ট্রাম্পের ‘ইরান চুক্তি’ যেভাবে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ তেহরানের হাতে তুলে দিল

নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন

ট্রাম্পের ‘ইরান চুক্তি’ যেভাবে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ তেহরানের হাতে তুলে দিল

ফন্ট সাইজ:

গত জুনে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষর হয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সই করা এই সমঝোতা স্মারক মারাত্মক আইনি ও কৌশলগত দুর্বলতার কারণেই হরমুজ প্রণালি এখন সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার খাদের কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছে। চুক্তিটির এমন কিছু অস্পষ্ট ধারা ছিল যার সুযোগ নিয়ে ইরান এখন পুরো জলপথটির ওপর তাদের একচ্ছত্র সামরিক কর্তৃত্ব ও সার্বভৌমত্ব দাবি করছে। দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন থেকে ট্রাম্প প্রশাসনের এই চরম কূটনৈতিক ব্যর্থতা এবং এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে পুনরায় যুদ্ধাবস্থা তৈরির নেপথ্য কারণ জানা গেছে।

পর্দার আড়ালের ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ ও ওমান রুট: গত ফেব্রুয়ারি মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সাথে ইরানের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরপরই হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ও মাইন পুঁতে রাখা শুরু করে তেহরান। এতে বিশ্ব বাণিজ্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই রুটটি কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে মে মাসে মার্কিন নৌবাহিনী ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ নামে একটি গোপন অভিযান শুরু করে। এর অধীনে প্রায় ৮০০টি বাণিজ্যিক জাহাজকে তাদের অবস্থান শনাক্তকরণ ব্যবস্থা বা ট্র্যাকার বন্ধ করে ওমানের উপকূল ঘেঁষে দক্ষিণ দিক দিয়ে নিরাপদে যাতায়াত করার রেডিও নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছিল। এই সতর্ক পন্থার মাধ্যমে মে ও জুন মাসে যুদ্ধবিরতির মধ্যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের পরিমাণে বৃদ্ধি পায়।

ট্রাম্পের প্রচার বনাম চুক্তির রূঢ় বাস্তবতা: গত ১৪ই জুন ট্রাম্প যখন ইরানের সাথে ১৪ দফার সেই সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করেন, তখন তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উল্লাস প্রকাশ করে লিখেছিলেন, ‘বিশ্বের জাহাজসমূহ, তোমাদের ইঞ্জিন চালু করো... তেল ছড়াতে দাও!’ ট্রাম্প এটিকে আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের উন্মুক্ত অধিকার হিসেবে প্রচার করলেও সাবেক মার্কিন কূটনীতিক ও সামরিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্প আসলে ইরানের তৈরি করা নতুন স্থিতাবস্থাকেই আনুষ্ঠানিকভাবে মেনে নিয়েছেন। চুক্তির পঞ্চম অনুচ্ছেদে অত্যন্ত অস্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছিল যে, ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ যাতায়াতের জন্য ‘তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা দিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে’। সৌদি আরবে নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইকেল র‌্যাটনি বলেন, ইরান এই ধারাটিকে হরমুজ প্রণালিতে তাদের স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ ও একক কর্তৃত্বের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি হিসেবে ধরে নিয়েছে। আর এই লেভারেজ বা সুবিধা ধরে রাখতে তারা প্রয়োজনে যুদ্ধবিরতি ভেঙে নতুন করে সংঘাতে জড়াতেও দ্বিধা করছে না। চুক্তির শেষ লাইনে আরও বড় ছাড় দেওয়া হয়, যেখানে বলা হয়েছে ‘হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ প্রশাসন ও সামুদ্রিক পরিষেবা নির্ধারণ করতে ইরান ওমানের সুলতানাতের সাথে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা করবে’। এর অর্থ দাঁড়ায়, ট্রাম্প প্রশাসন ওমানের রুটটিকে সুরক্ষিত করার বদলে পুরো প্রণালির শাসনভার তেহরানের ওপর ছেড়ে দিয়েছে। প্রখ্যাত মধ্যপ্রাচ্য আলোচক ডেনিস রস বলেন, ট্রাম্পের শর্তই ছিল যে প্রণালি খুলবে, কিন্তু তা কেবল ইরানের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে এবং অন্য কোনো বিকল্প রুট গ্রহণযোগ্য হবে না।

চুক্তি সইয়ের পর ইরানের দাবি ছিল, হরমুজ প্রণালি পার হতে যাওয়া যেকোনো জাহাজকে তেহরানের গঠিত ‘পার্সিয়ান গালফ স্ট্রেইট অথরিটি’ থেকে অনুমতি নিতে হবে এবং তাদের নির্ধারিত উত্তর দিকের রুট অর্থাৎ ইরানের নিজস্ব জলসীমা ব্যবহার করতে হবে। আর এই সুবিধা দেওয়ার নামে তারা প্রতিটি জাহাজের কাছ থেকে ২০ লাখ ডলার পর্যন্ত টোল বা ফি দাবি করতে শুরু করে। যুক্তরাষ্ট্র ও ওমান এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে দক্ষিণ রুট দিয়ে জাহাজ চালানো অব্যাহত রাখলে গত সপ্তাহে ইরান ওই ওমান রুটের জাহাজে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। এর জবাবে ট্রাম্প ইরানে তীব্র বিমান হামলার নির্দেশ দেন এবং চুক্তিটিকে ‘ভেস্তে গেছে’ বলে ঘোষণা করে ইরানের তেল বিক্রির ওপর পুনরায় নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) গত এক সপ্তাহে ইরানি সামরিক স্থাপনায় ৩১০টি বিমান হামলা চালানের দাবি করেছে। অন্যদিকে ইরানও এই জলপথ অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছে। এই পাল্টাপাল্টি হামলার জেরে গত সপ্তাহে যেখানে ৪০০টি জাহাজ হরমুজ পার হয়েছিল, তা গত বৃহস্পতিবার কমে মাত্র ২২টিতে নেমে এসেছে। ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম হু হু করে বাড়ছে। ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড্যান অ্যালামারিউ পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে বলেন, মূল প্রশ্ন এখন একটাই কার দেয়াল আগে ভাঙবে। ইরান নাকি যুক্তরাষ্ট্রের?

মোঃ হারুনুর রশিদ

২ ঘন্টা আগে

যুক্তরাষ্ট্র নাকে খত দেওয়া লাগবে

মন্তব্য করুন