্লেক্সের সামনে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গুলিতে আহত হয়ে পরে মারা যায় কলেজছাত্রী রিতা আক্তার (১৭)। ওই ঘটনায় করা মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, মন্ত্রী, পুলিশসহ ৩৯৫ জনকে আসামি করা হয়। এর মধ্যে মিরপুর-১ নম্বরের মুক্তবাংলা শপিং কমপ্লেক্সের ব্যবসায়ী আফরোজ উদ্দিন ও শাহ আলী থানার ডি ব্লকের বাসিন্দা কাজী জয়নালের নামও রয়েছে।
ব্যবসায়ী আফরোজ উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, তাকে ফাঁসানো হয় তার ভাইয়ের হত্যা মামলা তুলে না নেওয়ার কারণে। ২০০৫ সালে চাঁদার জন্য শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহাদতের নেতৃত্বে দুর্র্ধষ সন্ত্রাসীরা তার বড় ভাই ব্যবসায়ী আফতাব উদ্দিনকে গুলি করে হত্যা করে। ভাইয়ের হত্যা মামলার আসামিরাই তাকে রিতা হত্যা মামলায় ফাঁসিয়েছে।
মামলার বাদী রিতার বাবা আশরাফ আলী পেশায় রিকশাচালক। ঘটনার সময় থাকতেন মিরপুর-২ নম্বর সেকশনে। এখন থাকেন গ্রামের বাড়ি জয়পুরহাটের কালাইয়ে। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘বিএনপির লোকেরা থানায় ছিল। তারা আসামির তালিকা ঠিক করে দিয়েছে। আমাকে সই করতে বলেছে, সই করেছি। আসামি কতজন, সঠিক বলতে পারব না।’
আসামির তালিকায় থাকা আফরোজ ও কাজী জয়নালকে চেনেন কি না, জানতে চাইলে বাদী আশরাফ বলেন, ‘আমি চিনব কীভাবে। বিএনপির লোকজন আমাকে কিছু টাকাপয়সা দিছিল, তারাই তো মামলায় নাম ঢুকাইছে। ভালো-মন্দ সবাই মামলায় ঢুইক্যা গ্যাছে। হামি সাক্ষ্য দিয়ে নির্দোষ লোকদের বাঁচাতে চাই।’
মামলাটি তদন্ত করছে পিবিআই। এর সঙ্গে যুক্ত একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, হত্যাকাণ্ডে আফরোজ উদ্দিনের সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি। পুলিশসহ এ মামলায় অনেক আসামি। তাই তদন্ত শেষ করে অভিযোগপত্র দিতে সময় লাগছে। আফরোজ উদ্দিনসহ যারা জড়িত নন, তাদের অব্যাহতির সুপারিশ করা হবে।
জুলাই অভ্যুত্থানের মামলাগুলোর তদন্তকাজ তত্ত্বাবধান করছেন পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক খোন্দকার রফিকুল ইসলাম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, আগে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতারা হত্যাকাণ্ড নিয়ে অনেক তথ্য দিতেন। এখন তারা কথা বলতে চান না। এ অবস্থায় হত্যা মামলা তদন্ত করতে গিয়ে সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
পুলিশের এই শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা আরও বলেন, একই ব্যক্তি হত্যার ঘটনায় ঘটনাস্থল তিন জায়গা দেখিয়ে পৃথক তিন থানায় ঢালাও আসামি করে মামলা করা হয়েছে। এ রকম অনেক মামলা রয়েছে, তারা নিহত ব্যক্তির ভাই বা স্বজন পরিচয় দিয়ে মামলা করেন। এসব মামলা নিয়ে বাণিজ্যও হচ্ছে। অনেক ঘটনার তদন্তে বাদীর সঙ্গে নিহত ব্যক্তির কোনো সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া যায়নি। এ ধরনের ভুয়া মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে।
তথ্য সংরক্ষণ করেনি কেউ
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র বলছে, বেশির ভাগ মামলা হয়েছে ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই এবং ৪ ও ৫ আগস্টের হতাহতের ঘটনায়। ১৯ জুলাই রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলায় নিহত হয়েছেন দেড় শতাধিক মানুষ। এরপর ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দেশত্যাগ এবং আগের দিন ৪ আগস্ট ব্যাপক হতাহতের ঘটনা ঘটে। তখন তীব্র আন্দোলনের মুহূর্তে মরদেহগুলো কোথায় যাচ্ছে, কোথায় দাফন করা হচ্ছে, চিকিৎসাধীন অবস্থায় কে, কীভাবে মারা গেছেন, সেসব তথ্য পুরোপুরি সংরক্ষণ করেনি হাসপাতাল, পুলিশ বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষ।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে এখন পর্যন্ত ৮৪৩ জন শহীদের নাম গেজেট আকারে প্রকাশ করেছে সরকার। এখন পর্যন্ত হত্যা মামলা হয়েছে ৭৯৯টি। এ অবস্থায় বাকি হত্যা ঘটনাগুলোর বিচারের কী হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, আন্দোলনে অনেক শহীদের পরিচয় এখনো শনাক্ত হয়নি। আবার গেজেটে থাকা নামগুলোর কয়েকটির বিষয়ে অধিকতর যাচাই-বাছাইয়ের প্রয়োজন রয়েছে। এসব কারণে সব ঘটনায় হত্যা মামলা হয়নি। তবে শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর সঠিক কারণ নিশ্চিত হলে এবং শহীদের পরিচয় পাওয়া গেলে পুলিশের পক্ষ থেকেও মামলা করা হতে পারে।
