ফরাসিদের ফুটবল-রঙ্গ: টাক, গোঁফ আর জ্যোতিষীর গল্প

ফরাসিদের ফুটবল-রঙ্গ: টাক, গোঁফ আর জ্যোতিষীর গল্প

ফন্ট সাইজ:

বিশ্বফুটবলের সুবিশাল এবং বর্ণাঢ্য মঞ্চে ফরাসিদের দাপট, আবেগ এবং পাগলামি বরাবরই অন্যরকম উন্মাদনার জন্ম দেয়। বিশেষ করে ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপে দিদিয়ের দেশমের দল যখন অপ্রতিরোধ্য ঝড়ের মতো সেমিফাইনালে পৌঁছে গেছে, তখন ফরাসি ফুটবলের অন্দরমহলের নানা চমকপ্রদ, ঐতিহাসিক ও হাস্যকর ঘটনা ফিরে দেখা বেশ প্রাসঙ্গিক। আধুনিক ফুটবলের এই চরম অনিশ্চয়তা ও মানসিক চাপ সামলাতে ফরাসি খেলোয়াড় ও কোচেরা যুগে যুগে এমন সব অদ্ভুত কুসংস্কারের আশ্রয় নিয়েছেন বা এমন সব ঘটনার জন্ম দিয়েছেন, যা শুনলে যেকোনো ফুটবলপ্রেমীর ঠোঁটেই হাসি ফুটে উঠবে। ফরাসি ফুটবল মানেই যেন মাঠের ভেতরের অবিশ্বাস্য সব স্কিল আর মাঠের বাইরের চরম নাটকীয়তার নিখুঁত সংমিশ্রণ।

ছবি - জাস্ট ফন্টেইন

ফরাসি ফুটবলের এই হাস্যকর বা অদ্ভুত ঘটনাগুলোর শিকড় খুঁজতে গেলে আমাদের ফিরে যেতে হবে ১৯৫৮ সালের বিশ্বকাপে। ফরাসি কিংবদন্তি জাস্ট ফন্টেইন সেবার এক বিশ্বকাপে ১৩ গোল করে এমন অতিমানবিক রেকর্ড গড়েছিলেন, যা আজও কেউ ভাঙতে পারেনি এবং হয়তো ভবিষ্যতেও কেউ পারবে না। কিন্তু এর পেছনের সবচেয়ে মজাদার ও অবিশ্বাস্য সত্যটি হলো, এই ১৩টি গোল ফন্টেইন নিজের বুট পায়ে দিয়ে করেননি! টুর্নামেন্ট শুরুর ঠিক আগে দলের শেষ অনুশীলনে তার নিজের বুট জোড়া ছিঁড়ে গেলে তিনি চরম বিপাকে পড়েন। ১৯৫৮ সালের সেই যুগে আজকের মতো স্পন্সরদের ছড়াছড়ি ছিল না যে চাইলেই নিমেষের মধ্যে নতুন বুট চলে আসবে। জুতো সরবরাহকারীরা কোয়ার্টার-ফাইনাল পর্যন্ত অপেক্ষা করত নতুন বুট দেওয়ার জন্য। বাধ্য হয়ে ফন্টেইন তার বদলি খেলোয়াড় ও সতীর্থ স্তেফান ব্রুয়ের কাছে গিয়ে তার বুট জোড়া ধার চান, কারণ সৌভাগ্যবশত দুজনেরই পায়ের মাপ একেবারে হুবহু এক ছিল। সেই ধার করা জুতো পায়ে দিয়েই ফন্টেইন একের পর এক গোল করে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ ছিন্নভিন্ন করে দেন। প্যারাগুয়ের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক, যুগোস্লাভিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোল, স্কটল্যান্ড এবং উত্তর আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে গোল করার পর সেমিফাইনালে পেলের ব্রাজিলের কাছে হারলেও তিনি গোল পেয়েছিলেন। আর তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে একাই ৪ গোল করে তিনি টুর্নামেন্টে নিজের গোলের সংখ্যা ১৩-তে নিয়ে যান। টুর্নামেন্ট শেষে তিনি সেই ইতিহাসগড়া জুতাজোড়া আবার পরম মমতায় ব্রুয়েকে ফেরত দিয়ে দেন, যা ফুটবলের ইতিহাসে এক অন্যতম সেরা রম্য উপাখ্যান হিসেবে বেঁচে আছে। পরবর্তীকালে এক সাক্ষাৎকারে ফন্টেইন মজা করে বলেছিলেন যে ওই ঐতিহাসিক জুতাজোড়া হয়তো কোনো ডাস্টবিনে বা ভাগাড়ে হারিয়ে গেছে।

