ছয় বছর দক্ষিণ সুদানের শরণার্থী শিবিরে শিশু অধিকার কর্মী হিসেবে কাজ করেন লুসি এভারলিন আতিম। এরপর যখন নিজের দেশে ফিরে আসেন, তখন দেখতে পান তাঁর শৈশবের স্মৃতিবিজড়িত শিয়া গাছটি আর নেই। স্থানীয়ভাবে ‘ময়াও’ নামে পরিচিত এই গাছটি আতিমের শৈশবকে রাঙিয়ে তুলেছিল, যার মিষ্টি ও ক্রিমি ফল খেয়ে তিনি ও তাঁর বন্ধুরা স্কুলে যেতেন। তবে কেবল তাঁর প্রিয় গাছটিই নয়, কাঠকয়লা তৈরির জন্য পুরো উত্তর উগান্ডাজুড়েই এমন অসংখ্য শিয়া গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন আল জাজিরা।
ত্রিশোর্ধ্ব এই জলবায়ু কর্মী আল জাজিরাকে বলেন, শিয়া গাছের এই ধ্বংসযজ্ঞ অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এই গাছগুলোকে রক্ষা করা জরুরি, তবে মানুষের জন্য জ্বালানির বিকল্প উৎসও প্রয়োজন। উগান্ডায় প্রতি বছর কয়লা উৎপাদন ও গাছ কাটার ফলে আনুমানিক ১ লাখ ২২ হাজার হেক্টর বনভূমি বিলীন হয়ে যাচ্ছে। দেশের প্রায় ৯০ ভাগ পরিবার রান্নার জন্য কাঠকয়লার ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় শিয়া এবং আফজেলিয়া আফ্রিকার মতো আদিম প্রজাতির গাছগুলো দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে। মেকেরের ইউনিভার্সিটির এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০০৮ সালে যেখানে পতিত জমিতে পরিণত শিয়া গাছের সংখ্যা ছিল ২০টি, ২০১৭ সালের মধ্যে তা কমে ১০ থেকে ১৫টিতে নেমে এসেছে। শিয়ার এই হ্রাস পাওয়ার সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া কঠিন, কারণ কয়লা উৎপাদনকারীরা গাছ কাটার সময় শিকড়সহ উপড়ে ফেলে, যার ফলে গণনার জন্য কোনো গুঁড়ি অবশিষ্ট থাকে না।
দক্ষিণ সুদানে কাজ করার সময় আতিম এক নারীর দেখা পেয়েছিলেন যিনি ফেলে দেয়া শিয়ার খোসা বা ভুসি থেকে জ্বালানি ব্রিকেট (এক ধরণের জ্বালানি পিণ্ড) তৈরি করতেন। সেই ধারণা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ২০২৩ সালে তিনি ‘ময়াও আফ্রিকা ইনিশিয়েটিভ’ নামে একটি সামাজিক উদ্যোগ প্রতিষ্ঠা করেন। এই প্রতিষ্ঠানটি শিয়ার বর্জ্যকে জ্বালানি ব্রিকেটে রূপান্তর করার পাশাপাশি নারীদের শিয়া বাটার বা মাখন তৈরি করে জীবিকা নির্বাহে সহায়তা করে। শুকনো শিয়ার খোসা গুঁড়ো করে, কাদা মাটি ও কাসাভা ময়দার মণ্ড তৈরি করে রোদে শুকিয়ে এই ব্রিকেট প্রস্তুত করা হয়। ৪৭ বছর বয়সী ৫ সন্তানের জননী ক্যাথরিন আকেলো জানান, আগে তিনি কেবল শিয়ার বীজ দিয়ে মাখন তৈরি করতেন এবং খোসাগুলো ফেলে দিতেন। এখন তিনি নিজেই এই খোসা দিয়ে ব্রিকেট তৈরি করছেন, যার ফলে রান্নার জন্য কাঠকয়লা কেনার চিন্তা থেকে তিনি মুক্ত হয়েছেন এবং তাদের দল বিক্রয়লব্ধ অর্থ সঞ্চয় করে জরুরি সময়ে পরিবারকে সহায়তা করতে পারছে।
বর্তমানে এই জ্বালানির চাহিদা ব্যাপকভাবে বাড়লেও শিয়ার মৌসুমী ফলনের কারণে উৎপাদন সীমিত রয়ে গেছে। এই সমস্যা সমাধানে আতিম প্রায় ৫৩০ ডলার মূল্যের ক্রাশার ও ব্রিকেট তৈরির মেশিন কেনার জন্য অর্থ জমাচ্ছেন, যা দিয়ে সারা বছর উৎপাদন সচল রাখা সম্ভব হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বস্কো ওডয়েক আল জাজিরাকে বলেন, শিয়ার খোসাকে ব্রিকেটে রূপান্তর করা বর্জ্যের চমৎকার ব্যবহার এবং এটি কাঠকয়লার একটি বাস্তবসম্মত বিকল্প। তবে মানবিক ও উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ পল ম্যুরিশিয়া মনে করেন, গ্রামীণ পরিবারগুলোর জন্য পরিচ্ছন্ন জ্বালানি এখনও নাগালের বাইরে, তাই সরকারের উচিত আতিমের মতো স্থানীয় সংস্থাগুলোকে সহযোগিতা করা। কেবল জ্বালানি উৎপাদনই নয়, আতিমের এই প্রতিষ্ঠানটি ২০টি স্কুলে পরিবেশ ক্লাব পরিচালনা করছে এবং চারা বিতরণ করে প্রকৃতি পুনরুদ্ধারে কাজ করছে।
