চট্টগ্রামে কমছে পানি, দুর্ভোগে হাজারো মানুষ

চট্টগ্রামে কমছে পানি, দুর্ভোগে হাজারো মানুষ

ফন্ট সাইজ:

চট্টগ্রামে বন্যার পানি ধীরে ধীরে কমতে শুরু করলেও দুর্ভোগ কাটেনি হাজারো মানুষের। এখনো বহু পরিবার পানিবন্দি অবস্থায় মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে। ঘরে নেই পর্যাপ্ত খাবার, দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট। দুর্গম ও নিচু 
এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, দুর্যোগের এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও পর্যাপ্ত সরকারি ত্রাণ সহায়তা তাদের কাছে পৌঁছায়নি। টানা কয়েকদিনের ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যায় চট্টগ্রামে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৭ লাখ ৫৪ হাজার ৫৯০ জন মানুষ। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত বাঁশখালী, সাতকানিয়া ও লোহাগাড়া উপজেলার বাসিন্দাদের দাবি, প্রায় ৮০ শতাংশ বন্যার্ত এখনো কোনো সরকারি সহায়তা পাননি।

জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় ১ লাখ ৮৮ হাজার ৬৪৮টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে ২০ লাখ টাকা এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে ৬৫ লাখ টাকাসহ মোট ৮৫ লাখ টাকা এবং ৭০০ টন চাল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। সরজমিন মঙ্গলবার দুপুরে বাঁশখালী খানখানবাদ ইউনিয়নে ঘুরে দেখা যায়, পাঁচদিন পর অনেকে বাড়ি ফিরছেন। এখনো পানির পরিস্থিতি স্বাভাবিক নয়। কেউ কেউ বাড়িতে এসে দেখছেন বাড়ির পরিস্থিতি। দীর্ঘ সময় পানির নিচে তলিয়ে থাকায় মাটির কাঁচা ঘরগুলো একেবারেই কাদাযুক্ত হয়ে গেছে। চুলা ভেঙে গেছে। রান্নার কোনো পরিবেশ নেই। সরকারি সহায়তা গত চারদিন না পৌঁছালেও সোমবার কিছু কিছু সামাজিক সংগঠনের সহায়তা পৌঁছেছে। কিন্তু বেশ কিছু এলাকায় সড়ক যোগাযোগ না থাকায় ওই এলাকার বাসিন্দারা কোনো প্রকার সহায়তা পায়নি।

জানা যায়, সোমবার পর্যন্ত ৭০ লাখ টাকার শুকনো খাবার ও ৬১০ টন চাল বিতরণ করা হয়েছে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যার তুলনায় এ বরাদ্দকে অপ্রতুল বলছেন স্থানীয়রা। হিসাব অনুযায়ী, দৈনিক বরাদ্দের পরিমাণ প্রায় ১০ লাখ ৬২ হাজার টাকা, যা মাথাপিছু মাত্র ১১ টাকা ৬২ পয়সা। বাঁশখালীর কাথারিয়া, কাঞ্চনাবাদ, বাহারছড়া, সরল, সনুয়া ও শেখেরখীল ইউনিয়নে সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। অসংখ্য কাঁচা ও মাটির ঘর ধসে পড়েছে বা পানিতে তলিয়ে গেছে। বিদ্যুৎ না থাকায় বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে বৃষ্টির পানি কিংবা খাল-বিলের পানি ব্যবহার করছে। ভেঙে পড়েছে স্যানিটেশন ব্যবস্থাও। কাথারিয়া ইউনিয়নের মধ্যম মানিকপাঠার এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ হাফেজ (৫৫) বলেন, পাঁচদিন ধরে পরিবারের ১০ সদস্য নিয়ে পানিবন্দি অবস্থায় আছেন। ঘর তলিয়ে যাওয়ায় আত্মীয়ের বাড়ির সিঁড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন।

