আপনাদের সঙ্গে আমরা আছি

উদ্যোক্তাদের প্রধানমন্ত্রী

আপনাদের সঙ্গে আমরা আছি

ফন্ট সাইজ:

যারা উদ্যোক্তা অথবা উদ্যোক্তা হতে চাচ্ছে তাদের সহযোগিতার জন্য সরকার পাশে রয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, এই মুহূর্তে আমার সরকারের অবস্থান থেকে আমি বলতে পারি, আমরা আছি, আপনাদের সঙ্গে। আপনাদেরকে হেল্প করার জন্য, আপনাদেরকে পথ দেখানোর জন্য, আপনাদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য আমরা আছি। কতোটুকু পারবো আমি জানি না। বাট আমরা আছি। যতটুকু পারবো সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে আপনাদেরকে আমরা আপনাদের পাশে থাকার চেষ্টা করবো।

মঙ্গলবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী মিলনায়তনে ‘তারুণ্য, স্টার্টআপ ও সম্ভাবনার বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তরুণ উদ্যোক্তাদের সাফল্য এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন। অনুষ্ঠানের শুরুতে বাংলাদেশে স্টার্টআপ ইকো সিস্টেম ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার ওপর তৈরি বিশেষ অডিও ভিজুয়াল উপস্থাপন করা হয়। বাংলাদেশ মঞ্জুুরি কমিশনের সদস্য অধ্যাপক আবদুল্লাহ আল মামুনের পরিচালনায় অনুষ্ঠানের প্রথম পর্বে ৪ জন স্টার্টআপ উদ্যোক্তা তাদের যাত্রা শুরুর গল্প তুলে ধরেন। তারা হলেন- ‘শেয়ার ট্রিপ’-এর সিইও’র সাদিয়া হক, চর্চা’র প্রতিষ্ঠাতা রায়হানুল ইসলাম, ‘রাফিয়া ফ্যাশন হাউজ’-এর প্রতিষ্ঠাতা লুৎফুন্নেসা মেঘনা, এগ্রি ট্যাক কোম্পানি ‘আই ফার্সা’র সিইও ফাহাদ ইফাজ। অনুষ্ঠানে রাফিয়া ফ্যাশন হাউজের প্রতিষ্ঠাতা লুৎফুন্নেসা মেঘনা তার নিজের প্রতিষ্ঠানের জন্য মন্ত্রণালয় থেকে অনুদান প্রাপ্তির আবেদনের কথা প্রধানমন্ত্রীর সামনে উপস্থাপন করলে প্রধানমন্ত্রী তাৎক্ষণিক সেই অনুদান প্রদানের কথা বলেন।

অনুষ্ঠানে চর্চা’র নাফিস রায়হান, ‘রেনোভা বায়োট্যাক’-এর সাজিদুল ইসলাম ও ফ্যাশন হাউজের লুৎফুন্নেসা মেঘলা প্রত্যেকের হাতে ১০ লাখ টাকা, ইন্টারভিউ বস এআই’র শারমিন আখতার, বার্জ শিল্ড’র নিশাদ জাহান ও নিউজ ফেভার এল: ধীরন রায় প্রত্যেকের হাতে ৫ লাখ টাকা এবং ‘কারেক্ট’- এর হাতে ১ লাখ টাকার অনুদানের চেক প্রদান করেন প্রধানমন্ত্রী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক এবিএম ওবায়দুল ইসলামসহ প্রোভিসিরা প্রধানমন্ত্রীকে ক্রেস্ট উপহার দেন। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী ‘জাতীয় স্টার্টআপ ও তরুণ উদ্যোক্তা প্ল্যার্টফরমে’র (ংঃধৎঃঁঢ়.রপঃফ.মড়া.নফ) আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।

নিজের জীবনের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমার লাইফের ছোট্ট একটা বিষয় তুলে ধরতে চাইছি, দেখুন আমার লাইফে ব্যবসা-বাণিজ্য শুরু করতে না করতেই আমি রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে যাই। দুটো জিনিস একসঙ্গে চলে না। কিন্তু বেঁচে থাকতে হবে। সেজন্য যতটুকু ব্যবসা করার প্রয়োজন ডিসেন্ট লাইফের জন্য, আমি ততটুকু করেছি। বাকি সময়টা আমি আমার রাজনীতির জন্য দিয়েছি। এখানেই আমি ঠিক করে নিয়েছি যে, এখানে আমাকে এগিয়ে যেতে হবে। এই এগিয়ে যেতে গিয়ে একটা মানুষকে অনেক কিছুর ভেতর দিয়ে যেতে হয়। আমি গিয়েছি মানসিক নির্যাতন, আমি গিয়েছি শারীরিক নির্যাতন, বিভিন্ন রকম হিউমিলেশন, বিভিন্ন রকম যন্ত্রণার মধ্যদিয়ে আমি গিয়েছি। অনেক ধৈর্য পরীক্ষা দিতে হয়েছে। তারপরে আমি আজকে আলহামদুলিল্লাহ আল্লাহ’র রহমতে একটা জায়গায় এসেছি।

এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, আপনাদেরকে খুব সংক্ষেপে এটা বলার অর্থ হলো, আপনাদেরকে এরকম অনেক কষ্টের মধ্যে দিয়ে যেতে হবে। এজন্য আমি এই কথাটা বলছি, কারণ আপনাদেরকে এগিয়ে আসতে হবে। আপনারা আজকে যারা এন্টারপ্রেনার হবেন, যারা হতে চাইছেন, যারা হয়ে গিয়েছেন, কাজ শুরু করেছেন। এখানে বেশ কয়েকজনকে আমরা দেখেছি, যারা কিছুদূর এগিয়ে গিয়েছেন এবং এগিয়ে গিয়ে যারা মানুষ ও সমাজ, সামগ্রিকভাবে দেশের উপকার করছেন। আপনাদেরকে প্রয়োজন আপনার জন্য নয়, আপনাকে প্রয়োজন লক্ষ কোটি মানুষের জন্য প্রয়োজন, আপনাকে প্রয়োজন এই দেশের জন্য প্রয়োজন।

সম্প্রতি অনুষ্ঠানে স্কুলের বাচ্চাদের কথা উল্লেখ করে সরকারপ্রধান বলেন, আমি রাজনীতি করেই মাঝে মাঝে হতাশ হয়ে যেতাম বা মাঝে মাঝে এখনো অনেক ক্ষেত্রে হতাশ লাগে। কিন্তু এই বাচ্চাগুলোকে দেখার পরে নিজেকে খুব কনফিডেন্ট মনে হয়েছে। আজকে যখন আপনাদের কতোগুলো কাজ দেখলাম, আপনাদের কয়েকজনের বক্তব্য শুনলাম তখন নিজের কনফিডেন্সটা আজকে আরও বেড়ে গিয়েছে। এর কারণ তুলে ধরে তিনি বলেন, যেহেতু রাজনীতি করি, একটা তো আমার লক্ষ্য আছে, উদ্দেশ্য আছে। দলের পরিকল্পনা আছে, কাজ আছে। আবার যেহেতু দেশ পরিচালনার দায়িত্বে আছি, দেশকে নিয়ে আমরা চিন্তা করি, দেশের বিভিন্ন সেক্টর নিয়ে চিন্তা করি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, যেহেতু দেশ পরিচালনার দায়িত্বে আছি, দেশকে নিয়ে আমরা চিন্তা করি, দেশের বিভিন্ন সেক্টর নিয়ে চিন্তা করি। আজকে যখন আপনাদেরকে (নতুন উদ্যোক্তা) দেখলাম এবং গত দু’টা ইভেন্টে ওই বাচ্চাগুলোকে দেখেছি, আজকে আমার কাছে মনে হয়েছে-এই যে আমরা রাতদিন যে পরিশ্রম করছি, চেষ্টা করছি একটু চেঞ্জ করার জন্য। আমার মনে হলো যে, হ্যাঁ আমরা কিছু সংখ্যক মানুষের হাতে দিয়ে যেতে পারবো, আমরা যেখানে ছেড়ে যাবো সেখান থেকে তারা দেশটাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবে।

তিনি বলেন, এই যে দেশটাকে আপনারা (শিক্ষার্থীরা) এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবেন, আপনাদের কাছে এই প্রত্যাশাটা, এই দৃঢ় আশাটা, এই বিশ্বাসটা রাখছি। আপনাদের সাফল্য কামনা করে, আপনারা যারা যারা এগিয়ে এসেছেন প্রত্যেকের সাফল্য কামনা করছি, আবারো আমি বলছি- আমরা আছি। আপনাদের সঙ্গে কতোটুকু পারবো জানি না। আমাদের সর্বোচ্চ দিয়ে আমরা চেষ্টা করবো আপনাদের পাশে থাকার জন্য।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি একটু আগে ওখানে বসে চিন্তা করছিলাম যে, আচ্ছা বলবোটা কি? যদিও আমার কাছে অনেকগুলো কথা লেখা আছে। এজন্য চিন্তা করছিলাম যে, আমার আগে যারা বক্তব্য রাখলেন এবং আমার যে এক্সামটা কিছুক্ষণ আগে হয়ে গেল, আমার মনে হয় মোটামুটিভাবে সেখানে বক্তব্যের সবকিছুই চলে এসেছে, বোধহয় খুব বেশি কিছু নেই। বলাবলি যা বলার, সেটা বলা হয়ে গেছে- এখন বোধহয় কাজ করার সময়। আপনাদেরকে একটা কথা আমি শুধু বলি, আপনারা যেটা করতে চাইছেন, ইটস টাফ সো ইজি, ইটস ভেরি ডিফিকাল্ট। কিন্তু আপনি পারবেন। যদি আপনার ইচ্ছা থাকে।

অনুষ্ঠানে দ্বিতীয় পর্বে ছিল প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্ন-পর্ব। এই পর্বে ৮টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৩০ জন শিক্ষার্থী অংশ নেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নুসরাত জাহান, মেহরাব আনোয়ার, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের নাজমুল ইসলাম নাফিউ, আসিফ আজাদ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সৈয়দা অনন্যা ফারিয়া, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মাহিদ হোসেন, ইউনিভার্সিটি অফ প্রফেশনালসের আদনান সাবাব আজাদ, মিলিটারি ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির নাফিসা তাসকিন জাহারা, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সামিয়া তাহসিন প্রমুখ শিক্ষার্থী প্রধানমন্ত্রীকে প্রশ্ন করেন এবং প্রধানমন্ত্রী তার জবাব দেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের ছাত্র নুসরাত জাহানের প্রশ্ন ছিল, ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ঋণ দেয়া হয় জামানতের ভিত্তিতে অর্থাৎ জমি বা সম্পত্তির বিপরীতে। এখন যে তরুণ-তরুণীর বাবার জমি নেই, তাদের ভালো আইডিয়া রয়েছে তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ পাওয়ার কী ব্যবস্থা রয়েছে জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এক কথায় যদি আমাকে বলতে হয় আপনার এই সমস্যাটা কিন্তু আমরা সবাই জানি। আমাদের আইসিটি ডিপার্টমেন্ট থেকে যে ফান্ড রাখা হয়েছে, ৫০০ কোটি টাকার মতো বাজেট রাখা হয়েছে। এই ফান্ড থেকে আমরা ৫ লাখ টাকা থেকে ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত উদ্যোক্তাকে সহায়তা দেয়ার চেষ্টা করবো। একই সঙ্গে আমরা অলরেডি ডিসিশন নিয়েছি যে, আপনার মতো যদি এমন উদ্যোক্তা থাকে, আপনি একদম ফ্রেশ স্টার্টআপ, আপনাকে ব্যাংকের যে হ্যাসেলগুলো বিভিন্ন রকম সম্পদের সিকিউরিটি দিতে হয়, বিভিন্ন রকম কাগজপত্র দিতে হয়, এর ভেতর দিয়ে যাতে আপনাকে যেতে না হয়, আপনি আসবেন, আপনার প্রজেক্ট দেখাবেন, নিরপেক্ষ একটা কমিটি করা হয়েছে সেখানে মন্ত্রী সাহেবও নাই, এডভাইজার সাহেবও নাই, একদম পিউর একটা কমিটি করা হয়েছে। তারা আপনার প্রজেক্ট দেখবেন, দেখে ডিসিশন নিয়ে উইথআউট অ্যানি কোলেটারাল আপনাকে ফান্ড করবে।

এ ছাড়া জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সৈয়দা অনন্যা ফারিয়া প্রান্তিক পর্যায়ে তরুণ উদ্যোক্তাদের টিকিয়ে রাখতে সরকারের ধরনের পরিকল্পনা কী প্রধানমন্ত্রীর কাছে জানতে চান। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনি বলেছেন যে, স্টার্টআপ শুধু ঢাকা শহরকেন্দ্রিক নয়, সারা দেশে যাতে হয়। স্টার্টআপের এ বিষয়টা আমরা নতুনভাবে শুরু করতে চাইছি। আমরা চাইছি যে, আপনাদের মতো ইয়াং ইন্টারপ্রেনার যারা আছেন তারা আস্তে আস্তে আসুক। আমরা আপনাদের কাছে রিচ করতে চাইছি। একটু আমাদের সময় লাগবে, আমরা যদি সকলে মিলে সিনসিয়ারলি কাজ করি নিশ্চয়ই আমরা আমাদের গোলে অ্যাচিভ করতে পারবো এটা আমরা মনে করি। এর আগে প্রধানমন্ত্রী তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা ফাহিম স্টার্টআপকে প্রান্তিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার সরকারের পরিকল্পনা আছে বলে জানান।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সামিয়া তাহসিনের প্রশ্ন ছিল বিভিন্ন স্টার্টআপ দেশীয় বাজারে অনেক ভালো করলেও দেখা যায় বিদেশি যখন ইন্টারন্যাশনাল পর্যায়ে যায় অনেক সমস্যা মুখোমুখি হয়। এই ব্যাপারে কীভাবে হেল্প করতে পারে সরকার? জবাবে প্রধানমন্ত্রী এব্যাপারে নীতিমালা প্রণয়নসহ বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে বলেন, আমাদেরকে কিছু পলিসি নিতে হবে। এই পলিসিগুলোর উপর আমরা কাজ করছি। একই সঙ্গে আপনাদেরকে বিভিন্ন জায়গায় গভর্মেন্ট থেকে হেল্প করতে হবে।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনামের সভাপতিত্বে সভায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক এবিএম ওবায়দুল ইসলাম, অধ্যাপক মোর্শেদ হাসান খান বক্তব্য রাখেন। বক্তব্যের পরে প্রধানমন্ত্রী বাইরে নতুন উদ্যোক্তাদের বিভিন্ন স্টল ঘুরে দেখেন এবং উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কথা বলেন।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন