পরিবর্তনের আয়না নাকি হেয়ার রোডের বিদায়ী আবেগ

পরিবর্তনের আয়না নাকি হেয়ার রোডের বিদায়ী আবেগ

ফন্ট সাইজ:

জুলাই আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোতে বাংলাদেশের মানুষ শুধু একটি সরকারের পতন দেখেনি, তারা দেখেছিল এক ধরনের নৈতিক পুনর্জাগরণের স্বপ্ন। দীর্ঘদিনের কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা, দলীয়করণ, দুর্নীতি ও দায়মুক্তির সংস্কৃতির বিরুদ্ধে রাস্তায় নামা মানুষ বিশ্বাস করেছিল—এবার হয়তো ভিন্ন কিছু ঘটবে। “সুশীল সমাজ”, নাগরিক বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবী ও তরুণ প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারকে তাই কেবল একটি প্রশাসনিক কাঠামো হিসেবে নয়, একটি নৈতিক প্রতীক হিসেবেই দেখা হয়েছিল। কিন্তু সময় খুব দ্রুত আয়না মেলে ধরে।

নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিদায়ী উপদেষ্টাদের সরকারি বাসভবন ছাড়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। রাজধানীর হেয়ার রোডের বাসভবন ছাড়ার আগে সাবেক আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল ফেসবুকে আবেগঘন পোস্ট দিয়েছেন—ঝোপঝাড়, রোদ-ছায়া, চিলের ডানা আর বিশাল আকাশের প্রতি তাঁর মায়ার কথা লিখেছেন। বড় সরকারি বাসায় ওঠার শুরুতে পরিবারের অস্বস্তি, সন্তানদের বন্ধুদের থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার কষ্ট—সবই উঠে এসেছে তাঁর লেখায়। ব্যক্তিগত আবেগের জায়গা থেকে এটি মানবিক, স্বাভাবিক।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—এই আবেগের প্রেক্ষাপট কী? যে অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্বে ছিলেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ মুহাম্মদ ইউনূস, সেই সরকারের প্রায় সব উপদেষ্টার বিরুদ্ধেই এখন দুর্নীতির অভিযোগ জমা পড়ছে দুর্নীতি দমন কমিশন-এ। অভিযোগের সংখ্যা এত বেশি যে দুদকের ভেতর থেকেই বলা হচ্ছে—এটি রেকর্ড হতে পারে। অধিকাংশ অভিযোগ নামবিহীন হলেও, বেশ কিছু অভিযোগে নাম-পরিচয় ও তথ্য-প্রমাণ যুক্ত আছে বলে জানা গেছে।

অভিযোগ মানেই অপরাধ প্রমাণ নয়—এ কথা অবশ্যই স্মরণ রাখতে হবে। কিন্তু অভিযোগের ব্যাপকতা ও প্রকৃতি রাজনৈতিক ও নৈতিক প্রশ্ন তো তুলবেই।

সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে ট্রাস্ট গঠন করে অর্থ আত্মসাৎ, আয়কর ফাঁকি ও বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ এসেছে। আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের বিরুদ্ধে জামিন বাণিজ্য, বিচারক ও সাব-রেজিস্ট্রার পদায়নে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ। সাবেক ছাত্র উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি, ঘুষ নিয়ে কাজ না দেওয়া, এমনকি বিটকয়েনের মাধ্যমে অর্থ পাচারের অভিযোগ। পরিবেশ, জ্বালানি, স্বাস্থ্য, তথ্য—প্রায় প্রতিটি দপ্তরের সাবেক উপদেষ্টার বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে।

এখানে দুটো সম্ভাবনা আছে। প্রথমত, এগুলো রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, ক্ষমতা বদলের পর স্বাভাবিক অভিযোগের ঢেউ। দ্বিতীয়ত, সত্যিই যদি অন্তর্বর্তী সরকারের ভেতরে দুর্নীতির সংস্কৃতি ঢুকে পড়ে থাকে, তাহলে তা কেবল ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়—এটি সামাজিক প্রত্যাশার সঙ্গে এক গভীর বিশ্বাসঘাতকতা।

বাংলাদেশে ক্ষমতার সঙ্গে সুবিধা, প্রভাব ও আর্থিক লেনদেনের এক অদৃশ্য সেতুবন্ধন বহু পুরোনো। জুলাই আন্দোলনের পর মানুষ ভেবেছিল—এই সেতুটি হয়তো ভেঙে পড়বে। যদি অভিযোগগুলো প্রাথমিক সত্যতাও পায়, তাহলে বোঝা যাবে—সেতু ভাঙেনি, কেবল পথচারী বদলেছে।

সরকারি বাসা ছাড়ার প্রসঙ্গটিও এখানে প্রতীকী। মিন্টো রোড ও হেয়ার রোডে মন্ত্রী-উপদেষ্টাদের জন্য ৩৭টি বাসভবন, অথচ মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী-উপদেষ্টার সংখ্যা প্রায় ৬০। কে কোন বাংলো পাবেন, কে অ্যাপার্টমেন্ট—তা নিয়ে বৈঠক, আবেদন, পরিদর্শন—সবই চলছে। রাষ্ট্রের সম্পদের ওপর এই আকর্ষণ, ক্ষমতার আনুষঙ্গিক সুবিধা নিয়ে প্রতিযোগিতা—এগুলো নতুন কিছু নয়। কিন্তু পরিবর্তনের অঙ্গীকার নিয়ে আসা একটি পর্বের পরেও যদি একই দৃশ্যপট দেখা যায়, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই—এটাই কি আমাদের সমাজ ও রাজনীতির প্রকৃত আয়না?

আসলে “সুশীল সমাজ” বলে আলাদা কোনো নৈতিক গ্রহ নেই। তারা এই সমাজেরই অংশ। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, মানবাধিকারকর্মী, অর্থনীতিবিদ, পরিবেশবাদী— ক্ষমতার বাইরে থাকলে তাঁরা সমালোচক, ভেতরে গেলে সিদ্ধান্তগ্রহণকারী। ক্ষমতা মানুষের চরিত্র পরীক্ষা করে—এ কথাটি ইতিহাস বহুবার প্রমাণ করেছে। ব্রিটিশ দার্শনিক লর্ড অ্যাকটনের সেই বহুল উদ্ধৃত উক্তি—“Power tends to corrupt, and absolute power corrupts absolutely”—বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। তবে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে—প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান যথার্থই বলেছেন—কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নন। অভিযোগ আমলযোগ্য হলে তদন্ত হতে হবে, সত্যতা পেলে ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে হয়রানিও যেন না হয়, সে দিকেও খেয়াল রাখতে হবে। অতীতে ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দুদকের নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ ছিল। এখন দেখার বিষয়—দুদক কি সত্যিই স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে?

যদি পারে, তাহলে এটি হবে ইতিবাচক বার্তা— ক্ষমতা বদল মানেই শুধু ব্যক্তি বদল নয়, জবাবদিহিতার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা। আর যদি অভিযোগগুলো ধামাচাপা পড়ে যায় বা বেছে বেছে ব্যবহৃত হয়, তাহলে জনগণের ভরসা আরও ভেঙে পড়বে।

এখানে একটি বড় সামাজিক বাস্তবতাও বিবেচ্য। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতি পেশায় পরিণত হয়েছে। ক্ষমতায় গেলে সুবিধা নেওয়া “স্বাভাবিক” বলে একটি অবচেতন মানসিকতা তৈরি হয়েছে। এই সংস্কৃতি ভাঙতে হলে শুধু সরকার বদল নয়, মানসিকতা বদল জরুরি। নাগরিকদেরও প্রশ্ন করতে হবে—আমরা কি সত্যিই নৈতিকতার ভিত্তিতে নেতৃত্ব বেছে নিই, নাকি সুবিধা ও পরিচয়ের ভিত্তিতে?

আসিফ নজরুলের হেয়ার রোডের বাসভবনের প্রতি মায়া—এটি এক মানবিক মুহূর্ত। কিন্তু একই সঙ্গে এটি ক্ষমতার অস্থায়িত্বেরও স্মারক। সরকারি বাড়ি, প্রটোকল, নিরাপত্তা, প্রভাব—সবই ক্ষণস্থায়ী। স্থায়ী যদি কিছু থাকে, তা হলো সুনাম কিংবা কলঙ্ক।

জুলাই আন্দোলনের চেতনায় মানুষ চেয়েছিল স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও আইনের শাসন। সেই চেতনার সত্যিকারের পরীক্ষা এখন। অভিযোগের পাহাড় প্রমাণিত হোক বা ভেঙে পড়ুক—প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ হতে হবে। তদন্ত প্রকাশ্য হতে হবে। ফলাফল যুক্তিসংগতভাবে জানাতে হবে।

নইলে “পরিবর্তন” শব্দটি কেবল রাজনৈতিক স্লোগান হয়ে থাকবে। শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি একেবারেই মৌলিক : এ কি কেবল কিছু ব্যক্তির ব্যর্থতা, নাকি আমাদের সামগ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতিফলন? যদি সুশীল সমাজও ক্ষমতার ভেতরে গিয়ে একই অভিযোগে অভিযুক্ত হয়, তাহলে বোঝা যায়—সমস্যা ব্যক্তি নয়, কাঠামো ও সংস্কৃতিতে।

তবু হতাশার জায়গায় দাঁড়িয়ে একটি আশার কথা বলা যায়। অভিযোগ উঠছে, জনসমক্ষে আসছে, গণমাধ্যমে আলোচিত হচ্ছে—এটাই গণতন্ত্রের লক্ষণ। একসময় যা ফিসফাসে সীমাবদ্ধ থাকত, এখন তা প্রকাশ্য বিতর্কের বিষয়। এই বিতর্ক, এই প্রশ্ন তোলার সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখতে পারলে হয়তো একদিন সত্যিকার অর্থেই আয়নায় ভিন্ন এক সমাজ দেখা যাবে।

পরিবর্তনের স্বপ্ন ভেঙে গেছে—এ কথা এখনই বলা যাবে না। তবে স্বপ্নকে টিকিয়ে রাখতে হলে আবেগের চেয়ে বেশি প্রয়োজন নীতি, আর ব্যক্তির চেয়ে বেশি প্রয়োজন প্রতিষ্ঠান।

হেয়ার রোডের ঝোপঝাড়ে হয়তো আবার নতুন কেউ উঠবেন। আকাশ একই থাকবে। কিন্তু সেই আকাশের নিচে রাজনীতির চরিত্র বদলাবে কি না—সেটিই এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট
email: [email protected]

আলহাজ্ব আব্দুর রহিম মোল্লা

৪ মাস আগে

সুন্দর কথামালা। আমাদের মানসিকতা কবে ফিরে আসবে জানিনা।তবে দেশাত্মবোধের বড্ড ঘাটতি।শুধুই ব্যাক্তিস্বার্থ।

মন্তব্য করুন