তিনি বলেন, “এখন পর্যন্ত সরকারি কোনো সহায়তা পাইনি। বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন কিছু খাবার দিয়েছে, সেটুকুই ভরসা।” একই ইউনিয়নের বাসিন্দা আজাদ বলেন, “কিছু বেসরকারি সংগঠন ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে সীমিত সহায়তা এসেছে। কিন্তু সরকারিভাবে যেভাবে ত্রাণ পৌঁছানোর কথা, তা হয়নি।” ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো ঘুরে দেখা গেছে, অনেক পরিবারকে ১০ কেজি করে চাল দেয়া হলেও রান্নার পরিবেশ না থাকায় তাৎক্ষণিকভাবে সেটি খুব বেশি কাজে আসছে না। দুর্গতদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন এখন শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি, ওষুধ ও নিরাপদ আশ্রয়। স্থানীয়দের দাবি, প্রতি পাঁচটি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মধ্যে চারটিই এখনো সরকারি সহায়তা পায়নি।

কাথারিয়া ইউনিয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সঞ্জিত চন্দ্র সরকার জানান, সোমবার ২৫০টি পরিবারকে ১০ কেজি করে চাল বিতরণ করা হয়েছে। তালিকা চূড়ান্ত হলে আরও ৪০০ পরিবারকে ত্রাণ দেয়া হবে। এদিকে সরকারি ত্রাণ পৌঁছানোর আগেই অনেক দুর্গম এলাকায় সহায়তা নিয়ে গেছে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো। স্বেচ্ছাসেবক মোহাম্মদ নাঈম উদ্দিন জানান, হাইলধর ইউনিয়ন ফুটবল একাডেমি ও এলাকাবাসীর অনুদানে তারা রান্না করা খাবার, শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানি বিতরণ করছেন। তার ভাষ্য, খানখানাবাদের বাসিন্দারা জানিয়েছেন, আমাদের দেয়া সহায়তাই ছিল তাদের কাছে পৌঁছানো প্রথম ত্রাণ। পাশের সাতকানিয়া উপজেলায় সাঙ্গু ও ডলু নদীর পানি বেড়ে ১১টি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। সেখানে প্রায় সাড়ে চার লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

কেঁওচিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দাদের অভিযোগ, বহু পরিবার এখনো সরকারি ত্রাণ পায়নি। প্রশাসনের দাবি, যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়া এবং পানিবন্দি পরিবার শনাক্তে সময় লাগায় ত্রাণ বিতরণে বিলম্ব হয়েছে। বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রুহুল আমিন বলেন, ‘এই উপজেলায় এখনো ৩০ হাজারের মতো মানুষ পানিবন্দি। আগামী কয়েকদিন বৃষ্টি না হলে আশা করছি পানি নেমে যাবে। ইতিমধ্যে অনেকেই নিজ বাড়িতে যেতে শুরু করেছেন। অনেকগুলো মাটির ঘর বন্যায় ধসে গেছে। প্রাথমিক হিসাবে মনে হচ্ছে চার হাজারের বেশি ঘর ধসে পড়েছে। এজন্য নতুন করে এসব ঘর নির্মাণ করতে হবে। ইতিমধ্যে আমাদের টিম মাঠে কাজ করছে। কতোটি ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এর তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে।’ সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খন্দকার মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘বন্যায় এই উপজেলার ১৮টি ইউনিয়নের ৮৫ শতাংশ এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ‘ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি ইউনিয়ন থেকে পানি কমে গেছে। কিছু কিছু এলাকায় এখনো পানি আছে। রাস্তাঘাট ডুবে আছে। পানি কমে আসায় লোকজন নিজ ঘরে ফিরতে শুরু করেছেন। বেশ কিছু মাটির ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এগুলোর তালিকা করা হচ্ছে। আশা করছি, বৃষ্টি না হলে আগামী কয়েকদিনের মধ্যে সব এলাকা থেকে পানি নেমে যাবে।’ চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা জানিয়েছেন, সোমবার পর্যন্ত ৬৮৪ টন চাল এবং নগদ ৬২ লাখ ৫০ হাজার টাকা বিতরণ করা হয়েছে। চাহিদা ছিল ৬২২ টন চাল এবং ১ কোটি ১৫ লাখ টাকার। আগামী কয়েকদিনও ত্রাণ বিতরণ করা হবে। এসব কার্যক্রম অব্যাহত আছে জেলা প্রশাসনের। তিনি বলেন, “যেসব এলাকায় এখনো ত্রাণ পৌঁছেনি, সেসব তথ্য আমাদের জানানো হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হবে। প্রতিটি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের কাছে সরকারি সহায়তা পৌঁছে দেয়াই আমাদের লক্ষ্য।”

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন