ঢাকায় টাকা ঢেলেও জলাবদ্ধতা

সহযোগীদের খবর

ঢাকায় টাকা ঢেলেও জলাবদ্ধতা

ফন্ট সাইজ:

প্রথম আলো

‘ঢাকায় টাকা ঢেলেও জলাবদ্ধতা’-এটি দৈনিক প্রথম আলোর প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, ঢাকায় ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালিয়ে সংসার চালান সোহরাব সরদার। গতকাল রোববার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে তিনি রাজধানীর কাজীপাড়ায় হাঁটুপানিতে বিকল হওয়া মোটরসাইকেল ঠেলছিলেন। গন্তব্য মগবাজার।

সোহরাব বলেন, মিরপুর ১০ নম্বরে যাত্রী নামিয়ে ফেরার পথে তাঁর মোটরসাইকেলে পানি ঢুকে বিকল হয়ে গেছে। এখন সেটিকে ঠেলে ঠেলে মগবাজার নিয়ে সারাবেন। এতে পুরো দিনে আর কোনো আয়ের আশা দেখছেন না তিনি। তিনি বলেন, ‘আজকে (গতকাল) আর কোনো ট্রিপ পামু না।’

ঢাকায় শনিবার দিবাগত রাত ও গতকাল দিনের প্রথম ভাগে যে বৃষ্টি হয়েছে, তাতে জলাবদ্ধতা ও মানুষের দুর্ভোগের একটি খণ্ডচিত্র এটি। ঢাকা কার্যত ডুবে গিয়েছিল। অনেক এলাকার সড়কে বিকল হয়ে পড়েছিল যানবাহন। যাঁরা ঘর থেকে বেরিয়েছেন, তাঁদের সীমাহীন ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে। বহু মানুষের ঘরেও পানি ঢুকেছে। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছিল যে বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিজ উদ্যোগে পরীক্ষা স্থগিত ও ক্লাস বাতিল করে ছুটি দিতে বাধ্য হয়।

অবশ্য ঢাকায় অতিবৃষ্টি হলেও ‘১৫ মিনিটের মধ্যে’ পানি নেমে যাবে, আর ‘জলাবদ্ধতা দেখা যাবে না’—এসব কথা শোনানো হয়েছিল নগরবাসীকে। বলেছিলেন জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের স্থানীয় সরকারমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন (২০১৭ সালে) এবং ঢাকা দক্ষিণের তৎকালীন মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস (২০২৩ সালে)। খরচ করা হয়েছিল বহু টাকা।

ঢাকা ওয়াসা ও দুই সিটি করপোরেশনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ এক দশকে ঢাকা ওয়াসা ও দুই সিটি করপোরেশন নালা নির্মাণ ও সংস্কার, খাল পরিষ্কার এবং জলাবদ্ধতা নিরসনের অন্যান্য কাজে অন্তত ২ হাজার ১৪৬ কোটি টাকা খরচ করেছে। কিন্তু জলাবদ্ধতা যায়নি।

২০২৫ সালে কত খরচ হয়েছে, সে হিসাব পাওয়া যায়নি। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দায়িত্ব পালন করা ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ ২০২৫ সালের এপ্রিলে বলেছিলেন, চিহ্নিত ১৯টি স্থানের মধ্যে ৭টিতে জলাবদ্ধতা হতে পারে এবং পানি তিন ঘণ্টার মধ্যে নেমে যাবে। একই বছরের সেপ্টেম্বরে তিনি ‘রাইট পারসন, রাইট টাইমে, রাইট জায়গায়’ থাকার কারণে বড় জলাবদ্ধতা হয়নি বলে দাবি করেন।

অবশ্য গতকালের চিত্র এসব দাবিকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। নগর–পরিকল্পনাবিদ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ঢাকায় এত বেশি বৃষ্টির কারণে জলজট হতে পারে। কিন্তু জলাবদ্ধতা হলে বুঝতে হবে, সেটা ব্যর্থতা।

সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা সাধারণত অল্প সময় পানি জমে থাকাকে ‘সাময়িক জলজট’ বলেন। নগর-পরিকল্পনার সাধারণ ব্যাখ্যা অনুযায়ী, অল্প সময়ে অতিরিক্ত বৃষ্টি হলে নালার তাৎক্ষণিক ধারণক্ষমতা ছাড়িয়ে যে পানি জমে এবং বৃষ্টি কমার পর দ্রুত নেমে যায়, সেটিই জলজট। অন্যদিকে নালা, খাল, কালভার্ট বা আউটলেট বন্ধ, সরু কিংবা বিচ্ছিন্ন থাকায় পানি দীর্ঘ সময় আটকে থাকা এবং একই এলাকায় বারবার এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়াই জলাবদ্ধতা।

ঢাকায় গতকালের বৃষ্টিতে কিছু এলাকায় পানি দ্রুত নেমেছে। আবার অনেক এলাকায় দীর্ঘ সময় আটকে ছিল। অর্থাৎ জলাবদ্ধতাই বড় সমস্যা। নগর–পরিকল্পনাবিদদের মতে, সমস্যার কারণ দুটি। প্রথমত, পানি নেমে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট পথ নেই। দ্বিতীয়ত, খালগুলো অনেকাংশে বেদখল, ভরাট ও আবর্জনায় ভরা। যে ড্রেন বা নালা দিয়ে পানি নেমে যাবে, সেগুলোও বালু ও আবর্জনায় ভরে গেছে।

ঢাকা উত্তর সিটির প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান গতকাল কাজীপাড়ার পরিস্থিতি পরিদর্শন করেন। তাঁর ভাষ্য, যত্রতত্র ময়লা ফেলায় নালার সংযোগ বন্ধ হয়ে অধিকাংশ জলজট তৈরি হচ্ছে। এর আগে তিনি বিমানবন্দর সড়ক, মিরপুরসহ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নালা ও খালের পানিপ্রবাহ শতভাগ সচল রাখার নির্দেশ দিয়েছিলেন। রোববারের পরিস্থিতি দেখিয়েছে, সেই প্রস্তুতি যথেষ্ট ছিল না।

১২ ঘণ্টায় ১৫৮ মিলিমিটার বৃষ্টি

আবহাওয়া অধিদপ্তরের হিসাবে, শনিবার দিবাগত রাত ১২টা থেকে গতকাল সকাল ৬টা পর্যন্ত ঢাকায় ৭৬ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত হয়েছে আরও ৮২ মিলিমিটার। অর্থাৎ ১২ ঘণ্টায় বৃষ্টি হয়েছে ১৫৮ মিলিমিটার।

২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে ৬ ঘণ্টায় ১২২ মিলিমিটার বৃষ্টির পর রাজধানীর কিছু সড়ক থেকে ১৫ ঘণ্টায়ও পানি নামেনি। এর আগের বছর এক দিনে ঢাকায় ২৫৫ মিলিমিটার বৃষ্টিও হয়েছিল। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ৩ ঘণ্টায় ৬০ মিলিমিটার বৃষ্টিতেই রাজধানীর বহু এলাকা ডুবে যায়। মতিঝিল, কমলাপুর, গ্রিন রোড ও ঢাকা কলেজ এলাকার পানি ১২ ঘণ্টায়ও সরেনি।

সরেজমিনে দেখা যায়, গতকাল সড়ক পানিতে ডুবে যাওয়া এলাকার মধ্যে রয়েছে গ্রিন রোড, পান্থপথ, ধানমন্ডি, কারওয়ান বাজার, বিজয় সরণি, বনানী-কাকলী, বারিধারা, বাড্ডা, খিলগাঁও, মগবাজার, মোহাম্মদপুর, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, মিরপুর, নিউমার্কেট, আজিমপুর, মতিঝিল, শ্যামপুর ও কদমতলী। ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় খোঁড়াখুঁড়ি মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়েছে।

সমস্যা কী

নিউমার্কেট, নীলক্ষেত ও ঢাকা কলেজের সামনের সড়কে পানি এতটাই বেড়েছিল যে সড়ক ও ফুটপাতের সীমানা আলাদা করা কঠিন হয়ে পড়ে। সকাল থেকে নিউমার্কেটের সব দোকান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়। দুর্ঘটনা এড়াতে বিদ্যুৎ-সংযোগও বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। কোনো ক্রেতাও সেখানে যেতে পারেননি।

নিউমার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির অফিস সেক্রেটারি ফিরোজ উল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, পরিস্থিতি দেখে আজ সোমবার দোকান খোলার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

নিউমার্কেট এলাকার জলাবদ্ধতা সমাধানের গাফিলতির একটি উদাহরণ। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, নিউমার্কেটের জলাবদ্ধতা নতুন নয়। আগে নিউমার্কেট ও আশপাশের এলাকার পানি পিলখানার একটি নালা দিয়ে বুড়িগঙ্গায় যেত। ২০০৯ সালের পর নিরাপত্তার কারণে সেই পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়। কিন্তু নতুন কোনো কার্যকর পথ তৈরি করা হয়নি। ফলে বৃষ্টি বেশি হলেই ওই এলাকায় জলাবদ্ধতা হচ্ছে।

পানি নামার পথেই বাধা

ঢাকা উত্তর সিটিতে ২৯টি খাল রয়েছে। এগুলোর মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ১০৫ কিলোমিটার। খোলা ও পাইপ-নালা মিলিয়ে রয়েছে প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার। দক্ষিণ সিটিতে রয়েছে ২৬টি খাল এবং ১ হাজার ৩০০ কিলোমিটারের বেশি নালা-নর্দমা।

নথিপত্রে এত খাল-নালা থাকলেও পানি নামার পুরো পথ সচল নয়। বৃষ্টির পানি প্রথমে সড়ক থেকে নালায়, পরে কালভার্ট ও খাল হয়ে ‘আউটলেট’ দিয়ে নদীতে যাওয়ার কথা। এই পথের কোনো একটি অংশ বন্ধ, সরু বা বিচ্ছিন্ন হলে পুরো ব্যবস্থার সক্ষমতা কমে যায়।

উত্তর সিটির প্রকৌশল বিভাগ বলছে, ২৫ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টি হলে স্বল্প সময়ের মধ্যে পানি নেমে যায়। এর বেশি হলে সময় লাগে। গতকাল সংস্থাটি পানি সরানোর কাজে বাড়তি জনবল নিয়োগ করেছিল। একইভাবে দক্ষিণ সিটিও চেষ্টা করেছে বলে দাবি করেছে।

দক্ষিণ সিটির পানি মূলত তিনটি আউটলেট দিয়ে নদীতে যাওয়ার কথা। দোলাইপাড় পাম্পস্টেশনের তিনটি পাম্পের প্রতিটি প্রতি সেকেন্ডে পাঁচ হাজার লিটার পানি সরাতে পারে। কমলাপুরের টিটিপাড়া পাম্পস্টেশনের তিনটি পাম্পের মধ্যে দুটি সচল।

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের যান্ত্রিক বিভাগের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, কোথাও নালার মুখ বর্জ্য ও পলিতে বন্ধ, কোথাও কালভার্ট সরু, আবার কোথাও খালের সঙ্গে নালার সংযোগ বিচ্ছিন্ন। এসব প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে পানি পাম্প পর্যন্ত না পৌঁছালে উচ্চক্ষমতার পাম্পও কাজে আসে না।

দক্ষিণ সিটির প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান গতকাল বিকেলে প্রথম আলোকে বলেন, বিদ্যমান ব্যবস্থায় ৩০ মিলিমিটার বৃষ্টির পানি তাৎক্ষণিকভাবে এবং ৩০ থেকে ৫০ মিলিমিটার বৃষ্টির পানি সর্বোচ্চ দুই ঘণ্টায় সরানো সম্ভব। গতকালের বৃষ্টি সেই সক্ষমতার কয়েক গুণ।

অবশ্য বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন, বেশি বৃষ্টি ঢাকায় বিরল ঘটনা নয়। এত টাকা খরচের পরও সেই প্রস্তুতি নেই কেন?

জলাবদ্ধতা নিরসনে ২ হাজার ১৪৬ কোটি টাকা ব্যয়ের হিসাবটি দুই সময়ের। ২০১৫-১৬ থেকে ২০১৯-২০—এই পাঁচ অর্থবছরে ঢাকা দক্ষিণ সিটি নালা নির্মাণ ও সংস্কারে ৬০৫ কোটি ৫৪ লাখ এবং উত্তর সিটি ৭১১ কোটি টাকা খরচ করে। একই সময়ের কাছাকাছি ঢাকা ওয়াসা জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রায় ১০০ কোটি টাকা ব্যয় করে। সব মিলিয়ে ব্যয় হয় প্রায় ১ হাজার ৪১৬ কোটি টাকা।

২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর ওয়াসার কাছ থেকে পানিনিষ্কাশনের দায়িত্ব নেওয়ার পর পরবর্তী চার বছরে দুই সিটি আরও অন্তত ৭৩০ কোটি টাকা খরচ করে। দুই সময়ের অঙ্ক যোগ করলে ব্যয় দাঁড়ায় ২ হাজার ১৪৬ কোটি টাকার বেশি।

প্রশ্ন হলো, নালা নির্মাণ করা হলেও পানি যাওয়ার শেষ পথটি সচল হয়েছে কি না। অনেক ক্ষেত্রেই তা হয়নি। এ কারণে এত ব্যয়ের পরও দুই সিটি গত এপ্রিলে ঢাকায় জলাবদ্ধতার ঝুঁকিপূর্ণ ১৪১টি স্থান চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে উত্তর সিটিতে ১০৮টি এবং দক্ষিণ সিটিতে ৩৩টি।

ঢাকা দক্ষিণ সিটির প্রশাসক মো. আবদুস সালাম গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে বিগত সময়ে মন্ত্রী ও মেয়ররা যে বক্তব্য দিয়েছিলেন, সেটার সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল ছিল না। মুখরোচক বক্তব্য না দিয়ে জলাবদ্ধতা নিরসনে স্থায়ী সমাধানের দিকে যেতে হবে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, জলাবদ্ধতা থেকে বাঁচাতে হলে পানিনিষ্কাশনের পথ বাড়াতে হবে।

নগর-পরিকল্পনাবিদেরা একই কথা বলছেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান প্রথম আলোকে বলেন, ঢাকায় প্রাকৃতিক জলপথ ও কৃত্রিম নালাকে যুক্ত করে সমন্বিত পানিনিষ্কাশন মহাপরিকল্পনা নেই। বিচ্ছিন্নভাবে প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে, কিন্তু পানি শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে পড়বে, সেই ‘আউটলেট’ সচল করা হচ্ছে না। শুধু যেখানে পানি জমে, সেখানে নতুন নালা বানিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

