সাইফুরের মৃত্যুদণ্ড ৩ জনের যাবজ্জীবন

এমসি কলেজে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ

সাইফুরের মৃত্যুদণ্ড ৩ জনের যাবজ্জীবন

ফন্ট সাইজ:

সিলেটের এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে ঘুরতে যাওয়া দম্পতিকে আটকে স্বামীর সামনেই স্ত্রীকে ধর্ষণের মামলার রায়ে ছাত্রলীগ নেতা সাইফুর রহমানকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই ঘটনায় অপর তিন ছাত্রলীগ নেতা শাহ মাহবুবুর রহমান রনি, তারেকুল ইসলাম রনি ও অর্জুন লস্করকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছে। মঙ্গলবার দুপুরে সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক স্বপন কুমার সরকার জনাকীর্ণ আদালতে এ রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার সময় আসামিরা আদালতে উপস্থিত ছিলেন। মামলার রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী। তবে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা এ রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করবেন বলে জানিয়েছেন।

ঘটনা ২০২০ সালের ২৫শে সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায়। ওইদিন বিকালে এমসি কলেজ ক্যাম্পাসে ঘুরতে গিয়েছিলেন দক্ষিণ সুরমার এক নবদম্পতি। সন্ধ্যায় ছাত্রাবাসে নিয়ে স্বামীকে আটকে রেখে স্ত্রীকে ধর্ষণ করা হয়। জানাজানি হওয়ার পর দেশ জুড়ে আলোচিত হয় এ ঘটনাটি। ক্ষোভ বাড়ে সিলেটে। আসামিদের গ্রেপ্তার দাবিতে চলে আন্দোলন। ঘটনার পর র‌্যাব ও পুলিশের একাধিক টিম আসামি গ্রেপ্তারে অভিযান শুরু করে। একেক করে গ্রেপ্তার করা হয় ৮ জন আসামিকে।

এরা হচ্ছে এমসি কলেজ ছাত্রলীগ নেতা সাইফুর রহমান, শাহ মাহবুবুর রহমান ওরফে রনি, তারেকুল ইসলাম ওরফে তারেক, অর্জুন লস্কর, আইনুদ্দিন ওরফে আইনুল, মিসবাউল ইসলাম রাজন, রবিউল ইসলাম ও মাহফুজুর রহমান। ঘটনার পরদিন ধর্ষিতার স্বামী বাদী হয়ে শাহপরান থানায় ছয়জনের নাম উল্লেখ করে এবং দু’জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করে মামলা করেন। পরবর্তীতে আসামিরা এ ঘটনায় আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দেয়। আসামিদের ডিএনএ নমুনা পরীক্ষায় আটজন আসামির মধ্যে ছয়জনের ডিএনএর মিল পাওয়া যায়। এদিকে তদন্ত শেষ করে ওই বছরের ৩রা ডিসেম্বর আদালতে ৮ জনকেই অভিযুক্ত করে চার্জশিট দাখিল করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শাহপরান থানার তৎকালীন ওসি তদন্ত ইন্দ্রনীল ভট্টাচার্য।

চার্জশিটে সাইফুর রহমান, শাহ মাহবুবুর রহমান ওরফে রনি, তারেকুল ইসলাম ওরফে তারেক, অর্জুন লস্কর, আইনুদ্দিন ওরফে আইনুল ও মিসবাউল ইসলাম ওরফে রাজনকে দলবেঁধে ধর্ষণের জন্য অভিযুক্ত করা হয়। আসামি রবিউল ইসলাম ও মাহফুজুর রহমান ওরফে মাসুমকে ধর্ষণে সহায়তা করার জন্য অভিযুক্ত করা হয়। চার্জশিটে অভিযুক্ত হওয়ার ৮ জনকেই কলেজ কর্তৃপক্ষ স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ও এই ৪ জনের ছাত্রত্ব ও সার্টিফিকেট বাতিল করে। ছাত্রাবাস থেকে অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় সাইফুর রহমান ও শাহ মাহবুবুর রহমান রনিকে আসামি করে আরেকটি চার্জশিট দেয় পুলিশ।

২০২১ সালের ১৭ই জানুয়ারি সিলেটের নারী ও শিশু নির্যাতন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. মোহিতুল হক চৌধুরী মামলার অভিযোগ গঠন করে বিচারকাজ শুরু করেন। আর ২০২২ সালের ১১ই মে মাসে একই আদালতে অস্ত্র ও চাঁদাবাজির মামলার অভিযোগ গঠন করে আদালত। বিচার শুরুর আগে দু’টি মামলার বিচার কার্যক্রম একসঙ্গে শুরুর আবেদন করেন বাদীপক্ষ। শুনানি শেষে বিচারক আবেদনটি খারিজ করে দেন। এরপর বাদীপক্ষ এই আবেদন জানিয়ে উচ্চ আদালতে একটি ফৌজদারি বিবিধ মামলা করেন। ওই বছরের ৭ই ফেব্রুয়ারি হাইকোর্টের ভার্চ্যুয়াল বেঞ্চ মামলা দু’টির বিচার কার্যক্রম একসঙ্গে একই আদালতে সম্পন্ন করার আদেশ দেন। এরপর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বদলে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে মামলা দু’টির কার্যক্রম চালানোর আবেদন করেন বাদীপক্ষ। মামলায় ২৪ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন। তাদের মধ্যে ওই গৃহবধূ, তার স্বামী, আসামিদের স্বীকারোক্তি নেয়া ম্যাজিস্ট্রেট, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা, এমসি কলেজের অধ্যাপক, ওসমানী হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের চিকিৎসক রয়েছেন।

গত বুধবার সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে সর্বশেষ মামলার যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন বাদী ও আসামিপক্ষের আইনজীবীরা। এরপর আদালত আলোচিত এ মামলার রায় ঘোষণার তারিখ নির্ধারণ করেন। রায় ঘোষণার পর আদালত প্রাঙ্গণে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন আসামিপক্ষের আইনজীবী শাহ মোশাহিদ আলী। তিনি জানিয়েছেন, এই মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে কেউ সাক্ষ্য দেয়নি। ভিকটিমও আসামিদের শনাক্ত করেনি। অপরাধ প্রমাণ না হওয়া সত্ত্বেও কয়েকজনকে শাস্তি দেয়া হয়েছে। আমরা এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে যাবো। তবে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ও সিলেট দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের পিপি আবুল হোসেন রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, এ রায়ে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হয়েছে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন