জাতীয় সংসদে মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের একটি নিখুঁত, নির্ভুল ও সর্বজনগ্রাহ্য তালিকা প্রণয়নের দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানিয়েছেন, নিবিড় গবেষণার ভিত্তিতে একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরির জন্য মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে দেশের বিশিষ্ট মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষকদের নিয়ে বিশেষজ্ঞ সভার আয়োজন এবং বিভিন্ন অংশীজনদের সাথে আলোচনার মাধ্যমে একটি বিস্তারিত ও বাস্তবসম্মত কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হচ্ছে। সরকার মনে করে, এই উদ্যোগের সফল বাস্তবায়নের মাধ্যমেই মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যার শিকার ব্যক্তি ও সকল শহীদের আত্মত্যাগের যথাযোগ্য স্বীকৃতি ও মর্যাদা প্রদান করা সম্ভব হবে।
বুধবার (১৫ জুলাই) জাতীয় সংসদে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে সংসদ সদস্য রুহুল আমীন দুলাল এর করা প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ তথ্য জানান।
সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে সম্পূরক প্রশ্নে সংসদ সদস্য বলেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দলীয় কর্মীদের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে অনেক 'ভুয়া' ব্যক্তিকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে, যারা বর্তমানে মাসে বিশ হাজার টাকা করে ভাতা পাচ্ছেন। তিনি এই ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের চিহ্নিত করে ছাঁটাই করার জন্য একটি বিশেষ যাচাই-বাছাই কমিটি গঠনের দাবি জানান এবং সেই কমিটিতে সংসদ সদস্যদের উপদেষ্টা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দেন।
এর জবাবে প্রধানমন্ত্রী জানান, দেশ স্বাধীনের পর যাদের ওপর প্রকৃত শহীদ ও মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা প্রণয়নের দায়িত্ব ছিল, তারা বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে না দেখে রাজনৈতিকভাবে উপস্থাপন করেছিলেন। তবে বর্তমান সরকার মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিদের নিয়ে যে কমিটি গঠন করেছে, তার মূল লক্ষ্যই হলো সঠিক শহীদ ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা।
পরবর্তীতে কুড়িগ্রাম-১ আসন থেকে নির্বাচিত অপর এক সংসদ সদস্যের আরেক সম্পূরক প্রশ্ন করেন যে, রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষমতার পরিবর্তনের সাথে সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা যেভাবে পরিবর্তিত বা দলীয়করণ হয়, সেই সংস্কৃতির অবসান ঘটিয়ে ৫৫ বছর পর হলেও একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রকৃত তালিকা জাতির সামনে প্রকাশ করার কোনো পরিকল্পনা সরকারের আছে কিনা।
এই প্রশ্নের প্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী সংসদকে স্মরণ করিয়ে দেন যে, বর্তমান রাষ্ট্র পরিচালনায় থাকা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) বীর মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের দ্বারা গঠিত। যেহেতু একজন সম্মুখ সমরের বীর মুক্তিযোদ্ধার আদর্শে এই দল পরিচালিত, তাই মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি যথাযথ সম্মান ও দায়িত্ব প্রদর্শনকে সরকার একটি পবিত্র কর্তব্য বলে মনে প্রাণে বিশ্বাস করে। অতীতের সরকারগুলোর আমলে তালিকা প্রণয়নে নানা জটিলতা ও ত্রুটি-বিচ্যুতি তৈরি হলেও, বর্তমান সরকার দেশের বিশিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সহযোগিতায় সব ধরনের রাজনৈতিক প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে একটি পূর্ণাঙ্গ, সঠিক ও ঐতিহাসিক সত্যভিত্তিক মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা তৈরি করতে সম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং সেই লক্ষ্যেই কাজ করে যাচ্ছে।
বিশ্ব দরবারে শক্তিশালী হবে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ড