প্রশ্ন হলো, নতুন সরকার কি সমন্বিত পরিকল্পনা তৈরি করে কাজ করবে, নাকি বিগত সময়ের মতো অপরিকল্পিতভাবে টাকা ঢালবে? পরিকল্পিতভাবে কাজ না করা হলে মানুষের ভোগান্তি যাবে না।

এদিকে গতকাল রাত সাড়ে ৯টায় শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ঢাকার অনেক জায়গায় পানি জমে ছিল। ভাড়ায় মোটরসাইকেলচালক সোহরাব সরদার রাতে প্রথম আলোকে বলেন, তিনি গতকাল ৩০০ টাকা আয় করেছিলেন। মোটরসাইকেল ঠেলে ঠেলে মগবাজার নিয়ে মেরামত করাতে সেই ৩০০ টাকা খরচ হয়ে গেছে। আর পথে নামতে পারেননি তিনি।

যুগান্তর

দৈনিক যুগান্তরের প্রধান শিরোনাম ‘ভারি বৃষ্টিতে ডুবল ঢাকা দিনভর চরম দুর্ভোগ’। খবরে বলা হয়, রাজধানীতে শনিবার মধ্যরাত থেকে রোববার দুপুর পর্যন্ত মুষলধারে বৃষ্টি হয়েছে। এতে সড়ক, অলিগলি এবং বিভিন্ন নিচু এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। জলাবদ্ধতা ও জলজটে সড়কে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। এ কারণে অফিসগামী, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা দুর্ভোগে পড়েন। অল্প সময়ে অতি বর্ষণে রোববার রুটিন কার্যক্রমগুলো নানাভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমান উড্ডয়ন ও অবতরণ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠাগুলোর অর্ধবার্ষিক ও প্রাক-নির্বাচনি পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। অনেক স্কুলে ঘোষণা করা হয় ছুটি। অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নেওয়া হয়েছে অনলাইনে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে সাগরে লঘুচাপ তৈরি হওয়ায় ঢাকাসহ সারা দেশে অতি বৃষ্টিপাত হচ্ছে। রাজধানীতে শনিবার রাত ১২টা থেকে রোববার সকাল ৬টা পর্যন্ত ৭৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। এর পর থেকে দুপুর পর্যন্ত বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয় ৯৭ মিলিমিটার। সংশ্লিষ্টদের মতে, নগরীর নিষ্কাশন ব্যবস্থাপনার দুর্বলতায় বিভিন্ন সড়কে পানি জমে যায়। কোথাও ১ থেকে ২ ঘণ্টায় পানি সরে যায়। আবার কোথাও দীর্ঘ সময় আটকে থাকে। জনবহুল ঢাকার কর্মব্যস্ত দিনে রোববার লাখো মানুষকে সীমাহীন দুর্ভোগ মাড়িয়ে চলাচল করতে হয়। এ সময় জলমগ্ন সড়কে শত শত মোটর সাইকেল, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ব্যাটারিচালিত রিকশা এবং প্রাইভেট কার অকেজো হতে দেখা যায়।

প্রবল বর্ষণ প্রসঙ্গে পানি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত যুগান্তরকে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঢাকাসহ সারা দেশে অল্প সময়ে বেশি পরিমাণ বৃষ্টি হয়েছে। দিনদিন এটি আরও বাড়বে; জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অপ্রত্যাশিত অনেক কিছু আমাদের দেখতে হবে। তিনি বলেন, ঢাকার দুই সিটির ডোবা, নালা ও জলাশয়গুলো ভরাট হওয়ায় সামনের দিনগুলোয় জলাবদ্ধতার আশঙ্কা অনেক বেশি। ঢাকার পানি নিষ্কাশনের যে অবস্থা, ভারি বৃষ্টি হলে তা যথাযথভাবে নিষ্কাশন করা সম্ভব হবে না। এজন্য বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে পানি নিষ্কাশন সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

ড. আইনুন নিশাত আরও বলেন, ঢাকার ভূপ্রকৃতি হলো মাঝখানটা উঁচু এবং চারদিকে নিচু; ঠিক যেন কচ্ছপের পিঠের মতো। ২০১৫ সালে ঢাকার জলাবদ্ধতা বা পানি নিষ্কাশন বিষয়ে একটি গবেষণা করা হয়। সেখানে জলাবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টির পরিমাণ বৃদ্ধিতে ঢাকার বিদ্যমান বাস্তবতায় করণীয় বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তার যথাযথ বাস্তবায়ন হচ্ছে না।

সরেজমিন দেখা যায়, মৌসুমে ভারি বর্ষণে রোববার নগরীর বিজয় সরণি, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ, কাওরান বাজার, ধানমন্ডি, মিরপুরের কাজীপাড়া, সচিবালয়, কালশীসহ বিভিন্ন এলাকার সড়কে পানি জমে গেছে। কোথাও কোথাও হাঁটুসমান পানি থাকায় যানবাহনের গতি কমে যায় এবং দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। ভারি বৃষ্টির কারণে মিরপুরের কিছু এলাকার রাস্তাঘাট, বাসাবাড়ি, ক্যাম্প, বস্তি ও দোকানপাটে পানি ঢুকে পড়ে। মিরপুরে ১, ২, ১০, ১৩ নম্বর বিআরটিএ, শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া, আনসার ক্যাম্প, কালশী, সাংবাদিক আবাসিক এলাকা, মিরপুর-১২ নম্বর ‘বি’ ব্লক, বাইশটেকি, মিরপুর-১১ অ্যাভিনিউ ফাইভে জলজটে রীতিমতো নাকাল হয়েছে মানুষ।

নগরীর খিলগাঁও, গোড়ান, তালতলা, সবুজবাগ, মুগদা, মানিকনগর, মতিঝিল, মালিবাগ, মৌচাকসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সড়কে জলজটের সৃষ্টি হয়। অনেক এলাকায় ফুটপাত পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় পথচারীরা বাধ্য হয়ে মূল সড়ক ব্যবহার করেন। আর ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মেয়র মোহাম্মদ হানিফ ফ্লাইওভার টোল গেটসংলগ্ন কাজলা সড়ক হাঁটুসমান পানিতে ডুবে থাকতে দেখা গেছে।

মহাখালীর বাসিন্দা ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা মো. জাহিদ হাসান যুগান্তরকে জানান, পাঁচ বছর পেছনে তাকালে ঢাকার সড়কে এত পানি দেখছেন বলে তার মনে পড়ে না। রোববার বাসে করে মহাখালী থেকে কুড়িল যাওয়ার সময় সড়কের পানিতে বাসের দরজা ডুবে যেতে দেখেছেন তিনি। সড়কে গাড়ি অকেজো হয়ে পড়ে থাকতেও তিনি দেখেছেন। বনানীর প্রধান সড়কের জমাট পানি দেখে মনে হয়েছে-এটা যেন খাল, কোনো সড়ক নয়।

কালের কণ্ঠ

‘বন্যার পরিধি ও দুর্ভোগ বাড়ছে’-এটি দৈনিক কালের কণ্ঠের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, বর্ষার টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে ছয় দিনে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে দেশের উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল। গতকাল রবিবার বৃহত্তর চট্টগ্রামের অন্যান্য জেলার বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে।