মানবাধিকারকর্মী নূর খান প্রথম আলোকে বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত হতাহত ব্যক্তিদের নাম লিপিবদ্ধ করতে তিনি হাসপাতালে গিয়েছিলেন। তখন পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা ও আওয়ামী লীগের লোকজন তার কাছ থেকে কাগজপত্র কেড়ে নেয়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পুলিশ-গোয়েন্দা সংস্থা ও দলীয় লোকদের মাধ্যমে প্রভাবিত হয়ে অনেক চিকিৎসককে আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসায় বাধা দিতে তিনি দেখেছেন। অনেকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় হাসপাতালে আনার পথে মারা গেলে একই ব্যক্তিরা লাশের সুরতহাল প্রতিবেদন ও ময়নাতদন্ত না করিয়ে তাদের বেওয়ারিশ হিসেবে দাফনের ব্যবস্থা করে। মরদেহগুলো স্বজনদের কাছে পর্যন্ত দেওয়া হয়নি। হাসপাতালে হতাহতের বেশির ভাগ রেকর্ড নষ্ট করে ফেলা হয়েছে। মৃত ব্যক্তির আঙুলের ছাপ থেকে লাশ চিহ্নিত করার সুযোগ থাকলেও তা সঠিকভাবে করা হয়নি। আবার ৫ আগস্টের পর দুর্বৃত্তরা জোর খাটিয়ে অনেক মামলায় ঢালাওভাবে অসংখ্য নিরীহ মানুষকে আসামি করে মামলা-বাণিজ্য করেছে। ফলে মামলাগুলোর তদন্ত জটিল হয়ে উঠেছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ৬ রায়
গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের প্রায় আড়াই মাস পর ২০২৪ সালের ১৪ অক্টোবর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করে অন্তর্বর্তী সরকার। বিচার কার্যক্রমকে গতিশীল করতে গত বছরের ৮ মে আরেকটি ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। দুটি ট্রাইব্যুনাল থেকে ১৯ মাসে জুলাইয়ে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধকেন্দ্রিক ছয়টি মামলায় রায় দেওয়া হয়।
ছয়টি রায় বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, দণ্ডপ্রাপ্ত ৬১ আসামির মধ্যে ৪০ জনই পলাতক, কারাগারে আছেন ২১ জন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পুলিশের সাবেক ১১ সদস্যের মধ্যে ৭ জন পলাতক এবং ৪ জন কারাবন্দী আছেন। পলাতক ব্যক্তিদের রয়েছেন মধ্যে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, ডিএমপির সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী, রমনা অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার শাহ্ আলম মো. আখতারুল ইসলাম, আশুলিয়া থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ এফ এম সায়েদ, সাবেক সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) বিশ্বজিৎ সাহা, খিলগাঁও অঞ্চলের সাবেক এডিসি মো. রাশেদুল ইসলাম ও রামপুরা থানার সাবেক ওসি মো. মশিউর রহমান। এ নিয়ে প্রথম আলোয় বিস্তারিত প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে ৩ জুলাই।
তদন্ত দ্রুত শেষ করা জরুরি
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আবদুল কাইয়ুম প্রথম আলোকে বলেন, গণ-অভ্যুত্থানের ঘটনায় হওয়া অনেক মামলায় ঢালাও আসামি করে অনেক নির্দোষ মানুষকে আসামি করে হয়রানি করা হচ্ছে। এসব মামলা নিয়ে বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে। মহানগর ও জেলা পর্যায়ে কমিটি গঠন করে তাদের তত্ত্বাবধানে সময় বেঁধে দিয়ে মামলাগুলোর তদন্ত দ্রুত শেষ করা জরুরি। তদবির ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে শক্ত প্রমাণ ছাড়া কাউকে অভিযোগপত্রভুক্ত না করতে পুলিশকে নির্দেশনা দিতে হবে। সে ক্ষেত্রে পুলিশকে পৃথক ক্ষমতা দিতে হবে। সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতেই অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে পুলিশি প্রতিবেদন দিতে হবে।