এদিকে দেশে আন্তর্জাতিক মানের বিভিন্ন ডিজিটাল ডিভাইস উৎপাদন ও সংযোজনে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানিতে সরকার যুগোপযোগী শুল্ক সুবিধা প্রদান করেছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। সরকারের এই যুগোপযোগী সিদ্ধান্তের ফলে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি সেক্টরে স্থানীয় শিল্পের বিকাশ ঘটবে এবং ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ড বিশ্ব দরবারে আরও শক্তিশালী হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন তিনি। সুলতানা আহমেদের এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এ তথ্য জানান। প্রধানমন্ত্রী জানান, ডেস্কটপ, ল্যাপটপ, অল-ইন-ওয়ান পিসি, নোটবুক, নোটপ্যাড, ট্যাব, সার্ভার, প্রিন্টার, স্ক্যানার, রাউটার, নেটওয়ার্ক ডিভাইস, মনিটর, ডিজিটাল ওয়াচ ও মোবাইল ইত্যাদি প্রযুক্তি পণ্য দেশে উৎপাদন ও সংযোজনের ক্ষেত্রে বিশেষ ছাড় দেওয়া হচ্ছে। এই খাত বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণেও বড় ভূমিকা রাখবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ডিজিটাল ডিভাইস উৎপাদনের সুবিধার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী জানান, এসব পণ্য উৎপাদনে ব্যবহৃত কাঁচামাল আমদানিতে ১ শতাংশের অতিরিক্ত কাস্টমস শুল্ক, সমুদয় সম্পূরক শুল্ক, সমুদয় রেগুলেটরি ডিউটি এবং সমুদয় মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) মওকুফ করা হয়েছে। একইভাবে দেশে এসব পণ্য সংযোজনে (অ্যাসেম্বলিং) ব্যবহৃত কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে ৫ শতাংশের অতিরিক্ত কাস্টমস শুল্কসহ সমুদয় সম্পূরক শুল্ক, রেগুলেটরি ডিউটি এবং মূল্য সংযোজন কর মওকুফ করার সুবিধা দেওয়া হয়েছে বলে জানান সরকারপ্রধান।
এই সিদ্ধান্তের সুদূরপ্রসারী প্রভাব নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এমন যুগোপযোগী শুল্ক সুবিধার ফলে দেশের বাজারে অনেক কম দামে বিভিন্ন উন্নত প্রযুক্তি পণ্য সাধারণ মানুষের কাছে সহজলভ্য হবে। এর ফলে শিক্ষা, স্টার্টআপ, ফ্রিল্যান্সিং ও ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেশের বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য অভূতপূর্ব কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে যা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে গতি আনবে।
বন্ধ বস্ত্রকলগুলোকে চালু ও লাভজনক করতে সরকার কাজ করছে
ওদিকে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস্ কর্পোরেশনের (বিটিএমসি) বন্ধ বস্ত্রকলগুলোকে চালু ও লাভজনক করার লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে। ইতিমধ্যেই এই বিষয়ক দুটি সভা হয়েছে। সংসদ সদস্য ফরিদা ইয়াসমিনের এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ইতোমধ্যে, বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস্ কর্পোরেশনের নিয়ন্ত্রণাধীন ১৫টি বন্ধ অচল সরকারি বস্ত্রকল পাবলিক প্রাইভেটপার্টনারশিপ (পিপিপি), বেসরকারি উদ্যোগে এবং দুটি বন্ধ বস্ত্রকল দীর্ঘমেয়াদি লিজের মাধ্যমে পুনরায় চালু করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডে বাস্তবায়নাধীন "বাংলাদেশের সোনালী ঐতিহ্য মসলিনের সুতা তৈরির প্রযুক্তি ও মসলিন কাপড় পুনরুদ্ধার (২য় পর্যায়)" শীর্ষক প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। প্রকল্পের মাধ্যমে মসলিন উদ্যোক্তা ও তাদের অধীন তাঁতি ও স্পিনারদের প্রশিক্ষণসহ কারিগরি সেবা দেয়া হবে। পাট খাতে বিনিয়োগকারীদেরকে সরকার বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতা করছে। পাটশিল্পে বিনিয়োগের মাধ্যমে উৎপাদিত পাটপণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে সরকার বিনিয়োগকারীদের আর্থিক প্রণোদনা দিচ্ছে। বর্তমানে পাটপণ্য ক্রয়-বিক্রয়ের উপর মূল্য সংযোজন কর মওকুফ করা হয়েছে। এতে বিনিয়োগকারীগণ পাটশিল্পে বিনিয়োগ করতে আরও উৎসাহ বোধ করছে। পাটচাষীদের জন্য বীজ সরবরাহ এবং তাদের মনিটরিং করার জন্য 'উন্নত প্রযুক্তি নির্ভর পাট ও পাটবীজ উৎপাদন এবং সম্প্রসারণ' শীর্ষক প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, বস্ত্র খাতে বিনিয়োগকারীদেরকেও সরকার বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতা দিচ্ছে। বস্ত্র খাতে বিনিয়োগকারীদের শুল্ক মুক্ত টেক্সটাইল মেশিনারীজ আমদানি করতে বস্ত্র অধিদপ্তর হতে সুপারিশ করা হয়। বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের মাধ্যমে তাঁতখাতে বিনিয়োগকারীদের নীতিগত ও কারিগরি সহায়তা করা হয়। বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের আওতায় বিদ্যমান সার্ভিস সেন্টারসমূহ হতে স্বল্পমূল্যে ডাইং, প্রিন্টিং, ক্যালেন্ডারিং, ওয়াশিংসহ বিভিন্ন সেবা হয়ে থাকে।

SM Rafiqul Islam
২ ঘন্টা আগেমাননীয় প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রীর এই উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে এধরণের উদ্যোগ এর আগের অনেক সরকার নিয়েও বাস্তবায়ন করতে পারে নাই। ৭১ সালে যাদের জন্মই হয়নি তারাও মুক্তি যোদ্ধা ভাতা পায়। আবার ২ বৎসর চাকরির বয়স বাড়াতে প্রজাতন্ত্রের উর্দ্ধতন কর্মকর্তারাও এসব অপকর্মে জড়িত ছিল। আমরা আশাকরি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এবারের উদ্যোগের সফল বাস্তবায়ন হবে এবং এই বিষয়টির শেষ উদ্যোগ হবে। জাজাকআল্লাহ খাইরান।