১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনার ঐতিহাসিক কোয়ার্টার ফাইনাল শুধু মাঠের নায়কই তৈরি করেনি, জন্ম দিয়েছিল গ্যালারিরও এক আলোচিত চরিত্রের। যখন দিয়েগো ম্যারাডোনা ‘হ্যান্ড অব গড’ খ্যাত গোল এবং পরে ‘শতাব্দীর সেরা গোল’ করে কিংবদন্তিতে পরিণত হন, তখন আজতেকা স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে ইংলিশ সমর্থকদের সঙ্গে সংঘর্ষের একটি ছবি ও ভিডিও আর্জেন্টিনার সমর্থক রাউল ‘পিস্তোলা’ গামেসকে রাতারাতি পরিচিত করে তোলে। তবে ঘটনার প্রায় ৪০ বছর পর ৮২ বছর বয়সী গামেস বলেন, তিনি নিজেকে কখনও নায়ক মনে করেন না। এ খবর দিয়েছে ব্রাজিলের অনলাইন ‘ও গ্লোবো’। আর্জেন্টিনার রাদিও রিভাদাভিয়াকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে গামেস বলেন, আমি যা করেছি, তার জন্য অনুতপ্ত নই। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গল্পগুলো অনেক বড় হয়ে গেছে। বিষয়টি এখন আমাকে কিছুটা অস্বস্তিতে ফেলে। ৪০ বছর কেটে গেছে। এখন আমার বয়স ৮২। আমি কাউকে রক্ষা করছিলাম না। এটি কোনো বীরত্বের কাজও ছিল না। প্রকৃত বীর ছিলেন মালভিনাসে (ফকল্যান্ড দ্বীপের) যুদ্ধ করা সেই সৈনিকরা, যারা তুষারের মধ্যে, ক্ষুধার্ত অবস্থায়, অস্ত্রের অভাবে যুদ্ধ করেছিলেন। ইতিহাসে তারাই চিরকাল বীর হয়ে থাকবেন।
একটি ছবি বদলে দিয়েছিল জীবন
যে ছবিটি গামেসকে বিখ্যাত করে তোলে, সেটি ছিল এক সহিংস সংঘর্ষের মুহূর্ত। ভেলেস সার্সফিল্ডের এই সমর্থককে ছবিতে খালি গায়ে, বক্সারের ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। তার সামনে ছিলেন দুই ইংরেজ সমর্থক, যাদের একজন ঘুষি খেয়ে মাটিতে বসে পড়েছিলেন। ছবিটি দ্রুত পুরো আর্জেন্টিনায় ছড়িয়ে পড়ে। পরদিন দেশটির প্রভাবশালী দৈনিক ক্লারিন-এর প্রথম সারির খবরেও স্থান পায় সেটি। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ঐতিহাসিক জয়ের উচ্ছ্বাসের মধ্যেই গামেসও হয়ে ওঠেন সেই ম্যাচের আলোচিত এক চরিত্র।
১৯৮২ সালের মালভিনাস (ফকল্যান্ড) যুদ্ধের প্রেক্ষাপট এই ঘটনার গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দেয়। মাঠে ম্যারাডোনার পারফরম্যান্স যেমন অনেক আর্জেন্টাইনের কাছে যুদ্ধের প্রতীকী প্রতিশোধ হিসেবে দেখা হয়েছিল, তেমনি গ্যালারির এই সংঘর্ষকেও কেউ কেউ একইভাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন। ১৯৮২ সালের যুদ্ধে ৬৪৯ জন আর্জেন্টাইন সেনা নিহত হন। সেই ক্ষত এখনও দেশটির মানুষের মনে গভীরভাবে রয়ে গেছে। গামেস বলেন, সেদিন চারদিকে মারামারি হয়েছিল। রাস্তায়, স্টেডিয়াম থেকে বের হওয়ার সময়ও মারামারি হয়েছিল। ইংরেজরা বিশেষ করে মদ্যপ অবস্থায় খুব উসকানিমূলক আচরণ করত। তবে তারা মদ না খেলে ভদ্রই থাকে। ছবির সেই সংঘর্ষ ছিল সবচেয়ে ছোট ঘটনাগুলোর একটি। সেখানে শুধু আর্জেন্টাইন সমর্থকদের জন্য জায়গা করে দেয়ার চেষ্টা হচ্ছিল। ইংরেজরা তাদের ধাক্কা দিয়েছিল।
সমর্থক থেকে সফল ক্লাব কর্মকর্তা
ওই ঘটনার আগেই গামেস ভেলেস সার্সফিল্ডের পরিচিত সমর্থক এবং ক্লাব রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। তবে আজতেকার সেই ছবি তার জনপ্রিয়তা অনেক বাড়িয়ে দেয়। বিশ্বকাপ জয়ের এক সপ্তাহেরও কিছু বেশি সময় পরে বুয়েন্স আয়ারসের কাসা রোসাদায় জাতীয় দলের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানেও তিনি অংশ নেন। ১৯৯৩ সালে নিজের রাজনৈতিক গোষ্ঠী ক্লাবের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার পর তিনি ভেলেসের ফুটবল পরিচালক হন। তার দায়িত্বে থাকাকালেই ভেলেস ১৯৯৪ সালে কোপা লিবার্তাদোরেস এবং ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপ জেতে। সাও পাওলোর বিপক্ষে লিবার্তাদোরেসের ফাইনালে বিরতির সময় রেফারি আর্নেস্তো ফিলিপির সঙ্গেও উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়ে জড়িয়েছিলেন গামেস। আর্জেন্টিনার এল গ্রাফিকো সাময়িকীর তথ্য অনুযায়ী, তিনি রেফারিকে উদ্দেশ করে কড়া ভাষায় মন্তব্যও করেছিলেন।
ভেলেসের ইতিহাসে অন্যতম সফল সভাপতি
১৯৯৬ সালে গামেস প্রথমবার ভেলেস সার্সফিল্ডের সভাপতি নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে তিনি তিন দফায় (১৯৯৬-৯৯, ২০০২-০৫ এবং ২০১৪-১৭) ক্লাবটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ফুটবল পরিচালক ও সভাপতি- দুই দায়িত্ব মিলিয়ে তার সময়ে ভেলেস তিনটি আর্জেন্টাইন লিগ শিরোপার পাশাপাশি একাধিক আন্তর্জাতিক ট্রফিও জেতে। ১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপে তিনি আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের প্রতিনিধি দলের প্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
এখনও সেই ছবিই তার পরিচয়ের প্রতীক
ভেলেস সমর্থকদের কাছে গামেসের জনপ্রিয়তা এতটাই বেশি যে কয়েক বছর আগে হোসে আমালফিতানি স্টেডিয়াম-এর আশপাশে তার সম্মানে একটি দেয়ালচিত্র আঁকা হয়। সেখানে অন্য কোনো ছবি নয়, স্থান পায় ১৯৮৬ সালের সেই ঐতিহাসিক সংঘর্ষের ছবিই। পেছনে ছিল মালভিনাস দ্বীপপুঞ্জের মানচিত্র। যদিও গামেস এখনও জোর দিয়ে বলেন, সেই ঘটনার মাধ্যমে তিনি পরিচিতি পেয়েছেন ঠিকই, কিন্তু সেটিকে কখনও বীরত্বের প্রতীক হিসেবে দেখেন না। তার মতে, প্রকৃত বীর ছিলেন মালভিনাস যুদ্ধে প্রাণ দেয়া আর্জেন্টাইন সৈনিকরাই।