সমকাল
সমকালের প্রথম পাতার শিরোনাম ‘কোনোভাবেই উগ্রবাদকে প্রশ্রয় দেবে না সরকার।’ প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমান সরকার কোনোভাবে কোনো চরমপন্থা বা উগ্রবাদকে প্রশ্রয় দেবে না বলে দৃঢ় অবস্থান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
গতকাল বুধবার জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে তিনি বলেছেন, বাংলাদেশে চরমপন্থা বা উগ্রবাদের ঠাঁই হবে না। সরকারি ও বিরোধী দল কোনো কোনো বিষয়ে দ্বিমত থাকলেও অনেক বিষয়ে একমত হয়েছি। উগ্রবাদ ও চরমপন্থা প্রশ্নে বিরোধী দলের সম্পূর্ণ সহযোগিতা পাব বলে বিশ্বাস করি।
এ সময় তারেক রহমান জানান, রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাক্ষরিত জুলাই সনদের প্রতিটি দফা বাস্তবায়নে বিএনপি জনগণের কাছে দায়বদ্ধ-অঙ্গীকারবদ্ধ। বিএনপি সরকার ‘ইউনিভার্সেল কার্ড’ চালু করবে। এক কার্ডে সব সুবিধা মিলবে।
আজকের পত্রিকা
আজকের পত্রিকার প্রধান শিরোনাম ‘বেতনের গেজেট আগস্টে।’ প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকারি চাকরিজীবীদের নবম জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনা কমিটির কাজ এখন শেষ পর্যায়ে। আর দু-তিনটি সভা করেই সুপারিশ চূড়ান্ত করবে তারা।
পর্যালোচনা কমিটির সুপারিশ মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর অগাস্টের প্রথম সপ্তাহে নতুন বেতনকাঠামোর গেজেট প্রকাশের প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার।
পর্যালোচনা কমিটি সূত্র জানায়, কমিটির সদস্যরা ২০২৬ সালের পহেলা জুলাই থেকে মূল বেতন এবং ২০২৭ সালের পহেলা জুলাই থেকে ভাতা কার্যকরের বিষয়ে একমত হয়েছেন।
তবে বিষয়টি নিজেরা চূড়ান্ত না করে মন্ত্রিসভা থেকে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত চাইবে পর্যালোচনা কমিটি।
নতুন বেতনকাঠামোয় সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতন সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর বিষয়ে কমিটিতে আলোচনা হয়েছে। সব গ্রেডে সমান হারে বেতন না বাড়িয়ে নিচের গ্রেডের কর্মচারীদের বেতন তুলনামূলকভাবে বেশি বাড়ানোর পক্ষে মত দিয়েছেন কমিটির বেশিরভাগ সদস্য।
মূল বেতনের সঙ্গে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও যাতায়াত ভাতাসহ বিভিন্ন ভাতা পুনর্বিন্যাসের বিষয়েও কমিটিতে আলোচনা হয়েছে।
বণিক বার্তা
বণিক বার্তার প্রধান শিরোনাম ‘প্রায় ২ হাজার সন্দেহজনক লেনদেনে ব্যাংক-এমএফএসে জমা ৬ হাজার কোটি টাকা।’ প্রতিবেদনে বলা হয়, অনলাইন জুয়া, বেটিং, প্রতারণা ও ক্রিপ্টোকারেন্সি-সংশ্লিষ্ট অবৈধ আর্থিক কর্মকাণ্ড উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে।
২০২০-২৪ সাল, এই পাঁচ বছরে এ ধরনের কার্যক্রমে সংশ্লিষ্ট প্রায় দুই হাজার সন্দেহজনক লেনদেনের প্রতিবেদন (এসটিআর/এসএআর) পেয়েছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)।
এসব ঘটনায় ব্যাংক ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) ব্যবহার করে ছয় হাজার ১৪৪ কোটি টাকার বেশি জমা এবং প্রায় চার হাজার ৩৫০ কোটি টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। এক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়েছে ছয় হাজার ২২২টি ব্যাংক ও এমএফএস হিসাব।
গতকাল প্রকাশিত বিএফআইইউর ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২০ সালে এ ধরনের মাত্র ৫০টি সন্দেহজনক লেনদেনের প্রতিবেদন পাওয়া গেলেও ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় এক হাজার ৪৬টিতে।
সংস্থাটির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, অনলাইন গেমিং ও জুয়ার অর্থ শুধু ব্যাংক বা এমএফএস হিসাবেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। পাচারের উদ্দেশ্যে এসব অর্থ ক্রিপ্টোকারেন্সি, হুন্ডি এবং অন্যান্য অবৈধ চ্যানেলে স্থানান্তরের প্রবণতাও বাড়ছে।
নয়া দিগন্ত
নয়া দিগন্তের প্রথম পাতার শিরোনাম ‘হাসিনা পরিবার ও ১০ শিল্প গ্রুপের ৭৬ হাজার কোটি টাকার সম্পদ জব্দ।’ প্রতিবেদনে বলা হয়, গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার ছোট বোন শেখ রেহেনাসহ তাদের পরিবারের সদস্য এবং আলোচিত ১০টি শিল্প গ্রুপের দেশে-বিদেশে থাকা প্রায় ৭৬ হাজার কোটি টাকার সম্পদ জব্দ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে বিএফআইইউ।
এই দশ বণিক গোষ্ঠী তদন্তের আওতায় রয়েছে। শিল্প গ্রুপগুলো হলো— এস আলম, বেক্সিমকো, নাসা, সামিট, নাবিল, ওরিয়ন, বসুন্ধরা, প্রিমিয়ার, সিকদার ও আরামিট গ্রুপ।
একই সাথে সংস্থাটি জানিয়েছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সন্দেহজনক লেনদেন ও কার্যক্রমের (এসটিআর/এসএআর) রিপোর্টিং আগের বছরের তুলনায় ৭৪ দশমিক ১০ শতাংশ বেড়ে ৩০ হাজার ১৯৯টিতে পৌঁছেছে, যার ৯৫ শতাংশই এসেছে ব্যাংক খাত থেকে।
দেশ রূপান্তর
দেশ রূপান্তরের শেষের পাতার শিরোনাম ‘৬ মাসে রাজনৈতিক ও নির্বাচনী সহিংসতায় ৫৬ জন নিহত।’ প্রতিবেদনে বলা হয়, মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাস জানুয়ারি-জুনে সারাদেশে ৮৩০টি সহিংসতার ঘটনায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ৫৬ জন নিহত এবং ৫ হাজার ২৪৬ জনের বেশি নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ আহত হয়েছেন।
নিহতদের মধ্যে বিএনপির ৩৭ জন, জামায়াতের ছয়, আওয়ামী লীগের তিন এবং অন্যান্য দলের আটজন রয়েছেন।
৮৩০টি সহিংসতার ঘটনার ৬৭৩টিই ঘটেছে বিএনপির অন্তর্কোন্দল ও বিএনপির সাথে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের মধ্যে। বিএনপির অন্তর্কোন্দলে ২৭৩টি ঘটনায় ৩১ জন নিহত এবং ২ হাজার ৯২ জন আহত হয়েছেন।
গত ছয় মাসে গণপিটুনি ও মব সহিংসতায় সারাদেশে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, বাগ্বিতন্ডা, আধিপত্য বিস্তার, ধর্মীয় অবমাননাসহ নানা অভিযোগে ২৬১টি ঘটনায় ১৩৩ জন নিহত এবং ২৫৬ জন আহত হয়েছেন। যেখানে ২০২৫ সালের একই সময়ে ১৪১টি ঘটনায় অন্তত ৬৭ জন নিহত এবং ১১৯ জন আহত হন।
কালের কণ্ঠ
কালের কণ্ঠের প্রথম পাতার শিরোনাম ‘বিশ্বে ফের অস্থির তেলের দাম, বিপিসির বড় লোকসানের শঙ্কা।’ প্রতিবেদনে বলা হয়, যুদ্ধকে ঘিরে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ফের ঊর্ধ্বমুখী হওয়ায় বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও আমদানি ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
সবচেয়ে বড় চাপের মুখে পড়তে যাচ্ছে রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)।
আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চমূল্যে তেল কিনে দেশে কম দামে বিক্রি করতে হওয়ায় সংস্থাটি আবারও বড় অঙ্কের লোকসানের মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
গত ফেব্রুয়ারিতে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বেশি দামে তেল ও এলএনজি আমদানি করে অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্য সমন্বয় না করায় সরকারকে প্রায় ৩১ হাজার কোটি টাকার আর্থিক চাপ বহন করতে হয়েছে।
এর মধ্যে শুধু মার্চ থেকে জুন— এই চার মাসে তেল আমদানিতে বিপিসির লোকসান হয়েছে প্রায় ২১ হাজার কোটি টাকা।
এদিকে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় গত মার্চ থেকে কোনো সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এলএনজি দিচ্ছে না। ফলে পুরোপুরি স্পট মার্কেটের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
অন্যদিকে, আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত জি-টু-জি পদ্ধতিতে ১৬ লাখ টন ডিজেল, অকটেন, ফার্নেস অয়েল ও জেট ফুয়েল আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে সরবরাহকারী কম্পানিগুলোর সঙ্গে প্রাথমিক সমঝোতা সম্পন্ন হয়েছে।