এরপর আসে ১৯৭৮ সালের আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপের সেই অদ্ভুত ঘটনা, যা ফরাসি ফুটবলের ইতিহাসে চিরস্থায়ী হাস্যরসের জন্ম দিয়েছে। সেবার ১০ জুন মার দেল প্লাটা স্টেডিয়ামে হাঙ্গেরির বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে ফরাসি ফুটবল ফেডারেশনের এক চরম প্রশাসনিক ভুলে ফ্রান্স এবং হাঙ্গেরি—উভয় দলই সাদা জার্সি পরে মাঠে হাজির হয়! ১৯৭৮ সালে বিশ্বের বেশিরভাগ মানুষের ঘরেই ছিল সাদাকালো টেলিভিশন, আর সাদাকালো টিভিতে দুটি দলের খেলোয়াড়দের আলাদা করে চেনার জন্য একটি দলকে গাঢ় রঙের এবং অন্য দলকে হালকা রঙের জার্সি পরতে হতো। ফিফা থেকে আগেই জানানো হয়েছিল ফ্রান্সকে নীল রঙের হোম জার্সি পরতে, কিন্তু ফরাসি ফুটবল ফেডারেশনের তৎকালীন সভাপতি অঁরি পাত্রেল সেই নোটিশটি দেখতেই ভুলে গিয়েছিলেন। উপায় না দেখে ফরাসি দল চরম বিপদে পড়ে, কারণ তাদের নীল জার্সিগুলো তখন প্রায় ৪০০ কিলোমিটার দূরে রাজধানী বুয়েনস আইরেসে রাখা ছিল। শেষ পর্যন্ত স্থানীয় একটি আর্জেন্টাইন ক্লাব 'অ্যাটলেটিকো কিম্বার্লি'-এর সবুজ-সাদা স্ট্রাইপযুক্ত জার্সি ধার করে মাঠে নামতে বাধ্য হয় ফরাসিরা। কিন্তু বিপত্তির এখানেই শেষ ছিল না। ওই ক্লাবের কাছে কেবল ১৪টি জার্সি ছিল, অথচ ফরাসি দলে খেলোয়াড় ছিলেন ১৬ জন। তড়িঘড়ি করে সেই জার্সিতে নম্বর ইস্ত্রি করে বসানোর জন্য খেলা ৪০ মিনিট দেরিতে শুরু হয়েছিল। নম্বর বসানোর এই তাড়াহুড়োর কারণে খেলোয়াড়দের শর্টসের নম্বরের সাথে জার্সির নম্বরের কোনো মিলই ছিল না! ফরোয়ার্ড ডমিনিক রোশেতো তার নিজস্ব ১৮ নম্বরের বদলে ৭ নম্বর জার্সি পরে মাঠে নামেন, আর ক্লদ পাপি পরেন ১০ নম্বর জার্সি। তবুও ফরাসিরা সেই উদ্ভট পোশাকেই ম্যাচটি ৩-১ গোলে জিতেছিল, যা বিশ্বকাপে অন্য কোনো ক্লাবের জার্সি পরে কোনো জাতীয় দলের জয়ের একমাত্র নিদর্শন।

মাঠের বাইরের এসব ঘটনার পাশাপাশি ফরাসি খেলোয়াড়দের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার নিয়েও চরম হাস্যকর রেকর্ড রয়েছে, যার জ্বলন্ত উদাহরণ হলেন ফরাসি ডিফেন্ডার ফ্রাঙ্ক জুরিয়েত্তি। ২০০৫ সালের ১২ অক্টোবর বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের এক ম্যাচে সাইপ্রাসের বিপক্ষে স্তাদ দে ফ্রান্সে ফ্রান্স যখন জিনেদিন জিদান, সিলভ্যাঁ উইল্টর্ড, ভিক্যাশ ধোরাসো এবং লুডোভিক জুলির গোলে ৪-০ ব্যবধানে এগিয়ে, তখন বদলি খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নামার সুযোগ পান ৩০ বছর বয়সী এই লেফট-ব্যাক। কোচ রেমোঁ দোমেনেখ খেলার একেবারে অন্তিম মুহূর্তে, অর্থাৎ ৯১তম মিনিটে তাকে মাঠে নামার নির্দেশ দেন। সিডনি গোভুর বদলি হিসেবে জুরিয়েত্তি যখন প্রবল উদ্দীপনা নিয়ে মাঠে পা রাখেন, তখন ফরাসি গোলরক্ষক গ্রেগরি কুপে গোলকিক নিচ্ছিলেন। কুপের পা থেকে বলটি শূন্যে ভাসতে না ভাসতেই জার্মান রেফারি ম্যাচ শেষের বাঁশি বাজিয়ে দেন! আশ্চর্যের বিষয় হলো, জুরিয়েত্তি মাঠে পা রাখার ঠিক ৫ সেকেন্ড পরই খেলা শেষ হয়ে যায়। তিনি একবার বল ছোঁয়ারও সুযোগ পাননি এবং এরপর আর কখনোই ফরাসি জাতীয় দলের হয়ে মাঠে নামার ডাক পাননি। এটি আজও আন্তর্জাতিক ফুটবলের ইতিহাসে সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত ক্যারিয়ার হিসেবে স্বীকৃত। তবে জুরিয়েত্তি এই ৫ সেকেন্ড নিয়েই অত্যন্ত গর্বিত। তিনি বলেন যে অন্তত তিনি ফ্রান্সের হয়ে মাঠে তো নেমেছিলেন, যা তার জীবনের এক চরম পাওয়া।

এই ধরনের ঐতিহাসিক পাগলামি আর কুসংস্কারের চর্চা আধুনিক যুগেও ফরাসি ফুটবলে প্রবলভাবে অব্যাহত ছিল। ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপে, যেবার ফ্রান্স নিজেদের মাটিতে প্রথমবারের মতো বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে, সেই দলের এক অদ্ভুত এবং হাস্যকর কুসংস্কার গোটা বিশ্বের নজর কেড়েছিল। দলের নির্ভরযোগ্য সেন্টার-ব্যাক লরাঁ ব্লাঁ প্রতিটি ম্যাচের কিক-অফের ঠিক মুহূর্তে তাদের গোলরক্ষক ফাবিয়েন বার্থেজের কাছে ছুটে যেতেন এবং তার সম্পূর্ণ ন্যাড়া বা চকচকে টাক মাথায় একটি সশব্দ চুম্বন করতেন। দলের খেলোয়াড়দের মনে এক অদ্ভুত দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছিল যে, বার্থেজের চকচকে টাক মাথায় ব্লাঁর এই জাদুকরী চুম্বন তাদের রক্ষণভাগকে অভেদ্য করে তুলবে এবং প্রতিপক্ষের কোনো স্ট্রাইকারই তাদের জালে বল জড়াতে পারবে না। এবং আশ্চর্যের বিষয় হলো, সেবারের টুর্নামেন্টে তারা সত্যিই অসাধারণ ডিফেন্স করে বিশ্বকাপ জিতেছিল, আর বার্থেজের সেই টাক মাথা ফরাসি ফুটবলের অন্যতম আইকনিক প্রতীকে পরিণত হয়েছিল।

এরপর আসে ২০০৬ সালের জার্মানি বিশ্বকাপ, যেখানে ফরাসি দলের দায়িত্বে ছিলেন ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত এবং অদ্ভুত কোচ রেমোঁ দোমেনেখ। তিনি ছিলেন এমন এক কোচ, যিনি খেলোয়াড়দের ফর্ম, ফিটনেস বা ট্যাকটিক্যাল সামর্থ্যের চেয়ে তাদের 'রাশিচক্র' বা জ্যোতিষশাস্ত্রের ওপর অনেক বেশি ভরসা করতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে 'বৃশ্চিক' রাশির জাতকরা দলের মধ্যে বিভেদ তৈরি করে এবং তারা অত্যন্ত আত্মকেন্দ্রিক হয়। তাই ২০০৬ সালের বিশ্বকাপে তিনি আর্সেনালের তারকা খেলোয়াড় রবার্ট পিরেসকে দলে নেননি বলে ফরাসি মিডিয়ায় ব্যাপক গুঞ্জন রয়েছে, কারণ পিরেস ছিলেন বৃশ্চিক রাশির জাতক। দোমেনেখ অবশ্য পরে দাবি করেছিলেন যে তিনি দল নির্বাচনের জন্য সরাসরি জ্যোতিষশাস্ত্র ব্যবহার করতেন না, বরং খেলোয়াড়দের মনস্তত্ত্ব বোঝার জন্য এর সাহায্য নিতেন। তার যুক্তি ছিল, একজন 'মকর রাশি' এবং একজন 'মিথুন রাশি'র খেলোয়াড়কে কখনো একই পদ্ধতিতে সামলানো যায় না। জ্যোতিষশাস্ত্র দিয়ে দল চালানোর এই হাস্যকর প্রচেষ্টা ফরাসি ফুটবলের ইতিহাসে এক চিরস্থায়ী রম্য উপাখ্যানে পরিণত হয়েছে। তবে অদ্ভুতভাবে, জিদান, থুরাম এবং ম্যাকালেলেদের মতো অবসর ভেঙে ফিরে আসা তারকাদের নিয়ে তিনি সেই বিশ্বকাপের ফাইনালে পৌঁছে গিয়েছিলেন, যদিও শেষ পর্যন্ত জিনেদিন জিদানের সেই বিখ্যাত 'হেডবাট' বা ঢুস মারার ট্র্যাজেডি এবং টাইব্রেকারে ইতালির কাছে হারের মাধ্যমে তাদের স্বপ্নভঙ্গ হয়েছিল।

এই অদ্ভুত কুসংস্কারের ঐতিহ্য ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপেও প্রবলভাবে ফিরে আসে, যেবার ফ্রান্স তাদের ইতিহাসে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ শিরোপা ঘরে তোলে। সেবারের জাদুকরী বস্তুটি কোনো টাক মাথা বা জ্যোতিষশাস্ত্র ছিল না, ছিল দলের রিজার্ভ ডিফেন্ডার আদিল রামির পুরু, পেঁচানো এবং রীতিমতো রাজকীয় একটি গোঁফ। ফরাসি ফরোয়ার্ড অঁতোয়ান গ্রিজম্যান প্রথম খেয়াল করেন যে ম্যাচের আগে রামির সেই জাদুকরী গোঁফ ছুঁয়ে মাঠে নামলেই তিনি দুর্দান্ত খেলছেন এবং গোল পাচ্ছেন। এরপর থেকে এটি দলের একটি অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়। প্রতি ম্যাচের আগে গ্রিজম্যান থেকে শুরু করে দলের অন্যান্য খেলোয়াড় এবং এমনকি কোচ দিদিয়ের দেশম পর্যন্ত সবাই সৌভাগ্য কামনায় রামির গোঁফে পরম মমতায় হাত বুলাতে শুরু করেন। এই 'গোঁফ-তত্ত্ব' বা মনস্তাত্ত্বিক টনিক এতটাই কার্যকরী ছিল যে গ্রিজম্যান ফাইনালে গোলসহ টুর্নামেন্টে মোট চারটি গোল করেন এবং ফ্রান্স বিশ্ব চ্যাম্পিয়নের মুকুট পরে।

তবে ২০২৬ সালের জুলাই মাসে আমেরিকা, কানাডা ও মেক্সিকোতে অনুষ্ঠিত হওয়া ৪৮ দলের এবং ১০৪ ম্যাচের এই সুবিশাল ও ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপে ফরাসিদের আর কোনো জাদুকরী গোঁফ, টাক মাথা বা ধার করা জুতোর দরকার পড়ছে না। তারা একেবারে নিজেদের কৌশলগত শ্রেষ্ঠত্ব, অসীম স্ট্যামিনা এবং নিখুঁত ফিনিশিং দিয়েই একের পর এক প্রতিপক্ষকে গুঁড়িয়ে দিচ্ছে। ১৬ জুন নিউ ইয়র্কের মেটলাইফ স্টেডিয়ামে গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচে তারা আফ্রিকান পরাশক্তি সেনেগালকে ৩-১ ব্যবধানে হারিয়ে নিজেদের বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করে। এই ম্যাচে অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে জোড়া গোল করেন এবং তরুণ সেনসেশন ব্র্যাডলি বারকোলা একটি দুর্দান্ত গোল করেন। এরপর ২২ জুন ফিলাডেলফিয়ায় তারা ইরাককে অনায়াসে ৩-০ গোলে বিধ্বস্ত করে এবং এই ম্যাচেও এমবাপ্পে নিজের দাপট বজায় রেখে দুটি গোল করেন। তবে গ্রুপ পর্বের সবচেয়ে বড় চমকটি আসে শেষ ম্যাচে, যেখানে ২৬ জুন বোস্টনে আর্লিং হালান্ডের মতো বিশ্বসেরা স্ট্রাইকারের শক্তিশালী নরওয়েকে ৪-১ গোলে উড়িয়ে দেয় ফ্রান্স। এই ম্যাচে উসমান দেম্বেলে রীতিমতো তাণ্ডব চালিয়ে প্রথমার্ধেই বিশ্বকাপের ইতিহাসের অন্যতম দ্রুততম হ্যাটট্রিক করার অবিশ্বাস্য গৌরব অর্জন করেন। গ্রুপ পর্বের তিন ম্যাচে তারা মোট ১০টি গোল করে এবং মাত্র ২টি গোল হজম করে পূর্ণ ৯ পয়েন্ট নিয়ে নকআউট পর্বে পা রাখে।



নকআউট পর্বেও ফরাসিদের এই ফুটবলীয় তাণ্ডব অব্যাহত থাকে। ৩০ জুন রাউন্ড অফ ৩২-এর ম্যাচে নিউ ইয়র্কে তারা সুইডেনকে ৩-০ গোলের সহজ ব্যবধানে পরাজিত করে শেষ ষোলোতে জায়গা করে নেয়। এই ম্যাচেও এমবাপ্পে জোড়া গোল করে বিশ্বকাপে তার মোট গোলের সংখ্যা ১৮-তে নিয়ে যান এবং বারকোলা টুর্নামেন্টে তার দ্বিতীয় গোলটি করেন। তবে ৪ জুলাই ফিলাডেলফিয়ায় অনুষ্ঠিত রাউন্ড অফ ১৬-তে লাতিন আমেরিকার দল প্যারাগুয়ের বিপক্ষে ফরাসিদের কঠিন এক শারীরিক ও মানসিক পরীক্ষার মুখে পড়তে হয়। প্যারাগুয়ে অত্যন্ত রক্ষণাত্মক কৌশল অবলম্বন করে ফরাসি খেলোয়াড়দের ওপর শারীরিকভাবে চড়াও হয় এবং ম্যাচটিকে আক্ষরিক অর্থেই যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করেছিল। কিন্তু ফরাসিরা মাথা ঠান্ডা রাখে এবং প্রবল ট্যাকলের মুখেও ভয় না পেয়ে উল্টো প্যারাগুয়ের ওপর চাপ বাড়াতে থাকে। অবশেষে দ্বিতীয়ার্ধে তারা একটি পেনাল্টি আদায় করে নেয় এবং সেখান থেকে নিখুঁত শটে গোল করে এমবাপ্পের দলকে ১-০ ব্যবধানের কষ্টার্জিত জয় এনে দেন। এই ম্যাচ প্রমাণ করে যে ফরাসিরা শুধু সুন্দর ফুটবলই খেলে না, প্রয়োজনে মাটি কামড়ে যুদ্ধ করতেও জানে। ফরাসি তরুণ তারকা রায়ান চেরকি ম্যাচ শেষে দম্ভভরে বলেছিলেন, "যারা আমাদের সাথে যুদ্ধ করতে চায়, তাদের এই পরিণতির জন্যই প্রস্তুত থাকা উচিত।"

এরপর ৯ জুলাই বোস্টন স্টেডিয়ামে বহুল কাঙ্ক্ষিত কোয়ার্টার-ফাইনালে তাদের মুখোমুখি হয় টানা ৩৪ ম্যাচ অপরাজিত থাকা আফ্রিকা মহাদেশের বিস্ময় মরক্কো। ২০২২ সালের বিশ্বকাপের সেমিফাইনালেও এই মরক্কোকেই হারিয়েছিল ফ্রান্স। এবারও ম্যাচের শুরু থেকেই ফ্রান্স মরক্কোকে চেপে ধরে। প্রথমার্ধে এমবাপ্পে একটি পেনাল্টি পেয়েছিলেন, যা মরক্কোর গোলরক্ষক ইয়াসিন বুনু অসাধারণ দক্ষতায় রুখে দিয়েছিলেন। বুনু ভেবেছিলেন তিনি হয়তো মরক্কো শিবিরে প্রাণ সঞ্চার করেছেন, কিন্তু উল্টো এই ঘটনা ফরাসিদের আরও ক্ষিপ্ত ও মরিয়া করে তোলে। দ্বিতীয়ার্ধের ৬০ মিনিটের মাথায় দেজিরে দুয়ের একটি দুর্দান্ত পাস থেকে বল পেয়ে বক্সের বাইরে থেকে এক চোখধাঁধানো বাঁকানো শটে গোল করে এমবাপে দলের জয় নিশ্চিত করেন। শেষ পর্যন্ত ২-০ গোলে মরক্কোর ৩৪ ম্যাচের অপরাজিত যাত্রার অবসান ঘটিয়ে ফরাসিরা সেমিফাইনালে নিজেদের স্থান পাকা করে। ফরাসি দলের এই সাফল্যের নেপথ্যে শুধু আক্রমণভাগ নয়, তাদের গোলরক্ষক মাইক মাইনিয়ানের বিশাল অবদান রয়েছে। তিনি এই টুর্নামেন্টে টানা পাঁচটি ক্লিন শিট বজায় রেখে নকআউট পর্বে এখনো পর্যন্ত কোনো গোলই হজম করেননি।

এভাবেই গ্রুপ পর্ব থেকে শুরু করে নকআউটের বাধা পেরিয়ে টানা ধারাবাহিক জয়রথ ছুটিয়ে ফ্রান্স আগামী ১৪ জুলাই ডালাসের এটিঅ্যান্ডটি স্টেডিয়ামে প্রথম সেমিফাইনালে বর্তমান ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন স্পেনের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে। স্পেন তাদের জমাট রক্ষণভাগের জন্য সুপরিচিত এবং এই টুর্নামেন্টেও তারা নিজেদের জাত চিনিয়েছে, অন্যদিকে ফ্রান্স এবারের টুর্নামেন্টে সবচেয়ে বেশি ১৬টি গোল করে তাদের বিধ্বংসী আক্রমণভাগের প্রমাণ দিয়েছে। এর ফলে, এটি হতে যাচ্ছে স্পেনের জমাট রক্ষণ বনাম ফরাসিদের ভয়ংকর আক্রমণের এক মহাকাব্যিক লড়াই। ধার করা বুট, জ্যোতিষশাস্ত্র আর গোঁফে হাত বুলিয়ে ভাগ্য খোঁজার হাস্যকর যুগ পেরিয়ে দিদিয়ের দেশমের বর্তমান ফরাসি দল এখন তাদের নিখুঁত ফুটবলীয় দক্ষতার জাদুকরী সুবাস ছড়াচ্ছে পুরো বিশ্বজুড়ে। ফুটবল বিশ্ব এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে দেখার জন্য যে, স্প্যানিশ রক্ষণভাগের ঘাম আর ফরাসি স্ট্রাইকারদের গতির এই মহাকাব্যিক লড়াইয়ে শেষ হাসি কে হাসে এবং ফ্রান্স টানা তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে পৌঁছাতে পারে কি না। ফরাসি ফুটবলের এই রোমাঞ্চকর যাত্রা ফুটবলপ্রেমীদের মনে চিরকাল অনন্য স্থান দখল করে থাকবে।

---

লেখক

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন