রাতভর টানা ভারী বর্ষণে চট্টগ্রামের বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। শনিবার কিছু এলাকায় পানি কমতে শুরু করলেও রোববার দিবাগত রাত থেকে শুরু হওয়া তীব্র ভারী বর্ষণে নতুন করে পানি বেড়েছে সাতকানিয়া, বাঁশখালী, লোহাগাড়া ও চন্দনাইশসহ বিস্তীর্ণ জনপদে। কোথাও কোথাও কাঁচা ও মাটির ঘর ধসে পড়েছে, আবার কোথাও ঘরের ভেতর কোমরসমান পানি ঢুকে পড়েছে। লাখো মানুষ এখনও পানিবন্দি অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
চট্টগ্রামে সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা বিরাজ করছে সাতকানিয়া ও বাঁশখালী উপজেলায়। এ দুই উপজেলায় প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ এখনও পানিবন্দি। জেলার ১৬টি উপজেলার ১৭৬টি ইউনিয়নে ৬ লাখের বেশি মানুষ বন্যাকবলিত অবস্থায় রয়েছেন। জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, বন্যায় এখন পর্যন্ত ১৪ হাজার ২৮১টি বসতঘর, ২১২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং ১৪৫টি সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সরজমিনে দেখা গেছে, উপজেলার বাহারছাড়া ইউনিয়নের দক্ষিণ ইলশা এলাকায় ভিন্ন জায়গা থেকে আসা ত্রাণবাহী বেশ কিছু গাড়ি লক্ষ করা যায়। বন্যার পানিতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যোগাযোগব্যবস্থা। যে কারণে ভুক্তভোগীদের কাছে ত্রাণগুলো পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। সকাল থেকে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থেকে একই ব্যক্তিদের বারবার ত্রাণ পেতে দেখা গেছে।
বাঁশখালীর কাথারিয়া, বড়ইতলী, গণ্ডামারা, ডোমরা, কদমরসুল, খানখানাবাদ, বাহারছড়া, চাম্বল, ছনুয়া, শেখেরখীল, সরল ও পুঁইছড়িসহ উপকূলীয় বিভিন্ন এলাকায় অধিকাংশ বাড়িঘর এখনও পানির নিচে। অসংখ্য কাঁচা ও মাটির ঘর ধসে পড়েছে। অনেকে আশ্রয়কেন্দ্রে গেলেও অনেক পরিবার বাড়ির উঁচু অংশ কিংবা টিনের ছাদে আশ্রয় নিয়ে দিন কাটাচ্ছে।
চাম্বল ইউনিয়নে বাসিন্দা হারুন আল রশীদ জানান, আমাদের দাদার আমলের সেই মাটির বাড়ির দেয়ালগুলো ভেঙে পড়ছে। শনিবার পানি কমে গেছিলো রোববার বিকালে থেকে আবার পানি বাড়তে শুরু করেছে। ঘর ভেঙে গেলে আশ্রয়হীন হয়ে পড়বো ।
বাঁশখালী ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন অফিসার মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘শনিবার পানি কিছুটা কমলেও রাতের বৃষ্টিতে আবার পানি বেড়েছে। বেশিরভাগ এলাকায় নৌকা ছাড়া যাতায়াত সম্ভব নয়। পানি নামলে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে নতুন করে জীবনযুদ্ধ শুরু করতে হবে।’
সাতকানিয়ার কেঁওচিয়া, বাজালিয়া, এওচিয়া, ছদাহা, সোনাকানিয়া, ঢেমশা, খাগরিয়া, চরতী ও আমিলাইষ ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা এখনও পানিতে তলিয়ে রয়েছে। অনেক সড়ক ডুবে যাওয়ায় যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট দিন দিন বাড়ছে।
সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খন্দকার মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘পানি ধীরে ধীরে নামতে শুরু করেছে। তবে ডলু নদীসংলগ্ন নিচু এলাকায় এখনও পানি রয়েছে। দুর্গম এলাকায় নৌকায় করে শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানি পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।’
লোহাগাড়া সদর, আধুনগর, বড়হাতিয়া ও আমিরাবাদ ইউনিয়নের অধিকাংশ এলাকা এখনও প্লাবিত। অনেক পরিবার ঘরবাড়ি ছেড়ে আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। ব্যবসায়ী মো. আলমগীর বলেন, ‘সরকারি ত্রাণ প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। শিশুদের দুধ ও বয়স্কদের ওষুধের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।’
চন্দনাইশেও পরিস্থিতির পুরোপুরি উন্নতি হয়নি। নতুন করে বৃষ্টি শুরু হওয়ায় শঙ্খ নদী তীরবর্তী নিচু এলাকায় পানি বাড়ছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুর রহমান জানান, উপজেলায় প্রায় ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন। এখন পর্যন্ত ১৪৫ মেট্রিক টন চাল, ১ হাজার ১০০ প্যাকেট শুকনো খাবার এবং ২০০ প্যাকেট রান্না করা খাবার বিতরণ করা হয়েছে।
এদিকে আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, গতকাল রোববার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় আবহাওয়া অফিসের পতেঙ্গা পর্যবেক্ষণাগারে ১৬০ মিলিমিটার ও আমবাগান পর্যবেক্ষণাগারে দেশের সর্বোচ্চ ১৪০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। এর আগে বিকেল ৩টা পর্যন্ত সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় পতেঙ্গা পর্যবেক্ষণাগারে ১৫১ দশমিক ৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়।
গতকাল দুপুর ১২টায় দেয়া আবহাওয়া অফিসের ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাসে বলা হয়, পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রাম, সিলেট, ঢাকা, রাজশাহী, ময়মনসিংহ ও রংপুর বিভাগের কোথাও কোথাও ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে।
পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাস কর্মকর্তা সুমন সাহা জানান, আজ সোমবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত চট্টগ্রাম ও পার্শ্ববর্তী জায়গাসমূহের অধিকাংশ জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়া ও বিদ্যুৎ চমকানোসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের ভারী এবং কোথাও কোথাও অতি ভারী বৃষ্টি অথবা বজ্রসজহ বৃষ্টি হতে পারে। পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, নদ-নদীর পানি ধীরগতিতে নামছে। তাই নিচু এলাকার মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
এদিকে জেলা মৎস্য বিভাগের হিসাবে এবারের বন্যায় প্রায় ৪০ কোটি টাকার মৎস্যসম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রাণিসম্পদ বিভাগের প্রাথমিক হিসেবে প্রায় ২৮ কোটি টাকার প্রাণিসম্পদের ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে।
জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, চট্টগ্রামে ৬৭০টি আশ্রয়কেন্দ্রে বর্তমানে ২২ হাজার ৬০০ মানুষ অবস্থান করছেন। পাঁচ জেলায় মোট ১ হাজার ৭২৭টি আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন ৩৭ হাজার ৫৫ জন।
এ পর্যন্ত চট্টগ্রামে ৫৫৭ টন চাল ও ৩০ লাখ ৪০ হাজার টাকা বিতরণ করা হয়েছে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য আরও ৫৬৫ টন চাল, ৮৮ লাখ টাকা এবং ৪ হাজার ৩৫০ বান্ডিল ঢেউটিনের প্রয়োজন রয়েছে বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন।
চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, ‘দুর্গম এলাকায় স্পিডবোট ব্যবহার করে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড, ফায়ার সার্ভিস ও প্রায় ১০ হাজার স্বেচ্ছাসেবক উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে কাজ করছেন।’
অতি ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড়ধসের কারণে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে। বিভাগীয় প্রশাসনের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, পাঁচ জেলায় এ পর্যন্ত ৫০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে কক্সবাজারে ২৮ জন, চট্টগ্রামে ১৩ জন, বান্দরবানে ৬ জন এবং রাঙামাটিতে ৩ জন মারা গেছেন। আহত হয়েছেন অন্তত ৫০ জন। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ লাখ ৬৬ হাজার ৬১৪ জন।
