স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে প্রধান করে সংবিধান সংশোধনে বিশেষ কমিটি গঠন হয়েছে। বিরোধীদল এই পরিষদে নাম না দেয়ায় প্রস্তাবিত ১৭ সদস্যের মধ্যে ১২ সদস্যের বিশেষ এই কমিটি গঠন করা হয়। বিরোধী দল এই কমিটির বিরোধীতা করে গণভোটের আলোকে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবি জানিয়ে জাতীয় সংসদ থেকে ওয়াকআউট করে। সোমবার রাতে চিফ হুইপ বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব উত্থাপন করেন। পরে তা কণ্ঠভোটে পাস হয়। ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন।
চিফ হুইপ মোহাম্মদ নূরুল ইসলাম মনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী ইতিমধ্যেই ঘোষণা করেছেন যে, তার নেতৃত্বে গঠিত বর্তমান সরকার জুলাই ইশতেহার অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়নে বদ্ধপরিকর। সেই প্রেক্ষিতে বর্তমান সংসদের প্রথম অধিবেশনে কার্যপ্রণালী বিধির ২৬৬ বিধি মোতাবেক প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে অত্র সংসদের প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিটি রাজনৈতিক দল ও জোটের সদস্যদের সমন্বয়ে এমনকি স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের সমন্বয়ে সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত একটি কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেয়া হয়। সেই লক্ষ্যে বিরোধীদলীয় নেতৃবৃন্দের সাথে যোগাযোগ করলে তাদের কাছ থেকে অত্র অধিবেশনে নাম পাওয়ার আশ্বাসের প্রেক্ষিতে কমিটি গঠন প্রক্রিয়া বিলম্বিত করি। ইতিমধ্যেই কয়েক দফা এ বিষয়ে তাদের সাথে কথা হয়েছে কিন্তু তারা এখনো কোনো নাম আমার কাছে দেননি। এহেন অবস্থায় আমরা যে ১৭ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি তার প্রস্তাবিত কাঠামো নিম্নরূপ: বিএনপি থেকে ৭ জন, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি থেকে ১ জন, গণসংহতি আন্দোলন থেকে ১ জন, গণঅধিকার পরিষদ থেকে ১ জন এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ থেকে ১ জন, স্বতন্ত্র সদস্যদের মধ্য থেকে ১ জন এবং বিরোধী দল থেকে ৫ জন-এই নিয়ে ছিল মোট ১৭ জন। এই ১৭ জনের মধ্যে বিরোধী দলের জন্য ৫টি পদ শূন্য রেখে আজ ১২ সদস্যের কমিটি গঠনের প্রস্তাব করছি। বিরোধী দলের কাছ থেকে নাম পাওয়া গেলে তাদের ৫ জনকে অন্তর্ভুক্ত করে কমিটি পুনর্গঠন করা হবে।
কমিটির সদস্যরা হলেন-সালাউদ্দিন আহমেদ, ২৯৪ কক্সবাজার-১, সভাপতি। সদস্য মোহাম্মদ নূরুল ইসলাম (বরগুনা-২), মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান, (ঝিনাইদহ-১), জয়নাল আবেদিন (বরিশাল-৩), মোহাম্মদ জুনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি (ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬) হাবিবুর রহমান (ভোলা-১), মোহাম্মদ নুরুল হক (পটুয়াখালী-৩), মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন (চট্টগ্রাম-৫), ফারজানা শারমিন (নাটোর-১), সাকিলা ফারজানা (মহিলা আসন-১) মোহাম্মদ মাহমুদুল হক রুবেল (শেরপুর-৩), মোহাম্মদ অলিউল্লাহ (বরগুনা-১)।
বিরোধীদলের ওয়াকআউট :
গণভোটের রায় উপেক্ষা করে কমিটি গঠন করা হয়েছে অভিযোগ এনে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান কমিটিতে অংশ না নেয়ার ঘোষণা দেন এবং ওয়াকআউট করেন।
সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, এক দফায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাদের সঙ্গে বৈঠক করে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছেন এবং তখনই তাদের অবস্থান স্পষ্ট করা হয়েছিল। তারা কখনো সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে নাম দেয়ার বিষয়ে সম্মতি দেননি। নির্বাচনের আগে জনগণের কাছে দেয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট বিজয়ী হলে সেই রায় বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করা হয়েছিল বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, সেই অঙ্গীকারের ধারাবাহিকতায় তারা সংসদ সদস্য হিসেবে এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দুটি শপথ নিয়েছেন। তাদের মতে, দুটি শপথই এখনো বহাল রয়েছে। তাই গণরায়কে পাশ কাটিয়ে যদি সংবিধান সংশোধনী কমিটি গঠন করা হয়, তাহলে সেটি তারা গ্রহণ করবেন না।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, প্রায় ৬৮ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ গণভোটে যে মতামত দিয়েছেন, সেটিকে এভাবে উপেক্ষা করা হলে ভবিষ্যতে জনগণ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর আস্থা হারাবে। জনগণের রায়কে অসম্মান করার প্রতিবাদে তারা শুধু কমিটিতে অংশ নেবেন না, সংসদ থেকেও ওয়াকআউট করবেন।
ওয়াকআউটের পর বক্তব্য দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, বিরোধীদলের সিদ্ধান্ত তাদের রাজনৈতিক বিবেচনার বিষয় হলেও গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করতে হলে পঞ্চদশ সংবিধান সংশোধনী বাতিল করা প্রয়োজন। আর তা করতে হলে প্রথমেই সংসদের মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে।
মন্ত্রী বলেন, বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন হয়েছে, রাষ্ট্রপতি সংসদ আহ্বান করেছেন এবং সংসদের সব কার্যক্রমও একই সংবিধান অনুসারেই চলছে। সে অবস্থায় সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে আলাদা শপথ নেয়ার কোনো সাংবিধানিক ভিত্তি নেই। সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদ ও তৃতীয় তফসিলে এমন কোনো শপথের বিধান নেই। ফলে এ ধরনের শপথ আইনগতভাবে ‘নাল অ্যান্ড ভয়েড’।
তিনি আরও বলেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করতে হলেও আগে সংবিধান সংশোধন করতে হবে। সংসদ যদি ভবিষ্যতে সংবিধানে সংবিধান সংস্কার পরিষদের বিধান সংযোজন করে, তখন সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করেন, ‘জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন সংস্কার আদেশ’ রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক এখতিয়ারের বাইরে গিয়ে জারি করা হয়েছে। এটি সংবিধানের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ এবং আদালতে বিচারাধীন বিষয়ও রয়েছে। তাই সংসদের বাইরে বিকল্প কোনো কাঠামোর মাধ্যমে সংবিধান পরিবর্তনের সুযোগ নেই।
তিনি বলেন, সংবিধানের ৬৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আইন প্রণয়ন ও সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা জাতীয় সংসদের এবং ৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জনগণ সেই ক্ষমতা সংসদকে দিয়েছে। ফলে সংবিধান সংশোধনের একমাত্র বৈধ পথ সংসদীয় প্রক্রিয়া।
মন্ত্রী জানান, সংবিধান সংশোধনী কমিটি বিচার বিভাগ, আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন, গণমাধ্যমের সম্পাদক, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, বুদ্ধিজীবী এবং জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষরকারী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করবে। তাদের মতামতের ভিত্তিতে একটি সুপারিশ চূড়ান্ত করে সংসদে ১৮তম সংবিধান সংশোধনী বিল উত্থাপন করা হবে।
তিনি বিরোধীদলের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, আবেগতাড়িত রাজনীতি না করে একটি শক্তিশালী ও গ্রহণযোগ্য সংবিধান প্রণয়নে তারা যেন সংসদীয় প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়ে সহযোগিতা করেন।
ফাইল ছবি
সংবিধান সংশোধনে বিশেষ কমিটি গঠন, বিরোধী দলের ওয়াকআউট
সংসদ রিপোর্টার
অনলাইন
৪ ঘন্টা আগে
১৩ জুলাই (সোমবার), ২০২৬, ১০ঃ১৮ (অপরাহ্ণ)
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