তবে বান্দরবান জেলায় নদ-নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে বইছিল। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সিলেট, সুনামগঞ্জ ও নেত্রকোনায় নদীর পানিও বিপৎসীমার ওপরে বইছিল। পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র এ তথ্য জানিয়েছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, দেশের অভ্যন্তরে ও উজানে বৃষ্টিপাত বেড়ে যাওয়ায় নদ-নদীর পানি বেড়েছে।

এতে ১০টি জেলায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে। সংস্থাটি আরো জানায়, তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানি বেড়ে গতকাল বিপৎসীমার ওপরে বইছিল। এতে নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর ও গাইবান্ধা জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে কোথাও কোথাও স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতি হতে পারে। সংস্থার নির্বাহী প্রকৌশলী সর্দার উদয় রায়হান গতকাল সন্ধ্যায় কালের কণ্ঠকে বলেন, দেশের অভ্যন্তরে টানা ভারি থেকে অতিভারি বৃষ্টিপাত ও উজানে ভারি বৃষ্টিপাত বেড়ে যাওয়ায় ১০টি জেলায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে।

বৃহত্তর চট্টগ্রামে বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢল কমে আসায় চট্টগ্রাম জেলায় বন্যা পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতি হয়েছে। বান্দরবানের পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। চার জেলায় বন্যা পরিস্থিতি আগের অবস্থায় আছে।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, উজানে ভারি বৃষ্টিপাতে চট্টগ্রাম অঞ্চলে ফেনী জেলায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতির শঙ্কা দেখা দিয়েছে। সিলেট অঞ্চলে সিলেট ও সুনামগঞ্জ, রংপুর অঞ্চলে লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী ও রংপুর এবং ময়মনসিংহ অঞ্চলে ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা ও শেরপুর জেলায় বন্যা পরিস্থিতি অবনতি ঘটতে পারে।

সাঙ্গু নদীর পানি বান্দরবান পয়েন্টে এখনো বিপৎসীমার ওপরে বইছে এবং দোহাজারী পয়েন্টে বিপৎসীমার নিচে নেমে এসেছে। মাতামুহুরী নদী গতকাল লামা ও চিরিংগা পয়েন্টে বিপৎসীমার নিচে বইছিল। চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির ধীরগতিতে উন্নতি হয়েছে। মুহুরী, ফেনী, সিলোনিয়া ও হালদা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার ওপরে বইছিল। এ ছাড়া লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালী জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চল কোথাও কোথাও সাময়িকভাবে প্লাবিত হতে পারে।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র সূত্রে জানা গেছে, সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, শেরপুর ও ময়মনসিংহ জেলার সারিগাইন, যাদুকাটা, সোমেশ্বরী ও ভুসাই-কংস নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হতে পারে। কুশিয়ারা নদীর পানি সিলেট ফেঞ্চুগঞ্জ পয়েন্টে চার সেন্টিমিটার বেড়ে বিপৎসীমার ২৫ সেন্টিমিটার ওপরে এবং সুনামগঞ্জ জেলার মারকুলি পয়েন্টে তিন সেন্টিমিটার কমে বিপৎসীমার ১৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইছিল। সোমেশ্বরী নদীর পানি নেত্রকোনা জেলার কলমাকান্দা পয়েন্টে চার সেমি বেড়ে বিপৎসীমার দুই সেমি ওপর দিয়ে বইছিল এবং নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে কোথাও কোথাও স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। আবহাওয়াবিদ এ কে এম নাজমুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, দেশে মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকায় বিক্ষিপ্তভাবে সারা দেশে বৃষ্টি অব্যাহত থাকবে। কোথাও কোথাও ভারি থেকে অতিভারি বৃষ্টিপাত হতে পারে। বৃষ্টিপাত আরো অন্তত পাঁচ দিন থাকতে পারে।
 সমকাল

দৈনিক সমকালের প্রধান শিরোনাম ‘চট্টগ্রাম বিভাগ: দুর্ভোগে পানিবন্দি মানুষ’। প্রতিবেদনে বলা হয়, চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নের সৌদিপ্রবাসী আক্কাস আলীর পাকা ঘরে এখন হাঁটুপানি। রান্নাবান্না বন্ধ। নেই কোনো পুরুষ মানুষ। দুই সন্তানকে নিয়ে গৃহবধূ আসমা বেগম পড়েছেন ঘোর বিপদে। গতকাল রোবার দুপুরে জানতে চাইলে আসমা বেগম বলেন, ‘বিল্ডিং ঘরে থাকি। মানুষ ভাবছে, আমরা ভালো আছি। আমাদের হাতে কিছু টাকা আছে। কিন্তু সে টাকা দিয়ে খাবার ও বিশুদ্ধ পানি আনার মতো অবস্থা নেই।’

শুধু আসমা বেগম নন; ছয় দিন ধরে নানা দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে চট্টগ্রামের বানভাসিদের। পানি আগের তুলনায় কিছুটা কমলেও গতকাল আবার বৃষ্টি বাড়ায় নতুন করে বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, ৫ জুলাই থেকে গতকাল পর্যন্ত অতিবৃষ্টিতে সৃষ্ট বন্যায় পাঁচ লাখ ৯৫ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত। প্রাণ হারিয়েছেন ১৩ জন। আহত ১২ জন। ৫৮০টি কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন ২১ হাজার ৯০০ জন।

গতকাল বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্র থেকে লোকজন বাড়ি ফিরতে শুরু করেন। সড়ক ও ট্রেন যোগাযোগ আবার স্বাভাবিক হচ্ছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী চট্টগ্রাম বিভাগের পাঁচ জেলা এবং হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের ৫৮টি উপজেলার সোয়া ১০ লাখ মানুষ পানিবন্দি। তারা খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকটে ভুগছেন। এ পর্যন্ত এই দুর্যোগে সব মিলিয়ে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫১। এর মধ্যে চট্টগ্রামে পাহাড় ধসে মৃত্যু হয়েছে ২৫ জনের। এদিকে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষায় মাঠ প্রশাসনকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, দুর্গতদের মধ্যে ৭১০ টন চাল, প্রায় ৬০ লাখ টাকা এবং ৩৯ হাজার ২৫০ প্যাকেট শুকনা খাবার বিতরণ করা হয়েছে। আরও ৪৯০ টন চাল ও নগদ অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

গতকাল আবার ভারী বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে চট্টগ্রাম নগরে। নগরের বেশ কয়েকটি এলাকা পরিদর্শন করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। তিনি বলেছেন, সরকারের সব প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা সমন্বিতভাবে কাজ করছেন। প্রয়োজনীয় খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, ওষুধ এবং অন্যান্য সহায়তা অব্যাহত থাকবে। গতকাল চট্টগ্রাম নগরের কয়েকটি এলাকার দুর্গত মানুষের হাতে ত্রাণ তুলে দিতে গিয়ে এসব কথা বলেন তিনি।

নগরের চান্দগাঁও সিঅ্যান্ডবি ও মোহরা এবং দক্ষিণ কাট্টলি এলাকা পরিদর্শন করেন এবং পানিবন্দি পরিবারের মধ্যে খাদ্য ও প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করেন তিনি। এ সময় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন, সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ এবং সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমান সঙ্গে ছিলেন।

সাতকানিয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খন্দকার মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘উপজেলার প্রায় প্রধান প্রধান সড়ক থেকে পানি নেমে গেছে। তবে নিচু জায়গায় এখনও পানি রয়ে গেছে। জনগণকে দুর্ভোগ থেকে বাঁচাতে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

