শ্বাসরোধ হয়ে আসছিল আর্জেন্টাইন ও বিশ্বজুড়ে তাদের কোটি কোটি ভক্তের। তারা ধরেই নিয়েছিলেন হেরে যাচ্ছে মেসিবাহিনী। কিন্তু কি এক অবিশ্বাস্য জাদু দেখালেন লিওনেল মেসি। ম্যাচ শেষ হতে নিয়ম অনুযায়ী তখন আর ৫/৭ মিনিট বাকি। তখন পুরো খেলা নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আর্জেন্টিনাকে পৌঁছে দিলেন ফাইনালে। সঙ্গে সঙ্গে সেই ‘মৃতপ্রায়’ আর্জেন্টাইন ও তাদের সমর্থকরা উল্লাসে চিৎকার করে ফেটে পড়লেন। লাইতারো মার্টিনেজের গোলের সঙ্গে সঙ্গে রাজধানী বুয়েন্স আয়ারসে মুহূর্তে যেন বিস্ফোরণ ঘটলো। পারমাণবিক বিস্ফোরণের মতো মানুষ রাস্তায় নেমে এলো। কেউ চিৎকার করছেন। কেউ কাঁদছেন। কেউ খালি গায়ে পাগলের মতো দৌড়াচ্ছেন।
কারণ তাদের জাদুকর ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বার এবং নিজেদের ইতিহাসে তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ ফাইনালে উঠিয়েছেন। তরুণ-তরুণীরা বৈদ্যুতিক খুঁটি ও ট্রাফিক সিগন্যালের ওপর উঠে জাতীয় পতাকা ওড়াতে থাকেন। আবেগে আপ্লুত হয়ে অনেককে কান্নায় ভেঙে পড়তেও দেখা যায়। লিওনেল মেসির জোড়া অ্যাসিস্টে এনজো ফার্নান্দেজ ও লাউতারো মার্টিনেজের গোলের সুবাদে আটলান্টায় অনুষ্ঠিত সেমিফাইনালে নাটকীয় জয় পাওয়ার পর শুরু হয় এই উদ্যাপন। বুয়েন্স আয়ারসের কেন্দ্রস্থলের ঐতিহাসিক ওবেলিস্ক স্মৃতিস্তম্ভের দিকে মানুষের ঢল নামে। চারদিকে বাজতে থাকে গাড়ির হর্ন, ফুটতে থাকে আতশবাজি, আর হাজারো কণ্ঠে ধ্বনিত হতে থাকে সমর্থকদের গান। ৪৮ বছর বয়সী ক্যাথলিক সন্ন্যাসিনী রোসানা বেতো ক্রুজ বলেন, চারদিকে তাকান। কত অচেনা মানুষ একসঙ্গে লাফাচ্ছে, নাচছে। তিনি আরও বলেন- বিশ্বকাপ, আমাদের জাতীয় দল, এগুলোই এমন মুহূর্ত তৈরি করে। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা এপি।
অনেক সমর্থকের মতে, এই আনন্দ শুধু ফাইনালে ওঠা বা চার বছর আগে কাতারে জেতা শিরোপা ধরে রাখার সম্ভাবনা নয়; বরং ঐতিহাসিক প্রতিদ্বন্দ্বী ইংল্যান্ডকে হারানোর মধ্যেও বিশেষ আবেগ কাজ করেছে। আর্জেন্টিনা ও বৃটেনের মধ্যে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিরোধের কেন্দ্র ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ, যাকে আর্জেন্টিনা মালভিনাস নামে নিজেদের ভূখণ্ড বলে দাবি করে। ৪০ বছর বয়সী মারিয়া বেরতেরো বলেন, এটা শুধু ফুটবল নয়। এটা সেই দেশকে হারানোর আনন্দ, যারা আমাদের হৃদয় ভেঙেছিল। তিনি ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড যুদ্ধের কথা স্মরণ করে বলেন, যে তরুণদের মৃত্যুর মুখে পাঠানো হয়েছিল, তাদের কথা মনে পড়লে এখনো বুক কেঁপে ওঠে। তবে ম্যাচের প্রসঙ্গে এসে তার কণ্ঠে উচ্ছ্বাস, এটা অসাধারণ। এটা যেন জাদু। আমি আর্জেন্টাইন হতে পেরে গর্বিত।
সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি ওঠে, ফিফা ও ম্যাচ কর্মকর্তারা নাকি লিওনেল মেসি ও আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে তুলতে সহায়তা করেছেন। যদিও এ ধরনের অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই। তবে টুর্নামেন্টে কয়েকটি বিতর্কিত রেফারিং সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবুও এতে আর্জেন্টিনার সমর্থকদের উচ্ছ্বাসে কোনো ভাটা পড়েনি। জর্জ লুইস লেমা নামে এক সমর্থক বলেন, যারা বলছে সব সাজানো, তারা কি মাঠে কী হয়েছে সেটা দেখেছে? আমরা কত কষ্ট করেছি! বুয়েন্স আয়ারসের একটি বারে ম্যাচটি দেখছিলেন তিনি। ৮৫ মিনিটে এনজো ফার্নান্দেজের সমতাসূচক গোলের আগ পর্যন্ত পরিবেশ ছিল স্তব্ধ। তিনি বলেন, এসব অভিযোগ মিথ্যা। ফুটবল তো ফুটবলই। যে ভালো খেলবে, সেই জিতবে। আর আর্জেন্টিনা আবারও জিতেছে।
ফকল্যান্ড যুদ্ধের স্মৃতি এখনো তাজা
১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড যুদ্ধে ৬৪৯ জন আর্জেন্টাইন নিহত হন। তাদের অনেকেই ছিলেন স্বল্প প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত তরুণ সেনা। তারা বৃটিশ বাহিনীর তুলনায় দুর্বল অবস্থায় যুদ্ধ করেন। এই যুদ্ধ আর্জেন্টিনার ইতিহাসের অন্যতম বেদনাদায়ক অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়। ফুটবলেও এর প্রতিফলন দেখা যায়। ১৯৮৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দিয়েগো ম্যারাডোনার বিখ্যাত ‘হ্যান্ড অব গড’ গোল এবং ৫৮ মিটার একক দৌড়ে করা ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’ এখনো ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত মুহূর্তগুলোর একটি। তবে ম্যাচের আগে ফকল্যান্ড যুদ্ধের একদল আর্জেন্টাইন সাবেক যোদ্ধা উত্তেজনা কমানোর আহ্বান জানিয়ে বলেন, ম্যারাডোনার সেই দুই গোলই আমাদের প্রতিশোধ নিয়ে দিয়েছে। ইংল্যান্ডের সঙ্গে ক্রীড়াঙ্গনে আর কোনো হিসাব বাকি নেই।
মেসির নতুন ইতিহাস
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম এবং সম্ভবত শেষবারের মতো খেলতে নেমে ৩৯ বছর বয়সী লিওনেল মেসি আবারও নিজের ছাপ রেখে গেলেন। ম্যারাডোনার উত্তরসূরি হিসেবে প্রত্যাশার ভার বহন করা মেসি আরও একবার দেশের আশা পূরণ করলেন। ম্যাচ শেষে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা ‘লাস মালভিনাস সন আর্জেন্তিনাস’ লেখা একটি বড় ব্যানার প্রদর্শন করেন। যার অর্থ- ‘মালভিনাস আর্জেন্টিনার’। ২৮ বছর বয়সী সমর্থক মাতিয়াস আদোর্নো বলেন, এই বয়সেও মেসিকে যেভাবে খেলতে দেখছি, তাতে আমি বাকরুদ্ধ। তিনি আরও বলেন, আমরা আর্জেন্টাইনরা সব সময় তার ওপর বিশাল চাপ দিয়েছি। কিন্তু তিনি আমাদের সবকিছুই দিয়েছেন। রাজধানীর ঐতিহাসিক আভেনিদা নুয়েভে দে হুলিও সড়কজুড়ে ভেসে আসে স্লোগান- ‘মালভিনাসের জন্য, দিয়েগোর জন্য, লিওর শেষ বিশ্বকাপের জন্য।’ আরেকটি বহু পুরোনো সমর্থকগানও বারবার শোনা যায়- ‘যে লাফ দিচ্ছে না, সে একজন ইংরেজ।’
অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেও আনন্দের উপলক্ষ
চরম মূল্যস্ফীতি ও রাজনৈতিক বিভাজনের মধ্যে থাকা আর্জেন্টিনার মানুষের জন্য এই জয় যেন স্বস্তির এক বিরল মুহূর্ত হয়ে এসেছে। ৪০ বছর বয়সী ইয়ানিনা কুইন্তেরোস ছয় বছর বয়সী মেয়েকে কাঁধে নিয়ে উদ্যাপনে অংশ নেন। তিনি বলেন, এটা নিখাদ আনন্দ। জীবন এখন খুব ব্যয়বহুল। দেশের পরিস্থিতিও কঠিন, আর এই প্রেসিডেন্ট আমাদের বিভক্ত করে ফেলেছেন। তিনি আরও বলেন, আজ দাদা-দাদি, মা-বাবা, সন্তান- সবাই একসঙ্গে শুধু আনন্দ উদ্যাপন করতে এসেছে।