ইত্তেফাক

‘মেসির সামনে ইংলিশ বাধা’-এটি দৈনিক ইত্তেফাকের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, এটাই সবাই চিন্তা করেছিল, আর্জেন্টিনা সুইজারল্যান্ডকে হারাবে, আর অন্যদিকে ইংল্যান্ড হারাবে নরওয়েকে। সেমিফাইনালে খেলবে আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড। সেটাই হয়েছে। ফুটবলের হিসাব-নিকাশ যারা করেন, তাদের অঙ্ক মিলেছে হুবহু। মেসি এখন ইংলিশ বাধা পার হতে পারবেন কিনা, সে-ই দেখার পালা। ৮৬-র পর আর্জেন্টিনা বার বার হোঁচট খেয়ে ২০২২ বিশ্বকাপে তৃতীয় ট্রফি পেয়েছে। এবার তাদের সামনে চতুর্থ ট্রফি জয়ের সুযোগ। অন্যদিকে ৬৬ বিশ্বকাপে শেষবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল ইংল্যান্ড। বিশ্বকাপের বাছাইয়ে বাদ হওয়ার লজ্জাজনক ইতিহাস লেখা আছে ইংলিশ বইয়ে। বার বার হোঁচট খেয়েছেন ইংলিশরা। ৬০ বছরের অপেক্ষার অবসান হতে পারে এবার। এক ম্যাচ দূরে ইংল্যান্ড। এক ম্যাচ দূরে আর্জেন্টিনা। তাই এ কথা সহজেই বলা যায় ফাইনালের উত্তাপ ছড়াবে আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড সেমিফাইনালে।

বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে স্পেন-ফ্রান্স নিয়ে যা-ই হোক, আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড হবে অলিখিত ফাইনাল। এটাই হবে কঠিন ম্যাচ। রোনালদো, নেইমাররা বিদায় নেওয়ার পর বিশ্বকাপের মশাল হাতে বয়ে বেড়াচ্ছেন আর্জেন্টিনার মেসি। আর্জেন্টিনা বিদায় নিলে বিশ্বকাপের সব আলো নিভে যাবে, এটা হলফ করেই বলা যায়। তখন ইউরোপীয়ানদের দাপট থাকবে বিশ্বকাপের মঞ্চে।

আর্জেন্টিনাকে ঘিরেই এখন লাতিন ফুটবলের সব আকর্ষণ। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আগেও ম্যাচ খেলেছে আর্জেন্টিনা। তবে মেসির জন্য এটি হবে প্রথম পরীক্ষা। আর্জেন্টিনা ইংল্যান্ডের বিপক্ষে খেললেও মেসির খেলা হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টায় ১৬ জুন ইংল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচ খেলবেন মেসি। ফুটবলের জন্য নতুন এক মেসিকে দেখার সুযোগ মিলবে সেই ম্যাচে। মেসি ইংলিশ পরীক্ষায় কেমন করে, সেটা দেখার সুযোগ। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ম্যাচে আগেও ছিলেন মেসি। কিন্তু মেসি ছিলেন বেঞ্চে। খেলা হয়নি। এটা একটা অপূর্ণতা মেসির জন্য। ১৯৬২ থেকে ২০০২, বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড পাঁচ বার মুখোমুখি হয়েছে। এর মধ্যে ইংল্যান্ড জিতেছে তিন বার, দুই বার আর্জেন্টিনার জয় হলেও এক বার টাইব্রেকিংয়ে আর্জেন্টিনা জিতেছিল। অন্য জয়টি (২-১) ছিল ৮৬ বিশ্বকাপে, মেক্সিকোতে। কোয়ার্টার ফাইনালের ম্যাচ। বিশ্বকাপের ইতিহাসের সবচেয়ে ঘটনাবহুল ম্যাচ ছিল এটি। কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের জালে মারাদোনা জোড়া গোল করেছিলেন। এরপর প্রীতি ম্যাচ বিশ্বকাপ ফুটবলের ম্যাচ খেললেও গত ২০ বছরে আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড খেলেনি। মেসি বিশ্বকাপ শুরু করেছেন ২০০৬ সালে। মারাদোনার ঐতিহাসিক ম্যাচ দেখেছে ফুটবল দুনিয়া, ৩৯ বছর বয়সে পা দিয়ে ইউরোপীন পাওয়ার হাউস ইংল্যান্ডের বিপক্ষে মেসি কী করে, সেটা দেখার অপেক্ষায় থাকবে ফুটবল দুনিয়া।

ধারণা ছিল সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে সহজেই জিতে যাবেন মেসিরা। ম্যাচটা সহজেই জিতেছে বলতে পারবে না আর্জেন্টিনা। অথচ ম্যাচটা সহজই ছিল। ১০ মিনিটে মেসির বানিয়ে দেওয়া বলে ম্যাক অ্যালিস্টার গোল করেন, ১-০। এর মধ্যে আর্জেন্টিনার গোল পোস্টে খুব একটা হানা দিতে পারেনি সুইজারল্যান্ড। আর্জেন্টিনার হেলায় সুইজারল্যান্ড সুযোগ নেয়। গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজ প্রথম বার বল ধরেছিলেন ৬৬ মিনিটে। একটা হেড সেভ দিয়েছিলেন। পরপর দুইটা সেভ দিয়েছেন এমিলিয়ানো মার্টিনেজ। ৬৭ মিনিটে গোল শোধ করে সুইসরা। ড্যান অ্যানদোয় গোল করে আর্জেন্টিনার স্বপ্নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এমিলিয়ানো মার্টিনেজের পায়ের ফাঁক দিয়ে গোল করেছেন ড্যান অ্যানদোয়। ম্যাচের মোমেন্টাম ঘুরে যায় সুইসদের একটা লাল কার্ডে। পর্তুগিজ রেফারি জোয়াও পিনহেইরোকে বোকা বানাতে গিয়ে সুইস ফুটবলার এমবোলো নিজেই বোকা হয়ে যান।

আর্জেন্টিনার পারদ্রেসের সঙ্গে ফাউলের ঘটনায় রেফারির চোখ আটকে যায়। ভিএআর দেখে পর্তুগিজ রেফারি জোয়াও পিনহেইরো বুঝে ফেলেন, তাকে বোকা বানানো হয়েছে। রেফারি এমবোলোকে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখিয়ে লাল কার্ড দেখান। সঙ্গে সঙ্গে কাঁদতে শুরু করেন এমবোলো। ১০ জন নিয়েই আর্জেন্টিনাকে ঘোল খাইয়ে দিচ্ছিল সুইজারল্যান্ড। জয়ের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে আর্জেন্টিনা। রোমাঞ্চ ছড়াতে থাকে ম্যাচে। পেন্ডুলামের মতো দুলতে থাকা ম্যাচের ৯০ মিনিট শেষ। অতিরিক্ত ৩০ মিনিটের খেলা, ১১২ মিনিটে গোল পায় আর্জেন্টিনা। মেসির চালিকাশক্তি হুলিয়ান আলভারেজ বক্সের বাইরে থেকে ডান পায়ের বাঁক খাওয়ানো বলে দর্শনীয় গোল করেন, ২-১। ১২০ মিনিট শেষ, তখনো আর্জেন্টাইনদের দম বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা। অতিরিক্তি সময়ের খেলায় আচমকা গোল করেন লাউতেরা মার্টিনেজ, ৩-১। ব্যাস সব উত্তেজনা শেষ হয়। মেসিদের কোচ লিওনেল স্কালনি দৌড়ে ড্রেসিং রুমে ওয়াশ রুমে চলে যান। ফিরেই মেসিদের সঙ্গে উল্লাসে যোগ দেন। স্কালনি রাকঢাক করেননি, বলেছেন ভাগ্য ভালো ছিল বলে জিতেছি।’

বণিক বার্তা

দৈনিক বণিক বার্তার প্রধান শিরোনাম ‘সংরক্ষিত হয়নি ঢাকার ৫ ওয়াটার রিটেনশন পন্ড’। খবরে বলা হয়, গতকাল সকাল ৬টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত ৯ ঘণ্টায় রাজধানী ঢাকায় ৯৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। এর আগের ২৪ ঘণ্টায়ও ঢাকায় ৯৭ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছিল।

দুইদিনের অতিভারি বর্ষণে গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক ও স্থানে পানি জমে জনজীবন কার্যত অচল হয়ে পড়ে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভারি ও অতিভারি বর্ষণে পানি নিষ্কাশনের সক্ষমতা হারিয়েছে কংক্রিটের নগরী। জলাবদ্ধতা নিরসনে কৌশলগত পরিকল্পনায় থাকা রাজধানীর পাঁচটি স্থায়ী জলাধার বা ওয়াটার রিটেনশন পন্ডও সংরক্ষিত হয়নি। অনেক জায়গায় সংরক্ষণের আগেই গত আড়াই দশকে বিভিন্ন স্থাপনা নির্মিত হয়ে গেছে। ফলে সামনের দিনগুলোয় ঢাকায় জলাবদ্ধতা আরো তীব্র রূপ নিতে পারে বলে সতর্ক করেছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা।

গতকালের বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে জুরাইন, শ্যামপুর, যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ, লালবাগ, পলাশী, আজিমপুরসহ বিভিন্ন এলাকার সড়ক, অলিগলি। সরজমিন ঘুরে দেখা যায়, জলাবদ্ধতায় জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। গুলশান, ধানমন্ডি, খিলগাঁওসহ বিভিন্ন এলাকায়ই ছিল হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি। গুলশানে সড়কের ফুটপাত থেকে পানির স্রোত লেকে ভেসে যেতে দেখা গেছে। মানারাত বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন গুলশান লেকের পাড়ে ফুটপাত ভেঙে পানির স্রোত লেকে বইতে দেখা যায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় কোথাও কোথাও কোমর থেকে হাঁটুসমান পানি জমেছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠসহ অনেক হল এলাকা পানিতে ডুবে যায়। মতিঝিল ও আরামবাগ এলাকায়ও কোমর পর্যন্ত ভিজে রাস্তায় চলাচল করতে দেখা যায় পথচারীদের।

রাজধানীর এমন জলাবদ্ধতার ব্যাপারে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন বলছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ঢাকায় বৃষ্টিপাত হয় এমন দিনের সংখ্যা কমে গেছে। কিন্তু একদিনে বৃষ্টির পরিমাণ বেড়েছে। বর্ষায় রাজধানীতে এমন ভারি ও অতিভারি বর্ষণ হলে সে পানি নিষ্কাশনের কোনো সহজ সমাধান দুই সিটি কর্তৃপক্ষের কাছে নেই। এ প্রসঙ্গে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রাজধানীতে ভারি বর্ষণ হলে বেশ কয়েকটি এলাকা থেকে পানি নামতে সময় লাগছে। বিশেষ করে যে স্রোতে পানি নামার কথা তার নিষ্কাশন ব্যবস্থা অনেক জায়গাতেই নেই। আবার বৃষ্টির পানি কোথাও জমা হবে, কোথাও ভূগর্ভস্থ লেয়ারে চলে যাবে এমন সলিড মাটির পরিমাণও কমে এসেছে। ফলে রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসনে নতুন করে পরিকল্পনা করছি। আমরা নতুন রিটেনশন পয়েন্ট, আউটলেট পয়েন্ট ও স্লুইসগেট নির্মাণের কথা ভাবছি।’

ক্রমাগত খোলা জায়গা, সবুজ ও জলাশয় কমার কারণে ঢাকার জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি আগামী দিনে আরো জটিল আকার ধারণ করবে বলে মনে করছেন নগর পরিকল্পনবিদরা। তাদের ভাষ্যে, শুধু বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের সংযোগপথই জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য যথেষ্ট নয়। বরং ভারি বৃষ্টি হলে সে পানি কোথায় গিয়ে জমা হবে সেজন্য স্থায়ী জলাধারও প্রয়োজন। ঢাকায় এমন পাঁচটি স্থায়ী জলাধার বা রিটেনশন পন্ড চিহ্নিত থাকার পরও সেগুলো সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়া হয়নি। ফলে গত আড়াই দশকে এ রিটেনশন পন্ডগুলোর নির্ধারিত স্থানে অনেক স্থাপনা নির্মিত হয়ে গেছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আশরাফুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ঢাকাকে বাঁচানোর জন্য যে কয়টি জরুরি উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন সেগুলোর মধ্যে প্রধানতম হলো রিটেনশন পন্ডগুলো পুনরুদ্ধার করা। এগুলো শুধু বৃষ্টির পানিই ধারণ করবে না, বরং তাপ শোষণ, ভূগর্ভস্থ পানি রিচার্জ, জীববৈচিত্র্য রক্ষাসহ আরো অনেক কাজ করবে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এগুলো দিন দিন দখল হয়ে যাচ্ছে।’

জানা যায়, ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকার ভবিষ্যৎ রূপরেখা নির্ণয়ের জন্য ১৯৯৫ সালে ২০ বছর মেয়াদি একটি কৌশলগত পরিকল্পনা করেছিল রাজউক। পরিকল্পনাটির নাম ছিল ঢাকা মেট্রোপলিটন ডেভেলপমেন্ট প্ল্যান (ডিএমডিপি ১৯৯৫-২০১৫)। সে পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, ভবিষ্যতের ঢাকাকে জলাবদ্ধতা থেকে বাঁচাতে পাঁচটি রিটেনশন পন্ড বা স্থায়ী জলাধার প্রয়োজন। কোন কোন এলাকায় জলাধারগুলো হবে তা চিহ্নিত করে দেয়া হয়েছিল।

পরে রাজউক ডিএমডিপি প্ল্যানের নির্দেশনা অনুযায়ী ২০১০ সালে রাজধানীর জন্য একটি বিশদ আঞ্চলিক পরিকল্পনা বা ড্যাপ প্রণয়ন করে। সে বিশদ পরিকল্পনায় কল্যাণপুর, গোড়ান চটবাড়ি, নাসিরাবাদ, বেরাইদ ও উত্তরখানে বৃহৎ এলাকাজুড়ে (২০০ থেকে ৫০০ একরের বেশি বা কাছাকাছি আয়তনের) স্থায়ী জলাধার বা রিটেনশন পন্ড সংরক্ষণের সুপারিশ করা হয়। এসব রিটেনশন পন্ডের উদ্দেশ্য ছিল রাজধানীর বৃষ্টির পানির আধার তৈরি করা এবং ভূগর্ভস্থ পানি পুনর্ভরণ। বর্তমান ড্যাপ ও ঢাকা ওয়াসা ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যানেও এ এলাকাগুলো স্থায়ী জলাধার হিসেবেই চিহ্নিত করা আছে।

আজকের পত্রিকা

‘মানুষের হাতে বাড়ছে নগদ টাকা’-এটি দৈনিক আজকের পত্রিকার প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, একদিকে নগদ অর্থের ব্যবহার কমিয়ে ক্যাশলেস অর্থনীতি গড়ে তোলার উদ্যোগ। অন্যদিকে ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নিজের কাছেই রাখছে মানুষ। ফলে দেশে ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থের পরিমাণ দ্রুত বাড়ছে। একই সময়ে ব্যাংক আমানতের প্রবৃদ্ধি তুলনামূলক কম থাকায় বিষয়টিকে উদ্বেগের সঙ্গে দেখছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকাররা।

তাঁদের মতে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতে আস্থার সংকট, কয়েকটি ব্যাংকের আর্থিক দুর্বলতা, অনিশ্চিত অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং নগদনির্ভর ব্যবসায়িক সংস্কৃতির কারণে মানুষের মধ্যে হাতে টাকা রাখার প্রবণতা বেড়েছে। এই প্রবণতা দীর্ঘস্থায়ী হলে তা ব্যাংকিং ব্যবস্থার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য বলছে, চলতি বছরের মে মাস শেষে ব্যাংকের বাইরে মানুষের হাতে থাকা নগদ অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৪৯ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা। এক মাস আগে এপ্রিলে এই পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৯৯ হাজার ৪২৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ মাত্র এক মাসেই নগদ অর্থ বেড়েছে ৪৯ হাজার ৯৪৯ কোটি টাকা বা ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ। আর গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ব্যাংকের বাইরে থাকা মুদ্রার প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৮ দশমিক ৯২ শতাংশ। সেই সময় হাতে রাখা টাকার পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৯৩ হাজার ৭৭৮ কোটি টাকা। বিপরীতে একই সময়ে ব্যাংক আমানতের প্রবৃদ্ধি ছিল ১১ দশমিক ৪৪ শতাংশ।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরি আজকের পত্রিকাকে বলেন, মানুষের হাতে নগদ অর্থ বেড়ে যাওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ হলো ব্যাংকের প্রতি আস্থাহীনতা। অনেক আমানতকারী এখন আর ব্যাংকে অর্থ রাখতে নিরাপদ বোধ করছেন না। ফলে দুর্বল ব্যাংকগুলো থেকে তুলে নেওয়া অর্থের একটি অংশ আর ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ফিরে আসছে না।

মুস্তফা কে মুজেরি বলেন, মূল্যস্ফীতির কারণে পরিবারের মাসিক ব্যয়ও বেড়েছে। বাজার, চিকিৎসা, শিক্ষা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় মেটাতে আগের তুলনায় বেশি নগদ অর্থের প্রয়োজন হচ্ছে। আবার অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে অনেক পরিবার হাতে নগদ অর্থ রাখাকে নিরাপদ মনে করছে।

ব্যাংকারদের ভাষ্য, কয়েকটি দুর্বল ব্যাংক থেকে গ্রাহকদের অর্থ তুলে নেওয়ার প্রবণতা এখনো পুরোপুরি থামেনি। উত্তোলিত অর্থের একটি অংশ তুলনামূলক শক্তিশালী ব্যাংকগুলোয় জমা হলেও একটি বড় অংশ নগদ হিসেবে মানুষের হাতে থেকে যাচ্ছে।

দেশ রূপান্তর

দৈনিক দেশ রূপান্তরের প্রধান শিরোনাম ‘বৃষ্টিতে ডুবন্ত নগরী ঢাকা’। খবরে বলা হয়, একদিনের বৃষ্টিতেই রাজধানী ঢাকা গতকাল রবিবার কার্যত অচল হয়ে পড়ে। সকাল থেকে বেশিরভাগ প্রধান সড়ক ও অলিগলি পানির নিচে তলিয়ে যায়। প্রচণ্ড জলাবদ্ধতা ও যানজটে ভয়াবহ দুর্ভোগে পড়েন নগরবাসী। অনেক এলাকায় রাতেও সড়কে পানি দেখা গেছে। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের কর্মীরা জলাবদ্ধতা নিরসনে কাজ করলেও তা জনদুর্ভোগ লাঘবে খুব একটা কার্যকর হয়নি।

আবহাওয়া অফিস গতকাল সন্ধ্যায় জানায়, আগের ২৪ ঘণ্টায় রাজধানীতে ১৭৫ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে, যা চলতি মৌসুমে ঢাকায় একদিনে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত। আবহাওয়াবিদ এ কে এম নাজমুল হক জানান, সক্রিয় মৌসুমি বায়ু এবং পশ্চিমা লঘুচাপের সম্মিলিত প্রভাবে অল্প সময়ের মধ্যে এত ভারী বর্ষণ হয়েছে।

প্রবল বৃষ্টিতে সকাল থেকে রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কে হাঁটুপানি জমে যান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। কোমর পানির কারণে বন্ধ হয়ে যায় নিউমার্কেট। শহরের অলিগলি ও মূল সড়কের পাশের অনেক দোকানপাট ও বিপণিবিতানও বন্ধ ছিল। জলাবদ্ধতার কবলে পড়ে অটোরিকশা, ব্যাটারিচালিত রিকশা, বাস, মোটরসাইকেল ও প্রাইভেটকারসহ বিভিন্ন যানবাহন রাস্তায় বিকল হয়ে পড়ে থাকতে দেখা গেছে। রাজধানীর বিজয় সরণি, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনের সড়ক, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ, কারওয়ান বাজার, ধানম-ি, মিরপুরের কাজীপাড়া, কালশী, সেগুনবাগিচা, আরামবাগ, কাকরাইল, নয়াপল্টন, বিজয়নগর, রাজারবাগ, মালিবাগ, মৌচাক, শান্তিনগর, উত্তরা, বিমানবন্দর, খিলক্ষেত, নিউমার্কেট ও সচিবালয়সহ রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকার সড়ক পানিতে তলিয়ে যায়।

অন্যান্য সময়ের তুলনায় গতকালের জলাবদ্ধতা ছিল দীর্ঘস্থায়ী। কোথাও কোথাও হাঁটুপানি থাকায় যান চলাচল ধীরগতির হয়ে পড়ে। অনেক জায়গায় ফুটপাত তলিয়ে যাওয়ায় পথচারীরা প্রধান সড়ক দিয়ে হাঁটতে বাধ্য হন। সড়কে গণপরিবহনের সংখ্যা তুলনামূলক কম থাকলেও ধীরগতির কারণে বিভিন্ন অংশে যানজট ছিল তীব্র। গন্তব্যে যেতে বিকল্প যানবাহনে বাড়তি ভাড়া দিয়ে যাতায়াত করতে হয়েছে নগরবাসীকে।

রামপুরা বাসস্ট্যান্ডে অপেক্ষারত বেসরকারি চাকরিজীবী আনিসুর রহমান দেশ রূপান্তরকে জানান, আধা ঘণ্টা অপেক্ষা করেও বাসে উঠতে পারেননি। যে দুটি বাস এসেছে, তাতে তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না। অটোরিকশাও বেশি ভাড়া হাঁকাচ্ছে। বাংলামোটর এলাকায় হাফসাতুল ইসলাম নামে একজন বলেন, ‘অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেও বাসে চড়তে পারিনি। অন্য যানবাহন যে পরিমাণ ভাড়া চাইছে সেটা দেওয়া আমার জন্য কষ্টকর।’

এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের বনানী র‌্যাম্প এলাকায় জলাবদ্ধতার কারণে প্রচণ্ড দুর্ভোগ তৈরি হয়। র‌্যাম্পের নিচে পানি জমায় যানবাহনকে গতি কমিয়ে চলতে হয়। এর প্রভাব পড়ে আশপাশের সড়কেও। সামাজিক মাধ্যমে এক সতর্কবার্তায় গুলশান ট্রাফিক বিভাগ জানায়, টানা বর্ষণের কারণে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের বনানী র‌্যাম্পের নিচের অংশ, খিলক্ষেত এবং মহানগরের বিভিন্ন নিচু এলাকায় উল্লেখযোগ্য জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। এতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কে যান চলাচল ধীর হয়ে পড়েছে এবং কোথাও কোথাও দীর্ঘ যানজট তৈরি হয়েছে। দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে নগরবাসীকে প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের না হওয়ার অনুরোধও জানায় গুলশান ট্রাফিক বিভাগ।

দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে নীলক্ষেতসংলগ্ন আজিমপুরে ইডেন মহিলা কলেজের ২ নম্বর গেটের বিপরীত পাশে একটি বড় গাছ উপড়ে পড়ে সড়ক বন্ধ হয়ে যায়। খবর পেয়ে ডিএসসিসি প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আবদুস সালাম ঘটনাস্থলে ছুটে যান। হাঁটুপানিতে দাঁড়িয়ে থেকে তাকে কর্মীদের নির্দেশনা দিতে দেখা গেছে। দুপুর ১টার দিকে গাছটি অপসারণ করার পর সড়কে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক হয়।

বাংলাদেশ প্রতিদিন

‘নগরজুড়ে জলাবদ্ধতা ভোগান্তি’-এটি দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, ছয় ঘণ্টায় ৮২ মিলিমিটার বৃষ্টিতে রাজধানীজুড়ে সৃষ্টি হয় ব্যাপক জলাবদ্ধতা। তলিয়ে যায় রাজপথ থেকে গলিপথ। সীমাহীন ভোগান্তিতে পড়েন নগরবাসী। অনেক স্থানে বাসাবাড়ি, অফিস প্রাঙ্গণেও ওঠে পানি। ঢাকার নিচু অঞ্চলের অনেক জায়গায় বুকসমান পানিতে বন্দি হয়ে পড়ে মানুষ।

শনিবার সন্ধ্যা থেকে গতকাল দুপুর পর্যন্ত কখনো হালকা ও কখনো মাঝারি বৃষ্টিপাত হয়েছে। এতে থমকে যায় জনজীবন। প্রধান সড়ক থেকে অলিগলি ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র সবখানেই জমে হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি। কোথাও যানবাহন বিকল হয়ে দীর্ঘ যানজট, কোথাও দোকানপাট ও বাসাবাড়িতে পানি ঢুকে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। আবার কোথাও নোংরা পানিতে হেঁটে গন্তব্যে পৌঁছাতে বাধ্য হয়েছেন মানুষ। প্রতি বছর বর্ষায় একই চিত্রের পুনরাবৃত্তি হলেও রাজধানীর জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান এখনো অধরাই রয়ে গেছে। অথচ গত ছয় বছরে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন জলাবদ্ধতা নিরসনের নামে দেড় হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। কিন্তু সেই বিপুল ব্যয়ের প্রতিফলন শূন্যই দেখতে পেল নগরবাসী।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত বিগত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকায় বৃষ্টি হয়েছে ১৭৫ মিলিমিটার। যা প্রায় ১৭ বছরের মধ্যে ঢাকায় এক দিনে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের রেকর্ড। এর আগে ২০০৯ সালে এক দিনে ৩৩৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। টানা এ বৃষ্টিতে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। বিশেষ করে ধানমন্ডি, গ্রিন রোড, পান্থপথ, কারওয়ান বাজার, নিউমার্কেট, মতিঝিল, আরামবাগ, যাত্রাবাড়ী, দনিয়া, পূর্ব জুরাইন, লালবাগ, কাজীপাড়া, রোকেয়া সরণি, মিরপুর, কচুক্ষেত, কাফরুল, ইসিবি চত্বর , ভাসানটেক, কল্যাণপুর, বিজয় সরণি, মেরুল বাড্ডা, মিরবাগ, মধুবাগ, পশ্চিম হাজীপাড়া, মগবাজার, ভাটারা, মালিবাগ, মৌচাক, শান্তিনগর, খিলগাঁও, বাসাবো, মতিঝিল ও কমলাপুর এলাকায় বেশি পানি জমে। একই সঙ্গে মহাখালী, ফার্মগেট, কাঁঠালবাগান, বনানী, গুলশান খিলক্ষেত, উত্তরা, দক্ষিণখান ও প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের সামনের সড়কসহ রাজধানীর বেশির ভাগ এলাকার সড়ক ডুবে যায়। অনেক বাসাবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকেছে। কোথাও ছিল হাঁটু, কোথাও প্রায় কোমরসমান পানি দেখা গেছে। তবে সাপ্তাহের প্রথম কর্মদিবস হওয়ায় গতকাল সড়কে যানবাহন ও মানুষের উপস্থিতি ছিল বেশি। কিন্তু ডুবে যাওয়া সড়কের বিভিন্ন অংশে বিকল হয়ে পড়ে থাকে সিএনজিচালিত অটোরিকশা, বাস ও প্রাইভেট কার। এতে বিভিন্ন স্থানে যানজট দেখা দেয়। ভোগান্তিতে পড়েন কর্মজীবী মানুষ।

মিরপুর এলাকার বাসিন্দা বেসরকারি চাকরিজীবী আরিফুল ইসলাম বলেন, সকালে বাসা থেকে বের হয়ে মনে হয়েছে রাস্তা নয়, যেন খাল পার হচ্ছি। কোথায় ম্যানহোল বা কোথায় গর্ত কিছুই বোঝার উপায় ছিল না। কাপড়, জুতা সব ভিজে গেছে। প্রতিবার বর্ষায় একই কষ্ট ভোগ করতে হয়। এত উন্নয়নের কথা শোনা যায়, কিন্তু বৃষ্টি হলেই সবকিছু পানির নিচে চলে যায়।

বিজয় সরণি ও তেজগাঁও হয়ে হাতিরঝিলের দিকে আসা সিএনজিচালক জাহিদুর রহমান বলেন, আসার পথে একাধিক সড়ক ও অলিগলি পুরোপুরি পানিতে তলিয়ে থাকতে দেখেছি। জমে থাকা পানিতে দু-একটি অটোরিকশা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চালকদের ঠেলে নিয়ে যেতেও দেখেছি। বলতে গেলে পুরো ঢাকা সিটির সব সড়কেই জলাবদ্ধতা ছিল।

অথচ ভারী বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা যেন না হয় সেজন্য ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন গত ছয় বছরে দেড় হাজার কোটি টাকার বেশি খরচ করেছে। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন খাল থেকে বর্জ্য অপসারণ, ড্রেন সংস্কার ও ড্রেন পরিষ্কার বাবদ প্রায় ৫৭৫ কোটি টাকা খরচ করে। অন্যদিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন খাল উন্নয়ন, নর্দমা ও খাল পরিষ্কার এবং জলাবদ্ধতা নিরসনে ৯২৬ কোটি টাকা। দুই সিটির প্রকৌশল বিভাগ সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন